সভ্যতার সূচনা থেকেই মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, একাকীত্ব মানুষের কাছে বরাবরই অসহনীয়। মানুষের সারাজীবনের স্বপ্ন একজন মনের মানুষকে নিজের জীবনে পাওয়া। বয়ঃসন্ধির সূচনা লগ্ন থেকেই সব মানুষের মনে আস্তে আস্তে এই মনের মানুষ খুঁজে বের করার ইচ্ছাটা জেগে উঠতে থাকে।
নব্বইয়ের দশকে বড় হয়ে ওঠা ছেলে-মেয়েদের মনের মানুষ খুঁজে নেওয়ার উপায় ছিল কমন টিউশন ব্যাচ আর বসন্ত পঞ্চমী অর্থাৎ সরস্বতী পূজা! ধীরে ধীরে অলিখিত নিয়মে বাঙালির ভ্যালেন্টাইনস ডে হয়ে উঠেছে এই বসন্ত পঞ্চমী। এককালে স্কুল-কলেজগুলিতে এই দিনে পাটভাঙা লাল-হলুদ রঙা শাড়ি আর নতুন পাঞ্জাবি পরে সরস্বতী ঠাকুর দেখে বেরোনো, বন্ধুদের সাথে মিলে প্রসাদ খাওয়ার ধুম পড়ে যেত! তার ফাঁকে ফাঁকে চলত ভীরু প্রেমিক-প্রেমিকার দৃষ্টি বিনিময়, কখনও খুব সন্তর্পণে কয়েক পা একসাথে হাঁটা, একটু সাহসী হলে হাতে হাত রাখা! বাগদেবীর পূজার ফাঁকে ফাঁকে উদযাপিত হত নবীন প্রেমের প্রথম মুহূর্ত! তারপর হয়তো সাহস করে বাড়ির ল্যান্ডলাইনের বা সদ্য আগত মুঠোফোনের নম্বর বিনিময়! কত শত প্রেমের উপাখ্যানের সূচনা হয়েছে এই দিনটা থেকেই! এরপরেই তাল মিলিয়ে চলত ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে ভালোবাসার উদযাপন! ৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি অবধি টানা রোজ ডে, কিস ডে, হাগ ডে, চকলেট ডে, টেডি ডে, প্রমিজ ডে আর অবশ্যই সব শেষে ভ্যালেন্টাইনস ডে।
নব্বইয়ের দশক অবধি এই দিনগুলিতে মা-এর কাছ থেকে আদায় করা শাড়ি পরে অনভ্যস্ত পায়ে হেঁটে আসা লাজুক তরুণীরা তুফান তুলত তাদের প্রেমিকের বুকে! এই বিশেষ দিনগুলোতে সংগোপনে আদান-প্রদান হত গোলাপ ফুল, Dairy Milk চকলেট, ছোট্ট সাদা বা গোলাপি টেডি বিয়ার। আর্চিস-এর গ্রিটিংস কার্ডের আলাদাই মূল্য ছিল সেই সময়! কত লুকিয়ে লুকিয়ে, বিশ্বস্ত বন্ধুদের মাধ্যমে বা কখনও টিউশন পড়ে ফেরার পথে আদান-প্রদান হত সেইসব রঙিন খাম, ছোট্ট ছোট্ট গিফটের প্যাকেট। বাড়ি এসে সেসব লুকিয়ে রাখাটাও ছিল এক বিশাল ব্যাপার। খুব সাহসী হলে স্কুল-কলেজের নাম করে বেরিয়ে পার্কে বা গঙ্গার ধারে নয়তো ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ঘুরতে যাওয়া, কয়েক ঘণ্টা পাশাপাশি বসে প্রিয় মানুষটির কাঁধে মাথা রেখে মনের কথা বলে একটু সময় কাটানো! কিন্তু সন্ধ্যার মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসাটা ছিল বাধ্যতামূলক। নব্বইয়ের দশকের প্রেম ছিল বড় লাজুক আর ভীরু সতর্ক প্রেম। লোকে কী বলবে, কেউ দেখতে পেল কিনা, বাড়িতে কেউ জেনে গেল কিনা — এই নিয়ে চলত বুক ধুকপুক!
সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করব এখানে!
এখনকার তরুণ প্রজন্মের কাছে কিন্তু প্রেম আর ডেটিং-এর সংজ্ঞা অনেকটাই পাল্টেছে। দু মিনিটে বানানো ইনস্ট্যান্ট ম্যাগি নুডলসের মতো এখন ভালোবাসা, প্রেম, বন্ধুত্বও হয়েছে চটজলদি! Tinder, Hinge, OkCupid, Bumble, Chat & Date, Aisle... বর্তমান যুগে খুব পরিচিত কিছু নাম। তবু সকলের জ্ঞাতার্থে জানাই, এগুলি আর কিছুই নয় — বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপের নাম। আধুনিক তরুণ প্রজন্ম অর্থাৎ Gen Z প্রেম বা বন্ধুত্বের জন্য মনের মানুষ খুঁজে নেওয়ার উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, WhatsApp-এর মতো সামাজিক মাধ্যমের পাশাপাশি এই অ্যাপগুলিকে। এখন সেই জন্য বসন্ত পঞ্চমী বা ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকতে দেখা যায় না নবীন প্রেমিক-প্রেমিকাদের! নতুন শাড়ি, পাটভাঙা পাঞ্জাবি আর সেই মুগ্ধতা জাগায় না মনে! এখন আর প্রেম বা ভালোবাসার উপায় হিসেবে নবীন প্রেমিক-প্রেমিকারা প্রেমপত্র বা কমন ফ্রেন্ডের সাহায্য খোঁজে না। এখন সামাজিক মাধ্যমে সহজেই যোগাযোগ করা যায় নিজের পছন্দের লোকের সাথে।
সাধারণত নিজের নাম, ঠিকানা, পূর্ণ পরিচয় এবং নিজের preference জানিয়ে সাবস্ক্রিপশন নিয়ে এই ডেটিং অ্যাপগুলিতে নিজের প্রোফাইল তৈরি করে আধুনিক যুগের তরুণ-তরুণীরা। তারপর প্রোফাইলে উল্লিখিত ঠিকানা, প্রেফারেন্স ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে অ্যাপ খুঁজে দেয় suitable match। এই সব suitable match-এর মধ্যে পছন্দসই লোকদের সাথে চ্যাটিং-এর মাধ্যমে এগোয় এই ভার্চুয়াল ফ্রেন্ডশিপ। প্রথমজন যদি সাড়া না দেয় আহ্বানে, সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ আছে পরবর্তী পছন্দসই মানুষটিকে তথা পরবর্তী "শিকার"কে আক্রমণ করার!
ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে মানুষে-মানুষে যোগাযোগ হয়তো এই ভাবে খুব সহজেই হয়ে যায়, প্রযুক্তির কাছে হার মানে দূরত্ব। কিন্তু সত্যিই মনের সম্পর্ক তৈরি হয় কি?! এই অতি নৈকট্য কি সম্পর্কের মাধুর্য আদৌ বজায় রাখতে সক্ষম? নিজের মনের মানুষটিকে একটিবারের জন্য চোখের দেখা দেখতে পাওয়া, প্রথমবার তার হাতে যৎসামান্য উপহার তুলে দেওয়া বা প্রথম তাকে ট্র্যাডিশনাল পোশাকে হেঁটে আসতে দেখা — এইসব অনুভূতি কী আসে সামাজিক মাধ্যমের যান্ত্রিক টাইপিংয়ে?! বর্তমান কর্মব্যস্ত জীবনে ক্রমবর্ধমান একাকীত্বের কারণে মানুষ যতই সামাজিক মাধ্যমে নিজের সঙ্গী খুঁজে নিতে তৎপর হচ্ছে, ততই জড়িয়ে যাচ্ছে না কি বিভিন্ন অনলাইন প্রতারণার চক্করে? মানুষের একাকীত্বকে কাজে লাগানোর জন্যই এখন তৈরি হয়েছে নানা জালিয়াতির চক্র। ডেটিং অ্যাপে একে অপরের প্রোফাইল পছন্দ করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রতারণার প্রথম ধাপ, তারপর চলে টুকটাক মেসেজ, ফোন নম্বর আদান-প্রদান। চ্যাটিং-এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান, কখনও বা চলে sex chat-এর সুড়সুড়ি! অবশেষে দুপক্ষের সম্মতিতে OYO-তে গমন এবং সেখানেই আসে প্রতারণার শেষ ধাপ — প্রতারক তার নিছক ফুর্তিসন্ধানী সঙ্গীটিকে হোটেলের ঘরে নিয়ে গিয়ে বিকৃত পরিস্থিতিতে ফেলে ব্ল্যাকমেল শুরু করে। ফলত নিজের মান-সম্মান, সামাজিক অবস্থানের কথা ভেবে নিছক আনন্দ করতে আসা মানুষটি বাধ্য হয় তার প্রতারক "বন্ধু"কে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে। ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে একাকীত্ব থেকে মুক্তি খুঁজতে গিয়ে মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যায় তরুণ-তরুণীদের, বেশিরভাগ সময়েই।
এখন যেমন অতি সহজেই Gen Z কলকাতায় বসে খুঁজে নিতে পারে দিল্লি বা মুম্বাইয়ে থাকা মনের সঙ্গী বা সঙ্গিনীকে, তেমনি তাদের কাছে সুযোগ আছে দুদিন কথা বলে vibe match না হওয়ার কারণে একজনকে বাতিল খেলনার মতো ফেলে দিয়ে নতুন সঙ্গী বা নতুন খেলনা তৎক্ষণাৎ খুঁজে নেওয়ার। কোনো নতুন সম্পর্ক তৈরি করে তাকে সারা জীবন ধরে আগলে রাখার বা পাশে নিয়ে চলার ধৈর্য মানুষ যেন হারিয়েই ফেলেছে! সব কিছু এখন চাই চটজলদি। চটজলদি রিলেশনশিপে হতে হবে intimate, হতে হবে physical। আবার এতটুকু মতের অমিল, একটু মেসেজের রিপ্লাই আসার দেরি, একটা ফোন কল মিস হয়ে যাওয়ার মতো অপরাধেই এখন নবপ্রজন্ম ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে তার পার্টনারকে। সামাজিক মাধ্যমে এক সপ্তাহের মধ্যে relationship status single থেকে in a relationship হয়ে আবার single নয়তো complicated হয়ে যাচ্ছে কত সহজে! একটা মেসেজ বা টেক্সটের মাধ্যমে ব্রেকআপ, আবার প্যাচ-আপ, আবার ব্রেকআপ — খেলায় মেতে উঠেছে নবপ্রজন্ম। দুদিনের ভার্চুয়াল সম্পর্কে, একে অপরকে ভালো করে না চিনেই দুই পার্টনার চলে যাচ্ছে joy ride-এ, নাইট আউট-এ! যার পরিণতি অনেক সময়েই মেয়েটির rape, murder বা একান্ত ব্যক্তিগত ভিডিও viral হওয়া!
অনেক সময় মেয়েরাও ইচ্ছা করে victim card ব্যবহার করে। নিজেদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিওকে অক্লেশে চালিয়ে দেয় "অবলা নারীর ওপর বলশালী অত্যাচারী পুরুষের করা অত্যাচার" বলে। এখানেও চলে আসে ব্ল্যাকমেলের গল্প। সম্পর্ক কি এতই ঠুনকো যে দুদিন বিবাদ হলেই নিজেদের ব্যক্তিগত আনন্দের মুহূর্তগুলো ব্ল্যাকমেল করার হাতিয়ার হয়ে যায়? মানুষে-মানুষে বিশ্বাসটুকুও আজকাল এত সস্তা হয়ে গেছে?
ডেটিং অ্যাপের থেকেই জন্ম নিয়েছে ghosting, breadcrumbing, situationship প্রভৃতি বিবিধ শব্দবন্ধ। দুদিনের দোস্তি, ঘোরাঘুরি, শারীরিক সুখ আর তারপরই নতুন খেলনার নেশা কেটে গেলে বিনা বাক্যব্যয়ে তাকে ব্লক! শুরু আবার নতুন সঙ্গীর খোঁজ! অথবা situationship বা হয়ে ওঠা friends with benefits। নিজের friend circle-এ দেখানো — আমারও boyfriend বা girlfriend আছে, আমিও cool! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই সম্পর্ক পুরোটাই show off-এর ফাঁপা কলসি! কখনও কখনও একপক্ষ অপর পক্ষের হাতে তুলে দেয় অর্থ বা কখনও একপক্ষ অপর পক্ষকে দেয় সাময়িক শারীরিক সুখ। বেশিরভাগ সম্পর্কই হয়ে যায় চোখের ভালোবাসা, one night stand!
কিন্তু একটা সিরিয়াস সম্পর্ক মানে কি শুধু এই বিনিময় প্রথা? কোথায় বিশ্বাস, কোথায় commitment? পারস্পরিক সম্মান, পাশে থাকা, ভালোবাসা, দিনের শেষে একটা মানুষের কাঁধে মাথা রেখে মনের শান্তিটুকু খুঁজে পাওয়া — এসব অনুভূতি কি আজ ব্যাকডেটেড? এই চটজলদি সম্পর্ক বানানোর চক্করে পড়ে মানুষ মানুষের পারস্পরিক ভরসা, সম্মান প্রদর্শন — সবই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সত্যিকারের সম্পর্ক — যা গড়ে ওঠে ধৈর্য, বন্ধুত্ব আর পারস্পরিক বিশ্বাসের বিনিসুতোয় — তার মাধুর্য নষ্ট হচ্ছে ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। মানুষ সঙ্গী খুঁজতে গিয়ে হয়ে যাচ্ছে আরও একা!
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি আর ইন্টারনেটের রমরমার যুগে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম বা ডেটিং অ্যাপের ব্যবহার থেকে মানুষকে, বিশেষত নবপ্রজন্মকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হয়তো সত্যিই অসম্ভব। কিন্তু এই অ্যাপগুলির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় না ঘটায়, প্রযুক্তির অপব্যবহার না হয় — তা দেখার দায় ব্যবহারকারীদেরই! নবপ্রজন্মকেই বুঝে নিতে হবে নিজেদের ভবিষ্যতে কোনটা প্রয়োজন — দুদিনের use & throw relationship নাকি serious commitment! একটার পর একটা নতুন খেলনা নাকি একজন বিশ্বস্ত সারাজীবনের সঙ্গী — নবপ্রজন্মকেই বুঝে নিতে হবে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন কোনটা! নিজেদের priority-টুকু তরুণ-তরুণীরা ঠিক মতো বুঝে নিতে পারলেই ইন্টারনেট এবং সামাজিক মাধ্যমগুলির সঠিক এবং যথাযথ ব্যবহার হওয়া সম্ভব! নয়তো মানব সমাজ এক ভয়ঙ্কর বিকৃত মানসিকতার শিকার হবে অচিরেই! নব্বইয়ের দশকের ইন্টারনেট-বিহীন প্রেম আজকের দিনে ব্যাকডেটেড হলেও, বর্তমান যুগের নবপ্রজন্ম ধীরে ধীরে যে অনুভূতিহীন স্বার্থসর্বস্ব প্রেম-বন্ধুত্বের দিকে ঝুঁকছে, তার সুদূরপ্রসারী ফল সমাজকে এক চরম অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে — নিয়ে যাচ্ছে এক অন্ধকার যুগের দিকে! এখনই সাবধান না হলে, এর ভবিষ্যৎ ফল হবে চরম মারাত্মক!
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।