"ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলে তার জাল।"
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সৃষ্টি, শৈলী এবং ধ্বংসে আমরা — বিজ্ঞানের ভাষায় 'হোমো সেপিয়েন্স' — অতুলনীয়। হোমো সেপিয়েন্সের আক্ষরিক অর্থ Wise Man (জ্ঞানী মানব)। মানবপ্রজাতির এই সর্বশেষ প্রজাতিটি প্রাণীকুলে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে তার আপন বুদ্ধিমত্তার ভালমন্দ প্রয়োগে। কখনো মিঠে, কখনো কড়া। সে নদীর জল থামিয়ে বাঁধ দেওয়া হোক অথবা উচ্চফলনশীল বীজ উদ্ভাবন করে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনই হোক। তাজমহল থেকে হাওড়া ব্রি্জ তারই জয়কীর্তি। আজ হোমো সেপিয়েন্সের পদচিহ্ন পৃথিবী থেকে চাঁদ সর্বত্র পড়েছে। উন্নয়নের নিরিখে সে বহু হাজার বছর আগেই ছাড়িয়ে গিয়েছে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অধুনালুপ্ত হোমো নিয়ানডারথ্রাল কেও। অবলুপ্ত করেছে অগুনতি প্রজাতি কে। হতে হয়েছে নিষ্ঠুর, নির্দয়।
তবে কি আমরা অপরাজেয়? বিজ্ঞাপণের ভাষায় আমাদের কোন সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ শাখা নেই?
বিজ্ঞানীদের মতে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট ইত্যাদির দৌলতে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে আমাদের স্থান দখল নেবে 'হোমো ডিজিটালিস'। সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে মানব প্রজাতির বিবর্তনের সামান্য গৌরচন্দ্রিকা সেরে নেওয়া যাক। প্রায় ৫০,০০০ বছর আগে বিবর্তনে লড়াইয়ে 'হোমো নিয়ানডার্থাল'দের পিছনে ফেলে হোমো সেপিয়েন্সের জয়যাত্রা শুরু। নিয়ানডার্থাল মানবের সাথে আমাদের জিনগত মিল ৯৯.৭ শতাংশ। এছাড়া নিয়ানডার্থাল মানবের উচ্চতা কম হওয়ায় 'সারফেস টু ভলিউম' অনুপাতও কম ছিলো যা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অনুকূল ভূমিকা পালন করে। এছাড়া উভয় প্রজাতির মাথার আকার, আয়তন প্রায় একই ছিলো। তাহলে কী কারণে পৃথিবীর বুক থেকে আমাদের পুর্বপ্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো?
হোমো সেপিয়েন্সের উত্থানের কারণ
বিজ্ঞানীদের মতে হোমো সেপিয়েন্সই প্রথম প্রজাতি যারা জটিল ভাষা-পরিকাঠামো তৈরি করতে পেড়েছিলো। এরফলে জ্ঞান এবং কর্মদক্ষতা অর্জনের গতি দ্রুততর হয়। ভাষাজ্ঞান অর্জনের ফলে বনে কী খাবো, কী খাবোনা, কখন, কোন ফসল হয়, সে সব বিষয় মানুষের করায়ত্ত হয়ে উঠে যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সহজলভ্য হয়ে যায়। ভাষাদক্ষতার কারনে সমাজ আরো বেশি সংঘবদ্ধ হয়েছে, অর্থনীতি, রাজনীতির মতো বিষয় আলোচনা এবং প্রয়োগের রুপ পেয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় — ভাষা কেবল ব্যক্তিগত পরিসরে আবদ্ধ থাকেনি। এই জ্ঞান প্রভাবশালী হয়ে ধীরে ধীরে সমাজে ছড়িয়েছে।
দ্বিতীয় যে উদ্ভাবনের ফলে হোমো সেপিয়েন্সের বিজয়রথ আজও ছুটে চলেছে সেটি হলো লিখতে পারার ক্ষমতা। ভীমবেটকার দেওয়াল অঙ্কন হোক বা আজকের আ্যলগোরিদম। লেখা আবিষ্কারের সাথে সাথে জ্ঞানের ব্যপ্তি দেশ এবং কালের সীমাবদ্ধতা কে অতিক্রম করে ফেলে। কথ্যভাষায় একজন শিক্ষকের সামনে থেকে যে শিক্ষা গ্রহণ করতে হতো আজ সেই সীমাবদ্ধতা নেই। লিখিত ভাষার দৌলতে দুনিয়ার যেকোন জায়গায় বসে আজ জ্ঞানার্জন করা যায়। গুটেনবার্গের ছাপাখানা আবিষ্কারের পরে জ্ঞানের গতি যেন নতুন প্রাণ প্রায়। বর্তমান ইন্টারনেটের দৌলতে কোনকিছু জানতে চাওয়া কেবলমাত্র 'ওয়ান ক্লিক আ্যওয়ে।' জ্ঞান হয়েছে সহজলভ্য এবং প্রাচুর্যপূর্ণ।
হোমো ডিজিটালিস যেভাবে শিখছে
সমাজবিজ্ঞানী এবং নৃবিজ্ঞানীদের মতে হোমো সেপিয়েন্সের জ্ঞানার্জনের বর্তমান পদ্ধতিটি 'কলেকটিভ লার্নিং' নির্ভর। এই পদ্ধতিতে একটি প্রজন্ম তার পুর্ববর্তী প্রজন্মের থেকে সরাসরি পড়াশোনা, ভাষাজ্ঞান ইত্যাদি শিখছে। ফলে সমষ্টিগত ভাবে আমরা যতটা বুদ্ধিমান, একজন একলা মানুষ হিসেবে সবাই কিন্তু আমরা সমান বুদ্ধিমান বা বুদ্ধিমতী নই। ভাষার প্রয়োগের মাধ্যমে একসাথে লাখ লাখ মানুষ আজ বিশ্বজুড়ে পড়াশোনা করছেন,শিক্ষিত হচ্ছেন।
'কলেকটিভ লার্নি'-এর অপর দিকে দাড়িয়ে আছে 'কো-লার্নি' পদ্ধতি যার মাধ্যমে হোমো ডিজিটালিস-রা জ্ঞানার্জন করছে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর হোম ডিজিটালিস যা শিখবে তাতে মানুষের মতো 'কগনিটিভ' বৈষম্যের সৃষ্টি হবেনা। প্রকৃত অর্থে সাম্যবাদী ডিজিটাল শিক্ষিত সমাজ। এক্ষেত্রে হোমো ডিজিটালিসরদের মধ্যে কম্পিউটার কোডের মাধ্যমে তথ্য প্রদান করা হবে যেখানে ভাষার মতো এত বৈচিত্য নেই। নেই মানবস্মৃতির দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা। এই কোডকে আলাদা আলাদা ভাষায় অনুবাদ করার ঝামেলাও থাকবেনা।
বিশ্বব্যপী কো লার্নিং
ইতিমধ্যে গুগল এবং টেসলার মতো বহুজাগতিক সংস্থাগুলি তাদের পণ্যে বিশ্বব্যপী 'কো-লার্নিং' ব্যবস্থা চালু করে দিয়েছে। উদাহরন স্বরুপ বলা যায় — ধরুন নিউইয়র্কের রাস্তায় একটি টেসলা গাড়ির সামনে হঠাৎ আর একটি গাড়ি মুখোমুখি আসলো। এই পরিস্থিতিতে টেসলা গাড়িটি যেভাবে দুর্ঘটনা এড়িয়ে যাবে সেটি দিনের শেষে পৃথিবীর সকল দেশের টেসলা গাড়ির সিস্টেমে আপলোড হয়ে যাবে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত ভাবে অর্জন করা জ্ঞান অতিদ্রুত নিজের কমিউনিটির মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া গেলো কেবলমাত্র কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার কোড এবং মেশিন লার্নিং পদ্ধতির যুগপৎ ব্যবহারের মাধ্যমে। হোমো সেপিয়েন্সের পক্ষে এই গতিতে দ্রুত জ্ঞান আতস্থ করা সম্ভব না। হেরে যাওয়া তাই ভবিতব্য।
যন্ত্রের সুবিধা
মেশিন লার্নিং পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে হোমো ডিজিটালিসের উত্থানের প্রবল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এই সিস্টেমের বেশ কিছু সুবিধা আছে —
🔸 প্রথমত, কম্পিউটারের 'মেমোরী' মানুষের তুলনায় বহুলাংশে বাড়ানো যায়। নারীর বার্থ ক্যনেলের গঠনের সীমাবদ্ধতার কারনে মানুষের মাথায় সাইজ বাড়ানো সম্ভব নয়। পুর্বে বড়ো সাইজের মাথার জন্য শিশু জন্মানোর সময় বহু গর্ভবতী নারীর মৃত্যু হতো। কম্পিউটার থুড়ি হোমো ডিজিটালিসের এই সমস্যা একেবারেই নেই।
🔸 দ্বিতীয় সুবিধাটি হলো গতি। কম্পিউটারের কাজ করার গতি ১৯৮১ তে ছিলো পাঁচ মেগাহার্জ। বর্তমানে এর মান পাঁচ গিগাহার্জ। অপর দিকে মানুষের মস্তিষ্কের গতি ১০০ হার্জের থেকেও কম।
🔸 তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো মানব মস্তিস্ক এবং কম্পিউটারের তুলনামূলক পাওয়ার সাপ্লাই। প্রাপ্তবয়স্ক মানব মস্তিস্ক মাত্র ২০ ওয়াট মতো শক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম। অপরপক্ষে সাধারন ল্যপটপের শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ ৬০ ওয়াটের বেশি এবং প্রয়োজনে সেই শক্তি বাড়ানো কমানোও যায়।
🔸 চতুর্থত, কম্পিউটারের নিদ্রা, বিশ্রাম ইত্যাদির ঝক্কি নেই। সে ইউনিয়নও করেনা। আন্দোলনও করেনা (তবে করবে কিনা সেটা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের ওপর নির্ভর করছে) ।
🔸 পঞ্চম সুবিধা, কম্পিউটার ভোলেনা। বিস্মৃতির প্রভাব যতটা মানুষকে আক্রান্ত করে তার কিয়দংশও কম্পিউটারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
🔸 পরিশেষে বলতে হয় মানুষের মতো কম্পিউটার আবেগময় নয় ফলে অতিদ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে মানুষকে টেক্কা দেবে।
আমাদের উত্তরসূরী কে?
অতঃপর আমাদের থুড়ি হোমো সেপিয়েন্সের উত্তরসূরী তবে কে? একটি প্রজাতি সংজ্ঞায়িত হয় তার জৈবপ্রকৃতি কিরুপ এবং কোথায় তার কর্মতৎপরতা। আমাদের নিজেদের ডিজিটাল জগৎকে কেন্দ্র করেই হোমো ডিজিটালিস তার যাত্রা শুরু করবে। আমরা আমাদের অধিকাংশ চিন্তা, চেতনা ধীরে ধীরে সমর্পণ করবো ডিজিটালিস কে। আমাদের এই ডিজিটাল প্রত্যয়িত নকলের থাকবেনা কোনো অনুভূতি, ক্ষোভ, কেবলমাত্র সীমাবদ্ধ মস্তিস্ক অস্তিত্ব তীব্র হবে। ক্রমশ আমরা জন্মগত প্রাকৃতিক দেহের ঊর্ধ্বে উঠে একসাথে পরিনত হবো 'ভার্চুয়াল' এবং আ্যকচুয়াল মানবে। মানব দেহের বিশেষত মস্তিস্কের 'অগমেন্টেসন' করে হোমো ডিজিটালিসরা আরো বুদ্ধিধর হয়ে উঠবে! আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় বর্তমানে গৃহীত সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে।
শতাব্দী শেষের কোন অপরাহ্নে আজকের মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের স্তরে প্রতিষ্ঠিত দেখতে পেলে অবাক হওয়ার কোনো কারন নেই। কারণ ডিজিটাল এই জগৎ আমাদের সৃষ্টি। স্রষ্টা ঈশ্বরের সমান।
এই অর্থে মানুষের ঈশ্বর হয়ে ঈশ্বরকে ছুঁয়ে যাওয়ার উপলব্ধি স্বার্থক হবে। প্রশ্ন হচ্ছে মানুষের এই ঈশ্বরে উন্নিত হওয়ার ড্রপ সিনে প্রাপ্তি কী? একাকীত্ব? ঈশ্বরত্ব লাভের জন্য নিজের প্রজাতিকে বিনষ্ট করতে পারবে কী মানুষ থুড়ি হোমো সেপিয়েন্স?