দাসপ্রথা একদিন আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সভ্যতা তখন নিজের পিঠ চাপড়ে বলেছিল — আমরা উন্নত হয়েছি, আমরা মানবিক হয়েছি। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলটা সেখানেই হয়েছিল।
কারণ দাসত্ব শুধু হাত-পায়ে পরানো শিকলের নাম নয়। শিকল যদি লোহার না-ও হয়, তা হতে পারে ভয়ের, অভ্যাসের, অভাবের কিংবা মাথার ভেতরে জন্ম নেওয়া আত্মসমর্পণের। আর সেই শিকল আইন মানে না, সংবিধান বোঝে না, নিষেধাজ্ঞায় ভাঙে না।
শরীর মুক্ত হলেও মন যদি বন্দি থাকে, তবে মানুষ নিজেই নিজের কারাগারের প্রহরী হয়ে ওঠে। তখন আর বাইরের অত্যাচারী লাগে না। মানুষ নিজেই নিজের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় — প্রশ্ন করতে ভয় পায়, প্রতিবাদ করতে লজ্জা পায়, আর ধীরে ধীরে অন্যায়কে 'স্বাভাবিক' বলে মেনে নিতে শেখে।
আজ আমরা যে সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে দাসত্বের নাম বদলে গেছে। তার মুখে আর পুরোনো চাবুক নেই, গায়ে আর শেকলের শব্দ নেই। তার বদলে এসেছে আধুনিক শব্দ — 'চুক্তি', 'ঋণ', 'চাকরি', 'ভিসা', 'ক্লিক', 'ইমেজ', 'অ্যালগরিদম'।
শব্দগুলো শুনতে পরিশীলিত, আধুনিক, এমনকি সম্মানজনক। কিন্তু এই শব্দগুলোর আড়ালে যে নিয়ন্ত্রণ লুকিয়ে আছে, তা আগের চেয়েও সূক্ষ্ম, আগের চেয়েও গভীর। আগে দাসত্ব দেখা যেত। এখন দাসত্ব অনুভব করা যায় না, কারণ তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে গেছে।
শুনলে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু সত্যটা অস্বস্তিকর — দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হলেও আধুনিক দাসত্ব পৃথিবী থেকে মুছে যায়নি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ হিসাব বলছে, ২০২১ সালে পৃথিবীর যেকোনো একদিনে প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষ আধুনিক দাসত্বের ভেতরে বাস করছিল। কেউ জোরপূর্বক শ্রমে আটকে, কেউ জোর করে বিয়ে দেওয়ার শিকার হয়ে।
ভারতের চিত্রও আলাদা নয়। ২০২৩ সালের 'গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্স' জানাচ্ছে, ২০২১ সালে এই দেশে আনুমানিক ১১ মিলিয়ন মানুষ জোরপূর্বক শ্রম বা জোর করে বিয়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।
এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। এগুলো আসলে কোটি কোটি নিঃশ্বাসের হিসাব — যাদের কণ্ঠ রুদ্ধ, যাদের জীবনের সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নিয়ে নিয়েছে। এই তথ্যগুলো আমাদের একটাই কথা বলে — দাসত্ব আজ আর 'চেনা' নয়, দাসত্ব আজ 'লুকানো'।
সে লুকিয়ে আছে অফিসের কেবিনে, ঋণের কাগজে, ভিসার শর্তে, স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আর সামাজিক স্বীকৃতির অদৃশ্য মাপে।
সবচেয়ে ভয়ংকর দাসত্ব জন্ম নেয় মানুষের মনের ভেতর। যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শেখে — সহ্য করাই স্বাভাবিক। অপমানই বুঝি নিয়তি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই দেশদ্রোহী, ধর্মদ্রোহী, পরিবারদ্রোহী হয়ে যাওয়া অনিবার্য। তখন মানুষ প্রশ্ন করাকে অপরাধ ভাবতে শেখে, নীরবতাকে গুণ বলে ধরে নেয়। আর যখন মানুষ নিজের মূল্য নির্ধারণ করতে শুরু করে টাকা দিয়ে, পদবি দিয়ে, ফলোয়ার সংখ্যা দিয়ে, মানুষের বাহবা দিয়ে — ঠিক তখনই সে নিজের অজান্তেই বাজারের দাসে পরিণত হয়। তার আত্মসম্মান তখন আর তার নিজের হাতে থাকে না। থাকে অ্যালগরিদমের রেটিংয়ে, লাইক আর শেয়ারের ওঠানামায়।
এই দাসত্ব টিকে থাকে, কারণ এতে কারও না কারও লাভ হয়। শাসকের সুবিধা হয়, কারণ প্রশ্নহীন মানুষকে শাসন করা সহজ। বাজারের মুনাফা বাড়ে, কারণ ক্লান্ত, ভীত, অনিশ্চিত মানুষ বেশি কেনে, বেশি খরচ করে, বেশি সমঝোতা করে।
এইখানেই আধুনিক দাসত্ব সবচেয়ে নিঃশব্দ। কেউ চাবুক মারে না, তবু মানুষ দৌড়ায়। কেউ শেকল পরায় না, তবু মানুষ বাঁধা পড়ে থাকে। কারণ শিকলটা এখন বাইরে নয় — ভিতরে।
অনেকে ভাবে, দাসপ্রথা শেষ মানেই দাসত্ব শেষ। কিন্তু সত্যটা আরও কঠিন। দাসপ্রথা শেষ হওয়া মানে কেবল একটি ব্যবস্থা ভেঙে পড়া। দাসত্ব শেষ হয় তখনই, যখন মানুষ নিজের ভয়কে চিনতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে আর নিজের মূল্যকে আবার নিজের হাতে ফিরিয়ে আনে। স্বাধীনতা কোনো কাগজে লেখা অধিকার নয়, কোনো দিবসে উদ্যাপনের বিষয়ও নয়। স্বাধীনতা একটা প্রতিদিনের অভ্যাস। প্রতিদিন অন্যায়ের সামনে “না” বলার সাহস। প্রতিদিন নিজের সময়, চিন্তা আর সম্মানকে সস্তায় না বেচার সংকল্প। প্রতিদিন মনে করিয়ে দেওয়া — আমি মানুষ, আমি পণ্য নই।
আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় লড়াইটা বাহ্যিক শাসনের বিরুদ্ধে নয়, এই মানসিক দাসত্বের বিরুদ্ধে। কারণ শাসক বদলানো যায়, আইন বদলানো যায় — কিন্তু ভেতরের ভয় ভাঙতে হলে লাগে চেতনা, সাহস আর সচেতনতা।
তাই প্রশ্নটা আজ জরুরি। আজকের সময়ে আপনার চোখে সবচেয়ে ভয়ংকর মানসিক দাসত্ব কোনটা? ঋণের অদৃশ্য শিকল? চাকরি হারানোর আতঙ্ক? নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার নেশা — যা ধীরে ধীরে আমাদের মন আর চিন্তাকে গ্রাস করছে? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো ঠিক করবে — আমরা সত্যিই স্বাধীন হচ্ছি, না কি কেবল দাসত্বের নাম বদলাচ্ছি।
৭৩ বছর বয়সী এই অবসরপ্রাপ্ত লেখক দীর্ঘ কর্মজীবনের পর কলমকে করেছেন জীবনের সঙ্গী। সময়, স্মৃতি ও মানবজীবনের সূক্ষ্ম অনুভব তাঁর লেখায় প্রাণ পায়। নিঃশব্দ পর্যবেক্ষণ ও গভীর চিন্তার মিশেলে তিনি নির্মাণ করেন হৃদয়স্পর্শী গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা — যেখানে জীবনের রোদ-বৃষ্টি মিশে যায় এক অনন্ত মানবতার স্রোতে। প্রতিটি লেখায় তিনি সময়কে বন্দি করেন মানবতার রঙে।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।