Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
লাক্সারি বনাম আত্মসম্মান — নতুন প্রজন্মের বিপথগামী পথ
লাক্সারি বনাম আত্মসম্মান — নতুন প্রজন্মের বিপথগামী পথ

মানুষের জীবনে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তির সংজ্ঞা সময়ের সঙ্গে পাল্টে যায়। একসময় সাফল্যের মানে ছিল শিক্ষায় উৎকর্ষ, কর্মক্ষেত্রে পরিশ্রম, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্মান। কিন্তু বর্তমান সময়ের দ্রুত পরিবর্তিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় সাফল্যের মানদণ্ড যেন ক্রমশ লাক্সারি বা বিলাসী জীবনযাপনের ভেতর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। বিশেষত নতুন প্রজন্মের একাংশ, বিশেষত কিছু তরুণী, আজ এমন এক পথ বেছে নিচ্ছে যেখানে শরীরকে তারা রূপান্তর করছে 'ডেবিট কার্ডে' — যার পিন নম্বর হলো লোভ, আর স্বপ্ন হলো ঝলমলে লাক্সারি লাইফস্টাইল।

তাদের কাছে দামি মোবাইল ফোন, ব্র্যান্ডেড পোশাক, হানিমুনের ব্যক্তিগত ফটো, পাহাড়, সমুদ্র, পাঁচতারা হোটেলের বুফে, বিদেশ ভ্রমণের হাজারো ছবি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝলমলে হাসি — এসবই হয়ে উঠছে সাফল্যের মাপকাঠি। অথচ এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক ভয়ঙ্কর শূন্যতা। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সমাজব্যাপী এক ধরনের নৈতিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে।

এনিয়ে আমাদের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী বলেছেন — "The world has enough for everyone's need, but not for everyone's greed" — পৃথিবীতে প্রয়োজন মেটানোর মতো সবকিছু আছে, কিন্তু বিলাসিতার পেট ভরানোর মতো যথেষ্ট নেই।

বর্তমান সময়কে বলা যায় 'প্রদর্শনের যুগ'। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট কিংবা ইউটিউব — সবখানেই চলছে কৃত্রিম জীবনযাপনের অসম্ভব প্রতিযোগিতা। এখানে প্রশ্ন হয় না — "তুমি কেমন আছো?" বরং হয় — "তুমি কেমন দেখাচ্ছো?" যে যত বাহ্যিক আড়ম্বর দেখাচ্ছে সে তত লাইক, কমেন্ট পাচ্ছে। এই লাইক, কমেন্ট, সাবস্ক্রাইবারের চক্করে মেয়ে বা নারীরা অশ্লীলতার চূড়ান্ত নীচে নেমে গিয়েছেন। অনেকে বয়ষ্ক বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা বলছেন — আগে পয়সা দিয়ে সিনেমাতে বা নৃত্যঘরে গিয়ে 'বাইজি নাচ' দেখতে হত, আর এখন ফ্রীতে ঘরে বসেই আধুনিক নারীরা সব দেখিয়ে দিচ্ছে। লাজ-লজ্জা-শরম সব খেয়ে বসেছে। আমরা এক অদ্ভূত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। ছেলে-মেয়েরা মাঠে খেলে না, খেলে মোবাইলে। দেখার জন্য ঘুরতে যায় না বা অবসর সময় একাকী কাটানোর জন্য ঘোরে না, ঘোরে সোস্যাল মিডিয়ায় নিজেদের 'বড়লোকস' দেখানোর জন্য, আর লাইক ও ভালো ভালো কমেন্টের আশায়। ভিতরে ভিতরে শূন্যতা — কিন্তু বাইরে ঠাটবাট, পোষাক আর ফটোতে লাক্সারি।

অন্যের ঝলমলে জীবন দেখে নিজের বাস্তব জীবনকে তুচ্ছ মনে হয়। এই হীনমন্যতা থেকে জন্ম নেয় তুলনামূলক মানসিকতা। তরুণ-তরুণীরা ভাবে — "আমার কেন নেই? ওর আছে, আমারও চাই।" আর সেই চাওয়ার ফাঁদেই অনেকেই জড়িয়ে পড়ে শর্টকাটের খেলায়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন — সোশ্যাল মিডিয়ার অবিরাম স্ক্রল করার অভ্যাস একধরনের মানসিক আসক্তি তৈরি করছে। এই আসক্তি শুধু সময় নষ্ট করছে না, বরং ভেতরে ভেতরে আত্মবিশ্বাসও খেয়ে নিচ্ছে।

আজকের সমাজে "আমার নেই" বলা যেন লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বরং "আমার আছে" দেখানোই মর্যাদার প্রতীক। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নিচ্ছে ভোগবাদ।

একজন তরুণী হয়তো জানে, দীর্ঘ পড়াশোনা, পরিশ্রম বা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে লাক্সারি অর্জন করা কঠিন। তাই সে বেছে নিচ্ছে শর্টকাট। সম্পর্ককে যেন পরিণত হচ্ছে চুক্তিতে — "তুমি আমাকে লাক্সারি দাও, আমি তোমাকে বিনোদন দেব।" কিন্তু সমস্যা হলো, এই চুক্তি অস্থায়ী। যখনই অর্থ ও ভোগের সম্পর্ক ভাঙে, তখন শুরু হয় মানহানি, ব্ল্যাকমেইল আর অস্থিরতা। ফলে লাক্সারি যতই ঝলমলে হোক, তা কখনো স্থায়ী সুখ আনতে পারে না।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন — তরুণ প্রজন্মের বিপথগামী হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হলো পারিবারিক অবহেলা। অনেক পরিবারে সন্তানকে ভালোবাসা, মূল্যবোধ বা সময় না দিয়ে কেবল অর্থ ও ভোগের সুযোগ দেওয়া হয়। ফলত সন্তান মনে করে — "আমার জীবনে সম্পর্কের গুরুত্ব নেই, কেবল অর্থই আসল।" এই শূন্যতা তাকে ঠেলে দেয় সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম গ্ল্যামারে, যেখানে ভোগবিলাসই জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে অনেক সময় পরিবারের অর্থনৈতিক দুরবস্থাও সন্তানকে ভুল পথে ঠেলে দেয়। 'সহজে টাকা'র স্বপ্নে বিভোর হয়ে মেয়েরা শরীরকে ব্যবহার করছে মূলধন হিসেবে। সহজে পাওয়া অর্থের নেশা ভীষণ শক্তিশালী। একবার কেউ এই পথে নামলে তা থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। কারণ এই নেশা শুধু অর্থ নয়, সাথে নিয়ে আসে 'স্ট্যাটাস'। দামি পোশাক, বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি, রেস্তরাঁর টেবিল — এসব দেখিয়ে তারা নিজেকে প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু সমাজের চোখে তা যতই ঝলমলে মনে হোক, ভেতরে ভেতরে তারা নিজেরাই জানে — এটি একটি মিথ্যা আবরণ।

এখানে একটি বৈপরীত্য চোখে পড়ে। পেশাদার যৌনকর্মীরা অন্তত জানেন তারা কী করছেন — কিন্তু আধুনিকতার মুখোশে আবৃত এই তরুণীরা কখনোই স্বীকার করতে চান না যে তারা আসলে শরীর বিক্রি করছেন। উল্টে তারা নিজেদের সাজান 'স্মার্ট, মডার্ন গার্ল' হিসেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের কার্যকলাপ অনেক সময় পেশাদারদের থেকেও বেশি বিপজ্জনক। কারণ তারা মুখে স্বপ্ন ও স্বাধীনতার কথা বললেও কাজের জায়গায় আত্মসম্মান বিসর্জন দিচ্ছে।

এই প্রবণতা শুধু কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ঢেউ সমাজের গভীরে ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণ প্রজন্মের মনে ভুল ধারণা জন্মাচ্ছে যে সাফল্যের মানে হলো শর্টকাট আর শরীর বেচাকেনা। পরিশ্রম, মেধা ও সততার গুরুত্ব ক্রমশ কমে যাচ্ছে। সম্পর্কের ভিত্তি ভেঙে যাচ্ছে — প্রেম, বন্ধুত্ব বা বিয়ের মতো সামাজিক বন্ধনগুলো অর্থনির্ভর হয়ে উঠছে। পুরুষদের মধ্যেও অর্থ থাকলেই সব পাওয়া যায় মানসিকতা বাড়ছে, যা নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতার জন্য ভয়াবহ।

শহরের কফিশপে বা নাইটক্লাবে গেলে প্রায়ই দেখা যায় — একজন টিনএজার বা কিশোরী দামি পোশাকে সেজে এসেছে এক মধ্যবয়সী পুরুষের সঙ্গে। বাইরের মানুষ ভাবে — এটা হয়তো প্রেম। কিন্তু বাস্তবে তা একটি লেনদেন, একটি চুক্তি। সংবাদপত্রে প্রায়ই আসে — ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে পরিচয়, এরপর বিলাসী উপহার, আর শেষমেশ প্রতারণা বা ব্ল্যাকমেইল। এর শিকার শুধু তরুণীরা নয়, কখনো কখনো পুরুষেরাও।

সমাধানের পথ
এই বিপথগামী প্রবণতা রোধ করা সহজ নয়। তবে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি —
🔸 পারিবারিক ভূমিকা: সন্তানকে কেবল অর্থ নয়, সময়, ভালোবাসা ও মূল্যবোধ দিতে হবে। তাদের বুঝতে হবে — সাফল্যের মানে লাক্সারি নয়, আত্মসম্মান।
🔸 সোশ্যাল মিডিয়ার সচেতনতা: স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিমতা নিয়ে আলোচনা জরুরি। বাস্তব জীবনকেই প্রধান হিসেবে গ্রহণ করতে শেখাতে হবে।
🔸 আত্মসম্মান শিক্ষা: মেয়েদের বোঝাতে হবে, শরীর নয়, মেধা ও যোগ্যতাই আসল সম্পদ। লাক্সারি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সম্মান চিরস্থায়ী।
🔸 সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ: সাহিত্য, সিনেমা ও গণমাধ্যমে এমন কন্টেন্ট তৈরি করতে হবে যেখানে পরিশ্রম, সততা ও আত্মসম্মানকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।

পরিশেষে বলা যায়, আজকের প্রজন্মের একাংশ হয়তো টাকার জোরে লাক্সারি কিনছে, বিদেশ ভ্রমণ করছে, ব্র্যান্ডেড পোশাকে হাসি ছড়াচ্ছে। কিন্তু সময় নির্মম। যখন টাকাওয়ালা পুরুষেরা মুখ ফিরিয়ে নেবে, তখন একমাত্র সঙ্গী হবে আয়না। আর সেই আয়না ঠান্ডা গলায় বলবে — "তুই মানুষ নয়, এক প্যাকেজড পণ্য।"

লাক্সারি সাময়িক সুখ দিতে পারে, কিন্তু আত্মসম্মান একবার হারালে তা আর ফিরে আসে না। তাই এখনই প্রয়োজন নতুন প্রজন্মকে সচেতন করা — সত্যিকারের সাফল্যের পথ হলো পরিশ্রম, মেধা ও সততার ওপর দাঁড়িয়ে। লাক্সারি নয়, আত্মসম্মানই মানুষকে মানুষ করে তোলে। বিশ্ববিখ্যাত আধুনিক উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবক এলন মাস্ক যথার্থই বলেছেন — "Luxury doesn’t make you successful. Solving problems does" — সাফল্যের মাপকাঠি বিলাসিতা নয়, বরং তুমি সমাজের জন্য কী সমাধান তৈরি করলে সেটাই আসল গর্ব।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
5 1 ভোট
স্টার
guest
1 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top