অনিমেষ রাতের সিকিউরিটি গার্ড। শহরের পুরনো "লেক পার্ক" — এ দিনে প্রচুর মানুষের ভিড়, রাতে শুনশান। শীতের কুয়াশা নেমে এলেই পার্কটা যেন আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। অনিমেষের পাহারার মধ্যে এই পার্কটিও পড়ে।
সেরাতেও অনিমেষ টর্চ হাতে টহল দিচ্ছিলেন। রাত তখন প্রায় তিনটে। কুয়াশা এমন ঘন যে হাত বাড়ালেও নিজের আঙুল দেখা যায় না। ঠান্ডায় হাঁটু কাঁপছে, তবু কাজে ঢিলে দেওয়ার মানুষ নন তিনি। হঠাৎই দূরে, লেকের দক্ষিণ দিক থেকে একটা ক্ষীণ আলো দেখা গেল। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো পথচ্যুত বাইকার। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখলেন, আলোটা এক জায়গায় স্থির হয়ে রয়েছে। কুয়াশা একটু সরে যেতেই দেখলেন — আলোর মধ্যে যেন একটা মানুষের মতো ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।
অনিমেষের বুক ধুকধুক করতে লাগল। "কে ওখানে?" তিনি টর্চ তুলে চিৎকার করলেন। কোনো উত্তর এল না। আলোটা কেবল মৃদু দুলতে লাগল। টর্চের আলো ফেলতেই ছায়াটা যেন ধীরে ধীরে পিছোতে লাগল।
পার্কের পুরনো রেস্টুরেন্টের পাশ দিয়ে এগোতেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। আলোটা এবার লেকের ওপর! জলের উপর কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে কেউ? আলোটা হঠাৎই রূপ বদলে হলো নরম নীল — এত স্বচ্ছ, যেন ভোরের প্রথম আকাশ। ছায়াটা হাত তুলল। যেন ডাকছে।
"এ... এটা কি?" অনিমেষ নিজের হাতে চিমটি কাটলেন। দেখতে চাইলেন, তিনি জেগে আছেন তো!
এক পা এগোতেই বাতাসে একটা অচেনা সুগন্ধ — এলাচ আর ভেজা ঘাসের এক অদ্ভুত মেশানো গন্ধ। তিনি থমকে গেলেন। কুয়াশা তখন আরও নেমে এসেছে, জলের রেখা আর আকাশের সীমা একেবারে যেন মিশে গেছে।
হঠাৎ এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল। তাতে আলোটা কেঁপে উঠে যেন ভেঙে গেল টুকরো টুকরো হয়ে। ছায়াটাও মিলিয়ে গেল। চারদিকে শুধু কুয়াশা আর লেকের মৃদু ঢেউয়ের শব্দ।
কয়েক মিনিট তিনি স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর দৌড়ে গিয়ে লেকের ধারে টর্চ ফেললেন — কেউ নেই। কোনো চিহ্ন নেই। শুধু ভেজা ঘাসে নিজের পায়ের ছাপ আর তার ওপর জমে থাকা কুয়াশার শিশির।
ঠিক তখনই গেটের দিক থেকে আরেকজন গার্ড এসে বলল, "দাদা, এই সময় লেকের কাছে কেন? জানেন তো, বছর দশেক আগে সেই ঘটনাটা? এই লেকে নাকি একটা ছেলে ডুবে গেছিল... মাঝে মাঝে নাকি কেউ কেউ বেশি রাতের দিকে আলোর মতো কিছু দেখে... যেন কেউ হাত নেড়ে ডাকছে..."
অনিমেষ মুখে কিছু বললেন না। কেবল কেমন একটা শিউরে উঠে নিজের কোটটা আরও টেনে নিলেন। তিনি জানেন, এই মুহূর্তে তিনি ছাড়া এই এলাকায় আর কোনো গার্ড নেই — থাকার কথা নয়। অনেক নাইট গার্ড এ দৃশ্য দেখেছে। সেজন্যই কেউ রাতে এদিকটায় আসতে চায় না। আজ তিনিও দেখে নিলেন।
পিছু হটে দ্রুত অন্য দিকে হাঁটা দিলেন তিনি। ততক্ষণে ভোরের প্রথম আলোয় পার্ক জেগে উঠছে। পাখিরা ডাকছে। লেকের জল এখন শান্ত। সবকিছু স্বাভাবিক — যেন রাতে কিছুই ঘটেনি।
অনিমেষ মনে মনে ভাবলেন,
"আমি কি দেখলাম? যা দেখলাম… সত্যিই দেখলাম তো?"
তিনি জানতেন — এর কোনো ব্যাখ্যা মিলবে না।
কুয়াশা যতটা ঢেকে রাখে, তার চেয়ে অনেক বেশি লুকিয়ে রাখে।