"স্থূল নয়, সূক্ষ্ম শরীরই শক্তিশালী, ক্ষমতাবান।" — কথাটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মানুষের মেনে নিতে কষ্ট হতে পারে। অথচ ভারতীয়রা, বলা ভালো হিন্দুরা, জীবনে মোক্ষ লাভের আশায় সাধ্য অনুসারেই ভগবানের আরাধনা করেন, কিংবা ভগবান লাভের আশায় ছুটে বেড়ান শূন্য থেকে মহাশূন্যের দিকে।
হিন্দু শাস্ত্র বা পুরাণে উল্লেখ রয়েছে — "অহং ব্রহ্ম, দ্বিতীয় নাস্তি, নেহ নেনস্তি কিঞ্চন।" অর্থাৎ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে একটাই ব্রহ্ম। তিনিই সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা এবং পালনকর্তা। তাঁর দ্বিতীয় বলে কিছুই নেই এই মহাবিশ্বে। আবার বলা হয়েছে — সেই সর্বশক্তিমান ব্রহ্মের কোনও আকার নেই, তিনি নিরাকার ব্রহ্ম। সুতরাং এই পরম ব্রহ্ম আসলে এক অদৃশ্য শূন্যতা। তাই ধর্মবিশ্বাসীরা নিরন্তর শূন্য থেকে মহাশূন্যের দিকে ছুটে চলেছেন।
মানুষ যেহেতু মরণশীল, অর্থাৎ নশ্বর, তাই এই জরাব্যাধিগ্রস্ত শরীর নিয়ে অহংকার করাটাই মায়া, মোহ ও মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়।
মানুষের তিনটি দেহ
হিন্দু দর্শনে বলা হয়েছে — মানুষ তিনটি দেহ নিয়ে গঠিত:
(১) ভৌত দেহ,
(২) সূক্ষ্ম বা জ্যোতিষ দেহ,
(৩) কার্যকারণ বা কর্মিক দেহ।
প্রতিটি দেহই বিভিন্ন ঘনত্বের একটি শক্তিক্ষেত্র যা নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে কম্পিত হয়।
ভৌত দেহ
দেহের মধ্যে সবচেয়ে স্থূল বা ঘন হল ভৌত দেহ — যা ভৌত জগতের সঙ্গে সংযুক্ত। এটি আমাদের নশ্বর মানবদেহ, যা পাঁচটি ইন্দ্রিয় ও পাঁচটি কর্মঅঙ্গ নিয়ে গঠিত এবং পাঁচটি উপাদান দ্বারা নির্মিত।
ভৌত দেহের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন। খাদ্য শরীরকে সেই পাঁচটি উপাদান সরবরাহ করে, যার দ্বারা শরীর নিজেকে তৈরি ও পুনর্নির্মাণ করে। বাত, পিত্ত ও কফ — এই তিনটি জৈবিক শক্তি দেহের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি দুটি উপাদান আকাশ ও ভূমি — যা পরমা প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে থাকে।
এই ভৌত দেহের তিনটি দোষ আসলে পাঁচটি উপাদান থেকে উদ্ভূত ভৌত শক্তি।
সূক্ষ্ম বা জ্যোতিষ দেহ
সূক্ষ্ম বা জ্যোতিষ দেহ হলো ভৌত দেহের শক্তিমান প্রতিরূপ, যা সূক্ষ্ম জগতে তার ছায়া প্রতিফলিত করে। এটি শক্তি ও চেতনার আধার — এক গভীর অন্তর্জাগতিক ভাণ্ডার।
এই দেহও ভৌত দেহের মতো একই উপাদান নিয়ে গঠিত, তবে তা অনেক কম ঘন এবং কঠিন নয়। সূক্ষ্ম দেহকে বলা হয় "অর্ধবস্তু" বা মন-দেহের মধ্যবর্তী সত্তা, যা পুরোপুরি ভৌত বা পুরোপুরি আধ্যাত্মিক নয়।
এটি মন, বুদ্ধি ও অহংকারের সমন্বয়ে গঠিত এবং ভারতীয় দর্শন, যোগ, তন্ত্র ও বৌদ্ধধর্মে এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। একে বলা হয় "অতীন্দ্রিয়" বা "লিঙ্গ-শরীর"। সূক্ষ্ম দেহ স্থূল দেহের তুলনায় অনেক সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী, যা মানুষের চেতনা ও অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। গীতায় এই ধারণা আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সূক্ষ্ম দেহের উপাদান
▪ অহংকার
▪ মন
▪ বুদ্ধি
▪ স্মৃতি ও সচেতনতা
▪ পাঁচটি ইন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, ত্বক)
▪ পাঁচটি কর্মঅঙ্গ (হাত, পা, মুখ, মলদ্বার, জননাঙ্গ)
▪ পাঁচটি প্রাণবায়ু বা প্রাণশক্তি
সূক্ষ্ম দেহের কাজ ও গুরুত্ব
▪ শারীরিক নিয়ন্ত্রণ — সূক্ষ্ম দেহ স্থূল দেহকে নিয়ন্ত্রণ করে।
▪ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা — সূক্ষ্ম দেহের মাধ্যমে জীবনের সূক্ষ্ম দিক উপলব্ধি করা যায় এবং আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব।
▪ অনুভূতি ও চেতনা — এটি মন ও আবেগ ধারণ করে এবং মানসিক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে।
▪ মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা — ভৌত দেহ ও চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক সত্তার মধ্যে সেতু রচনা করে।
যোগশাস্ত্র অনুসারে মানুষের তিনটি দেহ — স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ দেহ — একে অপরের পরিপূরক। পাশ্চাত্য দর্শনের “mind–body” ধারণার সঙ্গে সূক্ষ্ম শরীরের তুলনা করা হলেও এটি অনেক বেশি আধ্যাত্মিক গভীরতাসম্পন্ন।
কারণ বা কর্মিক দেহ
কারণ বা কর্মিক দেহ হলো মানুষের সত্তার মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্ম কম্পন — যাকে আধ্যাত্মিক দেহ বলা হয়। এটি মানুষের প্রকৃতির বিস্তৃততম অংশ। সূক্ষ্ম দেহের বিপরীতে, এটি ভৌত দেহের কোনও প্রতিরূপ নয়; বরং এটি এক ধরনের বীজশক্তি, যা সূক্ষ্ম ও ভৌত দেহকে অঙ্কুরিত করে।
অর্থাৎ, এটি শরীর নয়, বরং এক আদিম শক্তি — যা আত্মার গভীরে নিহিত।
স্থূল দেহ বনাম সূক্ষ্ম দেহ
স্থূল দেহ (Gross Body) — এটি আমাদের পরিচিত বস্তুগত, নশ্বর দেহ, যা খাওয়া, শ্বাস নেওয়া ও নড়াচড়ার মাধ্যমে বেঁচে থাকে। এটি পাঁচটি ইন্দ্রিয় অঙ্গ ও পাঁচটি উপাদান দ্বারা গঠিত।
সূক্ষ্ম দেহ (Subtle Body) — এটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক বা সম্পূর্ণ বস্তুগত নয়; এটি বস্তু ও আত্মার মধ্যবর্তী স্তর। একে বলা হয় "অতীন্দ্রিয়" দেহ, যা মন, আবেগ ও চেতনার সঙ্গে যুক্ত। সূক্ষ্ম দেহ বস্তুজগতের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত এবং সত্তার গভীরে থাকা অপরিহার্য প্রকৃতির অ্যাক্সেস দেয়।
যোগ ও আধ্যাত্মিকতা — কুণ্ডলিনী যোগ বা অন্য আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে সূক্ষ্ম শরীরকে উপলব্ধি করা যায় এবং এর শক্তির উৎসে পৌঁছনো সম্ভব।
সত্তা ও চেতনা — সূক্ষ্ম শরীরই "আমি আছি" এই চেতনার অনুভূতির জন্ম দেয়।
উপসংহার
সংক্ষেপে, "স্থূল নয়, শক্তিশালী সূক্ষ্ম শরীর" বলতে সেই সত্তাকে বোঝানো হয় যা বস্তুজগতের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত, কিন্তু শক্তি ও চেতনার গভীর স্তরে বিদ্যমান। এটি মানুষের আধ্যাত্মিক ও মানসিক শক্তিকে প্রকাশ করে — এক অনন্ত বিশ্বাস, অনুভূতি ও আত্মবোধের প্রতীক।
লেখক পঞ্চগব্য আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ও সাংবাদিক। সাপ্তাহিক দুর্নিবার বাংলা এবং পাক্ষিক সোনারপুর বার্তা পত্রিকার এডিটর-ইন-চিফ। প্রায় দুই দশক ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত; দৈনিক স্টেটসম্যান, সংবাদ প্রতিদিন, বর্তমান, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, সংবাদ, প্রাত্যহিক খবর, একদিন, যুগশঙ্খ ও স্বভূমি-সহ একাধিক দৈনিক, সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক সংবাদপত্রে নিয়মিত লেখালেখি করেন।