ঝমঝম বৃষ্টি, লাগাতার চলছে আজ চারদিন হল। আকাশ ঘন ধূসর রঙা গর্ভবতী মেঘেদের দখলে। মাঝেমধ্যেই তাদের বজ্র হুংকারে কেঁপে উঠছে কুলিলাইনের লাগোয়া কোয়ার্টারগুলো। জল জমেছে ঘরের সামনে। রোদের দেখা নেই দূরদূরান্তে।
ভোরে ঘুম ভাঙা ইস্তক, মাঘের শীতের এই অকাল বৃষ্টিতে বিপদের গন্ধ পাচ্ছে সোমারু। এর আগে মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে সিকিমের লোনাক লেকের জল বিস্ফোরণে ওদের ডুয়ার্সে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছিল। সুন্দরী তিস্তা পাহাড়ি জলে তখন খরস্রোতা! দুকূল ভাসিয়েছিল। সোমারুর পিসতুতো ভাই সুরজ সিকিমে রাজমিস্ত্রির কাজে জোগাড়ে ছিল। বিপর্যয়ের পর থেকে নিখোঁজ সে। জীবিত বা মৃতের মাঝখানে সে। বডি পাওয়া না যাওয়ায় ফ্যামিলি ক্ষতিপূরণ পায়নি। খুবই খারাপ পরিস্থিতি। সোমারুর নিজের নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে খরচ বাঁচিয়ে চেষ্টা করেছিল সাহায্য করতে, কিন্তু যা হয়! কন্টিনিউ করতে পারেনি।
ধর্মান্তরিত না হয়ে নিজেদের চিরাচরিত আদি ধর্ম পালন করলেও সোমারু ছোটবেলা স্থানীয় চার্চের ফাদারের সান্নিধ্যে এসেছিল। সামান্য পড়াশোনা করেছিল। ফাদারের মুখে শুনেছিল ওদের পূর্বপুরুষের এই ডুয়ার্সে আসার মর্মস্পর্শী ইতিহাস। ঔপনিবেশিক প্রভুরা আবিষ্কার করেছিল দার্জিলিং ও ডুয়ার্সের আবহাওয়া, যেখানে প্রচুর বৃষ্টি হয় অথচ পার্বত্য অঞ্চলের ঢালু জমিতে জল দাঁড়ায় না। চা উৎপাদনের পক্ষে অত্যন্ত উপযোগী। দার্জিলিং অঞ্চলে উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে পুরোপুরি চা উৎপাদন শুরু হলেও ডুয়ার্সে শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। মুশকিল হয়েছিল অন্যত্র। এখানকার স্থানীয় অধিবাসী, নেপালী, রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষজন চা উৎপাদনের অংশীদার হতে আপত্তি জানায়। তারা কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখেছিল নতুন আবিষ্কৃত পানীয় এবং তার উৎপাদন প্রক্রিয়াকে। অতএব মুশকিল আসানে তারা নতুন পথ ধরল। মধ্যভারত সংলগ্ন ছোটনাগপুর, হাজারিবাগ, রাঁচি, সাঁওতাল পরগণা প্রভৃতি অঞ্চলের অধিবাসীদের বলপূর্বক ধরে আনা হল স্বল্পবেতনের শ্রমিক হিসেবে। প্রচুর আড়কাটি বা দালালেরা নিযুক্ত ছিল এই কাজে। প্রায় ক্রীতদাসের জীবনযাপন করতেন এরা। মধ্যদেশ থেকে আগত বলে এরা মদেশিয়া জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত হয়। নিজস্ব মাতৃভাষার সাথে বাংলা, নেপালী, হিন্দির মিশ্রণে সৃষ্ট সাদরি ভাষার চলন হয়। এখনও নিজেদের মধ্যে সোমারুরা সাদরি ভাষাতে কথা বলে।
স্মৃতির সরণি থেকে বর্তমানে ফেরে সোমারু। একটানা বিরামহীন বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত। ওদের চা বাগান থেকে সস্তার রেনকোট দিয়েছে বটে। এত বৃষ্টিতে কাজে আসে না তেমন। ক’দিনের মধ্যে ফুটো হয়ে যায়, নইলে ছিঁড়ে যায়। সুতরাং ডিউটি যাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। এছাড়া সাপখোপের ভয়, বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব, ছাড়াও নানান বিপদ উপেক্ষা করেই কাজে যেতে হয়। কাজ না করলে পয়সা আসবে না, পেট চলবে না। ঘরে তিন তিনটে পেট। তার মধ্যে মেয়েটা পড়ালেখা করে। এবারে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। ওর কুলি লাইনের সহকর্মীরা বলে, "গরিবের ঘোড়া রোগ।" ওদের ভাষায় অন্য হলেও মর্মার্থটা এক।
আঠারো বছরের মেয়ে কোথায় শাদি দেবে তা না করে বলে শহরের কলেজে পড়াবে! সোমারুর দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তের সমালোচক অনেকেই। সমর্থক আছে হাতেগোনা দু’একজন।
বৌ মুংলী স্বামীর অনুগামিনী। ঘর থেকে কর্মক্ষেত্র সর্বত্র। নেশাভাঙ নেই! স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত! এমন মানুষ ওদের কুলি লাইনে বিরল। কাজেই পতিদেব ওর কাছে আক্ষরিক অর্থে দেবতাস্বরূপ। সুতরাং বর যা বলে ওর কাছে বেদবাক্য। একেবারে রাজযোটক। একমাত্র মেয়ে দুর্গা ওদের সবটুকু। ওকে ঘিরে ওদের ছোট্ট পৃথিবীর আবর্তন। মেয়ে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে দুজনের সমান নজর। মেয়ে নিয়ে বাড়াবাড়ি দেখে পাল্লাভারী সমালোচকেরা, সমালোচনার উপসংহার টানে এক মোক্ষম ব্রহ্মাস্ত্রে — "তাও যদি নিজের মেয়ে হত! কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েকে নিয়ে এত ঢং!"
রোজ সকালে মন্দিরে প্রণাম করতে যাওয়া সোমারু, তিনটি পথকুকুরের সজাগ পাহারায় কাপড়ের পুটলির সামান্য নড়াচড়া এবং ক্ষীণ ক্রন্দনধ্বনির আওয়াজে কৌতূহলবশত এগিয়ে গিয়ে আবিষ্কার করেছিল এক সদ্যোজাত শিশুকন্যাকে। ও বাচ্চাটিকে কোলে নেওয়ায় যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল কুকুরগুলো। দায়িত্বমুক্তির ছাপ তাদের শারীরিক অভিব্যক্তিতে। মানবিকতার নজির দেখাল মনুষ্যতর প্রাণীগুলি।
দুর্গাকে পাওয়ার দিনটি ছিল এমনই এক বর্ষার ভোর। শীতকাল হলে হয়তো বাঁচানো যেত না শিশুটিকে। বাচ্চাটিকে উদ্ধার করে স্ত্রী মুংলীর কোলে তুলে দিয়েছিল সোমারু। নিঃসন্তান দম্পতির পরিবার পরিপূর্ণ হয়েছিল মা দুর্গার আশীর্বাদক্রমে — এমন বিশ্বাসে মেয়ের নাম রেখেছিল দুর্গা। রঙে-রূপেও মেয়ে সার্থকনামা। যদিও বিপদে ত্রিশূল ধরার পরিস্থিতি আসেনি এখনও বাপ-মায়ের নজরদারির দৌলতে।
পিঁপড়ের কামড়, সারারাত ওভাবে পড়ে থেকে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সদ্যজাত দুর্গা। মালবাজারের হাসপাতালে তিনদিন ভর্তি ছিল মেয়েকে নিয়ে মুংলী। সোমারু ওই বাড়ি ফেরেনি। একেবারে বৌ-মেয়েকে নিয়ে ফিরেছে বাগানে। সেই থেকে দুর্গা আছে ওদের কাছে, পরম যত্নে। নিজেরা কষ্ট করলেও মেয়েকে কষ্টের আঁচ পেতে দেয় না একেবারে।
বৃষ্টিটা অবশেষে ধরেছে। কাজে বেরোয় ওরা। এভাবে ভালো-মন্দে দিন কেটে যায়।
ওদের নিস্তরঙ্গ জীবনে আলোড়ন ওঠে, যখন বাপ-মায়ের মান রেখে উচ্চমাধ্যমিকে দুর্দান্ত রেজাল্ট করে দুর্গা মুন্ডা — সোমারু আর মুংলী মুন্ডার সুযোগ্যা কন্যা। পেপারওয়ালা এসে খবর করে। নিউজপেপারে ফটো ওঠে ওদের। কুলি লাইনে এই প্রথম এত বড় সাফল্য! তাও আবার ওদের মেয়ের হাত ধরে। সমালোচকদের থোঁতা মুখ ভোঁতা করে দিয়েছে একরত্তি মেয়ে দুর্গা।
মেয়ে স্কলারশিপ পেল। কলকাতার বড় কলেজে পড়ার সুযোগ পেল সেই সঙ্গে। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রথম বড় শহরে পা রাখা সোমারুর। এর আগে চা বাগানের বাইরে পা রাখেনি বা রাখার সুযোগ হয়নি। ওদের সঙ্গে অবশ্য ম্যানেজার সাহেব বড়বাবুকে পাঠিয়েছিলেন। শুধু সোমারু নয়, দুর্গার কল্যাণে অখ্যাত এই গ্রিন-ভ্যালি চা বাগানের নাম সকলে জানে। এটুকু তো কর্তব্য ছিল মালিকপক্ষের তরফ থেকে। এতদিন বিষাক্ত মদ, অনাহার, লকআউটের খবরের বাইরে গিয়ে সফলতার মুক্ত বাতাস বয়ে এনেছে মেয়েটা।
মুংলী যায়নি। সে ঘরে বসে মুখ লুকিয়ে কেঁদেছে। মা–মেয়ের ছাড়াছাড়ি এই প্রথম। একা একা মেয়ে কী করে থাকবে? কী খাবে? পেট ভরবে নাকি? এসব ভেবে ভেবে হয়রান হয়ে যাচ্ছে সরলসিধে মেয়েটা। ডিউটিতে গিয়েও কাজে ভুল হচ্ছে বারেবারে।
সাতদিনের মাথায় সোমারু ফিরল, মেয়েকে কলেজের হোস্টেলে রেখে। স্কলারশিপ পেলেও আনুষঙ্গিক অনেক খরচ আছে। ওদের স্বামী-স্ত্রীকে আরও পরিশ্রম করতে হবে। করবে। মেয়ের জন্য একটু পারবে — পারতেই হবে। চোয়াল শক্ত হয়।
বাবা চলে যাওয়ার পর লুকিয়ে খুব কেঁদেছিল দুর্গা। একা একা থাকতে ওর মোটেও ভালো লাগছিল না। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল এত ভালো রেজাল্ট না করলেও হত। বড়জোর জলপাইগুড়ির কলেজে পড়ত। বাবা-মায়ের কাছে তো থাকতে পারত।
ওর রুমমেট পলিটিকাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের রাবেয়া খাতুন। মেয়েটি ভালোই। মালদা থেকে এসেছে। দুর্গার মতোই গরিব ঘরের মেয়ে এবং দু’জোড়া সালোয়ার-কামিজ সম্বল করে এসেছে।
দুই পরিবারে ওরাই প্রথম, যারা উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে এসেছে, উপরন্তু কন্যাসন্তান। অনেক আশা নিয়ে পাঠিয়েছে বাপ-মা। পরিবারের সম্মান রাখার গুরুদায়িত্ব ওদের কাঁধে। দুদিনেই ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে দুজনের।
কলেজে গিয়ে আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠতেই মাসখানেক কেটে গেছে। ইকোনমিকসে অনার্স নিয়েছে দুর্গা। ধনী–দরিদ্রের অসাম্য ঘোচানোর শপথ ওর। ধনীশ্রেণী ফুলে-ফেঁপে আরও উঠছে, অন্যদিকে সর্বহারা গরিব শ্রেণী খালি পেটে রাত কাটাচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না। ছোট থেকেই এই ভাবনা ওর। দারিদ্র্য অনুভব করেছে ও, সে বাবা-মা যতই গোপন করার চেষ্টা করুক।
ও আরও জানে, ও কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে। ওর ধবধবে গায়ের রং, খাড়া নাকের আর্যসুলভ চেহারা সম্পূর্ণ বেমানান মদেশিয়া দম্পতির সন্তান হিসেবে। সুতরাং বিস্তারিত তথ্য দায়িত্ব নিয়ে ছোটবেলাতেই জানিয়ে দিয়েছিল তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
ম্যাচিওরিটি ছিল অতটুকু বয়সেও। বাবা-মাকে জানতে দেয়নি যে ও জানে নির্মম সত্যিটা। বড় হয়ে হিসেব মিলিয়েছিল — ও পরিত্যক্ত সন্তান। মেয়ে হওয়ার অপরাধে কোনো দম্পতি ছেড়ে গিয়েছিল মৃত্যুমুখে। উত্তরাধিকারসূত্রে যে সৌন্দর্য পেয়েছে, স্বভাবতই ধরা যায় জন্মদাতা পিতামাতা তথাকথিত ভদ্র ও উচ্চবিত্ত পরিবারভুক্ত হবেন। নিকৃষ্ট মানসিকতার মানুষগুলির প্রতি একরাশ ঘৃণা দুর্গার।
ভাগ্য ভালো, এমন মহান হৃদয়ের মানুষদুটির সন্তান হতে পেরেছে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা — পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে, ও যেন এবার সোমারুর ঔরসে এবং মুংলীর গর্ভে জন্মায়। পালক পিতামাতা ওর কাছে সব। নিজের বাপ-মায়ের খোঁজ পেতে ইচ্ছে করেনি কখনও। তাদের ঘৃণা করে ও মনেপ্রাণে।
ভালোই চলছিল সব। ক্লাসের প্রফেসররা যথেষ্ট স্নেহ করেন ওকে। এত স্টুডেন্টের মাঝেও আলাদা নজর পড়েছে ওর ওপর, যদিও ওর নিজের কৃতিত্ব এখানে ষোলো আনা। ওর বুদ্ধিমত্তা, পড়াশোনায় মনোযোগ, নিয়মানুবর্তিতা নজর কেড়েছে প্রফেসরদের।
না চাইতেও নজরে পড়েছে আরও একজনের — উঠতি ছাত্রনেতা সৌরভ দত্তর। যদিও কারণটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ নজর কামনাজর্জর লোভের। গাঁইয়া মেয়েটা বেশ ডাগরডোগর। একদিন চেখে দেখতে হবে। শান্তশিষ্ট হলেও খবর আছে একটু প্রতিবাদী টাইপ। জংলি বিড়াল পোষ মানাতে বেশ লাগে। এর আগে কম তো মেয়ে ঘাঁটেনি — রোগা-মোটা, বেঁটে-লম্বা, ফর্সা-কালো সব ধরনের। সব বড্ড মিয়ানো। শিকার ধরার আগেই বশ্যতাস্বীকার।
সৌরভের বাবা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কেষ্টবিষ্টু গোছের। বাতাসে খবর ভাসছে — আসন্ন নির্বাচনে তার বিধায়ক পদে মনোনয়ন কেবল সময়ের অপেক্ষা। পিতৃদত্ত ক্ষমতাবলে বলীয়ান সৌরভ পারলে হাত দিয়ে মাথা কাটে। বছর দশেক হয়ে গেল কোন যাদুবলে কলেজের ছাত্রনেতার পদে আছে। কী পড়ে? কোন ইয়ারে পড়ে? সাবজেক্ট কী? সম্ভবত দেবতারও অজ্ঞাত সে সব তথ্য।
তবে নিয়ম করে, দায়িত্ব নিয়ে প্রতিবছর প্রত্যেক ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের ইন্টারভিউ — যা র্যাগিঙের নামান্তর — নিয়ে থাকে সে। কেউ প্রতিবাদ করে নিজের বিপদ ডেকে আনতে চায় না, তাই দুর্বিনীত, অসভ্য, অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে সে। বাবার সৌজন্যে রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে নেপথ্যে। ভবিষ্যতের ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ হওয়ার সব উপাদান রয়েছে ওর মধ্যে বলে আশাবাদী অনেকেই। সুতরাং আগামীর সম্ভাবনা সমাদরে পালিত হচ্ছে।
অপরিমেয় ক্ষমতা পেলেই হয় না, তার সঠিক ব্যবহার জানতে হয় — তা বোধহয় ভুলে গিয়েছিল সৌরভ। প্রতিবছরের অভ্যেসমতো এবারও ফাস্ট ইয়ার স্টুডেন্টদের ডেকেছিল ইন্ট্রোডিউস প্রোগ্রামে। সেখানেই চোখে পড়েছিল দুর্গাকে। গাত্রবর্ণের সঙ্গে পদবীর অসামঞ্জস্যতা নিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিতের পরিপ্রেক্ষিতে সপাটে চড় কষিয়েছিল দুর্গা সর্বসমক্ষে। প্রাণ থাকতে বাবা-মায়ের অপমান সইবে না সে। সহপাঠীরা অবাক বিস্ময়ে দেখেছিল আপাত শান্ত, নিরীহ গ্রাম্য মেয়েটির রাগের বহিঃপ্রকাশ।
হিসহিসিয়ে বলেছিল — অশ্রাব্য কিছু বিশেষণ যুক্ত করে — "শালী! তোর এমন হাল করব, নিজেই নিজের থেকে পালাবি ঘেন্নায়, লজ্জায়!"
এই ঘটনার পরিণতি হয়েছিল সুদূরপ্রসারী এবং ভয়ানক। যার অভিঘাতে বদলে গিয়েছিল সহজ-সরল দুর্গার জীবনের গতিপথ।
সেদিন হোস্টেলে ফিরতেই সব শুনে রাবেয়া কেঁদে ফেলে আশঙ্কায়। বিষধর সাপের লেজে পা দিয়েছে দুর্গা। পাল্টা ছোবল এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
ছোট দুটো কি-প্যাড ফোন কিনেছিল দুর্গা বাপ-বেটি পরস্পরের জন্য। ওটাই একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম। সে রাতে বাবাকে সব জানিয়েছিল দুর্গা। মেয়েকে আশ্বস্ত করলেও অজানা বিপদের আশঙ্কায় দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি সোমারু আর মুংলী।
খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ঘটনা বা দুর্ঘটনায় তিনদিনের মাথায় কলেজফেরতা দুর্গার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে ঝলসে দিল দুজন অজ্ঞাতপরিচয়, মুখঢাকা হেলমেটপরিহিত বাইক আরোহী। প্রথমজন বাইক চালাচ্ছিল। পেছনে বসা দ্বিতীয়জন অ্যাসিড ছুঁড়েছে।
তীব্র জ্বলনে জ্বলে গেল ব্রহ্মাণ্ড! অমানুষিক যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়েছিল দুর্গা। জ্ঞান ফিরেছিল পাক্কা দুদিন পর হাসপাতালের বিছানায় নিজেকে অনুভব করেছিল। দেখতে পায়নি আর। পেশাদার আক্রমণকারীর সৌজন্যে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। শরীরে-মনে অপরিমেয় যন্ত্রণায় কাটে প্রহর। বাঁচার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ওকে ফেরায় জীবনে। সঙ্গে অসহায় বাপ-মায়ের প্রার্থনা।
যমে-মানুষে লড়াই চলেছিল ওকে নিয়ে। হাসপাতালের সার্জেন ডাক্তার বরুণ মজুমদারের আন্তরিক চিকিৎসা আর সহযোগী সিস্টারদের অপরিসীম যত্ন এবং নাছোড় মানসিকতার লড়াইয়ে হার হল যমের, জিতল মানুষ। দুর্ভাগা মেয়েটির উপর মায়া পড়ে গিয়েছিল ওদের। সুস্থ করে বাবা-মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে ওরা যেন স্বস্তি পেলেন। উদ্বেগমাখা আকুল কণ্ঠস্বরে বাবা-মাকে চিনতে ভুল হয়নি দুর্গার। ইনফেকশনের আশঙ্কায় তখনও মেয়েকে স্পর্শ করা বারণ।
ক্ষীণ কণ্ঠে দুর্গা প্রশ্ন করেছিল, "বাবা-মাকে কে খবর দিল?"
জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে থাকা দুর্গা জানত না যে ও নিজেই এখন খবর — একেবারে সংবাদশিরোনামে। নির্বাচনের মুখে বিরোধীপক্ষ লুফে নিয়েছে এমন হট টপিক। প্রিন্ট থেকে ইলেকট্রনিক সব মিডিয়ায় মারাত্মক হৈচৈ হচ্ছে ওকে নিয়ে। বিজ্ঞজনদের নিয়ে আলোচনা সভা হচ্ছে। শহরে-শহরে মোমবাতি মিছিল বেরিয়েছে ফেরার অপরাধীর শাস্তির দাবিতে।
ভোটের মুখে এমন বেমক্কা সিদ্ধান্ত নেওয়াতে ছেলেকে তিরস্কৃত করলেও ধৃতরাষ্ট্রের ঐতিহ্য মেনে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিয়েছেন ছেলেকে সরোজবাবু। পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে ধীরে-সুস্থে ঘরের ছেলেকে ঘরে ফেরানো যাবে। পাবলিকের একটি মহৎ গুণ — তাদের স্মৃতিশক্তি বড্ড দুর্বল। বেশিদিন কিছু মনে রাখে না। অন্য কোনো গরমাগরম খবর পেলে এটি ভুলে নতুন খবরের পেছনে ছুটবে। আপাতত ধীরে-চল নীতি ফলো করছেন। একদিন হাসপাতালে গিয়ে মেয়েটিকে দেখেও এসেছেন যথাযথ চিকিৎসার আশ্বাস দিয়ে। জনপ্রতিনিধি বলে কথা! মানুষ-মানুষে ভেদাভেদ করলে চলে? একটাই আশঙ্কা — বিধায়কের মনোনয়ন যেন বাতিল না হয়ে যায়। এত দৌড়াদৌড়ি বিফলে না যায়।
দীর্ঘ তিনমাস হাসপাতালে কাটিয়ে যখন বাইরে এল দুর্গা, তখন বাপ-মা আর অন্ধের যষ্টি সম্বল।
জননেতা সরোজবাবুর দূরদর্শিতাকে মান্যতা দিয়ে পাবলিক তখন ব্যস্ত নতুন কোনো হট নিউজের পোস্টমর্টেমে। সৌরভ ততদিনে আবার ফিরে এসেছে স্বমহিমায়। নির্বাচন মিটে গেছে। সরোজ দত্ত বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন দুর্বল স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন জনগণের সৌজন্যে।
কোর্টে কেস চলছে বটে — সেই প্রতিবাদী আদিবাসী মেয়েটির। বাবা-মায়ের হাত ধরে বর্তমানে সে তো অন্ধ! হাত ধরা ছাড়া গতি কী? নিজের মনেই খানিক হেসে নেন সরোজবাবু। কেবল কাল্পনিক হরর গল্পে নয়, বাস্তবে সরোজবাবুদের মতো আরও ভয়ংকর পিশাচ আছে। থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারি ঘুরছে, ঘুরুক। কাজ হয়নি। প্রমাণাভাবে এবং সরোজবাবুর দাক্ষিণ্যে সে কেস ধামাচাপা পড়ল বলে। হাতি-ঘোড়া গেল তল…! বহুকাল আগে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের “আইনের বড়লোকের অর্থবলের সৌজন্যে তামাশায় পরিণত হওয়া” মূল্যায়নটি আজ একবিংশ শতকেও সমান প্রাসঙ্গিক।
“সব ভালো যার শেষ ভালো” আপ্তবাক্য স্মরণ রেখে সব ঝড়ঝাপটা সামলেও পার্টির মনোনয়ন তথা টিকিট তিনি পাবেন বলে এখনও যথেষ্ট আশাবাদী সরোজবাবু।
এদিকে সবার অলক্ষে বড় শহর ছেড়ে বাবা-মায়ের হাত ধরে নিউ জলপাইগুড়ি ফেরার ট্রেনে চাপে দুর্গা। আবার ফিরবে ও — মুখ লুকিয়ে নয়, মাথা উঁচু করে নিজের প্রাপ্য বুঝে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে। আপাতত কঠিন লড়াই লড়তে যাচ্ছে ও।
ফিরে আসে দুর্গা। একটা বছর নষ্ট হল। স্থানীয় কলেজে ভর্তি হয়।
ওর বিভৎস মুখ দেখে কেউ ভয় বা অস্বস্তি পেলেও মুখ ঢাকে না ও। সমাজের কদর্যতা, অবিচারের জ্বলন্ত প্রতিবাদস্বরূপ। এই বিভৎসতার দায় তো ওর নয়! তবে ও কেন মুখ ঢাকবে?
সুস্থ হতেই সময় নষ্ট না করে ব্রেইলে পড়াশোনা শুরু করে। নতুন সিস্টেমে ধাতস্থ হতে সময় লাগবে। দৃষ্টিহীন মেয়েকে পালা করে বাবা-মা নিয়মিত কলেজে নিয়ে যায়।
অন্ধকারে আলোর শিখার মতো এই দুঃসময়ে ওর জীবনে বসন্ত আসে শঙ্করের রূপে। শঙ্কর ওঁরাও — লম্বাচওড়া, মজবুত শরীর। কালো কষ্টিপাথর কুঁদে সযত্নে গড়েছে ওকে বিধাতা। কলেজ পাস করে চাকরির চেষ্টা করছে। ওদের বাগানের কুলি লাইনের ছেলে। দুর্গার থেকে বছর তিনেকের বড় হবে। ছোট থেকেই দুর্গাকে পছন্দ করত, বলার সাহস করে উঠতে পারেনি তখন। দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়েছে এখন ঢাল হয়ে।
প্রথমে দুর্গা তাড়িয়ে দিয়েছিল যা-তা অপমান করে — "দয়া দেখাতে এসেছিস? মুখপোড়া, অন্ধ মেয়েকে? আমার কারও দয়া চাই না!"
ভাগ্যবিড়ম্বিতা মেয়েটির ওর প্রতি দয়া দেখানোতে চরম আপত্তি। দিনের পর দিন ধৈর্য ধরে শঙ্কর দুর্গাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল “দয়া” আর “ভালোবাসার” সূক্ষ পার্থক্য। থমথমে পরিবেশ রসিকতায় হালকা করার সহজাত ক্ষমতা আছে সদাহাস্যোজ্জ্বল ছেলেটির। পুরাণে আছে তপস্যা করে শঙ্করের ধ্যান ভাঙিয়েছিল দুর্গা — আর এখানে উল্টোপুরাণ! শঙ্কর তপস্যা করে দুর্গার ধ্যান ভাঙাচ্ছে।
নিজের রসিকতায় নিজেই হা-হা করে হাসে। গুমোট ভাবটি যেন কেটে যায় শঙ্কর নামক দমকা হাওয়ায়। ওকে দেখে সোমারু-মুংলীর মুখেও হাসি ফোটে। এখনও মনুষ্যত্ব বেঁচে আছে।
ইদানীং শঙ্কর দুর্গাকে কলেজে নিয়ে যাচ্ছে। খানিক নিশ্চিন্ত হয়েছে হতভাগ্য বাপ-মা।
সবাই খারাপ নয় — ভালো-মন্দ মিলিয়েই দুনিয়া। বাবার কথার সার্থকতা অনুভব করে দুর্গা, যখন দেখে বিনাস্বার্থে প্রফেসররা ওর প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। সহপাঠীরা সহযোগিতা করে। ক্রমশ জীবনের মূল স্রোতে ফেরে দুর্গা। মনে প্রত্যয় জাগে — দুষ্কৃতিরা কেবল চামড়া পুড়িয়েছে, চোখ নষ্ট করে দিয়েছে। ওগুলো তো বাইরের আভরণ। ওর প্রত্যয় নষ্ট করতে পারেনি — আঘাতে বরং সেটি আরও ধারালো, মজবুত হয়ে উঠেছে। সেই অস্ত্রে শান দেয় দুর্গা অহর্নিশি।
ক্রমে দিন-সপ্তাহ-মাস কাটে, ঋতু পরিবর্তিত হয়, বছর ঘোরে। ভালো নম্বর নিয়ে গ্রাজুয়েশন করে এল.এল.বি.-তে অ্যাডমিশন নিয়েছে দুর্গা।
এদিকে ততদিনে খেটে-খুটে শঙ্কর পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চাকরি পেয়েছে। আলিপুরদুয়ারে পোস্টিং। ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করে — যত কাজ থাকুক, দুর্গার কাছে একবার আসবেই।
দুর্গা ওর অন্ধকার পৃথিবীতে অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছে। এখন ও একা-একাই চলাফেরা করে। বাবা-মা আর কতদিন ওর সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরবে? বাবা-মায়ের তো পেট চালাবার সঙ্গে-সঙ্গে ওর পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়। দুজনে কাজ না করলে চলবে কেন?
লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি দুর্গা। পাখির চোখ ওর নির্ধারিত শিকারের দিকে।
সৌরভ এখন ছাত্ররাজনীতি ছাড়িয়ে মূল রাজনৈতিক স্রোতে মিশছে ক্রমশ। ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাঘুরি শুরু করেছে ইদানীং। ওর কেসটা ধামাচাপা পড়লেও একেবারে খারিজ হয়ে যায়নি — খোঁজখবর নিয়ে জেনেছে শঙ্কর। যদিও আইনের ছাত্রী হিসেবে জানে, যেকোনো কেসে প্রমাণ কথা বলে। ওর কেসে প্রত্যক্ষদর্শী কেউ নেই।
আকাশকুসুম ভেবে কূলকিনারা পায় না দুর্গা। বিচারের বাণী নিরবে-নিভৃতে কেঁদে চলবে যুগে-যুগে! মাঝেমধ্যে হতাশা গ্রাস করে।
আরও কটা বছর কেটে গেছে। দুর্গা ওকালতি পাস করে কোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করেছে অভিজ্ঞ সিনিয়র উকিলের অধীনে। মেধাবী, বিনয়ী মেয়েটিকে যথেষ্ট স্নেহ ও সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট অরিন্দম বসু। হার না-মানা মেয়েটির লড়াইয়ে সামিল তিনিও।
ধীরে-ধীরে অভিজ্ঞতার সঙ্গে-সঙ্গে পসার ভালো জমছে দুর্গার। বাবা-মাকে আর কাজ করতে যেতে দেয় না। এখন ওরা চা-বাগানের কুলি লাইনের কোয়ার্টারে থাকে না। মালবাজার শহরে ছোট একটা বাড়ি তৈরি করেছে। ওখানেই বসবাস ওদের ছোট পরিবারের।
শঙ্করের প্রমোশন হয়েছে। বেচারা রোজের ডিউটি কামাই নেই — সে অফিস হোক বা দুর্গাদের বাড়ি।
সোমারু-মুংলীর ইচ্ছে — মেয়ের বিয়ে, শরীর-গতিক ঠিক থাকতে-থাকতেই নাতি-নাতনি মানুষ করে দেওয়া!
মেয়ের একগোঁয়েমি — অপরাধীকে শাস্তি না-দিয়ে ও কিছুতেই বিয়ে করবে না। পরিস্থিতি দেখে ব্যাজার মুখে শঙ্কর ভাবে — শয়তান সৌরভ ধরাও পড়বে না এ জীবনে, আর বিয়েও হবে না ওর! বয়স পঁয়ত্রিশ পেরিয়ে গেছে।
শঙ্করের বাবা মারা গেছে সেই ছোটবেলায়। মা একাই মানুষ করেছে ওকে। বুড়ি মা — ছেলের বউ না-দেখার আক্ষেপ নিয়েই চিতায় যাবে শেষ পর্যন্ত।
ঈশ্বরের বোধহয় ইচ্ছে অন্যরকম ছিল। নইলে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে দীর্ঘ পনেরো বছর পর সৌরভের ডানহাত এবং অ্যাসিডকাণ্ডের অন্যতম অপরাধী রোহন সিংহ কলকাতা থেকে সুদূর উত্তরবঙ্গে এসে দুর্গার সঙ্গে যোগাযোগ করবে কেন? সৌরভের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে অপমানিত রোহন নিজের নাক কেটে অপরের — অর্থাৎ সৌরভের — যাত্রাভঙ্গ করতেও প্রস্তুত।
রোহন ছিল সেই অভিশপ্ত দিনের বাইকচালক। সৌরভের নির্দেশে অ্যাসিড ছুঁড়েছিল জিতেন রজক।
রোহনকে সঙ্গে পেয়ে নতুন উদ্যমে ঝাঁপালো দুর্গা। সঙ্গে শঙ্করের অকুণ্ঠ সহযোগিতা। দুর্ঘটনাটা যে থানায় নথিবদ্ধ হয়েছিল, তৎকালীন পুলিশ ডিপার্টমেন্টের প্রয়োজনীয় গোপনীয় নথিপত্র ওখানকার সহকর্মীদের সহায়তায় জোগাড় করেছিল শঙ্কর। তবে অত্যন্ত গোপনে এবং খুব সন্তর্পণে এগোতে হচ্ছিল — কারণ বিপক্ষ অতি প্রভাবশালী।
দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত বাইকের নম্বর, সি.সি. ক্যামেরার ফুটেজ, থানার নথিপত্র, সর্বোপরি রোহনের সাক্ষ্য — ইত্যাদি অস্ত্র সংগ্রহ করে আজকের দুর্গা নামল অসুর-নিধনে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে পাল্টা লড়াইয়ের শুরু থেকেই গণতন্ত্রের তৃতীয় স্তম্ভ — সংবাদমাধ্যমের সাহায্য নিয়েছিল দুর্গা। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে লক্ষ্যে এগোল অবিচল মেয়ে।
কাজটা সহজ ছিল না। অনেক বাধা-বিঘ্ন, ভীতিপ্রদর্শন, প্রাণনাশের হুমকি উপেক্ষা করে যুদ্ধ জারি রেখেছিল দুর্গা। ওর দৃষ্টিহীন পোড়া মুখ যেন সমাজের যাবতীয় অন্ধকার, কদর্যতার বিভৎস রূপের প্রতীক হয়ে ধরা দিয়েছিল।
জনরোষে কোণঠাসা সপুত্রক সরোজ দত্ত। মাঝে কেটে গেছে পনেরো বছর। আবারও নির্বাচন আসন্ন। অতএব দলের যাবতীয় আবর্জনা ঝেড়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার্থে শীর্ষ নেতৃত্ব জনমতকে প্রাধান্য দিয়ে দল থেকে বহিষ্কার করল পিতা-পুত্রকে। কোর্টেও যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সৌরভের অপরাধ প্রমাণিত হয়ে গেল। ইতিমধ্যে পুলিশের তৎপরতায় জিতেন অ্যারেস্ট হয়ে তার অপরাধ স্বীকার করেছে এবং অপরাধটি যে সে সৌরভের নির্দেশে করেছে, সেকথাও কবুল করেছে।
নিজের জালে নিজেই জড়িয়ে সৌরভের আম-ছালা দুটোই গেছে। উজ্জ্বল রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ভাবমূর্তি ধূলিস্যাৎ। দুর্গার প্রতিবাদে ভরসা পেয়ে মুখ খুলেছে আরও নির্যাতিতা — যারা একদা অসম্মানিত হয়েছিল সৌরভের দ্বারা। সব মিলিয়ে সৌরভের কেরিয়ার শেষ। অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে পেরেছে দুর্গা।
সৌরভের অপরাধ প্রমাণিত হয়ে গেছে। জেলযাত্রা কেবলমাত্র স্বল্পসময়ের অপেক্ষা।
রূপকথার গল্পের মতোই সত্যের জয় হল অবশেষে। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ভেঙে পড়ে দুর্গা অসুর-দমনের আনন্দে। সোমারু-মুংলী আজ খুব খুশি। কতদিন পর মেয়ের মুখে আবার হাসি দেখছে ওরা।
দৃষ্টিহীন দুর্গা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুভব করে — এত ভিড়ের মাঝে একজোড়া চোখ চরম প্রত্যাশায় চেয়ে আছে ওর দিকে। বলাবাহুল্য, সে চোখজোড়া শঙ্করের। এতগুলো বছর সুখে-দুঃখে দুর্গার সঙ্গে সমান তালে লড়েছে ও। আর ওকে অপেক্ষা করাবে না।
শঙ্করের প্রশস্ত বুকে রণক্লান্ত শরীর নিয়ে আশ্রয় নেয় দুর্গা। পরম মমতায় পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে ওরা — পারস্পরিক ভরসামাখা ভালোবাসায়।
লেখিকার জন্ম ও কর্ম হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত শিলিগুড়ি শহরে। ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন, যা তাঁর প্রিয় বিষয়। বালিকা বয়সে লেখালেখি শুরু, প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও তার কলম থামেনি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে ইতিহাসভিত্তিক দুটি একক গ্রন্থ।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।