ছাত্রজীবন মানেই শেখার সময় — এই কথাটি এতদিনে প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা একটু বদলে নেওয়া দরকার। কী শেখা, কতটা শেখা এবং কোন শেখাটা আদৌ জরুরি — এই প্রশ্নগুলির উত্তর আর একরৈখিক নয়। আজকের সমাজে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষার যে এক বিস্তৃত জগৎ তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে স্বস্তির। অঙ্কন, গান, আবৃত্তি, নাটক কিংবা খেলাধুলার মতো চর্চাগুলিকে আজ আর ‘অতিরিক্ত’ বলে সরিয়ে রাখা হচ্ছে না। অভিভাবকেরা সন্তানের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশ নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন। এই বদল সমাজের পক্ষে ইতিবাচক।
তবু এই বহুমুখী শিক্ষাচর্চার ভিড়েই একটি নীরব প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে। এত কিছু শেখানোর মধ্যে কি আমরা একটি মৌলিক অভ্যাসকে অবহেলা করছি না? যে অভ্যাসটি না থাকলে অন্য সব শেখাই অনেক সময় অসম্পূর্ণ থেকে যায় — সেই অভ্যাসটির নাম লেখালেখি।
আজ শিশুরা পড়তে শেখে খুব তাড়াতাড়ি। প্রযুক্তির কল্যাণে তথ্যের জোগানও অফুরন্ত। কিন্তু নিজের ভাবনা, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে লিখে প্রকাশ করার সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। পাঠ্যসূচির চাপ, মূল্যায়নের কাঠামো আর নম্বরকেন্দ্রিক দৌড়ে লেখালেখি জায়গা পায় মূলত পরীক্ষার খাতার মধ্যেই। সেখানে স্বাধীন চিন্তার অবকাশ কম। অথচ ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষাই চিন্তাকে আকার দেয়। যে শিশু নিজের মতো করে লিখতে শেখে না, তার চিন্তার জগৎ-ও অনেক সময় অগোছালো থেকে যায়।
সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকটিও অগ্রাহ্য করা যায় না। একসময় যৌথ পরিবারে গল্প, তর্ক, অভিজ্ঞতার আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে যে স্বাভাবিক শিক্ষাটি ঘটত, আজ তা অনেকটাই অনুপস্থিত। ছোট পরিবার, কর্মব্যস্ত জীবন এবং একই ছাদের নীচে থেকেও আলাদা আলাদা সময়সূচি — এই বাস্তবতায় কথোপকথনের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। প্রযুক্তি আমাদের যুক্ত রেখেছে ঠিকই, কিন্তু গভীর সংলাপের জায়গা সবসময় তৈরি করতে পারেনি। এই শূন্যতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশু ও কিশোরদের উপর। তাদের প্রশ্ন থাকে, দ্বিধা থাকে, ভয় থাকে — কিন্তু প্রকাশের ভাষা পাওয়া যায় না।
এই প্রেক্ষিতেই লেখালেখির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। লেখা কোনও বিলাসিতা নয়, কিংবা ভবিষ্যতের লেখক তৈরির প্রশিক্ষণও নয়। লেখা হল নিজের সঙ্গে নিজের সংলাপ। কী ভাবছি, কেন ভাবছি — এই প্রশ্নগুলির মুখোমুখি দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া। নিয়মিত লেখালেখি শিশুকে নিজের চিন্তাকে গুছিয়ে নিতে শেখায়, অনুভূতিকে চিনতে সাহায্য করে। নিজের ভাবনাকে শব্দে বাঁধার চেষ্টা করতে গিয়েই চিন্তায় আসে স্বচ্ছতা ও সংযম।
আজকের প্রতিযোগিতামুখর সমাজে মানসিক চাপ অনিবার্য। লেখাপড়া, প্রত্যাশা, তুলনা — সব মিলিয়ে ছাত্রজীবনেও চাপের মাত্রা বাড়ছে। এই চাপকে অস্বীকার না করে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজে নেওয়াই বাস্তবসম্মত। মনোবিদদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ছোটবেলা থেকে যারা নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পায় — লেখা, আঁকা বা অন্য সৃজনশীল মাধ্যমে — তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অবসাদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। আবেগ জমে থাকলে তা একসময় ক্ষতিকর রূপ নেয়; লেখালেখি সেই জমাট বাঁধা অনুভূতিকে ধীরে ধীরে নিষ্কাশনের পথ দেখায়।
তবু শিক্ষাব্যবস্থায় লেখালেখি এখনও প্রান্তিক। খেলাধুলার জন্য সময় বরাদ্দ করা যায়, বিভিন্ন প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু লেখার জন্য নিয়মিত সময় রাখার কথা উঠলেই তা প্রায়শই অবান্তর বলে মনে হয়। ‘এতে কী হবে?’ — এই প্রশ্নটাই আমাদের মানসিকতার সংকীর্ণতাকে প্রকাশ করে। লেখালেখির ফল তাৎক্ষণিক নয়, কিন্তু তার প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। লিখতে শেখা মানে শুধু বাক্য গাঁথা নয়; মানে যুক্তি সাজানো, মত গঠন করা এবং অন্যের মতকে বোঝার ক্ষমতা অর্জন করা।
সবাই লেখক হবে না — এ নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু যারা লিখতে শেখে, তারা প্রশ্ন করতে শেখে। তারা কেবল তথ্য গ্রহণকারী নয়, চিন্তাশীল নাগরিক হয়ে ওঠে। গণতান্ত্রিক সমাজে এই গুণের প্রয়োজন অপরিসীম। মত প্রকাশের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ নিজের মত গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারে।
ছাত্রজীবনের শিক্ষা যদি কেবল নম্বর ও ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার আয়ু ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু সেই শিক্ষার সঙ্গে যদি নিজের ভাবনার চর্চা যুক্ত হয়, তবে তা আজীবনের সম্পদ হয়ে ওঠে। লেখালেখির অভ্যাস তাই কোনও বিকল্প নয় — এটি সময়ের দাবি, শিক্ষার দাবি এবং সমাজেরও দাবি।
লেখক কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে গৃহশিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছেন। নিবাস কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ। উত্তরবঙ্গ সংবাদের সম্পাদকীয় বিভাগ, কোচবিহার জেলা থেকে প্রকাশিত 'নেটফড়িং' মাসিক পত্রিকা প্রভৃতি আরও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।