লিপ লাইনার দিয়ে বর্ডার এঁকে লাল লিপস্টিক সবে স্পর্শ করেছে ঠোঁট, হঠাৎ মুঠোফোন বেজে উঠল — "মনে পড়ে রুবি রায়"। পাশের টেবিলে চার্জে বসানো আছে। বুঝতে পারলাম আমার সাথীরা ফোন করছে। চটপট কপালে একটা ছোট্ট টিপ আর গলায় বুটিকের হার পরে নিলাম। আমি তৈরি। ব্যাগ, জলের বোতল নিয়ে মোবাইল হাতে নিয়েছি, আবার শুরু হল — "মনে পড়ে রুবি..."।
হ্যালো, হ্যাঁ আমি প্রস্তুত। বেরিয়ে পড়েছি, রাস্তায়। যাচ্ছি যাচ্ছি বলে ফোন কেটে দিলাম। তিন মিনিটে পৌঁছালাম হরিপদ সাহিত্য মন্দির। রবীন্দ্রভবনের সামনে বোলেরো দাঁড়িয়ে আছে। সময় দুপুর ২.২৫ মিনিট। রওনা দিল গাড়ি। আমাদের গন্তব্য খড়িদুয়ারা, কুমারী গ্রাম (মানবাজার–২) সৃজন উৎসব ২০২৫।
বোলেরোতে আমরা আটজন। গল্প আর খুনসুটিতে শুরু হল যাত্রা। হেমন্তের দুপুর, হালকা রোদ্দুর আর খোলা জানলা দিয়ে আসা শিরশিরে হাওয়ায় মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। মনের মধ্যে রবি ঠাকুর উঁকি দিতেই গেয়ে উঠলাম — "তোমার খোলা হাওয়া / লাগিয়ে পালে.."। বহু দূর থেকে ভেসে আসছে রাখালিয়া বাঁশির সুর। কামধেনুর পাল চরে বেড়াচ্ছে ফাঁকা প্রান্তরে। হয়তো কচি ঘাসে মুখ দিয়েছে। আঁকা-বাঁকা পিচের রাস্তা, দু’পাশে সবুজ ঘাস আর কচি কচি লতাপাতায় ভরা জংলি নানান রঙের ফুল। মাঠ ভর্তি স্বর্ণালী ধান। আমন ধানে পুরো হলুদ হয়ে আছে মাঠের পর মাঠ। কোথাও আবার হলুদ–সবুজ, কোথাও আবার বোরো বা বরান ধানে সবুজ ক্ষেত। মনে হচ্ছে রঙবেরঙের কার্পেট পাতা আছে। গাছের ডালে পাখিদের খুনসুটি আর ধানের শীষে সোনালি রোদের ঝিলিক, নীল আকাশ। অপূর্ব! আমি প্রকৃতির সৌন্দর্য অবগাহনে ডুবে গেলাম — "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি"...।
ডরোডির কাছাকাছি আসতেই অর্ধেন্দুদা বললেন — এই এক কিলোমিটারের মধ্যেই কল্যাণেশ্বরী মায়ের মন্দির আছে। আপনারা যাবেন? সকলেই রাজি। অশোকদার নেতৃত্বে গাড়ি বাঁক নিল ডানদিকে। মাটির চওড়া রাস্তা, বিস্তীর্ণ ফাঁকা ডিহিতে বেশ কিছু গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় পাথরের চাঙ, ফাটা পাথরে সবুজ ঘাস, পাশে কয়েকটা ছাগল চরছে। কাছাকাছি লোকালয়। এই জায়গাতেই শুটিং হয়েছিল বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের পরিচালনায় "উত্তরা" এবং "জানালা" সিনেমা দুটি। বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকলাম জানলার বাইরে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে গাড়ি থামল। গাড়ি থেকে নেমে আমাদের চোখে পড়ল একটি বটগাছ। বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। বহু বছরের পুরনো বটগাছের ঝুরি থেকে আর একটি বটগাছ জন্মেছে। সেটিও অনেক পুরনো।
রক্তের দাগ দেখে বোঝা যায় এখানে আশেপাশের গ্রামের অন্নপ্রাশন, বিয়ে, উপনয়নের অনুষ্ঠানগুলি অনুষ্ঠিত হয়। পাশে একটি অতিথিশালা, একটি নলকূপ ও জলাধার রয়েছে। কিন্তু সবগুলিই বড় রুগ্ণ। অতিথিশালার আশপাশ ঘাস-আগাছায় ভর্তি। সবথেকে অবাক — এখানে মায়ের মন্দিরে পূজোতে বলি দেওয়া হয়, অথচ রক্তে মাছি বসে না। অর্ধেন্দুদার কাছে জানলাম রাজনোয়াগড়ের রাজপরিবার একসময় এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। পাঞ্চেত ড্যামের কাছে যে কল্যাণেশ্বরী মায়ের মন্দির আছে, সেই মা আর এখানের মা এক। এমনকি একই প্রস্তর দিয়ে নির্মিত। ডরোডি, ময়রাডি কিছুটা দূরে রাজনোয়াগড় ছাড়াও আশপাশে অনেক গ্রাম। এলাকার বেশ কয়েকজন মন্দিরের সামনে নানা কাজে ব্যস্ত। আমরাও বেশ কিছুটা সময় কাটালাম নির্জন মন্দির প্রাঙ্গণে।
রাজনোয়াগড় বলতেই মনে পড়ল প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবীর কথা। তিনি বছরের পর বছর এখানে শবরদের নিয়ে কাজ করেছেন। ওদের জীবনের দুঃখ, যন্ত্রণা, না-পাওয়ার গল্পের উপসংহারে ইতি টেনে নতুন উপন্যাসের গোড়াপত্তন করেছিলেন।
ভূমিহীন, অশিক্ষিত মানুষগুলোর চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু ছিল নিয়তি। জঙ্গলের কাঠ, পাতা, ফলমূল সংগ্রহ করে জীবন নির্বাহ করত। সহজ, সরল, আদিম মানুষগুলোকে অসামাজিক, বর্বর, অসভ্য, অপরাধপ্রবণ উপজাতি হিসেবে দেগে দিয়েছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। "বন আইন" প্রণয়নের মাধ্যমে কেড়ে নিয়েছিল ওদের অধিকার। আস্তে আস্তে যেন মানুষ হিসেবে ভুলতে বসেছিল নিজস্ব সত্তাকে।
মহাশ্বেতা দেবী ওদের আপন করে নিয়েছিলেন পরম স্নেহে, মাতৃত্বের কোমলতায়। আন্দোলন করেছিলেন ওদের শিক্ষা, ভূমি এবং সামাজিক স্বীকৃতির দাবিতে। অনেক লড়াই, অনেক কষ্টের পর ওদের মুখে পড়ছিল একটু আলোর ঝলক। সামাজিক স্বীকৃতি পাল্টে দিয়েছে ওদের জীবন। তবুও অশিক্ষা, অর্থনৈতিক সংকট এখনো কাঁটা হয়ে জীবনের গতি রুদ্ধ করে রেখেছে ওদের।
হঠাৎ বটগাছের ডাল থেকে দুটো শালিক উড়ে এসে বসলো আমার সামনে। দু’শালিক দেখে অন্যমনস্ক আমি হাত তুললাম কপালে। সম্বিত ফিরল। জানি কুসংস্কার, তবু...। হাসলাম মনে মনে।
সময় চলেছে আপন খেয়ালে। আমাদের চলতে হবে সময়ের তালে তাল রেখে — এটাই নিয়ম। অযথা সময় নষ্ট না করে উঠে পড়লাম গাড়িতে। আমাদের ড্রাইভার সুফল গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢুকলাম মানবাজারে। বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে রাস্তার ডানদিকে বিখ্যাত "গণেশ" মিষ্টান্ন ভান্ডার। মনটা আনচান করে উঠল চা আর চপের জন্য। গাড়ি থামিয়ে আমরা নেমে পড়লাম। চপ তখনই ভাজা শুরু হয়েছে। অগত্যা আমরা চা খেয়ে চপ নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। এখান থেকে আমাদের গন্তব্য বেশি দূর নয় — আর মাত্র পনেরো–কুড়ি মিনিট। এই জায়গাটা বড় সুন্দর। গাড়িতে বাজছে হালকা সুর, হাতে গরম চপ, হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে সূর্যদেবের রক্তিম আভা গাছের ফাঁক দিয়ে এসে পড়ছে সোনালি ধানের ক্ষেতে। সোনালি আর সবুজের চোখ জুড়ানো মনোরম পরিবেশে পাহাড়ের গা থেকে নেমে আসে শীত। মোহময় আবেশে কামড় দিলাম গরম চপে। তৃপ্ত হলাম স্বাদ আর দৃশ্য অবলোকনে।
রাস্তার পাশে বসেছে হাট। বিভিন্ন রকমের টাটকা সবজি বিক্রি করছে চাষিরা। নেমে কেনার ইচ্ছে হচ্ছিল। দেরি হয়ে যাবে। কী আর করা যায়...। সুতরাং দু’পাশে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কালো পিচের রাস্তায় এগিয়ে চলল বোলেরো। একটু এগিয়ে ব্রেক কষল সুফল। বুঝলাম এসে গেছি খড়িদুয়ারা কুমারী গ্রাম। গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে চললাম প্রাঙ্গণের দিকে। দু’পাশে বিভিন্ন রকমের খাবারের দোকান। সামনে বিস্তৃত এবড়ো-খেবড়ো প্রান্তর। চারদিকে দেবদারু, শাল, পলাশের জঙ্গল। আমরা উঠে গেলাম টিলার উপর। একপাশে শীর্ণ শুকনো টটকো নদী। পাহাড়, টিলা আর দিগন্ত-বিস্তৃত সবুজ প্রান্তভূমি। অন্যপাশে মহেন্দ্র পীঠ মঞ্চ লোকশিল্পীর অপেক্ষায়।
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, পুরুলিয়ার ভূমিপুত্র শ্রদ্ধেয় সৈকত রক্ষিত মহাশয় পরম যত্নে লালন করছেন এই সৃজনভূমি। তাঁরই হাত ধরে সৃজন উৎসব ৩১তম বর্ষে পদার্পণ করল। মানুষের ভালোবাসা আর আন্তরিকতায় রুক্ষ-শুষ্ক অহল্যাভূমির লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য এই উৎসব ভারতমেলার রূপ নিয়েছে। "সৃজন উৎসব" শুরু হয় রাসপূর্ণিমার সময়। এই উৎসব অন্য উৎসব থেকে আলাদা, কারণ এখানে মেলবন্ধন হয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের, আর সম্মান পায় মানুষের আবেগ। "নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান / বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান" — এ এক ক্ষুদ্র ভারত, যা "বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য"-র বৈশিষ্ট্যে অটল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লোকশিল্পীরা যেন এক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।
লোককথা, লোকগান, লোকশিল্প, লোকসংস্কৃতি বছরের পর বছর ধরে আদিম সরল মানুষগুলোর বিশ্বাসের হাত ধরে মহামিলনের আকরভূমি "সৃজন উৎসব" মহানন্দের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। হেমন্তের গোধূলিবেলায়, সবুজ বনানীর স্নিগ্ধতায়, শিরশিরে ঠান্ডা সমীরণ আর পাখির কলতানে শিশিরভেজা সৃজন টিলায় ঝুপ করে নামল সন্ধ্যা। বাঁশের ডগায় লাগানো বাতির আলো নীরবে চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আলোকিত করে তোলে পুরো চত্বর। চিত্রকূট শিল্পপীঠ, কিষ্কিন্ধ্যা শিল্পপীঠ সেজে ওঠে। মাইকে বাজে গান — "কি আনন্দ আকাশে বাতাসে"।
নেমে এলাম মেলা প্রাঙ্গণে। চিত্রকূট শিল্পপীঠে শুরু হল কবিতা পাঠ। প্রকৃতি বিষয়ে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা পঁচিশজন কবির কবিতা পাঠে, শব্দব্রহ্মের নিবিড় আলাপনে, সংগ্রামী মানুষের জীবনবেদনার কথা, মানভূম ভাষার সাবলীল ছন্দে, লোকগানের সুরের মূর্ছনায় কবি ও শ্রোতার মন ছুঁয়ে যায়।
মেলায় তখন ঢল নেমেছে মানুষের। বেতের ঝুড়ি, ট্রে, জামাকাপড়, খাবার, খেলনা আর চায়ের দোকানে ভিড় জমে ওঠে। গমগম করে মেলা প্রাঙ্গণ। এ যেন লোকসংস্কৃতি ও লোকশিল্পের পাশাপাশি জীবনের মহাসংগম।
কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভাবের আদান-প্রদানে, আনন্দে-আবেগে ভুলিয়ে দেয় জীবনের জটিলতা, মনের কলুষতা। একটু আনন্দ, অফুরন্ত অক্সিজেন আর অপরিসীম মুগ্ধতা কুড়িয়ে নিতে বছর বছর অকৃত্রিম, সংগ্রামী মানুষগুলো শীতের পরশ উপেক্ষা করে মিলনমেলায় মিলিত হয় আবেগ আর ভালোবাসার টানে। সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসে লোকশিল্পীর দল ভালোবাসার টানে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে। আর এখানেই তো উৎসবের সার্থকতা।
আমরাও প্রাণভরে শ্বাস নিলাম। ভালোলাগায়, ভালোবাসায় বন্দি করলাম মুহূর্তগুলো। ভালো থাকার রসদ করে নিজের কাছে রেখে দিলাম পরম যত্নে। গাড়ির হর্ন বেজে উঠল। এবার আমাদের ফেরার পালা। বসলাম যে যার নিজের সিটে। ঘুরে তাকালাম। মনে হল জ্যোৎস্নার আলোয় উদ্ভাসিত সৃজন টিলা চিৎকার করে বলে উঠল — "আমি পেরেছি এই ঘুণধরা বিষাক্ত পরিবেশে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে একটু হলেও নির্মল আনন্দ দিতে।" মনে মনে বললাম আবার আসব। গাড়ি এগিয়ে চলল। চোখ বুজে আনন্দের রেশ নিতে লাগলাম। গাড়িতে বাজছে — "এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না"...।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।