নারী এবং পুরুষ মিলেই মানব জাতি। এর একটি অংশ নষ্ট হলে অন্য অংশ টিকতে পারে না। যুগে যুগে নারীর পোশাক, চলাফেরা, কথাবার্তা থেকে শুরু করে যাবতীয় সবকিছুতেই নিয়ন্ত্রণবিধি চালু করতে গিয়ে — নারীকে শুদ্ধ করতে গিয়ে — পুরুষগুলো নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে গেছে।
আজ থেকে ২৫/৩০ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাথায় ওড়না দিয়ে যাবার কথা ভাবতেই পারতাম না। লেখাপড়ার পাশাপাশি নানা ধরণের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সামাজিক কাজ অনেক কিছুতেই ব্যস্ত ছিল শিক্ষার্থীদের জীবন। তখন ওড়না ছাড়া চলা বা মাথায় হিজাব পরা কোনোটাই প্রচলিত ছিল না। সমাজে তখন নারীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিল পুরুষ। দলবদ্ধ ধর্ষণ শব্দের সঙ্গে কেউ পরিচিত ছিলাম বলে মনে পড়ে না।
তখন প্রেম ছিল। প্রেমে ব্যর্থতা ছিল। সেই ব্যর্থতার অনলে জ্বলে সৃষ্টি হতো মহৎ কাজ, মহৎ সাহিত্য, মহৎ কাব্য। মহামারীর মতো ধর্ষণ কবে কখন ছড়িয়ে পড়লো বুঝলামই না। যখন থেকে নারীর চুল, উন্মূক্ত বাহু পুরুষকে দিশাহারা করতে শুরু করলো, নারী খাদ্য আর পুরুষ খাদকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো — তখন থেকেই প্রেম উবে গেলো। কামনার আগুনে প্রজ্বলিত পুরুষ তার মনুষত্ব হারালো।
শিক্ষা আর প্রযুক্তির কল্যাণে সভ্য মানুষ যখন ভাববে মানবতায়, সৃজনশীলতায় এগিয়ে যাবার কথা তখন এদেশের কতিপয় পুরুষ, এদেশের কতিপয় মুসলিম জনগণ, তাদের মানবতা হারিয়ে, মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে মেতেছে বিকৃত ধর্ষণে। যে জাতি নারী আর শিশুদের নিরাপত্তা দানে ব্যর্থ সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
দেশের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে সমস্যা। সকল সমস্যা বাদ দিয়ে ধর্ষণ নামক সমস্যায় নাজেহাল দেশবাসী। প্রতিটা ধর্ষণের পর নারীর পায়ের শিকল দৃঢ় হয়। পোশাকের আবরণে আরো কঠিনভাবে তাকে আবৃত করা হয়।
অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টা। শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রতিটি পুরুষের জন্য নজরদারি বাড়ানো উচিৎ ছিল। পুরুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ ছিল। কোনো মা-বাবা কি তার পুত্র সন্তানের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে? তাদের প্রতি নজরদারি বাড়িয়েছে?
আসলে আমরা ছেলে সন্তানকে মানুষ তৈরিতে মনোযোগী না হয়ে দিনের পর দিন নারীর জীবনকে শৃঙ্খলিত করেছি। শারীরিক শুদ্ধতার শিক্ষা যুগে যুগে নারীকে দেয়া হয়েছে কঠোরভাবে৷ পুরুষকে সাধারণত শারীরিক শুদ্ধতা নিয়ে কিছুই বলা হয় না। নারী ঋতুমতি হলে তা লজ্জার৷, পুরুষের খতনায় নেচে গেয়ে উৎসব পালন করা হয় কারণ লজ্জার নয় — ব্যাপারটা আনন্দের!
নারী তার শরীরের সুরক্ষায় যত কঠোর হয়, পুরুষ সে সুরক্ষা ভাঙ্গায় তত সচেষ্ঠ হয়। পবিত্রতা রক্ষা মানুষের কাজ। এই পবিত্রতা রক্ষায় পুরুষকে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বাধ্য করে না।
পুরুষের বেড়ে ওঠা এই ধারণা নিয়ে যে, বস্ত্র হরণ তার অধিকার। সেবা দেয়া নয়, সেবা পাওয়া তার অধিকার। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার প্রতি ধাপে ধাপে একটু একটু করে ছেলে শিশু মানবিক পুরুষ নয়, স্বৈরাচারী পুরুষ হয়। ভালোবাসা নয়, প্রেম নয়, কামনার কাছে আত্মসমর্পন করে। প্রেমের শাশ্বত বাণী তাকে কেউ শোনায় না। ভালোবাসায় সিক্ত হবার শিক্ষা তাকে সমাজ দেয না। কামনার আগুনে প্রজ্জ্বলিত পুরুষ ক্রমেই একা হয়। দহনে দহনে নিঃসঙ্গ সে মানবিকতা অর্জনে ব্যর্থ হয়।
লক্ষী মেয়ের বৈশিষ্ট্য হলো 'সাত চড়ে যে রা করে না।' সমাজ অতি যত্ন করে সব ক্ষেত্রে চুপ করে থাকা মেয়ে তৈরি করে। ফলে ঘরে-বাইরে, শিক্ষা ক্ষেত্রে — সর্বত্র চুপ করে থাকা লক্ষী মেয়েরা নির্যাতিত। সমাজে যেহেতু অসুরের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষের অবয়বের অসুর সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাই লক্ষী নয় — প্রয়োজন রণরঙ্গিনী, এলোকেশী 'মা কালী'কে।
এক সময়ে দেশ নাজেহাল ছিল অ্যাসিড নিক্ষেপে। মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পর কমিয়ে আনাই শুধু নয়, প্রায় শূন্যের কোটায় চলে এসেছে অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা।
বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে ভয়ংকর অন্যায়ের দিকে। বর্তমান অবস্থা সামাল দিতে আমাদের অতীতের অন্যায়গুলোর বিচার করতে হবে। প্রচলিত আইনের সংস্কার করে কঠিন কঠোর বিচারের আওতায় এনে অপরাধীর মনে আতঙ্ক তৈরির পাশাপাশি অনুশোচনা সৃষ্টি করতে হবে। অপরাধী যখন বুঝে যায় অপরাধ করে পার পাওয়া যায় টাকা বা ক্ষমতার জোরে — তখন সে অপরাধ করতে দুবার ভাবে না। অতীতের ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর অন্যায়ের শাস্তি এই রাষ্ট্র দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অপরাধিরা উৎসাহিত হয়েছে।
অতীতের কিছু আলোচিত এবং প্রমাণিত অন্যায়ের দিকে তাকাই —
২০১৮ সালে বরিশালের বানারিপাড়ায় মা-মেয়েকে একসাথে ধর্ষন করে মাথা নেড়ি করে দেয় প্রভাবশালী তুফান, তুফানের একটা বিচার হয়েছে, তবে ফাঁসি হয় নি।
সংরক্ষিত এলাকা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এর ভিতরে তনুকে ধর্ষন করার পর হত্যা করা হয়। কে বা কারা জড়িত — তা কিন্তু গোয়েন্দা বাহিনী ভালো করেই জানে, কিন্তু তনুর ধর্ষনকারী কেউ গ্রেফতার হয় নি।
৩১শে ডিসেম্বর ২০১৮ নোয়াখালীর সুবর্ণচরে দিনের বেলা যুবতি মেয়ের সামনে তার মাকে দল বেঁধে ধর্ষণ করার পর প্রহার করা হয়, ১৭ কোটি মানুষ এর সাক্ষী, ধর্ষক রুহুল আমীনের ফাঁসির দাবি উঠলেও, ফাঁসি কিন্তু হয় নি।
১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাসরঘর সাজিয়ে প্রতিরাতে একজন ছাত্রীকে ধর্ষন করা হতো, এভাবে একশত ধর্ষন করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে মিষ্টি বিতরণ করে উল্লাস করেছিলো ক্ষমতাসীন দলের সোনার ছেলে 'জসিমউদদীন মানিক'। এরও একটা বিচার হয়েছিলো, তবে ফাঁসি হয় নি।
এরকম অসংখ্য অমানবিক অন্যায় যা জানোয়ারকেও হার মানায় — কিন্তু কোনোটিরই শাস্তি এ দেশের মানুষ দেখেনি।
ধর্ষণ বাড়ে কিছু ওয়াজকারীদের নারী বিদ্বেষী ওয়াজ বাড়ে। সৃষ্টি হয় নারীর প্রতি বিদ্বেষী এক শ্রেণির মানুষ। সমাজে নেশা আর পর্ন মানুষকে অমানুষ, বিকৃত এক জীবে পরিণত করছে। মেরামত করতে হবে মানুষের মাথার। পচন মানুষের মাথায়, চিন্তায়।
ভাষা ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। লক্ষ কররে দেখা যাবে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিব নির্বিশেষে অশ্লীল বাক্যের প্রয়োগ বেড়েছে সমাজে। আনন্দে, দুঃখে, ক্ষোভে সব ক্ষেত্রেই অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করা হয়। কথায় কথায় বলা হয়, "তোর মায়েরে ... ..."। যাদের মাথায় মাকে ধর্ষণের চিন্তা থাকে, যাদের ভাষায় মাকে ধর্ষণের কথা নির্বিকার ভাবে প্রকাশ পায় — তাদের মাথা মেরামতের প্রয়োজন আগে।
সম্প্রতি নেশার প্রসার ঘটেছে সর্বত্র আশংকাজনক ভাবে। মোবাইলে দেখা পর্ন, দেহে নেশার আক্রমণ নিয়ে একটা পুরুষ যখন কোনো নারীর দিকে তাকায় তখন বোরকা, হাত মোজা, পা মোজা দিয়ে ঢাকা শরীর ভেদ করে তার দৃষ্টি চলে যায় আরো গভীরে। সুতরাং নারীর পোশাক বাদ দিয়ে পুরুষের মাথার চিকিৎসা আগে প্রয়োজন।
পিতার কাছে কন্যা, স্বামীর কাছে স্ত্রী নিরাপদ না হলে আর কোথায় নিরাপদে থাকবে নারী? নারীর নিরাপত্তায়, মানব জাতিকে মানবিক করে গড়ে তুলতে পুরুষকে যে কোনো মূল্যে মানুষ তৈরী করতে হবে। কঠিন, কঠোর শাস্তি ছাড়া, ন্যায় বিচার ছাড়া এই মহামারী বন্ধ হবে না। মৃত্যুদন্ড ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি ধর্ষণ রোধে কার্যকর হবে না। আইনের ফাঁক দিয়ে দোষী যাতে বেড়িয়ে যেতে না পারে সেটা যেমন দেখতে হবে, তেমন নির্দোষ ব্যক্তি যাতে শাস্তি না পায় — সেটাও লক্ষ রাখতে হবে।
সুতরাং নারীর পোশাক বাদ দিয়ে পুরুষের মাথার মেরামতে নজর দিতে হবে। একটি সুস্থ, মানবিক, সুন্দর জাতি গঠনের জন্য মানুষের মাথায় কামনা নয়, প্রেমের আলো জ্বালতে হবে। পুরুষকে মানুষ তৈরি করার পরিকল্পনা নিতে হবে। নারীকে দেখে যে পুরুষের মনে আবেগ জাগ্রত হয় না — সে পুরুষ নয়। আবার এই আবেগ যে পুরুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না — সে মানুষ নয়।
পুরুষ এবং মানুষ দুটোই তৈরি করতে হবে মানব সভ্যতার স্বার্থেই।
লেখিকা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম. এস. এস, তিন দশকেরও বেশি তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা। ২০০০ সালে শিশু অধিকারের ওপর গল্প লিখে লাভ করেন সুনীতি অ্যাওয়ার্ড। ২০১২ সালে ঢাকা জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। 'উজান স্রোতের নদী' গ্রন্থের রচয়িতা, ঢাকার 'খেয়ালী নাট্য গোষ্ঠী'র সাবেক সহ-সভাপতি, বর্তমানে দৈনিক 'যায়যায়দিন' পত্রিকার নিয়মিত কলামিস্ট।