বিধাতার আপন খেয়ালে পৃথিবীতে জন্ম হলো মানুষের। জন্ম যখন নিয়েছো বেঁচে থাকার লড়াই তোমাকে নিজেই নিজেকে করতে হবে। এ যেন সৃষ্টির অদ্ভুত নিয়ম। অতঃপর বেঁচে থাকার জন্য শুরু হলো লড়াই। গাছের ফল, নদী আর ঝর্ণার জল দিয়ে উদরপূর্তির ব্যবস্থা করলো। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য আরো দুটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিল আশ্রয় ও বস্ত্র। প্রাকৃতিক ঝড়ঝাপটা, পশুর আক্রমণ, অনেক পরে রোদ, বৃষ্টি, ঠান্ডায় শরীর ঢাকতে ও লজ্জা নিবারণের জন্য যা অতি প্রয়োজনীয়। একে একে সেটাও শিখলো। পাহাড়ের গুহায় নিল আশ্রয় আর গাছের বড়ো বড়ো পাতা আর বাকল দিয়ে শরীর ঢাকলো।
পৃথিবীতে সবথেকে বুদ্ধিমান জীব মানুষ। সেই আদিম যুগে যখন পুঁথিগত কোন শিক্ষা ব্যবস্থা শুরু হয় নি, সেই সময়ও মানুষ টিকে থাকার জন্য, আত্মরক্ষার জন্য গাছের ডাল, পাথর কে হাতিয়ার করেছে। শিখেছে আগুন জ্বালতে। আস্তে আস্তে লোহা, তামার ব্যবহার শিখেছে, পশুদের বশ করেছে। পশুর দুধ পান করতে এবং কাঁচা মাংস আগুনে পুড়িয়ে খেতে শিখেছে। গৃহপালিত পশুদের বিনিময়ের মাধ্যম করেছে। তারো পরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে এক একটি এলাকা জুড়ে বসবাস করতে শিখেছে। কয়েকটা পরিবার নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি গ্রাম। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ মিটানো ও কোন কিছু বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য একজনকে গ্রামের মাথা বা মোড়ল করে তাঁর সিদ্ধান্ত কে মান্যতা দিয়েছে। এভাবেই আস্তে আস্তে মানুষ পা বাড়ালো নিয়মশৃঙ্খলিত, উন্নত জীবনধারার পথে। গড়ে উঠলো সমাজ।
কালের নিয়মে আমরা পৌঁছে গেছি একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে। শিক্ষা-দীক্ষা, কারিগরী ব্যবস্থা, আধুনিকতায় মানুষ পাহাড়ের চূড়া কে স্পর্শ করেছে। সৃষ্টির সময় থেকেই মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান,পরিবহন, শিক্ষা, গৃহপালিত পশুদের রক্ষণাবেক্ষণ, আনন্দ, আশ্রয়, বিশ্রাম সব সবকিছুরই উৎসস্থল জঙ্গল। অথচ এখনকার শিক্ষিত, উন্নত, আধুনিক যুগের বেশিরভাগ মানুষের জঙ্গল, নদী, পাহাড় রক্ষা করার থেকে ধংস করাতেই আগ্রহ বেশি। আরো বেশি লাভবান হতে চায়। গাছ কেটে, পাহাড় কেটে হোটেল ব্যবসা করতে চায়। জলাধার বুঝিয়ে আবাসন। বনভোজন কিংবা জঙ্গলে বেড়াতে এসে অনেকেই থার্মোকল, প্লাস্টিকের থালা,বাটি, জলের বোতল, পলিথিন ফেলে নোংরা করে প্রকৃতিকে। অনেক সময় ধূমপানজনিত অসতর্কতায়, দাবানল অথবা মানুষের অসৎ উদ্দেশ্যের কারণেও জঙ্গলে আগুন লাগে। দিন দিন কমে যাচ্ছে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা। আখেরে ক্ষতি হচ্ছে আমাদেরই। বৃষ্টিপাত কমছে, সর্বত্রই জলসংকট বাড়ছে। পশুদের আশ্রয়স্থল জঙ্গল নষ্ট করার ফলে হাতি, হনুমান লোকালয়ে আসছে। শস্য,ঘরবাড়ি নষ্ট করছে, মানুষ মারছে। পরিবেশের দূষণ বাড়ার ফলে মানুষের শারীরিক সমস্যা বাড়ছে।
পুরুলিয়া জঙ্গল মহল এলাকা — এই সমস্যা এখানেও। তবুও জঙ্গল ঘেরা পুরুলিয়া এখন পর্যটন শিল্পে উন্নত একটি জায়গা। এতে অবশ্যই এখানকার প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকার সুরাহা হয়েছে। দেশ-বিদেশের বহু মানুষ এখানে ঘুরতে আসে প্রকৃতির টানে। রুখা-সুখা অহল্যাভুমি — বছরের ছয়টি ঋতুতেই যে তার রূপের ডালি সাজিয়ে বসে থাকে। তার মধ্যে বর্ষাতে প্রাণোচ্ছল কিশোরী আর বসন্তে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া সুগন্ধি টাটকা সতেজ ফুল। রূপ, রং, রস, সুর নিয়ে আহ্বান জানায় প্রকৃতি প্রেমিকদের। বাঁশির সুরে, ঝুমুরের গানে আপ্যায়ন করে আর মাদলের বোলে মাতিয়ে রাখে প্রকৃতির এক অকৃত্রিম সরলতায়।
বসন্তের আগমনে পুরুলিয়া, পলাশ আর প্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ঝোপে-ঝাড়ে পুটুস ফুল, বনে-বাদাড়ে পলাশ আর শিমুলের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে ডহর-ডুংরি। কৃষ্ণচূড়া ফুল যেন রঙিন প্রজাপতির মতো পাখা মেলে উড়ে বেড়ায় আকাশে। ভোর বেলা সূর্য ওঠার আগেই মহুলের ডাল থেকে টুপ টুপ করে খসে পড়ে রসালো মউফুল। সুবাসিত শিশির মেখে শিরশিরে ঠান্ডায় রসালো মউফুল টপ টপ করে কুড়িয়ে নেয় ফুলমণি, বাহামনিরা। সূর্য ওঠে। শালবনে কচি কচি পাতায় ঠিকরে পড়ে রবির কিরণ। ঠিক যেন তরল সোনা। সুগন্ধি সাদা ফুল মন ভরিয়ে দেয়। মনের আঙিনায় লাল রং ভালোবাসার বার্তা বহন করে। দিগন্ত জুড়ে প্রেমের দুর্নিবার স্রোতে ভেসে যায় মনের যত কালিমা, পঙ্কিলতা। ভালোবাসার আগুনে পুড়ে ছারখার হয় জীবনের সমস্ত হতাশা, বঞ্চনা, দুঃখ-দুর্দশার যন্ত্রণা গুলো। রুখা-সুখা অহল্যাভুমি পুরুলিয়ার সৌন্দর্য আর মহুলের গন্ধে মাতাল হতে পরিযায়ী পাখির মতো ছুটে আসে প্রকৃতি প্রেমিকের দল। ফাগুনের ফাগ আর পলাশের রং মিলেমিশে যায় সম্প্রীতির বন্ধনে। মহুলের গন্ধে মাতাল মন ভ্রমর হয়। পলাশের প্রতি পলের আশ নিয়ে বসন্ত ভ্রমণ করে ভালোবাসার টানে।
শিমুল, পলাশের ডাকে, মহুলের নেশায়, ঝুমুরের টানে তাইতো বারে বারে পর্যটকরা ছুটে যায় অযোধ্যার কোলে।