একে একে মনে পড়ে যাচ্ছে অফিসের কবে কোন সেকশনে কাজ করেছিল প্রণয়। সে বুঝে উঠতে পারে না কী করে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাচ্ছে। প্রণয় ফের চিনতে পারছে অমিতাকে। বিয়ের দিন লাল টুকটুকে বেনারসি পরে যে অচেনা মেয়েটা এসেছিল তার জীবনে, এখন তার এক ছেলে, এক মেয়ে — উভয়েরই বিয়ে-থা হয়ে গেছে। কত রাগ-অভিমান বয়ে গেছে ওদের জীবন-নদীর খাত দিয়ে। অটুট স্বর্গীয় গেরোতে ওরা বাঁধা পড়েছিল। হঠাৎ কেন, কী কারণে বেসুর হল ওদের জীবন? হা ঈশ্বর, তোমার লীলা বোঝা ভার। যদিও আজ ভালো লাগে এই ভেবে যে অমিতা আগের মতো আর অভিমান করে না, বরং অপারেশনের পর প্রণয়ের খাতির বহুগুণ বেড়ে গেছে।
নাতনি কিন্তু ফিরেও তাকাচ্ছে না তার দিকে। অনেক না-পাওয়া জমে জমে পাথর হয়ে গেছে। যাকে চোখে হারাত, যে নার্সারি স্কুলে গেলে দাদু হাপিত্যেশ করে বসে থাকত — সেই মিতেরই অবজ্ঞা! "মিতে ও মিতে" — যতই ডাকো না কেন, আমিও তোমায় চিনব না। কী যে ফ্যাসাদে পড়ল প্রণয়! সে ভাবে, ভগবান বোধহয় সবাইকে এমন আতান্তরে কোনো না কোনো সময় ফেলেন। প্রণয় স্বগতোক্তি করে — আমি ঠিক মিতার মান ভাঙাব।
প্রণয়ের অফিস-কাছারি, পাড়ায় ভালোবাসার লোকের অভাব ছিল না। এই ঘটনার আগে মাঝে মাঝেই ফোন বাজত। অমিতা বিরক্ত হত। তার মনে হত, ফোন এক কর্মনাশা আপদ। যদিও প্রণয়কে কর্মবিমুখ — এই বদনাম চরম শত্রুও দিতে পারবে না। আসলে যে যত পায়, তার আশাও তত বেশি। অমিতার সময় কেন ফোন হজম করে দেবে? এখন প্রণয়ের ফোন বোবা — স্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু প্রণয় নয়, অমিতাও কষ্ট পায়। গুম মেরে যাওয়া ফোনের দিকে তাকালেই অমিতার বুক ব্যথায় মুচড়ে ওঠে। একদিন প্রণয়ের ফোনের শব্দে দৌড়ে গিয়ে অমিতা দেখে — স্প্যাম কল। অমিতা মোবাইল আছড়ে বিছানায় ফেলে দেয়।
প্রণয় এই রহস্য ভেদ করে উঠতে পারে না কেন ছেলে রন্তু দূরে দূরে থাকে। মেয়ে মাঝে মাঝেই বাপের বাড়িতে আসে। একদিন রেগে গিয়ে প্রণয় বলেই ফেলল — "কিরে, শ্বশুরবাড়িতে ঝঞ্ঝাট বাঁধাসনি তো? রঞ্জনের সঙ্গে ঝগড়া করলে আমি কিন্তু ওর পক্ষই নেব। ও বড় ভালো ছেলে।" মুখ লুকিয়ে কাঁদে অমিতা।
আজ প্রণয়ের ডাক্তারবাড়ি যাওয়ার দিন। গাড়ি করে ছেলে, বউ আর বন্ধু মাধব সঙ্গে যাবে। সকাল থেকে অঝোরে মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে, শহর জল থইথই। পথে কত না গল্প করল প্রণয়। অফিসের খুঁটিনাটি সব ঘটনা ওর মনে আছে। একদিন এমনই বর্ষা মাড়িয়ে ও প্রথম দেখতে গিয়েছিল অমিতাকে। সেই স্মৃতিকথা আজ বন্ধুকে না শুনিয়ে ছাড়বে না প্রণয়। ওর হুঁশ নেই কত সহস্র বার মাধবকে শুনতে হয়েছে একই গল্প। এমন আদি রসাত্মক গল্প প্রণয় ফের জোর করে শোনাবে — তাও ছেলে, ছেলের বউয়ের সামনে। প্রণয়ের হঠাৎ খেয়াল হয় — সে ভাবে, আমি কি পাগল হয়ে গেছি? গল্পের পিছু ছেড়ে সে বলে, "আমার শরীরে কোনো রোগ নেই। আমি হেঁটে চলে বেড়াতে পারি। তাহলে তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?" পুত্রবধূ নমিতা বলে — "আরও ভালো যাতে থাকো, সে ব্যবস্থা করতে।"
গাড়ি ওভারব্রিজ হাঁকিয়ে ছুটছে। তলায় জলমগ্ন পথ। সার সার প্রাইভেট গাড়ি জলের তলায় খাবি খাচ্ছে। কোনো রকমে দশাসই বাসগুলো দম টেনে টেনে চলছে। ইতস্তত মোটরবাইকের দল আজ চালকের সওয়ারি। প্রণয় বলে, "বন্ধু, মনে আছে এমন দিনে আমরা লাইন ধরে হেঁটে বাড়ি ফিরেছিলাম?" বন্ধু বলে, "সে আর মনে থাকবে না!" বন্ধুকে থামিয়ে প্রণয় বলতে থাকে — জল মাড়িয়ে আমরা চলেছি। মানুষের মাথার ঢল নেমেছে রেললাইনে। একটার পর একটা স্লিপার পার হয়ে। অবিশ্রাম, ক্লান্ত শরীর টেনে — ডান পা, বাঁ পা। একটা পরিত্যক্ত লাইন পড়ে আছে। আমি সরে এসে সেটা ধরলাম। স্লিপারগুলোকে যেন স্বর্গে যাওয়ার সিঁড়ি মনে হতে লাগল। বিরক্ত হয় নমিতা। সবার অজান্তে রন্তুর চোখে জল চলে আসে। মাধব গল্পের বিষয় পরিবর্তন করতে বলে — পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁকগাছিয়া গ্রামের অভিজ্ঞতার কথাটা বল। প্রণয়ের গল্প ছোটে নতুন পাতাল লাইনে।
নমিতা ডাক্তারের ডাক আসার অপেক্ষায় আছে। দুই বন্ধু গল্পে ব্যস্ত। একা উদাসী রন্তু এদিক-ওদিক ঘুরছে। ডাক আসে — ওরা ঢুকে পড়ে চেম্বারে। নমিতা চোখের ইশারায় ডাক্তারকে কিছু বলতে চায়। পুরোনো পরীক্ষার সব রিপোর্ট দেখে উনি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন বলে প্রণয়কে ভিতরে নিয়ে যেতে চান। ছেলে রন্তুকে অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। ভিতরে যাওয়ার প্রাক্কালে ডাক্তার ইশারায় নমিতাকে প্রতিউত্তর করেন। নমিতা খুশি হয়।
প্রায় দু’ঘণ্টা হতে চলল পরীক্ষা। ওরা ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। সময় আর কাটছে না। হঠাৎ ঘোষণা হয় — "প্রণয় পড়িয়ার পরিবারের লোকজন ওটির ভিতরের লনে আসুন।" হুটোপাটি করে জুতো খুলে ওটি লনে ওরা প্রবেশ করে। উদিত সূর্যের কোমল স্মিত হাসি ঝরছে রোগী এবং ডাক্তার — উভয়ের মুখমণ্ডল বেয়ে। অবাক হয় ওরা। প্রণয় সবাইকে শুনিয়ে বলে — "অপারেশনটা না করালেও চলত। ওরা ঝুটমুট আমাদের হ্যারাস করল।" ঝুটমুট কথাটা হেব্বি খুশি হলে বলে প্রণয়। ডাক্তার মুচকি হাসছেন আর কী সব লিখে চলেছেন। প্রণয় বলে — "ডাক্তার দাস বলে দিয়েছেন আমি এখন আছি এবং বহাল তবিয়তে থাকব।" আনন্দে আত্মহারা রন্তু ডাক্তারের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেলে ডাক্তার বলে — "একটা কথা আছে কিন্তু — আমি যেভাবে লিখছি, রেডিয়েশনগুলো ঠিক দিনক্ষণ মেনে সেইভাবে নিতে হবে।" মামণিকে ফোন করে নমিতা। অবিশ্বাস্য খবর ছুটতে থাকে ফোনের ভিতর দিয়ে। বাড়ির ফোনগুলো আবার সরব হয়।
পুজো এসে পড়ে। প্রণয় টকঝাল-মিষ্টি লজেন্স কেনে মিতের জন্য। মিতে আনন্দে আত্মহারা। টকঝাল-মিষ্টি লজেন্স এত সুস্বাদু — প্রণয়ের জানা ছিল না। মিতে এখন জমিয়ে দাদুর সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরছে। পুজো মিটে গেলে শুরু এবং সম্পূর্ণ হয় রেডিয়েশন কোর্স। প্রণয়ের শরীর দুর্বল হলেও এখন যথেষ্ট ভালো। বাড়িতে মেয়ের আসা কমে গেছে। বাপই মাঝেমধ্যে গিয়ে হাজির হচ্ছে মেয়ের বাড়ি। রন্তু নিজস্ব বাণিজ্যে মন ঢেলে কাজ করছে। অমিতা ফের ঘোরতর সংসারী। মাঝের দিনগুলো সকলে ভুলে গেছে। দৌড়াচ্ছে সময় — চব্বিশ সাল বন্দে ভারতের গতিতে পার হয়ে গেল। মাঝেমধ্যে রুটিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চললেও ওদের সাংসারিক জীবনে তার কোনো ছাপ পড়েনি।
আজ সকাল থেকেই প্রণয়ের শরীরটা তেমন ভালো নয়। রন্তু ডাক্তার দেখানোর কথা বলতেই প্রণয় রাগ করে। অগত্যা রন্তু কাজে বের হওয়ার তোড়জোড় শুরু করে। নমিতা এসে বলে — "আজ কাজে না গেলেই নয়?" রন্তু কাজে না যাওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পায় না। মা অমিতাও তাকে কাজে যেতেই বলে। নিজেদের মধ্যে যখন আলোচনা চলছে, মিতে তখন দাদুর খাটের পাশে চুপটি করে বসে আছে। প্রণয় এতক্ষণ বসেই ছিল — হঠাৎ শুয়ে পড়ার ফাঁকে সে মিতাকে বলে — "আমার ফোনটা ড্রেসিং টেবিল থেকে দে দেখি।" প্রণয় কাউকে ফোন করে বেশ কিছুক্ষণ। মিতে বিরক্ত হয়।
বাড়িতে ভিড় জমে গেছে। পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব সবাই এসে হাজির। বাড়ির সামনে একটা সাদা হুন্ডাই ক্রেটা এসে থামল। বাড়ির লোকেরা ভিতরে। সাদা পোশাক পরিহিত আগন্তুককে কেউ চিনতে পারলেন না। আগন্তুক জিজ্ঞেস করলেন — "এটা কি প্রণয় পড়িয়ার বাড়ি?" সবাই পথ ছেড়ে দিলে নিশ্চিন্ত হয়ে আগন্তুক ভেতরে ঢুকলেন। সামনেই প্রণয়ের ঘর। সবাই ঘিরে বসে আছে তাকে। হঠাৎ প্রণয় ফেরেশতাকে দেখতে পায়। দু’বাহু তুলে প্রণয় বলে — "ফেরেশতা, আমাকে তোমার দু’ডানায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে?" ফেরেশতা বলে — "যাব তো। তবে এখনও সময় আছে, বন্ধু। তুমি দু’চোখ ভরে আপনজনদের দেখে নাও। তারপর নয় — অনাবিল আনন্দের দেশে আমি তোমাকে নিয়ে প্রবেশ করব। জাগতিক পৃথিবীর সুরমায়া কত গভীর, তা আমি তোমার কাছ থেকে শিখেছি। সংসার জীবনে তুমিই ফেরেশতা।"
প্রণয়ের খাটের চারপাশে সবাই ঘিরে বসে আছে। চিৎকার করে কাঁদছে অমিতা। স্তব্ধ রন্তুকে নমিতা সামলাচ্ছে। মিতে বুঝে উঠতে পারছে না হঠাৎ কী এমন হল। মাধব বলে ওঠে — "ডাক্তার তাহলে সব মিথ্যে!" নীচু গলায় প্রণয় বলে — "ভেবেছিলে তোমরা অভিনয় করবে আর আমি একা দর্শকাসনে বসে থাকব? পাশাটা ঘুরিয়ে দিয়েছিলাম, বন্ধু। এই দু’বছর তোমাদের নাট্যশালা জমিয়ে রেখেছিলাম আমি — শ্রী প্রণয় পড়ুয়া।"
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।