দুধ খায় না, শ্যামল। অরুচি। দু'চোখের বিষ। হজমে গোলমাল। তার মা বলতো, "আমার ছেলের দুধ খেয়ে নীল হতে হবে না। আমার ছেলে, শ্যামলা হয়েই বাঁচুক। খাবারের আকাল নাকি দেশে? মধ্যবিত্তের গৎবাধা ধারণার গঙ্গা-প্রাপ্তি ঘটুক।" সেই ছোট থেকে দেখেছি, বাটিভরতি দুধ দেখলেই ক্ষেপে যায়। দুধে বিশাল অ্যালার্জি শ্যামলের। সে নিয়ে আরও খেপিয়ে তুলতে, তাকে আমি ডাকতাম, পুতুবাবু। মাঝে মধ্যে শ্যামল বলতো, "বন্ধু, জীবনের বালতি ভর্তি দুধে এক ফোঁটা চণা, আমাগো দেশের বর্তমান রাজনীতি"। ভাবতাম, রাত জেগে দেশ-বিদেশের বই পড়ে পড়ে বেটার মাথা পাগল হয়ে আছে। বলতাম না, সে-কথা। অপেক্ষা করতাম। এরপর কী বলে, তা শোনার জন্য। তার কথা বলার মধ্যে অদ্ভুত এক মাদকতা জড়িয়ে থাকতো। মনে হতো তার কথা বলা যেন শেষ না হয়। আর একটু শুনি।
মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবার পর, গ্রামের লুঙ্গায়, পাটক্ষেতের ভিতর লুকিয়ে, প্রথম চার্মস সিগারেট ফুঁকায় হাতেখড়ি আমাদের। শ্যামলের বাবার সিগারেটের প্যাকেট থেকে মাঝে মাঝে চুপিসারে এক-দু'টো সরিয়ে ফেলতাম আমরা। দোকানে গিয়ে সিগারেট চাইবার সাহস ছিল না, সে সময়। ছোট পাড়া গায়ে সবাই সবাইকে চিনতো।
বোন শিবানী আর বাবা-মা নিয়ে শ্যামলদের ছিল চারজনের ছোট্ট সংসার। আমাদের পাড়ায় ভাড়া বাড়িতে যখন শ্যামলরা আসে, তখন সে আমার সাথে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ত। একই স্কুলে। তার বাবা ছিলেন, আমাদের গ্রামের একমাত্র দ্বাদশ শ্রেণী বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাংলা পড়াতেন। শিবেন সেন। 'রাগী স্যার' বললে, চিনতো না এমন কেউ ছিল না তল্লাটে। শিবেন স্যার, কখনো কাউকে রেগে কিছু বলেছেন, তা আমার বয়েসে আমি অন্তত শুনি নি। গম্ভীর, থম মারা একটা মুখ। সে মুখে হাসি কোনদিন দেখা গেছে কিনা শ্যামলও মনে করে বলতে পারেনি। পড়ার টেবিলের বাইরে ছাত্রদের অন্য কোনও জগত থাকতে নেই, এ ছিল শিবেন স্যারের স্ব-ঘোষিত ফরমান।
তাদের বাড়িতে একটা ঘরের পুরোটা ছিল নানা বইয়ে ঠাসা। সেখান থেকে অনেক বই আমিও পড়েছি। স্কুলের গ্রীষ্মের ছুটিতে, দুপুর বেলা, জাম গাছের উঁচু ডালে হেলান দিয়ে, জাম খেতে খেতে, নানা দেশের গল্প শোনাত শ্যামল। সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে, শ্যামলের মুখে প্রথম শোনা, বিপ্লবী চে' গুয়েভারার নাম। তার কাছে নানাধরনের গল্প শোনা, একসময় প্রতিদিনকার অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৮৩-তে শ্যামলদের বাড়িতে টিভি আসে। শাটার দেয়া কাঠের বাক্সে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি। আমাদের দিক থেকে রাজধানী আগরতলা ছাড়া আমাদের গ্রামের কাছে দূরে অন্তত টিভি ছিল না। ইন্দিরা গান্ধীর শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান দেখতে সেদিন শ্যামলদের বাড়িতে এত লোকের ভিড় হয়েছিল যে, টিভি বারান্দায় এনে বসাতে হল। তারপরও উঠোন, বাড়ি উপচে রাস্তা থেকেও উঁকি মেরে দেখছিল লোকজন। শিবানী ও আমাকে চা পরিবেশনে, হঠাৎ বিনা নোটিশে নিয়োগ করেন, 'রাগী স্যার'। ফলে, সেদিন মাসীমার হাতের চা না খেয়ে কেউ বাড়ি ফিরে গিয়েছেন বলে জানা নাই। একমাত্র শ্যামলের কোন পাত্তা পাওয়া যায় নি। সন্ধ্যেতে সবাই চলে গেলে, তিনি ফেরেন। হাতে বই। মলাটে লেখা, 'অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়রি'। কানের কাছে এসে বলল ও, "আজ তিনটি সিগারেট সরিয়েছি, ডায়রি পড়তে পড়তে দুটো খেয়ে ফেলেছি। তোর জন্য একটা রেখেছি। চল, কাছে ধারে কোথাও দ্রুত টেনে চলে আসবো।" সেদিন আর যাওয়া হয়নি, সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ায়। সে সময়, সন্ধ্যের পর, ছাত্রদের বাড়ির বাইরে থাকা ছিল, ঘোরতর অপরাধ।
শিবানীর জন্মের পর, আমাদের পাড়ায়, শ্যামলদের নিজস্ব এক টুকরো জমি হয়। বাড়ির এক কোণে কৃষি করতো মা ও ছেলে মিলে। নিজে থেকেই এরা হয়ে যেতো কখনো কৃষক কখনো বর্গাচাষী। শিবানী, স্কুলের বান্ধবীদের নিয়ে সে জমিতে উড়ে উড়ে বেড়াত। দূর থেকে তাদের উড়ে উড়ে গুনগুন করা দেখতে আমার বেশ ভাল লাগতো। শ্যামল বলতো 'ঝঞ্ঝাট'। এ-পাড়া ও-পাড়ার বলদ, গরু, ছাগলের দলের, সে জমিতে প্রবেশ বন্ধ রাখা, ডানপিটে শ্যামলের সাথে এক সময় আমারও কাজ হয়ে দাঁড়ায়। শ্যামলের মা বলতেন, "গোবিন্দ, তুই তো আমারই ছেলে"। তার বোন আমাকে আজও ভাইফোঁটা দেয়।
১৯৮৭-তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে, শ্যামল ও আমার জায়গা হয়, দুই ভিন্ন রাজ্যে। সে নিয়ে আমাদের মধ্যে ছিল, ব্যাপক মন খারাপ। যদিও নিয়মিত চিঠির আদান-প্রদান হতো আমাদের মধ্যে। এক সময় শ্যামলের দিক থেকে চিঠি আসা কমে যেতে যেতে বন্ধ হয়ে গেল। ছুটিতেও বাড়ি আসতো না সবসময়। আমাদের মধ্যে দেখা নেই অনেকদিন ধরে।
লোকজন বলল, "শ্যামল ভাল ছেলে। কথা কম বলে। নিয়মিত টাকা দিলেও প্রায়ই সে এখানে থাকে না। কোথায় যায় ঠিক জানা নাই। দু'একজন লোক নিয়ে কখনো ফিরে আসে, আবার তাদের সাথেই চলে যায়।" কলেজে খোঁজ নিতে জানা গেল, অনেকদিন ধরে শ্যামল, কলেজে আসে না। কেউ কোনও খবরই জানে না তার। পুরো এক সপ্তাহ তন্ন তন্ন করেও গৌহাটিতে শ্যামলের খোঁজ পাই নি। চরম উদ্বেগ ও মন খারাপ নিয়ে ফিরে আসতে হল। শ্যামলের খোঁজে গৌহাটি যাবার কথা, আমি আজ পর্যন্ত কাউকে বলিনি। এমনকি, শ্যামলের পরিবারকেও না। কেননা, মাসীমার তখন ক্যানসার শেষ পর্যায়ে ধরা পড়েছিল।
কলেজের পাঠ শেষে চাকরীর সন্ধানে ঘুরছি, এমন একদিন, পথে দেখা, শিবেন স্যারের সাথে। ভীষণ রাগী মানুষ বলে, ছোটকাল থেকে উনাকে এড়িয়ে চলায় ছিল, একধরণের স্বস্তি। কিন্তু, সেদিন দেখা মানুষটি, একদম অপরিচিত। ক্যানসারে স্ত্রীর মৃত্যু ও ছেলে হারিয়ে যাওয়ার শোকে ন্যুব্জ, পাথর প্রায়। স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া, প্রাক্তন একজন শিক্ষক। মেয়ের বিয়ে দিয়ে আরও নিঃসঙ্গ। বললেন, "থানা-পুলিশ করেও ছেলেটার কোনও খবর পেলাম না। মায়ের মৃত্যুর খবরটাও ছেলেটা জানতে পারলো না। আমাদের সাথে তার কোনও যোগাযোগ নেই। তুমি কি তার কোন খবর জানো ?" সংক্ষিপ্ত "না" বলা ছাড়া, সেদিন কিছু বলার মতো ছিল না, আমার। শ্যামল আমাকে ভুলে দূরে সরে থাকতে পারে, এতো আমারও ভাবনাতে ছিল না। নিজের বোনের বিয়ের খবরও সে জানতে পারে নি। গৌহাটির মেস-বাড়ি ছেড়ে সে কোথাও চলে গিয়েছিল, আমি ফিরে আসার পরপরই।
কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের শুরুতে শ্যামলের শেষ চিঠি এসেছিল আমার কাছে। কম কথা বলা শ্যামলের সব চিঠিতে পড়াশুনা ও আমি কেমন আছি, জানতে চাওয়া ছাড়া অন্য কোনও জিজ্ঞাসা ছিল না, কোনদিন। নানা বই পড়া, ক্ষেত করা, গ্রামের মাঠে দাপিয়ে খেলা ছিল, তার অভ্যাস। এ শ্যামল ছিল আমার অনেক কালের চেনা। আজকের অচেনা শ্যামলকে ঘিরে, অনেক ক্ষোভ, অভিমান, ভিতরে তীব্র যন্ত্রণায় বিদ্ধ করে। ঘৃণা নয় প্রবল এক উৎকণ্ঠা গলা বেয়ে উপরে উঠে যায়। তার কোনও খবর কারুর জানা নেই। লোকজন মাঝেমধ্যে বলাবলি করে, "বদ্যি বাড়ির ছেলেটা পড়তে গিয়ে কোথায় যে হারিয়ে গেল!" স্কুলের খাতায় শ্যামলের নাম ছিল, মৃন্ময় সেন।
মেয়েকে আজ হারিয়ে ফেলা বন্ধুর গল্প শোনাচ্ছি। বুক ভেসে যাচ্ছে। একটা বিকট চাপ গলা বেয়ে দলা পাকিয়ে উঠে আছে। বেরুতে পারছে না। মাঝপথে গল্প থামিয়ে উঠে আসা ছাড়া উপায় ছিল না। একটু জিরোতে চাইলে মেয়ে বলে, "বাবা, তারপর..."
শেষটা, আমিও জানি না ঠিক করে। অনেকদিন আগে অল্প পরিচিত এক সাংবাদিক বন্ধু, কথা প্রসঙ্গে বলেছিল, "সুকুমা'র জঙ্গলে পুলিশের সাথে গুলির লড়াইয়ে অনেক নকশাল ছেলেমেয়ে মারা গেছে। এদের সাথে একটি আন-ওয়ান্টেড বডিও পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলতে পারছে না, লোকটির আসল নাম। বলেছে, মাঝেমধ্যে গ্রামের হাটে আসতে দেখেছে। কোথায় থাকে কেউ সঠিক বলতে পারছে না। কেউ তার নাম বলছে, গুয়ে ভারা, কেউ বঙ্কা, কেউ শ্যামল। পুলিশের সাথে লড়াইয়ে মারা যাওয়া, কারুর পরিবার সনাক্ত করতে পারেনি লোকটি কে? জঙ্গলে লড়াইয়ের মাঝে লোকটি তাহলে কোথা থেকে কি উদ্দেশ্যে এসে, মারা গেল! মৃতদেহ তল্লাশিতেও কিছু পাওয়া যায় নি। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাহ করা হয়েছে"।
পত্রিকায় সুকুমা'র ঘটনার খবর পড়ার কিছুদিন বাদে আমার কলকাতার ঠিকানায় একটি চিঠি আসে। তাতে পুরুলিয়ার এক ডাকঘরের সিল দেখেছি। চিঠিতে লেখা ছিল —
সেই বেওয়ারিশ লাশের ছবি খুঁজে পেয়েও পুতুবাবুকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়ে উঠে নি। একগাল দাড়ি, থ্যাবড়ানো, কালো রক্তে জমাট সে মুখটায় কিন্তু, বাঁ-চোখের ভুরুর উপর একটা কালো তিল, আমি দেখতে পেয়েছিলাম। শ্যামলের মুখেও তেমন একটা ছিল। এরপর আর কোন চিঠি আসে নি। অনেক অনেক সময় পেড়িয়ে গেল।
আমার মেয়েও দুধ খেতে চায় না। ভালবাসে না। জোরাজুরি করলে তার বমি হয়ে যায়। শ্যামলেরও এমন বমি হয়ে যেত। দেখেছি। আমি মেয়েকে জোর করি না। দুধ না খেয়েই দিব্যি বড় হয়ে গেল, মেয়ে আমার। আগামী সপ্তাহে, সে মেয়ে ডাক্তারি পড়তে চলে যাবে দূরের কলেজে। তার মা ব্যাগ গুছিয়ে দিতে ব্যস্ত। দেখলাম, জামাকাপড়ের সাথে বেশকিছু বই নিয়ে যেতে চাইছে মেয়ে। দেখি একগুচ্ছ বইয়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, আনা ফ্রাঙ্ক, চে গুয়েভারার নামও রয়েছে। বললাম, "এ বইগুলো তো পড়েছিস, এগুলো ব্যাগ বোঝাই করে নিয়ে গিয়ে কি করবি?" বলল, "এগুলো আমার প্রিয় বই, মন ভাল করে দেয়"।
বুকটা চিনচিন ব্যথা করে উঠলো। শ্যামলও বাড়ি থেকে দূরের কলেজে যাবার সময়, ব্যাগ ভর্তি করে প্রিয় সব বই নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন সেও বলেছিল, "বইগুলো কাছে থাকলে মন ভাল হয়ে যায়"।
সত্যিই তো মন ভালা থাকা জরুরী৷ "মন ভাল থাকলে শরীরও ট্যাঁ ফু করে কম৷ চারপাশে নজর থাকে বেশি৷ সবার সবকিছু হজম করে ফেলার ক্ষমতা না থাকাটা দোষ না"৷ শ্যামলের মা বলতেন৷
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।