"কীরে, বিয়ে তো করলি, good newsটা কবে পাবো?" — খুব পরিচিত একটা প্রশ্ন, যা বিয়ের পর প্রায় প্রতিটি বিবাহিত মেয়েকেই কখনও না কখনও শুনতে হয়। বিয়ের পর যত বেশি সময় অতিবাহিত হয় এই প্রশ্নের তীক্ষ্ণতা তত বাড়তে থাকে। মাতৃত্ব ছাড়া নাকি নারীর অস্তিত্ব সম্পূর্ণ হয়না, নারীত্বের পূর্ণ বিকাশের জন্য মাতৃত্ব নাকি অপরিহার্য। কিন্তু সত্যিই কি তাই?!
ইতিহাসের পাতা উল্টে একটু অতীতের দিকে যদি চোখ দি, আমরা দেখতে পাই ছোট্ট ছোট্ট ৭-৮ বছরের বাচ্চা মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো ২৫-৩০ বছরের পূর্ণ যুবকের সাথে। তার দু-এক বছর পরেই শ্বশুর বাড়ি চলে যেতে হতো মেয়েটিকে এবং রজস্বলা হওয়ার পরপরই শুরু হতো সন্তানের জন্ম দেওয়া, যা প্রায় মেয়েটির বয়স চল্লিশোর্ধ হওয়া অবধি চালু থাকতো। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষীদের হস্তক্ষেপে দুর্ভাগা নারী সমাজ সতীদাহের মত কুপ্রথার হাত থেকে রক্ষা পায় আর ধীরে ধীরে সমাজে নারী শিক্ষা, বিধবা বিবাহের প্রচলন ঘটে। আস্তে আস্তে বাল্যবিবাহের অবসান ঘটে আর শিক্ষার আলোয় আলোকিত মেয়েরা ধীরে ধীরে অন্তঃপুরের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
আধুনিক যুগের নারী সমাজ শুধু শিক্ষার আলোয় নিজেকে আলোকিত করেনি, পুরুষদের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাইরে বেরিয়ে উপার্জনের কাজে লেগে পড়েছে। চারদিকে নারী স্বাধীনতার ভূরী ভূরী উদাহরণ, কিন্তু এত পরিবর্তনের মধ্যেও সমাজে বিবাহিত নারীদের অবস্থান বিশেষ বদলেছে বলে মনে হয়না। আজও সমাজ নির্ধারিত নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নারীদের জীবন। ওই রূপরেখা ধরে চলে দেখা যায় ২২-২৩ বছর বয়স পর্যন্ত স্নাতক, স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা, তারপর নির্দিষ্ট ট্রেনিং বা preparation নিয়ে প্রায় ২৫-২৬ বছর নাগাদ চাকরিতে যোগদান করে থিতু হয়ে বিয়ে করার বয়সটা স্বাভাবিকভাবেই মেয়েরা ২৮ এর বেশিতে নিয়ে গিয়ে ঠেকিয়েছে। কিন্তু বিয়েটা ২৮/৩০/৩৫ যে বয়সেই একটি মেয়ে করে থাকুক, বিয়ের ১-১.৫ বছরের পর থেকেই তার জন্য উচ্চারিত হয় ওই অমোঘ প্রশ্নটি — Good news, সে কবে দিচ্ছে !?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নবাণ ভেসে আসে আত্মীয় স্বজন, অফিসের শুভাকাঙ্খী সহকর্মীদের মুখ থেকে বা পাড়া প্রতিবেশীর মুখ থেকে, সংগত দিতে কখনও কখনও জুটে যান উভয়পক্ষের মা-বাবারাও। ক্রমাগত প্রশ্নবাণ আর তার সাথে জোটে সতর্কবাণী — "বেশী বয়সে বাচ্চা নেওয়া অসুবিধা"। আবার কখনও সুস্পষ্ট স্ক্যামরূপী আশ্বাস বাণী — "বাবা মা সুস্থ থাকলে, বাচ্চাকে তাঁরাই দেখে রাখবেন"! অনেক সময় অভিভাবকরা এও বলে থাকেন যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সুদৃঢ় করার জন্য বাচ্চা নেওয়া টা আবশ্যিক। বা দুজনের কোনো মতবিরোধ হলেই বলেন — "বাচ্চা হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে"! আশ্চর্য, স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের আঠা কী একটি নবজাত শিশু?!
চারদিকের বাক্যবাণ আর সামাজিক চাপের মুখে পড়ে চোখে সর্ষে ফুল দেখে মেয়েটি হয়তো নিয়েও নেয় একটি সন্তান — কিন্তু তার ফল কী হয়? মেয়েটি যে সময় অন্তঃসত্বা হয়, সেইসময়টা হয়তো তার career-এর গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল, হয়তো ওই সময়ে মেয়েটি খেটেখুটে নিজের প্রথম প্রমোশনটা পাওয়ার মুখে ছিল, তার সেই হিসাবে হয়ে যায় গণ্ডগোল। এই বাচ্চা নেওয়ার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েদের নিজদের প্রমোশন বা career বিসর্জন দিতে হয় নয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের ভালোবাসার চাকরিটিই ছেড়ে দিতে হয়। কারণ এখনো সমাজের অনেক শিক্ষিত মানুষের মতেই — "বাচ্চা হয়ে গেলে মায়ের কাছে বাচ্চাই first priority, মায়ের career, office, promotion, deadline — সব কিছুই secondary"।
এমনিতেই পরিণত বয়সে বিয়ে করার পর সব মেয়ের কানেই biological clock-এর ঘণ্টা তো বাজতে থাকেই, তারওপর থাকে pcod, hormonal imbalance বা কখনও obesity-র জুজু। তাই ৩৫ বা তার আশপাশের বয়সে মা হয়ে একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে নিজের successful career-এর সাথে অধিকাংশ মেয়েকেই compromise করে নিতে হয়।
মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের পক্ষে সাধারণত সম্ভব হয়না ডিম্বাণু সংরক্ষণ, surrogacy বা IVF এর মত ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নেওয়া। তার সাথে থাকে আরো একটা চিন্তা — "লোকে কী বলবে"? তাই ৩৫-৪০ এই বয়সের মধ্যে দরকার হলে, চাকরি career সব লাটে তুলে দিয়ে শুরু হয় একটা নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে আনার প্রস্তুতি।
আর একবার সেই শিশুটি পৃথিবীতে চলে এলে শুরু হয় মায়ের জীবনের নতুন এক লড়াই। মাতৃত্বকালীন ছুটি যদিও মেলে কিছু দিন কিন্তু সেই ছুটির শেষে অফিসে ফেরত এসে মেয়েটি দেখে অফিসের প্রফেশনাল competition এ অনেকটা পিছিয়ে গেছে সে। এমনিতেই আজকাল অধিকাংশ অফিসের পরিবেশ অত্যন্ত টক্সিক। বিবাহিত সন্তানবতী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি বা শিশুর যত্ন বাবদ ছুটি নিতে দেখলেই পুরুষ সহকর্মীদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে — শুরু হয় টিটকিরি দেওয়া। অনেক 'শিক্ষিত' পুরুষই মনে করেন — "মেয়েদের চাকরি করে কি লাভ। সেইতো দুদিন পর বিয়ে করে বাচ্চা নেবে। তখন পর পর ছুটি আর ছুটি, এভাবে কি অফিসের কাজ হয়, নাকি গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্ব মেয়েদের দেওয়া যায়?" কেউ একবারও নতুন মা হওয়া মেয়েটির মনের অবস্থা বুঝতে চায় না, বোঝেনা ক্রমাগত বাড়ি আর অফিস, দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা মেয়েটির বিপর্যস্ত অবস্থা।
অথচ সব ভুলে অফিসের কাজে টানা মনোযোগ দেওয়াও এই সময় হয়ে ওঠে মেয়েটির জন্য সমস্যার। মায়ের মন পড়ে থাকে বাড়িতে রেখে আসা খুদেটির কাছে — চিন্তা হতে থাকে আয়ার হাতে ঠিক মত যত্ন হচ্ছে কিনা, ঠিক মত স্নান খাওয়া দাওয়া হচ্ছে কিনা, সে সুস্থ আছে কিনা। যাদের বাড়িতে বাবা-মা বা শ্বশুর-শাশুড়ির সাহায্য মেলে তারা তাও এদিকে কিছুটা নিশ্চিন্ত হন। নয়তো অফিস ছুটি হলেই পড়িমড়ি করে ছুটতে হয় বাড়িতে, আয়া যাওয়ার সময়ের আগে ঢুকে খুদেকে দেখতে হবে যে! বাড়ির বড়রা অফিসের সময়টুকু সন্তানকে দেখে রাখলেও অফিস থেকে হাক্লান্ত হয়ে বাড়ি এসে ঢোকা মেয়েটিকে সব সময়ই মনে করিয়ে দেন — "বাড়িতে এসে ঢোকার পর বাচ্চার দায়িত্ব তোমার, আমরা সারাদিন দেখেছি ,এবার তুমি দেখো!" না থাকে একটু ভালো করে বিশ্রাম নেওয়ার অবকাশ, না থাকে কোনো পছন্দের কাজে মন দেওয়ার সুযোগ। বাচ্চা যতদিন ছোটো থাকে মায়ের পায়ে একটা অদৃশ্য শিকল পরিয়ে দেন অভিভাবকরা — চাকরি করো, ব্যবসা করো, ডেডলাইন থাকুক, যা খুশি থাকুক, দিনের শেষে তুমি মা, তাই বাচ্চার দায়িত্ব তোমার।
আর এসবের মাঝে সব থেকে বেশি কষ্ট সহ্য করতে হয় — এই নতুন মা এবং তার শিশু টিকেই। না হয় ঠিক মত সন্তানের যত্ন, না হয় ঠিক মত অফিসের কাজ, না মেলে পর্যাপ্ত শারীরিক বা মানসিক বিশ্রাম। মনের মধ্যে ক্রমাগত কাজ করা অপরাধবোধের জন্য মেয়েটি বিষাদগ্রস্ত হতে থাকে। অথচ তার মনের কথা ভাবেন খুব কম অভিভাবকরাই। বেশিরভাগ অভিভাবকরাই সদ্য মা হয়ে ওঠা মেয়েটির support না হয়ে তার মনের গ্লানি এবং অবসাদ বাড়ানোর কারণ হয়ে দাঁড়ান।
অথচ দিনের শেষে মাতৃত্ব তো অবশ্যই সুন্দর একটা উপহার একজন নারীর জীবনে।তার জন্য এত বাক্যবাণের সম্মুখীন কেনো হতে হবে একজন মেয়েকে। শুধু 'মা' না হতে পারলেই বা না হতে চাইলেই তার নারীত্ব বৃথা হয়ে যায়? এখনকার শিক্ষিত, কর্মরত আধুনিক নারীর কী কবে সন্তান নেওয়া উচিত, আদৌ সন্তান নিতে হবে কিনা, ঠিক করার অধিকার নেই? তার নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত কি সমাজ নির্ধারিত নিয়ম মেনেই নিতে হবে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও? নিজের চাকরি, কাজকর্ম, নিজের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে চাওয়া কোনো বিবাহিত মেয়ে যদি সিদ্ধান্ত নেয় মা না হওয়ার — সমাজ কি আজও তাকে 'অসম্পূর্ণ'ই বলে যাবে? সময় কি হয়নি — নারীকে তার নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে দেওয়ার? কয়েকটা নির্দিষ্ট মাপকাঠি পূরণ করতে পারলেই, সে আদর্শ নারী, নয়তো কিছুই নয়? সমাজ কবে সত্যি সত্যি পরিবর্তিত হবে? কবে 'মেয়ে মানুষ' থেকে শুধু 'মানুষ'-এর স্বীকৃতি দেবে নারীকে?