About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
নীরা আরিয়া — ত্যাগ, নির্যাতন ও বিস্মরণের ইতিহাস
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

নীরা আরিয়া: ত্যাগ, নির্যাতন ও বিস্মরণের ইতিহাস

বর্তমানে পৃথিবীতে কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে যাঁদের ভূমিকা অনবদ্য, তাঁরা হলেন গুপ্তচর। পুরুষ গুপ্তচরদের পাশাপাশি মহিলা গুপ্তচররাও আজ পিছিয়ে নেই। আমরা কয়জন জানি মহিলা গুপ্তচরদের জননী নীরা আরিয়ার কথা?

নীরা আরিয়া আজাদ হিন্দ ফৌজের সেই যোদ্ধা, যিনি না থাকলে হয়তো ব্রিটিশদের এক চাটুকারের হাতেই নেতাজির হত্যা হতো। তিনি নেতাজির প্রাণ বাঁচাতে নিজের স্বামীকে হত্যা করতেও পিছপা হননি। কারণ তাঁর স্বামী ছিলেন ব্রিটিশদের গুপ্তচর। নেতাজি-সংক্রান্ত সকল তথ্য তিনি তাঁদের সরবরাহ করতেন।

এখানেই শেষ নয়। গ্রেপ্তার হওয়ার পর নেতাজি-সংক্রান্ত তথ্য আদায়ের জন্য সাড়াশী দিয়ে তাঁর স্তন ছিঁড়ে ফেলা হলেও তাঁর মুখ থেকে একটি কথাও বের করা সম্ভব হয়নি। অথচ ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর কেউ তাঁর খোঁজ রাখেনি। শেষ জীবন তাঁর কেটেছিল রাস্তায় ফুল বিক্রি করে। এই মহীয়সী নারী হলেন নীরা আরিয়া।

১৯০২ সালের ৫ই মার্চ উত্তর প্রদেশের বাগপত জেলার থেকরা নগরে এক বিত্তশালী ব্যবসায়ী পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা মহাবীর সিং, মা লক্ষ্মী সিং। একেবারে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো যাকে বলে। টাকা-পয়সার অভাব না থাকলেও মাত্র আট বছর বয়সে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর জীবনে নেমে আসে কঠিন পরিবর্তন।

কিন্তু সব খারাপের পেছনেও ভালো কিছু লুকিয়ে থাকে — এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটল না। নীরা যখন তাঁর ভাই বসন্তকে নিয়ে একাকী ও অসহায় জীবন কাটাচ্ছিলেন, সেই সময় আর্য সমাজের সম্মেলনের সূত্রে থেকরায় উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত ব্যবসায়ী শেঠ চৌধুরী সাজারাম লামবা। নীরা ও বসন্তের কথা শুনে তিনি তাঁদের দত্তক নেন।

সাজারাম লামবা শুধু সাধারণ ব্যবসায়ী ছিলেন না — তিনি আর্য সমাজের কট্টর ভক্ত ও প্রবল দেশপ্রেমিক ছিলেন। তাঁর বাড়িতে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর আনাগোনা ছিল। একবার ভগত সিং ব্রিটিশদের গ্রেপ্তার এড়াতে তাঁর বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন। বৈপ্লবিক আবহে বেড়ে ওঠা নীরার মধ্যেও যে বৈপ্লবিক মানসিকতা গড়ে উঠবে, সেটাই স্বাভাবিক। ছোট থেকেই বিভিন্ন বিপ্লবীর তেজস্বিতা ও ওজস্বী বক্তৃতা তাঁর মনে স্বাধীন ভারতের স্পৃহা জাগিয়ে তুলেছিল।

পিতার প্রভাবে সরাসরি আর্য সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নীরা সিং থেকে হয়ে উঠলেন নীরা আরিয়া। সাজারাম লামবার ব্যবসা ছিল কলকাতায়। পড়াশোনায় নীরা যথেষ্ট মেধাবী ছিলেন। বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি — তিনটি ভাষাতেই তিনি ছিলেন সাবলীল।

নীরা তখন সদ্য যৌবনে পা দিয়েছেন। চারপাশের জীবন, বন্ধুদের গল্প তাঁর মনে প্রবল কৌতূহল জাগিয়ে তুলেছিল। একদিন এক বন্ধুর মুখে সমুদ্রে যাওয়ার কথা শুনে নীরা ও তাঁর বন্ধুরা পিকনিকে সমুদ্রের দিকে রওনা হলেন। কিন্তু তাঁর ধারণাই ছিল না, সমুদ্রের গভীরতা কতটা ভয়ংকর হতে পারে। হঠাৎ এক প্রবল ঢেউ এসে তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। নীরা হাত-পা ছুঁড়ে বাঁচার চেষ্টা করতে লাগলেন। বন্ধুরা পাড়ে দাঁড়িয়ে ভয় পেয়ে চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে এলো না।

যখন মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে যাবে, ঠিক সেই সময় এক যুবক তাঁকে উদ্ধার করলেন। তিনি সুভাষচন্দ্র, যদিও তখনও তিনি সুভাষচন্দ্র বসু নামে সুপরিচিত হননি। সেদিন ছিল রাখী পূর্ণিমা। নীরা তাঁর হাতে রাখি পরিয়ে দিলেন। সুভাষচন্দ্র হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, "আজ থেকে তুই আমার বোন হলি।"

নীরা তখনও ভাবতে পারেননি, ভাই-বোনের এই সম্পর্কই তাঁকে এক সাধারণ নারী থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী করে তুলবে।

দিন এগিয়ে চলল। নীরাও বিবাহযোগ্য হয়ে উঠলে সাজারাম তাঁর বিয়ে ঠিক করলেন শ্রীকান্ত জয়ারঞ্জন দাস নামে এক সরকারি অফিসারের সঙ্গে। তিনি ছিলেন এক ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার — প্রকৃত অর্থে ব্রিটিশদের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা। তিনি ছিলেন কট্টর ভারতবিদ্বেষী; বিপ্লবীদের প্রতি ছিল তাঁর চরম আক্রোশ। তাঁর কাজ ছিল বিপ্লবীদের সকল তথ্য সংগ্রহ করে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেওয়া।

দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষ একই ছাদের নিচে বসবাস করতে লাগলেন — একজন চরম ভারতবিদ্বেষী, অন্যজন ছোটবেলা থেকে বিপ্লবী আবহে বড় হয়ে ওঠা, যার শিরায়-শিরায় বইছে দেশপ্রেম এবং আর্য সমাজের আদর্শ।

প্রথম দিকে নীরা ভেবেছিলেন, বুঝিয়ে-সুজিয়ে স্বামীকে সঠিক পথে আনবেন। কিন্তু তা সম্ভব হলো না। তাঁর স্বামীর কাছে দেশপ্রেমের চেয়ে অর্থের মূল্য ছিল অনেক বেশি। ভারতবাসী, বিশেষত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি ছিল তাঁর তীব্র বিদ্বেষ।

যেদিন নীরা জানতে পারলেন, শুধু ধরপাকড়ই নয়, গোপনে নেতাজির ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং তাঁর মূল উদ্দেশ্য নেতাজিকে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেওয়া — সেদিনই তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি স্বামীকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিলেন — "হয় ব্রিটিশদের গোলামি বন্ধ করো, নয়তো আমাকে ছেড়ে দাও।" কিন্তু তাতেও কোনো ফল হলো না। স্বামী তাচ্ছিল্যভরে উত্তর দিলেন, "তুমি নও, টাকাই আসল।"

নীরা কলকাতায় বাবার কাছে ফিরে এলেন। কিছুদিন পর তিনি দিল্লিতে আচার্য চতুরসেনের কাছে চলে যান। সেখানে একটি বিদ্যালয়ে শিশুদের সংস্কৃত পড়িয়ে তাঁর দিন ভালোই কাটছিল। কিন্তু তাঁর মনে একটাই চিন্তা — দেশকে বাঁচাতে হবে। দিল্লি থেকেই শুরু হলো তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামী হয়ে ওঠার যাত্রা।

দিল্লিতে থাকাকালীন তিনি জানতে পারেন, তাঁর পরিচিত এক দাদা রামসিং সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দিতে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নীরা তাঁর ভাই বসন্তকে নিয়ে সিঙ্গাপুরে পাড়ি দেন। যোগ দেন ঝাঁসি কি রানি রেজিমেন্টে, যার দায়িত্বে ছিলেন লক্ষ্মী সায়গল। এখানেই শুরু হলো তাঁর প্রশিক্ষণ।

বন্দুক চালানো, গ্রেনেড নিক্ষেপ, জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা — সবই শিখতে হলো তাঁকে। কিন্তু নেতাজির সূক্ষ্ম দৃষ্টি নীরার সাহস ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা চিনতে ভুল করল না। তাঁর নজরে এলো এই তরুণীর অসাধারণ দুসাহস ও একাগ্রতা। তাই তাঁকে পাঠানো হলো গোয়েন্দা বিভাগে। সেখানে পবিত্র মোহন রায়ের তত্ত্বাবধানে শুরু হলো নীরার বিশেষ প্রশিক্ষণ।

প্রশিক্ষণের সময়ই বলে দেওয়া হয়েছিল — ধরা পড়ার আগেই নিজেকে শেষ করে দিতে হবে। এই কঠোর প্রশিক্ষণ শেষ করে নীরা আরিয়া হয়ে উঠলেন ভারতের প্রথম মহিলা গুপ্তচরদের একজন। তবে কাজের ঝুঁকি ছিল প্রবল। কখনো ছেলের ছদ্মবেশে, কখনো লুঙ্গি পরে তিনি তথ্য সংগ্রহ করতেন। কখনো আবার মালি বা রাঁধুনির বেশে ব্রিটিশ অফিসারদের বাড়িতে ঢুকে পড়তেন। কান পেতে শুনতেন তাঁদের গোপন কথোপকথন, তারপর তা সংকেতভাষায় রূপান্তর করে নেতাজির কাছে পাঠিয়ে দিতেন।

নীরার জীবনে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যা তাঁর সাহস ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় দেয়। তেমনই এক ঘটনা জড়িয়ে আছে দুর্গামণি বরখাকে ঘিরে। দুর্গামণি ছিলেন তাঁর এক সহযোদ্ধা। একবার ব্রিটিশরা তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং খবর আসে, খুব শীঘ্রই তাঁকে হত্যা করা হবে। নীরা ও তাঁর সঙ্গিনী সরস্বতী রাজামানী সিদ্ধান্ত নিলেন — যে করেই হোক দুর্গামণিকে উদ্ধার করতেই হবে।

হাতে সময় ছিল খুবই কম। দু’জনে মিলে বৃহন্নলার ছদ্মবেশে পৌঁছে গেলেন পুলিশ শিবিরে। সেখানে নাচ-গান করে পুলিশদের মনোযোগ বিভ্রান্ত করে তাঁদের খাবার ও পানীয়তে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে দেন। সুযোগ বুঝে দুর্গামণিকে অচেতন অবস্থায় নিয়ে পালিয়ে আসেন।

পালানোর সময় এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর ঘটনা ঘটে। জঙ্গলে ব্রিটিশ সিপাহিরা গুলি চালাতে শুরু করে। একটি গুলি এসে লাগে সরস্বতী রাজামানীর পায়ে।

সেই অবস্থায় নীরা তাঁকে কাঁধে তুলে নিলেন। তিন দিন তাঁরা গাছের মগডালে লুকিয়ে রইলেন। নিচে তখন ব্রিটিশ পুলিশের গুলিবর্ষণ চলছে। পুলিশ কুকুরেরা হন্যে হয়ে তাঁদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। না ছিল জল, না খাবার। তবুও সেই দুর্বিষহ পরিস্থিতি পেরিয়ে তাঁরা জীবিত ফিরে আসেন। এই সাহসিকতার খবর সুভাষচন্দ্রের কাছেও পৌঁছায়।

নীরার সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে নেতাজি তাঁকে ‘ক্যাপ্টেন’ পদে উন্নীত করেন এবং নিজের দেহরক্ষী হিসেবে নিযুক্ত করেন। দেহরক্ষীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।

১৯৬৬ সালে প্রকাশিত "নীরা: এক জীবন সংগ্রাম" গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ব্রিটিশদের ঘোষিত দুই লক্ষ টাকার পুরস্কারের লোভে নীরার স্বামী একদিন শিবিরে ঢুকে নেতাজির দিকে গুলি চালায়। একটি গুলি নেতাজির পাশ ঘেঁষে চলে যায়। মুহূর্তের বিলম্ব না করে নীরা রিভলভারের বেয়নেট দিয়ে তাঁর স্বামীর পেটে আঘাত করেন। শ্রীকান্তও তাঁর দিকে গুলি ছোড়ে। একটি গুলি পাশ কাটিয়ে গেলেও অন্য গুলি এসে লাগে নীরার গলায়, এবং তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।

চেতনা ফিরে তিনি দেখেন, তাঁর মাথার কাছে বসে আছেন নেতাজি। চোখে জল নিয়ে তিনি বললেন, "আমাকে বাঁচাতে নিজের স্বামীকেই হত্যা করলে।" সেই দিন থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজে তাঁর নতুন নামকরণ হয় — ‘নীরা নাগিন’।

কিন্তু যুদ্ধের নিয়ম বড়ই কঠিন। ১৯৪৫ সালে জাপানের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আজাদ হিন্দ ফৌজ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। নীরাকে প্রথমে পাঠানো হয় কলকাতা জেলে। পরে ব্রিটিশরা বুঝতে পারে, তিনি সাধারণ কোনো নারী নন। তখন তাঁকে পাঠানো হয় আন্দামানের সেলুলার জেলে — যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘কালাপানি’ নামে পরিচিত।

সেখানে তাঁকে একটি অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি রাখা হতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হতো। তিনি ছিলেন নিরামিষাশী, আর ব্রিটিশরা সেই বিষয়টিকেই অত্যাচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। তাঁকে জোর করে রান্না করা পচা মাংস খেতে দেওয়া হতো।

এই নির্যাতনের আসল উদ্দেশ্য ছিল নেতাজি-সংক্রান্ত তথ্য আদায় করা — নেতাজি কোথায় আছেন, সেটাই ছিল তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। একদিন নতুন এক জেলারের আগমন ঘটে। নেতাজির খবর জানার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তিনি নীরার ওপর শুরু করেন অকথ্য নির্যাতন, গালিগালাজ ও কটুক্তি।

নীরা প্রতিবাদে তাঁর মুখে থুতু ছুড়ে দেন। রাগে অন্ধ হয়ে জেলার নির্দেশ দেয় — তাঁর স্তন কেটে ফেলা হোক। কামারশালা থেকে সাড়াশী এনে সেই নৃশংস কাজ করা হয়। নীরা অচেতন হয়ে পড়েন।

চেতনা ফিরে এলে আবার শুরু হলো অকথ্য নির্যাতন। তাঁকে চড়কির মতো এক যন্ত্রের ওপর বসিয়ে এমনভাবে ঘোরানো হতো যে তাঁর হাত-পা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হতো। তবুও নীরার মুখ থেকে একটি কথাও বের করা যায়নি। তাঁর নীরবতার আড়ালে ছিল দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং নেতাজির প্রতি গভীর সম্মান।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো। কিন্তু ব্রিটিশরা তাঁদের অত্যাচারের প্রমাণ লোপাট করতে নীরাকে আন্দামানের জঙ্গলে ফেলে রেখে যায়, যেন হিংস্র জন্তু তাঁকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেখানকার আদিবাসীরা তাঁকে উদ্ধার করে। প্রথমে ভাষাগত অসুবিধা থাকলেও ধীরে ধীরে তাঁরা পরস্পরের কথা বুঝতে শেখেন। আদিবাসীরাও ব্রিটিশদের প্রতি গভীর ঘৃণা পোষণ করতেন। অবশেষে তাঁরা নীরাকে নৌকায় করে ভারতবর্ষে পাঠিয়ে দেন।

হিন্দি-উর্দু লেখিকা মধু ধামড়িয়ার লেখায় জানা যায়, নীরা প্রথমে হায়দরাবাদে গিয়ে ওঠেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল হায়দরাবাদকে নিজাম বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত করে ভারতের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। নিজাম বাহিনীর অত্যাচারে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। মানুষের সেই দুর্দশা দেখে নীরা আবার অস্ত্র তুলে নেন এবং হায়দরাবাদ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

১৯৪৮ সালে হায়দরাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে নীরা ভেবেছিলেন, সরকার তাঁকে উপযুক্ত সম্মান দেবে। কিন্তু উপযুক্ত সম্মান তো দূরের কথা, তিনি দেখলেন স্বাধীন ভারতে তাঁর জন্য কোনো স্থানই নেই। যে হাতে তিনি পিস্তল চালিয়েছিলেন, সেই হাতেই শুরু করলেন ফুল বিক্রি করা। সেই সময় সাধারণ মানুষ তাঁকে ‘পেডা মা’, অর্থাৎ ‘বড় মা’ বলে ডাকত।

রাস্তায় একটি ছোট্ট কুঁড়ে ঘর বানিয়ে তিনি বসবাস শুরু করেন। কিন্তু সরকারি কর্মচারীরা এসে সেটিকেও সরকারি জমি বলে ভেঙে দেয়। পরবর্তী কালে সরকার যখন তাঁকে পেনশন দিতে চাইল, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেছিলেন, "দেশমাতৃকার সেবা করেছি — তার বিনিময়ে দান নিয়ে নিজের আত্মসম্মান বিক্রি করতে পারব না।"

নিদারুণ দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্যেই তাঁর শেষ জীবন অতিবাহিত হয়। শরীর ভেঙে পড়ে। তেজপাল ধামা নামে এক সাংবাদিক তাঁকে নতুন করে আলোচনায় আনেন। অবশেষে ১৯৯৮ সালের ২৬শে জুলাই হায়দরাবাদের ওসমানিয়া হাসপাতালে ৯৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।




আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

এই সংখ্যায় প্রযোজ্য নিয়ম

একজন পাঠক এই সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই প্রতিক্রিয়া এই সংখ্যার অন্য কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা। দ্রষ্টব্য: আষাঢ় ১৪৩৩ সংখ্যা থেকে এই নিয়ম আরও সহজ ও উদার করা হয়েছে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের শারদ ১৪৩৩ সংখ্যাটি ৫ অক্টোবর ২০২৬ (১৭ই আশ্বিন) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top

    ‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

    ‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।