প্রত্যুষে নিদ্রাভঙ্গ হইলে চম্পাকলি দেখিল পাশে প্রভাত নাই। বুঝিল, প্রাতঃকৃত্য সারিয়া স্নানে গিয়াছে। এরপর খানিকটা পান্তা গিলিয়া সাতটার গাড়ি ধরিবে প্রভাত। তবেই কিনা এই গণ্ডগ্রাম হইতে কলিকাতার কলেজ স্ট্রীটে দশটার পূর্বে পৌঁছাইবে। এই নিয়মের অন্যথা হইলে ছাপাখানার মালিকের অপমান সহিতে হইবে। মালিকের মেজাজ অধিক বেজুত থাকিলে বরখাস্ত হইতেও পারে।
এর আগে এরূপ অপরাধে অন্তত তিনটি ছাপাখানা হইতে ঘাড়ধাক্কা খাইয়াছে প্রভাত। চম্পাকলি দেখিয়াছে, প্রভাত এই সকল কাণ্ডে ভাঙিয়া পড়ে না; বরং চোয়াল শক্ত করিয়া কঠিনতর শর্তে নূতন ছাপাখানায় কাজে যোগ দেয়। ছাপাখানায় প্রভাতের কাজ বলিতে প্রুফ দেখা। এর অধিক কিছু করিবার যোগ্যতা তাহার নাই। বছরের পর বছর এই কাজ করিতে করিতে প্রভাতের ঘাড় বসিয়া গিয়াছে, চোয়াল ঠেলিয়া বাহির হইয়া পড়িয়াছে, চক্ষু কোটরাগত হইয়াছে, গাত্রবর্ণ তামাটে হইয়াছে।
চাঁপা ওরফে চম্পাকলি এখন দেখে, ঘাড়ের কাছে তালি দেওয়া আদ্দির আধময়লা পাঞ্জাবিতে ঢাকা প্রভাতের দেহকাণ্ডটি পাঞ্জাবির আয়তনের তুলনায় ক্রমশ বেমানান রকমের কৃশ হইয়া যাইতেছে। ইহাতে মনে হয় যেন কঞ্চির উপর একটি ঢাউস কাপড়ের খোল পরানো হইয়াছে। নিজের স্বামীর বিষয়ে এইরূপ কল্পনায় ব্যথিত হইলেও চাঁপা তাহাতে লাগাম পরাইতে পারে না। মাঝে মাঝে তাহার মনে হয়, প্রভাতকে এই কষ্টকর ছাপাখানার চাকরি পরিত্যাগ করিতে বলিবে। পরক্ষণেই সংসারের পরিণাম ভাবিয়া নিরস্ত হয়।
আজ তবু প্রভাত স্নান সারিয়া ঘরে প্রবেশ করিতেই চাঁপা বলিয়া বসিল,
“তনি মাসীর বর কি একটা লটারিতে বিস্তর টাকা পেয়েছে। ওদের মেটে ঘর পাকা হয়েছে। খানিকটা জমি কিনেছে মেসো। তাইতে চাষবাস করে এখন দিব্যি চলছে ওদের। তুমিও তো একটা লটারি কাটতে পার!”
“হয়তো পারি,” প্রভাত মিয়ানো স্বরে উত্তর করিয়াছে, “কিন্তু লটারি না লাগলে টিকিটের আট আনা পয়সাই তো বরবাদ!”
“দু-চার বার কাটতে কাটতে ঠিক লেগে যাবে একদিন,” চাঁপা আশ্বাস দেয়। “আর লাগলেই তো আমরা বড়লোক!”
একটি দীর্ঘশ্বাস চাপিয়া রাখিয়া প্রভাত রান্নাঘরে প্রবেশ করিল পান্তাভাতের সন্ধানে।
শীতকালে সাতটার গাড়ির বাঁশি ঘর হইতেই শুনিতে পায় চাঁপা। আজও পাইয়াছিল। বাঁশি শুনিয়া সে বিছানা ছাড়িল। জমকালো সংসার না হইলেও তাহার কর্মভার বিস্তর — বিছানা পাট করা, ক্ষার-কাচার যোগাড় করা, চুলা ধরানো, ঝাঁট-পাট দেওয়া এবং আরও বহু অকিঞ্চিৎকর অথচ অপরিহার্য কাজ। বিছানা হইতে নামিয়া চাঁপা সেই সকল কাজে প্রবৃত্ত হইল।
ঝাড়ু দিতে দিতে দেখিল পশ্চিমের দেওয়াল হইতে খানিকটা চুন বালি খসিয়া পড়িয়াছে। উপরে চাহিয়া তাহার বোধ হইল, সে দিকেই চালের একটি টালিও বর্ষার আগে পাল্টাইলে সমীচীন হয়। বাড়িঘরের এবম্বিধ রক্ষণাবেক্ষণ প্রভাতের ক্ষুদ্র আয়ে সম্ভব কি না ভাবিতে ভাবিতে অন্যমনস্ক হইয়া চম্পাকলি তক্তাপোশের নিচে ঝাড়ু প্রবেশ করাইল।
ভাগ্য সত্যই ফিরিবে কি না কে বলিতে পারে! তবু সেই চিন্তায় অবশ হইয়া মেটে হাঁড়িতে চালটুকু ফুটাইবার পর আর কিছু করিবার শক্তি চাঁপার অবশিষ্ট রহিল না। তাহার স্নান হইল না, ক্ষার মাখা কাপড় পড়িয়া রহিল উঠানের ধারে, আহারের কথাও সে বিস্মৃত হইল। ইহা যে কি প্রকার অনুভূতি তাহা পুরাপুরি বুঝিতে পারিল না চম্পাকলি; প্রভাতের মতি ফিরিয়াছে ভাবিয়া কি তাহার মনে হর্ষোৎপাদন হইল, নাকি তাহারাও বড়লোক হইতে পারে ভাবিয়া বারংবার রোমাঞ্চিত হইল! অথবা, তাহাদের দীন কুটিরে টাকা নামক একটি নূতন ঊৎপাত আসিয়া পড়িবার দুর্ভাবনায় শঙ্কিত হইল মনে! সকল কথা মাথার মধ্যে নাড়াচাড়া করিতে করিতে ক্লান্ত হইয়া এক সময়ে নিদ্রাকর্ষন হইল চাঁপার।
কলেজ স্ট্রীটের দিনগত পাপক্ষয় করিয়া প্রভাত যখন ফিরিল, তখনও ঘুমে অচৈতন্য সে।
আজকাল এমন দৃশ্য আর দেখা যায় না। বহুদিন পরে স্ত্রীর নিদ্রিত মুখখানি দর্শন করিয়া প্রভাতের অন্তরে এক অপূর্ব সুখ জাগিল। শীর্ণ অথচ লাবণ্যে পূর্ণ। তাহার ইচ্ছা করিল না চাঁপাকে জাগাইতে, পোষাক পরিবর্তন করিয়া সে চাঁপার পাশে শয়ন করিল। রাত্রির মধ্যযামে চাঁপার নিদ্রাভঙ্গ হইলে সে দেখিল, নিদ্রিত প্রভাতের ললাটে রজতাভ চন্দ্রালোক পড়িয়া চকচক করিতেছে।
আজ পূর্ণিমা — চাঁপার মনে পড়িল।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।