মিডিয়ার ভাষায় যাকে বলে 'লাইভ টেলিকাস্ট' (সরাসরি সম্প্রচার) তেমন করেই বদলে যাচ্ছে "গ্লোবাল অর্ডার" বা বিশ্বের শৃঙ্খলা। সহজভাবে বললে, এই বিশ্বের সামগ্রিক পরিস্থিতি।
ঠান্ডা যুদ্ধ-পরবর্তী নব্বইয়ের দশকে শুরু হওয়া নয়া উদারবাদী আর্থিক জমানায় দ্রুত আর্থিক বৃদ্ধি সত্ত্বেও একের পর এক বিশ্বব্যাপী আর্থিক বিপর্যয়, বাড়তে থাকা সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য (একাধিক অক্সফাম রিপোর্ট), কোভিড মহামারি, ইউরোপ ও এশিয়া জুড়ে একের পর এক সামরিক সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সুপার পাওয়ার আমেরিকা ও সম্ভাব্য সুপার পাওয়ার চীনের ভূ-রাজনৈতিক লড়াই বদলে দিচ্ছে যাবতীয় সমীকরণ।
বহুমুখী এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে ভবিষ্যতের 'গ্লোবাল অর্ডার' কী হতে চলেছে তা অনুমান করা খুবই কঠিন। আগামী দিনের দিকে তাকালে একদিকে মনে হতে পারে সামগ্রিকভাবে গোটা বিশ্বে আর্থিক ও সামরিক সংঘাত বাড়বে, অস্থিরতায় ভুগবে গণতান্ত্রিক দেশগুলি, বৈষম্য তার প্রকোপ বাড়াবে। কিন্তু অপর দিকে বিকল্প স্থিতিশীল বিশ্বের কথাও আমরা ভাবতে পারি, যেখানে চীন, মার্কিনসহ শক্তিধর দেশগুলির সম্পর্কে মতান্তর থাকলেও কৌশলগত সহযোগিতা থাকবে, সামরিক সংঘাত কমবে, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের সাথে সামাজিক ও আর্থিক প্রগতিকে গুরুত্ব দিয়ে বৈষম্য কমানোর প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে এবং সবশেষে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলি একযোগে জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে পৃথিবীকে মুক্তি দেবে।
এই জাতীয় 'গ্লোবাল অর্ডার' বাস্তবে প্রয়োগ করা কঠিন হলেও অসম্ভবের সমার্থক নয়। বিকল্প ব্যবস্থা হবে একপ্রকার "মেটা - রেজিম", অর্থাৎ এমন একটি ফ্রেমওয়ার্ক যেখানে চরম শত্রু দেশগুলিও এক টেবিলে বসে আলোচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যাবতীয় সমস্যার সমাধান করার সুযোগ পাবে, যা বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা অথবা আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের ব্যবস্থাপনায় সম্ভব নয়। আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে এক্ষেত্রে সবার আগে আমাদের বুঝতে হবে বর্তমান বিশ্ব শৃঙ্খলার দুর্বলতা কী কী?
১৯৯০ সাল-পরবর্তী নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের অর্থনৈতিক মডেল ক্রমশ তার অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে উঠেছে। সুপার পাওয়ারসহ অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশগুলির আর্থিক বৃদ্ধির (উন্নয়ন নয়) সিংহভাগ ব্যবহার হচ্ছে সামরিক খাতে, যার ফলে রাষ্ট্রের যে সামাজিক কল্যাণকামী মুখ ছিল সেখানে ব্যর্থতার বলিরেখা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। একথা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে পশ্চিমী প্রশাসনিক "ফিট ফর অল সাইজ" ব্যবস্থাপনা তৃতীয় বিশ্বের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যর্থ।
প্রথম ক্যাটাগরির নিষেধাজ্ঞাযোগ্য কাজ হলো যেকোনো মাপের যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা — সে অসামরিক মানুষের ওপর মিসাইল চালানো থেকে বাণিজ্য জাহাজে আক্রমণ যাই হোক।
দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে এমন বিষয়গুলি থাকবে, যা আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নিলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলি উভয়েই উপকৃত হবে, যেমন সম্প্রতি মার্কিন – চীন বাণিজ্য সমঝোতা। এই চুক্তি অনুযায়ী চীন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রেয়ার আর্থ মেটেরিয়াল আমদানি সহজ হয়েছে, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে উন্নত প্রযুক্তি রপ্তানিসহ কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
যে পরিস্থিতিতে আলাপ-আলোচনা করেও সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না, সেখানে আসবে তৃতীয় ক্যাটাগরির বিষয়, যার মূল নীতি হবে অন্য দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ভৌগোলিক সার্বভৌমতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ না করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রতিটি দেশ তার নিজের দেশে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা বা শিক্ষা নীতি প্রয়োগ করা — যেমন ভারত তার নিজের মতো করে উপরোক্ত বিষয়গুলি নির্ধারণ করতে পারে, যার ফলে উপমহাদেশের আশেপাশের দেশগুলোর সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য বৃদ্ধি পেলেও তাঁদের সার্বভৌমত্বে আঘাত দেবে না।
চতুর্থ তথা শেষ ক্যাটাগরি হলো কোভিড-১৯, সন্ত্রাসবাদ, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলি, যেখানে একাধিক দেশের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজনীয়। সাম্প্রতিক সময়ে চলমান সংঘাতের আবহে এই ফ্রেমওয়ার্কের সুফলগুলি বোঝা যাবে, যেমন: নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে গাজা ভূখণ্ডে খাদ্য সংকট ও শিশু মৃত্যুর সমীক্ষা করানো হতো, তাহলে হয়তো প্রায় লক্ষাধিক নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যু হতো না।
আরো একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে রাশিয়া – ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলে দুই দেশের সামগ্রিক ক্ষতি তো হচ্ছেই, তার সাথে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে বিপদে পড়েছে গোটা ইউরোপ। রাশিয়ার ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা চাপানোর ফলে ইউরোপ, এমনকি আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশে গ্যাস ও পেট্রলের দাম বেড়েছে, যার ফল সবচেয়ে বেশি ভুগছে গরিব ও উন্নয়নশীল দেশগুলি। এর পাশাপাশি ইউক্রেনের শস্যের ওপর রাশিয়ার অবরোধের কারণে বিশ্বের বেশ কিছু দেশের খাদ্যের দাম ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী।
এই জাতীয় পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য উপরে উল্লেখ করা দ্বিতীয় ও চতুর্থ ক্যাটাগরির কূটনীতি ব্যবহার করা উচিত ছিল। ইউক্রেন যদি রাশিয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে চায়, তাহলে সেই কাজটা ন্যাটোর ঘাঁটি গড়ার মাধ্যমে না করে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে সুরক্ষা প্রদান করলে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য হতো।
একই কথা এশিয়াকে কেন্দ্র করে চীন – মার্কিন সংঘাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উভয় দেশ এখনও পর্যন্ত পরিষ্কার করে মার্কিন নীতি অথবা চীন নীতি সম্পর্কে কিছু বলেনি, তার বদলে মাঝে মাঝে মূলত তাইওয়ান ও বিশ্ববাণিজ্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজক বার্তা বিনিময় হয়, যা কোনোভাবেই দুটো শক্তিশালী দেশের নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে না।
এখনও পর্যন্ত আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের ("স্টেট টু স্টেট রিলেশন") সম্পর্ক, কিন্তু নন-স্টেট এক্টর (অসরকারি সংগঠন) এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে গোটা পৃথিবীর চিন্তাশীল মানুষেরা আজ এক সূত্রে বাঁধা, ফলে আগামী দিনের গ্লোবাল অর্ডার কী হবে, সেটা নিয়েও বিভিন্ন গোষ্ঠীতে আলোচনা শুরু হওয়াটা খুব দরকার। জাতীয় স্বার্থে, সুরক্ষিত বিশ্বের স্বার্থে ধীরে ধীরে হলেও সকল মানুষকে সচেতন করে তোলার এটাই উপযুক্ত সময়, নইলে এর থেকে দুর্বলতর ভবিষ্যৎ তো সহজেই আমরা বিনা কোনো চেষ্টাতে পেতে পারি, কিন্তু সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার যখন সুযোগ আমাদের আছে, তখন সেই সুযোগ গ্রহণ করা পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থে একান্ত প্রয়োজনীয়।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।