শিয়ালদহ স্টেশনের সিঁড়িতে যখন পা রাখছি, স্টেশনের ঘড়ি দেখাচ্ছে এখন সময় ছ’টা বেজে ষোলো। গেদে লোকালটা ছাড়বে-ছাড়বে করছে। কপাল ভালো, দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে দিয়েছে — বেশি দৌড়াতে হয়নি, কিন্তু বাধ্য হলাম জেনারেল বগিতে উঠতে। বসার জায়গা আশা করিনি, আর পাইওনি। দাঁড়িয়ে রইলাম ব্যাগ আর ওড়নাটা সামলিয়ে। ট্রেন বা বাসে উঠলে আমার মানুষজন দেখতে, তাঁদের কথা শুনতে বড় ভালো লাগে — এই যেমন আমার সামনে একটা জুটি বসেছে। ছাত্রজীবনটা এদের এখনও শেষ হয়নি, বুঝতে পারছিলাম কথা শুনে। মেয়েটির মুখের ওপর এসে পড়েছে তার কুচি কুচি চুলগুলো। এত ভিড়, তবু তা উপেক্ষা করে ছেলেটি কী সুন্দর সেগুলো কপালে বা কানের পাশে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। দৃশ্যটা থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না, কিন্তু তাকিয়ে থাকতেও নিজেকে কেমন হ্যাংলা মনে হচ্ছিল!
মনটা অন্যদিকে সরালাম। কানে আসছিল টুকরো টুকরো কথা। মেয়েটি বলছে, "চোদ্দ তারিখ — কিন্তু ভুলবি না। ওই দিন আমরা দেখা করব, মুভি দেখব..." ছেলেটার উত্তর শোনার আগেই আগরপাড়া চলে এল, এবং অতি কষ্টে আমি একটা বসার জায়গা পেলাম।
ট্রেনের দুলুনি আর সারাদিনের পরিশ্রম ধীরে ধীরে আমার চোখটাকে বন্ধ করে দেয়, আর চোখে ভেসে ওঠে কিছু দৃশ্য —
আমার মনে আছে উচ্চমাধ্যমিক শুরু হয়েছিল পয়লা এপ্রিল। হাতে প্রায় দেড় মাস সময় — মন দিয়ে পড়তে হবে, মক টেস্ট কোচিংগুলোতে দিতে হবে। পড়ার টেবিলের ওপর আমার টু-ইন-ওয়ানটা থাকত, প্লাগ লাগানো, যাতে পড়তে পড়তে — কী উত্তর লিখতে লিখতে ভালো না লাগলে — গান শুনতে পারি। সেই সময় রেডিও-র খুব রমরমা। রাত সাড়ে নটার সময় ভালো ভালো হিন্দি গান শোনাতেন আরজে অনিন্দিতা। কিছু আগে সোনু নিগমের গান শুনে আর পড়তে ভালো লাগছিল না। মার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বারান্দায় এসেছি। নিমগাছ, আমগাছ, দেবদারু গাছ, জামগাছ দিয়ে ঘেরা কম্পাউন্ড আমাদের। তালবেতাল হাওয়া আর লোকের বাড়ি থেকে টিভির আওয়াজ। পুরো সময়টাই ছিলাম নিজের মনে।
আসলে চোদ্দই ফেব্রুয়ারি তখন আমাদের পৃথিবীতে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করে দিয়েছে — সকালের কাগজ, কী রেডিও-র গানের মাধ্যমে। বেচারি মা ভয় পেয়েছিল — এই সময় মেয়ের মনে পড়ালেখা ছাড়া অন্য কেউ এসে বিরাজমান হলে উচ্চমাধ্যমিকের দফারফা। কিন্তু আমার চোদ্দই ফেব্রুয়ারি কী নীরস কেটেছিল? না, তা কাটেনি। পড়া ছিল, ফেরার পথে মামনির সাথে দেখা। ও বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছিল, তাই স্যার বা ম্যাম আলাদা ছিল আমাদের, কিন্তু বন্ধুর সাথে রাস্তায় বা পাড়ায় দেখা হয়ে যেত।
সেদিন প্রথম মা-কে লুকিয়ে আমরা টালিগঞ্জের মেট্রো স্টেশনে গেছিলাম। মামনি ওর পয়সা জমিয়ে "মেট্রো হরাইজন" থেকে তাতানদার জন্য একটা কার্ড কিনেছিল — বেশ গোলাপ ফুলের ছবি দেওয়া, আবার সেটা লাল গোলাপ।
আমার সাথেও সেদিন প্রথম আলাপ তাতানদার। মিথ্যে বলব না — এত ভদ্র, এত ভালো বিজ্ঞানের ছাত্র তাতানদাকে দেখে বন্ধুর ভাগ্যের প্রতি একটু ঈর্ষাই হয়েছিল। তখনও মন ভাঙা বা ভেঙে দেওয়ার কষ্ট পাওয়া মানুষকে চাক্ষুষ দেখিনি।
প্রিয় বন্ধুর কালো মুখটা হঠাৎ ভিড় গেদে লোকালে ভেসে উঠল — আজ, এই বছর ষোলো পর। ধড়ফড় করে চোখটা খুলে গেল। তাকিয়ে দেখি, "ওরা" নেমে গেছে। ট্রেন এবার নৈহাটিতে যাচ্ছে। এঁতাল-বেতাল হাওয়া, ট্রেনের দুলুনি আর মিষ্টি একটা জুটি — হায় রে, আমাকে ভিড় গেদে লোকাল থেকে সেই সময়, সেই আনন্দ, কষ্ট আর বন্ধুর কাছে নিয়ে চলে গেল!
কতদিন মামনির সাথে যোগাযোগ নেই। সেই মন খারাপের সময়গুলো ও যেমন আমার হাত ধরে পেরিয়েছিল, আমিও এরপর কোনো এক সময় ওর সাহায্যে পেরিয়ে এসেছিলাম আমার মন খারাপের দিন। ট্রেনের দুলুনি কি কিছু বলছে? কান পাতলাম। মনে হল বলছে — "ভালোবাসায় কষ্ট আছে, বিচ্ছেদ আছে, অন্যের জন্য শুভকামনা আছে — তাই এত সুন্দর! এত আনন্দ তার মধ্যে। তুমি কি নিজে অনুভব করোনি আর? এখনও কি করছো না?"
গেটের দিকে ভিড় ঠেলে এগোতে এগোতে বললাম, "মনে মনে বললাম — তাই তো আমার ঘরে ফেরার এত তাড়া, তুমি কি সেটা জানো না?"
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।