সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়ার বন্ধনজাল হল সমাজ। ব্যক্তি-সম্পর্কগুলির খুঁটি নিয়মবদ্ধভাবে সজ্জিত হয়ে তৈরি হয়েছে সমাজ কাঠামো। সম্পর্ক যেহেতু ব্যক্তি-কেন্দ্রিক, তাই ব্যক্তি-মনস্তত্ত্বই সমাজের মূল একক। সম্পর্কগুলি পারিবারিক, বন্ধুত্বের, আত্মীয়তার, কর্মক্ষেত্রের বা প্রতিবেশিক — যা-ই হোক না কেন, সমাজের অস্তিত্বের অবলম্বন এগুলিই। আর সমাজ ছাড়া সম্পর্কগুলির স্থায়িত্ব কোথায়? সমাজ এবং সম্পর্ক যেন একে অন্যের পরিপূরক।
সম্পর্ক ও সমাজের এই নির্ভরশীলতাকে ব্যক্তিবাচকতায় কল্পনা করলে হতে পারে দুই অবিচ্ছেদ্য বন্ধু, আন্তরিক বাঁধনে অটুট বন্দী দুই প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা পুরুষ ও প্রকৃতি; আবার এই দুই বিমূর্ত অপরিহার্যতাকে প্রকৃতিগত উপমায় উপমিত করা যেতে পারে ধরিত্রী ও সূর্যরূপে, জলভাগ ও বাতাসরূপে কিংবা মাটি ও উদ্ভিদের মূলরূপে। ধরিত্রীর কলহাস্যময় সতেজতা সম্ভব নয় সূর্যের এক একটি কিরণ বিনা, জলভাগের জলকণা বাতাসকে সমৃদ্ধ করে, মাটির বাঁধন নিশ্চিতভাবে আলগা হয় যদি উদ্ভিদের মূল মাটির কণাগুলিকে আটকে রাখে। সম্পর্কগুলিও সমাজকে আঁকড়ে ধরে অস্তিত্ব রক্ষা করে, বেঁচে থাকে। সম্পর্করা আছে বলেই সমাজ নামের প্রতিষ্ঠানটি সম্ভব ও সম্পূর্ণ।
সামাজিক জালটি কিছু নিয়মকানুন ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গঠিত হয়, যা ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখে। একটি সুসংহত বৃহৎ পরিবার হল আমাদের সমাজ। এই বিস্তৃত পরিবারের ভিন্ন ভিন্ন ছোট অংশগুলি সম্পর্ক নামধারী অনু-পরিবার। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র অংশগুলি একান্নবর্তীর খণ্ডীকরণ নয় — এগুলি চিরন্তন, পরস্পরের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা মালার ফুল, যা বিস্তৃত পরিসরের সমাজ-বাগানটিকে রঙে রূপে ভরিয়ে রাখে। ব্যক্তিগুলি যদি বৃহৎ পরিবারের ছোট অংশের সদস্য বলে বিবেচিত হয়, তবে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা আন্তঃসম্পর্ক সমাজের বিমূর্ত পরিচিতির মূর্তিমান রূপে প্রকাশ ঘটায়।
তাই সমাজের সদস্য হতে হলে, সামাজিক রূপে পরিচিত হতে চাওয়া ব্যক্তি বা ব্যক্তি-গোষ্ঠী সম্পর্কের বিভিন্ন রূপে পরিচিত হয়। সমাজ ছাড়া সম্পর্কের আশ্রয় কোথাও নেই। কোনো সজীব বস্তুই একা থাকতে পারে না; একা থাকা নির্জীবতার আরেক নাম। সুতরাং সম্পর্কগুলির মধ্যেই নিজেকে খুঁজে পায় সামাজিক জীব মানুষ। স্ব-ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়ও প্রতিটি ব্যক্তি একাধিক সম্পর্কের আয়নায় নিজেকে দেখে, দেখতে চায়। এই স্বাভাবিকত্ব সমাজকে টিকিয়ে রাখে নির্বিঘ্নে।
শিশুর সম্পর্ক তৈরি হয় পরিবার থেকে। বাবা, মা, ভাই, বোন, কাকা, মাসী — এই রক্তের সম্পর্কগুলি ছাড়াও বৈবাহিক সম্পর্কিত পরিবারের সদস্যরাও জড়িয়ে থাকেন আমৃত্যু। এই সম্বন্ধগুলিই পরিবারের বাইরের সম্পর্ক বিষয়ে সহজবোধ্য হওয়ার সূচনা। আবার প্রতিবেশীরাও এমন আত্মীক সম্পর্কের বাঁধনে বেঁধে ফেলেন বা বাঁধা পড়েন যে আলাদা করে আর ঘরে-বাইরের বোধ তৈরির দরকার হয় না। প্রতিবেশীদের মধ্যে আলাপচারিতা, কুশলবিনিময়, পাশ কাটিয়ে যেতে গেলে মৃদু হাসি, ঠোঁটে একটু ঘাড় হেলানো — চলতে চলতে কখন যে আত্মীয়ের থেকেও বড় আত্মীয়ে পরিণত হয়, সময়প্রবাহ বুঝতে দেয় না। এই একই অনির্দিষ্ট সম্পর্ক দেখা যায় বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটের মধ্যেও, যদিও এক্ষেত্রে তিক্ত সম্পর্কের উদাহরণও অসংখ্য।
প্রতিবেশীদের না-চাইতে পাওয়া মধুর বন্ধুত্ব সমাজের বড় সম্পদ, সমাজ কাঠামোর মূল খুঁটি। সম্পর্কিত হওয়া আমাদের জন্মগত, রক্তগত।
বন্ধুত্বের সম্পর্কের নির্ভরশীলতা, প্রতিজ্ঞাবদ্ধতা, অঙ্গীকার ব্যক্তি-সদস্যগুলিকে নিশ্চিন্ত করে। বন্ধু হতে পারেন পরিবারের সদস্য-আত্মীয়, স্কুলের সহপাঠী, সহশিক্ষার্থী, সহশিল্পী; হতে পারেন প্রতিবেশী কিংবা কর্মক্ষেত্রের সহযোদ্ধা। সুখে ও দুঃখে পাশে থাকা এই সম্পর্কগুলি অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ, স্বার্থহীন সম্পর্কের নাম বন্ধুত্ব।
কর্মক্ষেত্রে কর্মচারী-মালিক বা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও পরবর্তী ধাপের সহকর্মীদের মধ্যে পদাধিকারের নিরিখে মান্যতা দেওয়া ও নির্দেশ মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সরকারি বা বেসরকারি যে কোনো কর্মক্ষেত্রে অনেকগুলি শর্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিষ্ঠানটির উন্নতি বা অবনতির ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের অবস্থা প্রকাশ করে, যা নির্ভর করে সদস্যদের সম্পর্কের ওপর। শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, কাজের গুণমান প্রভৃতির সঙ্গে পদাধিকারের বিরোধ ঘটতে দেখা যায়। উচ্চপদাধিকারী হয়তো নিম্নপদস্থ সহকর্মীদের উপযুক্ত সম্মান দিতে উদার হন না, দাবিয়ে বা দমিয়ে রাখতে চান। আবার কখনও বয়স্ক সহকর্মীর অভিজ্ঞতার দাম ও সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রেও সংকীর্ণতা দেখা যায়। এই বিপরীত মনস্কতাগুলি সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। হতাশা, ঈর্ষা ভুল সিদ্ধান্তের পথে নিয়ে যায়। ভেদাভেদ, অবমাননা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশ কলুষিত করে। কর্মক্ষেত্রের সুস্থ পরিবেশ কর্মীদের কাজে মনোযোগী করে; নিজেদের পারদর্শিতার সাফল্যে তৃপ্ত হয়ে নতুন উদ্ভাবনা সম্ভব হয়। এর সুফল ভোগ করে সমগ্র সমাজ।
সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিদিন যাপনের চালিকা শক্তি সমাজবন্ধুরা অর্থের বিনিময়ে কাজ করলেও মানবিকতার অনুভব তাঁদের কাজের মধ্যেও দেখা যায়। তাঁরা কতটা অপরিহার্য, তাঁদের সঙ্গে একটি সমানুভূতির সম্পর্ক যে কতটা প্রয়োজনীয়, তখনই বোঝা যায় যখন প্রাত্যহিক যাপনে একদিন তাঁরা অনুপস্থিত থাকেন। দৈনন্দিন স্বাচ্ছন্দ্যের যোগানদারদের আর্থিক সম্পর্কেই বিচার না করে, আমাদের অক্ষমতা আর তাঁদের দক্ষতার তুলনা করে সম্মানের আসনটা একটু উঁচু করলে সমাজের মানসিক ভার কিছুটা লাঘব হয়।
পরিবার, বন্ধুত্ব — এই একান্ত সম্পর্কগুলোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত দাম্পত্য ও প্রেমের সম্পর্ক। সমাজের নির্মল আনন্দালোকের দিক হল এই দুই প্রকার সম্পর্ক। যে দিক লক্ষ্য করেই সামাজিক মানুষ ছুটে চলে, গন্তব্য স্থির করে। কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার প্রকৃতি, পরিবেশ ও সমাজের সঙ্গে প্রেম ও দাম্পত্যকে বিভিন্ন উপমায় উপমিত করে এই দুটি সম্পর্কের মাধুর্য ছড়িয়ে দিয়েছেন সমাজের আনাচে-কানাচে। দাম্পত্য প্রেম বা বিবাহ-পূর্ববর্তী প্রেমের মধ্যে অনুরাগ, বিরাগ, অভিমান, মানভঞ্জন — সামাজিক সম্পর্কের বিশেষ শ্রেষ্ঠ মধুর অনুভূতি। প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী সমাজের সব ক্ষেত্রেই আকর্ষণীয়। এই সম্পর্কের অগোপন গোপনীয়তা সমাজ অঙ্গনে সুগন্ধি বাতাস, প্রাণভরা প্রশ্বাস-বায়ু।
শিক্ষাক্ষেত্রের সর্বস্তরে সর্বপ্রেক্ষিতে শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক প্রাচীন ভারতের গুরু-শিষ্যের মনোরম সম্পর্কের আশা রাখে, যেখানে সহিষ্ণুতা, উন্মুক্ত মন, শিক্ষাদান ও গ্রহণের আগ্রহ হয় প্রধান। ব্যক্তিগত আক্রোশ, স্বার্থসর্বস্বতা, অবমাননা, অহঙ্কার, লাভ-ক্ষতি ইত্যাদি নেতিবাচক অনুভবগুলি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ককে কলুষিত করে, শিক্ষাঙ্গন তথা সমাজের অবনমন ঘটায়। শিক্ষাক্ষেত্রের শ্রদ্ধা ও সম্মানের মানবিক সম্বন্ধ সমাজকে ইতিবাচকতার উজ্জ্বল আলোকবর্তিকায় পথ দেখায়।
প্রথাগত বা প্রচলিত সম্পর্কিত যোগাযোগ ছাড়াও বর্তমানে অতি শক্তিশালী সম্পর্কের বাঁধন হল আন্তঃজাল সম্পর্ক। পরিচিত, অপরিচিত, অর্ধপরিচিত — আত্মীয়, বন্ধু সবাই জড়িয়ে আছেন এই মাধ্যমে। সমাজের ভালো-মন্দ দুই বিমূর্ততাকে চালনা করছে নেটদুনিয়ার সম্পর্ক। জানার পরিধি বাড়াচ্ছে, নিজেকে প্রকাশ করার সাহস যোগাচ্ছে এই জগৎ। বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পাওয়ার সুযোগের সদ্ব্যবহারে সমাজের চিত্র পরিবর্তিত হচ্ছে। সমাজ এগোচ্ছে সংস্কৃতিমনস্কতাকে গ্রহণ করে, নিয়োজিত হচ্ছে উপকারী কাজে। আপাতভাবে ছাড়ছে আলস্য, পরচর্চা, পরনিন্দা।
এই অতি বৃহৎ সম্পর্কজালের মন্দের দিকও অনেক — অসহিষ্ণুতা, ধৈর্যহীনতা গ্রাস করছে; চোখে চোখ রেখে না বলা অনুভূতি বুঝে নেওয়ার সময় থাকছে না; বিমূর্ততার দিকে ছুটতে গিয়ে মূল্যবান মূর্ততার সান্নিধ্য হারাচ্ছে মানুষের সমাজ।
এতগুলি বিভিন্নতা নিয়ে সম্পর্ক সমাজের চালিকা শক্তি। আলো-আঁধার, সুখ-দুঃখের মতোই এই সম্পর্কগুলিও সবসময় মসৃণ পথে চলে তা নয়। এরই মধ্যে থাকে প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা, ঘৃণা, লোভ — তবু এগুলিও সম্পর্কজাত। অসৎ, হানিকারক সম্পর্কগুলি সমাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফাঁকা স্থানগুলি অধিকার করে রাখে, যা চেষ্টা করে সামাজিক অবক্ষয় ঘটাতে, শান্তি বিঘ্নিত করতে, হানাহানি ও ভেদাভেদ টিকিয়ে রাখতে।
তবে আশার নিশ্চিন্ততা এই যে —
অসততার থেকে সততা, খারাপের থেকে ভালো শক্তি অনেক বেশি। তাই সুস্থ, মননশীল, সাংস্কৃতিক সম্পর্কগুলি সদা সচেষ্ট সর্বাঙ্গসুন্দর সমাজ গঠনে সবাইকে সামিল করতে।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।