গরম তেলে চিকেনটা ঢেলে মাঝারি আঁচে কষাতে কষাতে দু’কলি নজরুলগীতি ভাঁজছিলেন শশধর রক্ষিত। সকাল থেকেই তাঁর মনটা বেশ খুশিখুশি। আজ পর্ণা ফিরছে। ওঁর হাতের এই আলু দিয়ে পাতলা চিকেনের ঝোলটা পর্ণা ভারী ভালোবাসে। যদিও চিকেনের থেকে মাটনটাই ওর বরাবর বেশি পছন্দের, কিন্তু ইদানিং পর্ণার কোলেস্টেরল আর ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাটা বিচ্ছিরি রকম বেড়ে যাওয়াতে ওসবে ডাক্তারের কড়া নিষেধ। তাই ইদানিং বাজারে যাওয়া-আসার পথে "হাজী মিট শপ"-এর সামনেটুকু প্রায় চোখ বুঁজেই পার হন শশধরবাবু।
বেলা সওয়া দশটা বাজলেও আজ রোদের তেমন তেজ নেই; বরং বেশ মেঘ জমেছে পুবদিকটায়। এমন ওয়েদারে একটু আদা-চা হলে মন্দ হত না। একবার ভাবলেন ছেলেকে ডেকে বলবেন এক কাপ চা দিতে, কিন্তু পরক্ষণেই মত বদলালেন তিনি — বছরভর পি.জি.-তে একা একা থেকে আর কলেজের ধকলে বেচারা বড্ড ক্লান্ত; ছুটির কটা দিন একটু ঘুমোক। গ্যাসটা কমিয়ে দিয়ে শশধরবাবু নিজেই ইলেকট্রিক কেটলিতে চা বসালেন। ছোটবেলা থেকেই আদা-দারচিনি-লবঙ্গ-তেজপাতা দেওয়া মিষ্টি মিষ্টি লিকার চা তাঁর বড়ো প্রিয়, কিন্তু বছর দুয়েক আগে পর্ণার সুগার ধরা পড়ার পর থেকে বাড়িতে সেসবের পাট চুকিয়ে দিয়েছেন তিনি।
চায়ে প্রথম চুমুক দিতেই মুখটা বিকৃত হয়ে গেল শশধরবাবুর। এতদিন ধরে খাওয়া সত্ত্বেও চিনি ছাড়া চায়ে তিনি আজও পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি। অবশ্য তারপরেই নিজেকে আরও একবার বোঝালেন — চোখের সামনে চিনির বয়াম দেখলেই চায়ে চিনি খেতে ইচ্ছে করবে তাঁর, সাথে পর্ণারও; তারচেয়ে এই বরং ভালো। ভবিষ্যতে তাঁরও আর সুগার বাড়ার ভয় থাকবে না।
ঐ যাঃ! চা খাওয়ার চক্করে মাংসটা বোধহয় একটু লেগে গেল কড়ায়। নাকে পোড়া-পোড়া গন্ধ লাগতে তাড়াহুড়ো করে এসে খুন্তি নাড়তে যেতেই কিছুটা গরম তেল ছিটকে পড়ল শশধরবাবুর বাঁ হাতের চেটোর উলটোপিঠে। আসলে ঘরের টুকিটাকি কাজ আর অল্পস্বল্প রান্না জানা থাকলেও এভাবে রোজকার রান্নাবান্না-কাজকর্ম নিয়মিত করাটা তো শুরু হয়েছে রিটায়ারমেন্টের পর থেকে, তাই এখনও সবটা ঠিকমতো করায়ত্ত হয়ে ওঠেনি তাঁর। তবে না করেই বা উপায় কী — এতকাল পর্ণাই সংসার-ছেলে সব সামলেছে বলে তিনি নিশ্চিন্তে অফিস করেছেন, তিলতিল করে টাকা জমিয়ে কলকাতার লাগোয়া এই শহরতলীতে দোতলা বাড়ি বানিয়েছেন। নেহাত বছর তিনেক আগে ছাদের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে বেচারির কোমরের হাড়খানা ভাঙল, তাই আর অবসরযাপনের সুখভোগ কপালে সইল না তাঁর।
জ্যৈষ্ঠে এমন আকাশ-ভাঙা বৃষ্টি আলো শেষবার দেখেছিলেন বাইশ বছর আগে। মায়ের বিয়ের পুরোনো বেনারসি আর ধ্যাবড়ানো চন্দনের টিপ পরে নড়বড়ে তক্তপোশের ওপর পাতা নতুন চাদরে জড়োসড়ো হয়ে বসেছিল সদ্য-তরুণী মেয়েটা। আর তার উপস্থিতি প্রায় অগ্রাহ্য করেই ঘরের অপরপ্রান্তে জোর জল্পনা চলছিল বিয়ে উপলক্ষ্যে বাড়িতে আসা মাসি-পিসি-কাকিমাদের...
"মানছি রাঙাদার অবস্থা পড়েছে, কিন্তু তাই বলে অমন সোনার টুকরো মেয়ের বিয়ে দিচ্ছে দ্বিগুণ বয়সী ছেলের সঙ্গে? সরকারি চাকরিটাই কি সব হল?"
"আরে রাখো তোমার চাকরি! ছেলে তো শুনেছি জন্মখুঁতো, পা টেনে টেনে হাঁটে। ম্যা গো, কী লজ্জা!"
"ইশ, কী কপাল আমাদের খুকির! রাজরানীর মতো রূপ নিয়ে শেষে পড়ল কী না আধবুড়ো-প্রতিবন্ধী বরের হাতে!"
সেদিনের সব অপমান-অসম্মান নীরবে সহ্য করলেও পরদিন বর-বিদায়ের সময় ঠাকমা যখন বলেছিল গুরুজনদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নিতে, বছর উনিশের মেয়েটার চোখে ঝলসে উঠেছিল বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে এক পৃথিবী ক্ষোভ! বড়ো তিন দিদিকে ভালো বর-ভালো ঘরে বিয়ে দিয়ে কেন তার বেলাতেই এই বৈষম্য? তারুণ্যের অসহ্য-অবুঝ রাগে কাউকে প্রণাম না করে দৃঢ় পায়ে একাই বেরিয়ে এসেছিল সে — সবার আগে... বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় আর কখনো পা রাখেনি ও বাড়ির চৌকাঠে। বাইরের প্রবল বর্ষণও সেদিন এক ফোঁটা জল আনতে পারেনি মেয়েটার খটখটে-শুকনো চোখে!
"ও ছোড়দি, কী বিড়বিড় করছো গো একা বসে বসে? বৃষ্টির ঝাঁট লাগছে তো গায়ে... এ মা! তোমার গা যে পুড়ে যাচ্ছে! কী করি এখন? এই দুর্যোগে কাকেই বা বলি ডাক্তার ডাকতে? তোমার ভাইও তো বিছানায় পড়ে।"
মলিকে এমন অসহায় অবস্থা থেকে উদ্ধার করল আলো নিজেই, জড়ানো গলায় কোনো মতে বলল — "আমার তেমন কিছু হয়নি রে, খালি কদিনের অনিয়মে একটু জ্বর এসেছে। তুই শুধু তোর নন্দাইকে একবার ফোন কর, সে ঠিক আমায় বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে। আমি বাড়ি যাব! বাড়ি গেলেই আমার সব অসুখ সেরে যাবে!"
আলোকপর্ণার কথা সত্যি প্রমাণ করে ফোন করার ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পাড়ার চেনা ডাক্তার আর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গাড়ি ভাড়া করে বিয়ের পর থেকে এই প্রথমবার শ্বশুরবাড়িতে পা রাখলেন শশধর রক্ষিত।
"পইপই করে বলেছিলাম, অসুস্থ ভাইকে দেখতে যাচ্ছো যাও, কিন্তু গিয়ে একটু সাবধানে থেকো... কিন্তু মহারানি আমার কথা শুনবেন কেন? আমি কে এ বাড়ির? যার যা খুশি তাই করুক!" — স্ত্রীর কপালে জলপটি দিতে দিতে নিজের মনে গজগজ করেছিলেন শশধরবাবু। অন্য সময় হলে হয়তো দু’-চারটে যুৎসই উত্তর ছুঁড়ে দিতেন আলোকপর্ণাও, কিন্তু আজ কে জানে কেন দু’চোখ জলে ভরে উঠল তাঁর। এবারের জ্বরটা এমনই পেড়ে ফেলেছিল যে বাড়ি ফিরে ছেলেটা আর তার বাবাকে দেখতে পাবেন কি না, তা যেন অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল! শুভ্রর বাবাকে চিরকাল তার শারীরিক অসম্পূর্ণতা নিয়ে তাচ্ছিল্য আর অবহেলা করেছেন বলেই হয়তো ঈশ্বর এই মধ্য-চল্লিশে আলোকপর্ণার শরীরে ভরে দিয়েছেন গাদা-গুচ্ছের রোগ; চলতে ফিরতে তাঁকে এখন নির্ভর করতে হয় প্রতিবন্ধী স্বামীর ওপর। নাঃ, তাতে আজ আর কোনো লজ্জা নেই তাঁর। বরং এখন তিনি এভাবেই সুখী — ভীষণরকম সুখী! সময়ের সাথে সাথে জীবনে সুখের সংজ্ঞাও যে কখন অদ্ভুতভাবে পাল্টে যায়, মানুষ টেরও পায় না!
লেখিকা পেশায় একজন স্কুল শিক্ষিকা, বর্তমানে ডায়মন্ড হারবারের বাসিন্দা। ভালোবাসেন আবৃত্তি করতে। প্রত্যন্ত এক গ্রামে বড়ো হয়ে ওঠায় টিভি বা মোবাইলের বদলে শৈশবে বেড়ে ওঠার সঙ্গী ছিল বই। পড়তে পড়তেই লেখার শখ জাগে। রোজকার ব্যস্ততায় নিয়মিত লেখার সুযোগ না পেলেও আজও তিনি অজস্র বই পড়েন, বিশ্বাস করেন এক লাইন লেখার আগে অন্তত একশ লাইন পড়া উচিত।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।