পশ্চিম পাটে সূর্য ডোবার সাথে সাথে বনভূমিটা সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে গেল। শাল, শিরিষ, অর্জুন, সোনাঝুরি, বাবলা আর কেন্দু গাছের মেঠো জঙ্গল। আমরা যে শিরিষ গাছটায় পজিশন নিলাম, তার পেছনে হোগলার জঙ্গল, তারপর সরু মুসাল নদী। উড়িষ্যার মহানদীর মতন বৈতরণীও একটা প্রধান নদী। তারই একটা প্রশাখা মুসাল। আমরা — অর্থাৎ এই ফোর মাস্কেটিয়ার্স, আমি, বিপদ, শ্যামল আর রণবীর — এখন এই কেন্দুঝোরের হরিচন্দনপুর ব্লকের মুসালের তীরে কেন্দুঝোর জঙ্গলে একটা শিরিষ আর একটা ডেউয়া গাছে পজিশন নিয়েছি। মনে মনে ভাবছিলাম, শিকারের গল্প শোনা আর নিজেরা শিকার করতে গিয়ে জঙ্গলের পালস ফিল করাটাই যেন আলাদা। সঙ্গে সঙ্গে বন কাঁপিয়ে তক্ষক ডেকে উঠল। বিপদ বেশ নিচু স্বরে আমাকে বলল, "তক্ষক, আদি সরীসৃপ, ডেঞ্জারাস।" আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। তক্ষকটা তখনও বন কাঁপিয়ে ডেকে যাচ্ছে — তক-ক্ষক-ক্ষক-ক্ষক...
জঙ্গলে একটা রিভার্বেরেশন হচ্ছে। তক্ষকের ডাকটা থামতেই একটা দিনকানা পাখি হুড্রু হুড্রু করে ডাকতে শুরু করল। রাত একটু বাড়তেই আমরা শিশিরে ভিজতে থাকলাম। তারপর শুরু হল জঙ্গল ফ্লির উৎপাত। মশার কামড়ের চেয়েও সাংঘাতিক। মনে হতে লাগল জঙ্গল ফ্লির আক্রমণে আমরা নিচে পড়ে যাব। দূরে কোথাও কোনো ঝোরা আছে। সেই ঝোরার শব্দ নিস্তব্ধতাকে আরও গভীরভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছিল। কখনো কখনো একসাথে অনেক পাখি কিচিরমিচির করে ডেকে উঠছিল। বিপদ গাছের ওপরের একটা মোটা ডাল বেছে নিয়েছিল। সেখান থেকে বিপদ বলতে লাগল, নিশ্চয়ই কোনো বড় জানোয়ার কাছাকাছি এসেছে। পাখিগুলো জানান দিচ্ছে। এমন সময় হঠাৎ দেখলাম নরহরি একটা পাথুরে ঢিবির ওপর একটা জ্বলন্ত টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে। রাতজাগা পাখিগুলো ওকে দেখেই ডাকছিল বোধহয়। নরহরি ঢিবির ওপর থেকে চিৎকার করছিল, "ছোঁয়া এ ছোঁয়া কোন গাছরে পজিশন লেউছি?" আমরা চিৎকার করে বললাম, "এইঠি এইঠি — শিরিষ গাছরে!"
আমরা একটা ঘাতকের ঘায়েল অপারেশনে এসেছি। ঘাতক বনবেড়াল। যে ইতিমধ্যেই গ্রামের গৃহস্থদের কয়েকশো হাঁস-মুরগি সাবাড় করেছে। গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে তাকে ঘায়েল করার জন্য আমাদেরকে হায়ার করে এনেছে। গ্রামটা নরহরিদের। কাজেই আমাদের উড়িষ্যার কেন্দুঝোরে শিকারে আসার মূল সূত্র নরহরি — কলকাতার পচা পানের দোকানের মালিক নরহরি। কেউ তাকে উড়ে বলে সম্বোধন করলে সে কবিতার ছন্দে বলত —
"এ শহরে জেত্ত পান দোকান করুচি কে? উড়িয়া উড়িয়া"
"এ শহরে জেত্ত ছেঁদা পাইপ সারাউচি কে? উড়িয়া উড়িয়া"
"এ শহরে জেত্ত ঠাকুর কাম করুচি কে? উড়িয়া উড়িয়া"
আমরা যখন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বনমালী দাসের মুগ চাষের ক্ষেতে টমি গান — অর্থাৎ ছররা বন্দুক — নিয়ে বক শিকারে যেতাম, তখন নরহরিও আমাদের সঙ্গী হত। নরহরি আমাদেরকে তার গ্রামে বনবেড়ালের তাণ্ডবের কথা বলে। তার প্রস্তাবেই কেন্দুঝোরে আসা।
নরহরি আমাদের জন্য মশলা মুড়ি আর লঙ্কা ভাজা নিয়ে এসেছিল। ঠোঙায় করে সেগুলো আমাদের দিল। আমি আর বিপদ শিরিষ গাছে, শ্যামল আর রণবীর ডেউয়া গাছে পজিশন নিয়েছিল। সবাইকে সেই মুড়ি বিতরণ করা হল। তারপর যাওয়ার আগে নরহরি তার ঝোলা থেকে একটা জ্যান্ত হাঁস বের করে আমাদের শিরিষ গাছের নিচে বেঁধে দিয়ে গেল।
এটা ফাঁদ। বনবেড়াল এই পথেই যাওয়া-আসা করে। গ্রামে ঢোকার আগে জ্যান্ত হাঁস দেখে লোভে পা দেবে। অমনি আমরা গাছের ওপর থেকে ছররা বন্দুক দিয়ে গুলি বিদ্ধ করব। যাওয়ার আগে নরহরি বলে গেল, "সময় হইলা আসিবার — আসিবা, আসিবা।" ঠিক সেই সময় একটা টিকটিকি টিকটিক করে উঠল। নরহরি গাছে টোকা মেরে বলল, "সত্য, সত্য, সত্য।" নরহরিরা ডাইনিকে খুব ভয় পায়। তাই সে আমাদের সাথে রাতে থাকেনি।
প্রহরে প্রহরে পাখিরা ডেকে উঠছিল। এলোমেলো হাওয়াও বইছিল। সেই হাওয়ায় শালের শুকনো বড় বড় পাতা খসে পড়ছিল। হলুদ-বাদামি পাতায় বন ঢেকে যাচ্ছিল। একদল সজারু পাতার ওপর দিয়ে খস খস শব্দ করে চলে গেল। ময়ূরগুলো খুব নিচু শাখায় এ ডাল থেকে ওই ডালে উড়ে যাচ্ছিল। বিপদ হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, "সামনে তাকিয়ে দেখ।" দেখলাম একজোড়া চোখ জল জল করে জ্বলছে। আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। এ নিশ্চয়ই কোনো বাঘ হবে। আমাদের কাছে তো ছররা বন্দুক! শ্যামলরা ও উলটো দিক থেকে আমাদের এলার্ট করে দিল। বাঘটা আমাদের শিরিষ গাছের দিকেই এগিয়ে আসছে। প্রমাদ গুনলাম। আমি আর বিপদ শেষ পর্যন্ত বাঘের পেটেই যাব। বাঘ আমাদের চিবিয়ে খেয়ে চলে যাওয়ার পর শ্যামল আর রণবীররা দিব্যি গাছ থেকে নেমে ট্রেন ধরে কলকাতায় ফিরে যাবে!
বিপদ বলল, "এখানে .৪৫৮ উইঞ্চেস্টার ম্যাগনাম রাইফেল আনা উচিত ছিল।" আমিও মনে মনে ভাবলাম ব্যাপারটা একটু রিস্কিই হয়ে গেছে। বাঘটা শিরিষ বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। আমি টমি গানটা ওই জ্বলন্ত চোখজোড়ার দিকেই তাক করে বসে রয়েছি। মরতে যখন হবেই, তখন শেষ কামড় দিয়েই মরব। বিনা লড়াইয়ে সূচ্যাগ্র জমিও ছাড়ব না। বিপদ ফিসফিস করে বলছিল, "নরহরি বলে ছিল না, উড়িষ্যার বাঘের সামনে বন্দুকের কুঁদোটা ধরতে হয় — তাহলেই ওরা পালিয়ে যায়।" আমি বললাম, "তুই যা পারিস কর, আমি রেঞ্জে আসলেই ফায়ার ওপেন করব।" ঠিক তখনই জ্বলন্ত চোখ দুটো কোনাকুনি ভাবে দু’দিকে সরে গেল। বুঝলাম বাঘ নয় — জোনাকি।
রাত ফিকে হয়ে আসছে। ঘাতকের দেখা নেই। আমরাও অধৈর্য হয়ে পড়ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ রণবীর একটা তীক্ষ্ণ শব্দ করে ইশারায় আমাদের বাঁ দিকে একটা গর্তের দিকে তাকাতে বলল। দেখলাম একটা বাঘ শুয়ে ঘুমাচ্ছে। এখন গাছ থেকে নামব কীভাবে? মাটিতে নামলেই বাঘটা টের পেয়ে যাবে। তখন আমরা তার সকালের প্রাতরাশ হয়ে যাব — নির্ঘাত। বিপদ আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। সে গাছ থেকে ধুপ করে একটা শব্দ করে মাটিতে লাফিয়ে পড়ল। অমনি বাঘটা উঠে বসল, তারপর স্পষ্ট মানুষের ভাষায় বলে উঠল, "কউন?" ততক্ষণে তার গায়ের ডোরা-কাটা কম্বলটা তার গা থেকে খসে পড়েছে। বিপদ হাঁটু গেড়ে জোড় হাতে বলে উঠল, "নমস্তে সাধু বাবা।" সাধু বাবা গায়ে বাঘের ছালের কম্বল গায়ে মুখ ঢেকে শুয়ে ছিল। সাধু বাবা বিপদকে জিজ্ঞেস করল, "তেরে হাত মে বন্দুক কিউ?" বিপদ আমতা আমতা করছিল। ঠিক সেই সময় বনবেড়ালটা কোন এক গাছ থেকে সাধু বাবার কম্বলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে বনবেড়ালটা একবার গড়িয়ে গেল। কম্বলটা তার গায়ে রোলের মতো জড়িয়ে গেল। বিপদ দৌড়ে গিয়ে কম্বল-জড়ানো বনবেড়ালটাকে কোলে তুলে নিল। সাধু বাবা বলল, "শিকার করনা ছোড় দে বাবা — ম্যায় ভি শিকারি সে সাধু বনা।"
ততক্ষণে আমরা গাছ থেকে নেমে এসেছি। নরহরিরাও সদলবলে চলে এসেছে। সূর্যও উঠে গেছে পুবদিকে। একটা ভোরের পাখি মিষ্টি সুরে গান ধরেছে। আমরা জ্যান্ত বনবেড়াল, জ্যান্ত হাঁস — সব নরহরিদের হাতে ফেরত দিলাম। টার্কির ঝোল-ভাত খেয়ে বিকেলে কলকাতার ট্রেনে উঠে প্রতিজ্ঞা করলাম — আমরা অর্নিথোলজিস্ট হয়ে যাব। শিকার ছেড়ে দেব।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।