মানবসভ্যতার প্রথম আলো থেকে পাখি আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিবেশী। এই প্রতিবেশী বড়ো উপকারী — তা সে ফুলের পরাগমিলন ঘটানো হোক অথবা পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করে 'ন্যাচারাল পেস্ট কন্ট্রোলার'-এর যাবতীয় দায়িত্ব নিঃশব্দে হাজার হাজার বছর ধরে পালন করে চলেছে।
অতি সম্প্রতি এমন বন্ধুর হালহকিকত জানতে ভারতে প্রথম নিয়মমাফিক পক্ষীগণনা সহ বিশদে সমীক্ষা করেন কিংবদন্তি পক্ষীবিদ সেলিম আলি। তাঁর উদ্যোগই পরবর্তীকালে ভারতে পাখিবিজ্ঞান (ornithology)-এর ভিত্তি গড়ে দেয়। সেই উদ্যোগের সাম্প্রতিকতম প্রয়োগ দেখা গিয়েছে আসামের কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান-এর তৃণভূমিতে বসবাসকারী পাখিদের কেন্দ্র করে। কেবল কাজিরাঙা নয় — এই জাতীয় সমীক্ষা সারা বিশ্বের প্রায় সব দেশেই হয়। এর মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলো বার্সেলোনা সুপারকম্পিউটিং ইনস্টিটিউট-এর আমাজন বনভূমির পক্ষী সমীক্ষা — যেখানে প্রায় সাত দশকের তথ্যভান্ডার ও আনুষঙ্গিক যাবতীয় বিষয় উঠে এসেছে।
এক এক করে সে সব আলোচনায় আসব, তার আগে এখন ফিরে আসা যাক আসামের কাজিরাঙার তৃণভূমিতে। চলতি বছরের ১৮ মার্চ থেকে ২৫ মে অবধি আয়োজিত এই সমীক্ষায় উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিপদ-সংকেত। ১১৭৪ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত এই জাতীয় উদ্যানে একসাথে জলাভূমি, তৃণভূমি আর জঙ্গল দেখা যায় — যার ফলে এই এলাকার জৈব বৈচিত্র্যে পাখিদের অবদান নিতান্ত কম নয় — প্রায় ৪৩ প্রজাতি।
দু’মাস ব্যাপী এই কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে প্রথমবারের মতো ব্যবহার হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর পরোক্ষ শব্দ-রেকর্ডকারী যন্ত্র, যাতে পাখিরা অসুবিধা অনুভব না করে। গাছের কোটরে লুকিয়ে রাখা এই যন্ত্রগুলি পাখির গান সমেত দৈনন্দিন সকল প্রকার শব্দ রেকর্ড করেছে এবং একই সঙ্গে সেই শব্দগুলির গঠনশৈলী বিশ্লেষণ করে পাখির প্রজাতি নির্ণয় অবধি করেছে — যা এক কথায় অনবদ্য। কেবলমাত্র যন্ত্রনির্ভর তথ্য নয়, পাশাপাশি যে সকল গবেষক দু'মাস ধরে কঠিন পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের খাতা–পেনের আঁচড়ে উঠে এসেছে পক্ষীযাপনের বহুমুখী বিপন্নতা।
পাখিদের জন্য প্রকৃতির বরাদ্দ 'জল–জঙ্গল–জমিন' ক্রমশ কমে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের দৌলতে বদলে যাচ্ছে খাদ্য–শৃঙ্খল। কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক ডেকে আনছে অশনি–সংকেত। বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায়, নিত্যনতুন ভাইরাস ও ফাঙ্গাল রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১০ শতাংশ পাখির মৃত্যু হচ্ছে — ভারত থেকে আমাজন পর্যন্ত।
আমাজন — যা পৃথিবীর 'ফুসফুস' নামে পরিচিত — সেখানেও বিগত সাত দশকে (১৯৫০–২০২০) বিশেষ কিছু প্রজাতির পাখির সংখ্যা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এই বিষয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন উপরোক্ত ইনস্টিটিউটের ম্যাক্স মিলিয়ান কোটজ ও তাঁর দলবল। তাঁরা Living Planet Database ব্যবহার করে দেখেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও শিল্পবিপ্লব–পরবর্তী মানুষের কার্যকলাপের কারণে পাখিদের সংখ্যা ভয়াবহভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২১° থেকে ৪৩° অক্ষাংশ মধ্যবর্তী অঞ্চল পাখিদের জন্য সর্বাধিক বিপদজনক বলে চিহ্নিত — এই এলাকা জুড়েই বিপুল সংখ্যক পাখির বাসস্থান সংকটে, কমে আসছে খাবার ও প্রজননক্ষেত্র।
পরিস্থিতির এই জটিল আবর্তে পাখিদের জন্য আন্তর্জাতিক স্তর থেকে ব্যক্তিগত স্তর অবধি সকলেরই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রথমেই আমাজন, হিমালয়, কঙ্গো অববাহিকা, সুন্দরবন-সহ যেসব প্রাকৃতিক এলাকা একাধিক দেশের মধ্যে বিস্তৃত, তাঁদের নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে পাখিদের বসবাসের উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত অনেক অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য বাতিল করতে হবে।
বাড়তে থাকা উষ্ণতা পাখিদের জন্য মারাত্মক। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে খাবারের খোঁজে পাখিদের বেশি সময় রোদে কাটাতে হয়, তাই নির্দিষ্ট জায়গায় জল ও খাদ্যের ব্যবস্থা করলে অবশ্যই তাদের কষ্ট লাঘব হবে। গাছপালা বা সরীসৃপের মতোই পাখিরাও আমাদের সভ্যতার প্রাণধারণের অন্যতম স্তম্ভ। সেই স্তম্ভে ফাটল দেখা দিলে সামগ্রিক পরিবেশে তার প্রভাব পড়বে — তাই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এই সমস্যাগুলির সমাধান খোঁজা আমাদের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার অন্যতম শর্ত।