Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম — উপমহাদেশে ধর্ম, দর্শন ও সমাজবদলের দুই ধারা
বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম — উপমহাদেশে ধর্ম, দর্শন ও সমাজবদলের দুই ধারা

ভারতীয় উপমহাদেশে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে যে দু’টি শাখা-প্রবাহ ধর্ম, দার্শনিক আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কারের রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল — বৌদ্ধ ও জৈন — তারা কেবল ধর্মজীবন নয়, রাজনীতি, সমাজনীতি, শিল্পকলা ও অর্থনীতির নানা স্তরে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। এই প্রবন্ধে দুই ধর্মের জন্ম-ঐতিহ্য, প্রসার, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, নান্দনিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব, এবং ক্রমে সংকোচনের কারণসমূহকে ইতিহাস-ভিত্তিকভাবে সংকলিত করা হল।

আত্মপ্রকাশ: গঙ্গা-মহাজনপদের বৌদ্ধ–জৈন জাগরণ
শ্রামণিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মহাজনপদ যুগের (মগধ—বৈশালি—কোশল প্রভৃতি) ধর্ম-দার্শনিক অস্থিরতার পটভূমিতে গৌতম বুদ্ধ (খ্রি.পূ. ৫ম শতক) ও মহাবীর (খ্রি.পূ. ৬ষ্ঠ — ৫ম শতক) অহিংসা, অনাসক্তি ও আচার-যজ্ঞ-কেন্দ্রিক বৈদিক ধ্যানধারণার বিকল্প হিসেবে বৌদ্ধ ধর্ম (চতুরার্যসত্য, অষ্টাঙ্গিক মার্গ) ও জৈন ধর্ম (ত্রিরত্ন: সম্যক দর্শন–জ্ঞান–চারিত্র; কঠোর অহিংসা) প্রচার করেন। বৌদ্ধধর্মের জন্মভূমি মগধ ও আশপাশের অঞ্চল; প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে বৌদ্ধধর্মের উদয় ও প্রাথমিক বিস্তার এ অঞ্চলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত—এমন একটি সামগ্রিক চিত্র ইতিহাস-গ্রন্থে সুপ্রতিষ্ঠিত।

বিস্তার: রাজ-সমর্থন, বণিকপুঁজি ও সঙ্ঘ-বিহার
মৌর্য সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মকে রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষকতায় আনেন; ধাম্মনীতি, স্তম্ভলিপি ও ধর্ম-মহাসমিতির মাধ্যমে সঙ্ঘকে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি দেন এবং অভ্যন্তরীণ–বহিরাগত (শ্রীলঙ্কা, মধ্য–পশ্চিম এশিয়া) প্রচার চালান। পূর্ব উপকূল, দাক্ষিণাত্য ও উত্তর-পশ্চিমে রাজা, শহুরে গিল্ড, কারিগর ও বণিকেরা দান–অর্থায়নে বিহার–চৈত্য–স্তূপ স্থাপন করেন; 'পৃষ্ঠপোষকতা' ছিল এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা—রাজনীতি ও ধর্মকার্যের জোট, যা পূর্বতট ও গঙ্গাতটে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত কার্যকর ছিল।

জৈনধর্মও প্রারম্ভ থেকেই নাগরিক কুলীন-বণিক সম্প্রদায়ের শক্ত সমর্থন পায়। কুষাণ যুগে মথুরা ছিল জৈনদের কেন্দ্র; গুপ্তোত্তর যুগে কর্ণাটক–গুজরাট–রাজস্থানে তা দৃঢ় হয়। দক্ষিণ ভারতে চালুক্য, রাষ্ট্রীকূট ও গঙ্গ প্রভৃতি রাজবংশ জৈন তপোবন—পাঠশালা—বসতিস্থানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন — রাষ্ট্রীকূট যুগে দাক্ষিণাত্যে জনসংখ্যার বড় অংশই জৈন বলে আঞ্চলিক সূত্রে উল্লেখ আছে।

সামাজিক প্রভাব: বর্ণশৃঙ্খলার প্রশ্ন, অহিংসা, নারী ও জনধর্ম
দুই ধর্মই আচার—যজ্ঞ—ব্রাহ্মণ্য বর্ণব্যবস্থার কঠোরতাকে আঘাত করে 'শীল—সমতা—সহজ নীতির' এক সামাজিক নৈতিকতা গড়ে তোলে। বৌদ্ধ সঙ্ঘে উপাসক-উপাসিকা ও ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের নেটওয়ার্ক নতুন 'জনধর্ম' গড়ে দেয় — শহর–হাট–সড়ক–বন্দর-সংলগ্ন বিহারগুলো শিক্ষা, চিকিৎসা, আশ্রয় ও বিতর্কের কেন্দ্র হয়। জৈনধর্মের কঠোর অহিংসা, অনাহার-বিলোপ (অনেক ক্ষেত্রে শাকাহার, বৃত্তি-নৈতিকতা) বণিকপেশাকে নৈতিক আভা দেয়; বৃত্তিগত শৃঙ্খলায় সততা–মিতব্যয়–দানসংস্কৃতির প্রচলন ঘটে।

নন্দন ও স্থাপত্য: স্তূপ–চৈত্য–বিহার; মারু-গুজররা থেকে অজন্তা–এলোরা
বৌদ্ধ শিল্পে স্তূপ–চৈত্য–বিহার ছিল মূল রূপ; ধর্মচক্র, বোধিবৃক্ষ, বুদ্ধপদচিহ্ন প্রাথমিক প্রতীক, পরে গান্ধার–মথুরা স্কুলে প্রথম মানবমূর্তি-বুদ্ধের উদ্ভব ঘটে। অজন্তার গুহাচিত্র, সাঁচীর স্তূপ, নাগার্জুনকোণ্ড–আমরাবতীর রেলিং রিলিফ এবং এলোরা–কার্লার চৈত্যগৃহ এই ধারার অসামান্য নিদর্শন।

জৈন শিল্পে মারু-গুর্জরা (সোলাঙ্কি) শৈলীতে দিলওয়াড়া (মাউন্ট আবু)–শত্রুঞ্জয় (পালিতানা)–গিরনার–শিখরজি—অতুলনীয় মার্বেল খোদাই, মণ্ডপ, গর্ভগৃহ, জালিকাজের সূক্ষ্মতায় বিশ্বখ্যাত। এই তীর্থক্ষেত্রসমূহ জৈন তীর্থযাত্রা–বাণিজ্য–দানের অর্থনৈতিক ভূগোলও রচনা করে।

অর্থনৈতিক–শিক্ষাগত প্রভাব: পথ-ব্যবসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
সড়ক–নদীপথ–বন্দরনির্ভর বণিকসমাজের সঙ্গে দুই ধর্মের লেনদেন পারস্পরিক। বিহার–বসতিগুলো (উদাহরণ নালন্দা, বিক্রমশিলা) আঞ্চলিক অর্থনীতিতে জমি-দান, শুল্ক-ছাড়, মুদ্রা–দ্রব্যভিত্তিক দান প্রথা সৃষ্টি করে; 'বিশ্ববিদ্যালয়' ধাঁচের আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থা, গ্রন্থাগার, আন্তঃদেশীয় ছাত্র-শিক্ষকের চলাচল — সবই ধর্মীয়-শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক সহাবস্থানের নিদর্শন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: পৃষ্ঠপোষকতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংহতি
অশোকোত্তর যুগে কুষাণ, শুঙ–কাণ্ব, সাতকর্ণী, গুপ্ত, পাল–সেন প্রভৃতি রাজবংশ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় সহিষ্ণুতা–সমর্থন–আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার রাজনীতি চালিয়েছে। পাল যুগে (বাংলা–বিহার) বৌদ্ধতন্ত্র ও মহান বিশ্ববিদ্যালয়-জাল জোরদার হয়; দক্ষিণ–পশ্চিম ভারতে জৈনধর্ম রাজপৃষ্ঠপোষকতায় সমৃদ্ধ। তবে রাজনীতির দোলাচলে প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব রাজবংশের আর্থিক শক্তি ও নীতির উপর নির্ভরশীল ছিল — পৃষ্ঠপোষণ হ্রাস মানেই বিহার–মঠের ভাঁটি।

প্রসার: ভারতভূমি থেকে এশিয়া
বৌদ্ধধর্ম শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে—বণিক-রুট, দূতাবাস, তীর্থযাত্রা ও অনুবাদ-পরম্পরা তাকে আন্তঃসীমান্ত ধর্মে পরিণত করে। ভারতের শিল্প–চিত্রকলা ও মতাদর্শ সেখানকার আঞ্চলিক শৈলীকে সমৃদ্ধ করে; বৌদ্ধ শিল্প–স্থাপত্যের উপর আন্তর্জাতিক হেরিটেজ নথিতেও এই আন্তঃআঞ্চলিক সংযোগের গুরুত্ব আলোচিত।

জৈনধর্ম ভারতের বাইরে নগণ্য বিস্তার পেলেও অভ্যন্তরীণভাবে গুজরাট–রাজস্থান–কর্ণাটকে ঘনীভূত ধর্ম–সমাজ–অর্থনীতির এক বলয় রচনা করে, যা আজও তীর্থ–ট্রাস্ট, শিক্ষা–মাঠি, দাতব্য–ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কে শক্তিশালী।

জৈন ধর্মের প্রসার ঘটেছিল মূলত মগধ, বিহার ও পশ্চিম ভারতে। গঙ্গা উপত্যকায় কৃষিজীবী শ্রেণি ও শহুরে ব্যবসায়ীরা জৈন ধর্মকে গ্রহণ করে। জৈন দর্শনের মূল আকর্ষণ ছিল অহিংসা ও তপস্যার মাধ্যমে মুক্তিলাভের ধারণা। মহাবীর প্রচার করেছিলেন যে মোক্ষ লাভের জন্য কঠোর সন্ন্যাস ও দেহনিগ্রহ অপরিহার্য। এ কারণে বহু গৃহী মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে ন্যূনতম অনুব্রত অনুসরণ করে জৈন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

তবে জৈন ধর্মের এই শিক্ষা সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। এর একটি প্রধান কারণ ছিল এর কঠোর জীবনবিধি। গৃহী অনুব্রত মেনে চলা তুলনামূলক সহজ হলেও পূর্ণাঙ্গ জৈন সন্ন্যাসে প্রবেশ করা ছিল প্রায় অসম্ভব রকমের কঠিন। ক্ষুদ্রতম জীবকেও হত্যা করা পাপ বলে গণ্য হওয়ায় কৃষিকাজ, পশুপালন বা সামরিক পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের পক্ষে জৈন নীতি অনুসরণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সমাজের এক বড় অংশ জৈন ধর্ম গ্রহণ থেকে বিরত থাকে।

জৈন ধর্ম তার দার্শনিক ভিত্তিতে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও সামাজিক জীবনে এর প্রভাব সীমিত ছিল। ব্রাহ্মণ্যধর্ম তার আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ ও দেবতার প্রতি ভক্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মানসিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছিল। অপরদিকে, জৈন ধর্ম ছিল অনাড়ম্বর ও আধ্যাত্মিক দিকেই বেশি মনোযোগী। তাই সাধারণ মানুষ, বিশেষত গ্রামীণ জনগণ, জৈন ধর্মকে নিজেদের জীবনের সঙ্গে একাত্ম করতে পারেননি।

অন্যদিকে বৌদ্ধ ধর্ম জৈন ধর্মের তুলনায় অনেক বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এর একটি বড় কারণ ছিল বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যপন্থা। গৌতম বুদ্ধ তপস্যার চরমপন্থা বা ভোগের চরমপন্থা কোনোটিই গ্রহণ করেননি। তিনি মধ্যমার্গ প্রচার করেছিলেন যা সাধারণ মানুষের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। তাছাড়া বৌদ্ধ সংঘ ছিল সংগঠিত, প্রচারক ভিক্ষুরা ভ্রমণ করে ধর্ম প্রচার করতেন এবং রাজশক্তির আশ্রয়ও তারা লাভ করেছিলেন। মগধের সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে তা সর্বভারতে ও এমনকি ভারতের বাইরেও বিস্তার করেছিলেন। জৈন ধর্ম কখনো সেই মাত্রার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি।

ভারতের বাইরে জৈন ধর্ম বিস্তার লাভ করতে না পারার কারণও এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নিহিত। প্রথমত, জৈন ধর্মের প্রচারকরা সংখ্যায় কম ছিলেন এবং তারা মূলত ভারতের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিলেন। কঠোর সন্ন্যাসজীবনের নিয়ম বিদেশে ভ্রমণ ও প্রচারকে কঠিন করে তুলেছিল। দ্বিতীয়ত, জৈন ধর্মে দেবতার পূজার গুরুত্ব না থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে তা আবেগের পরিসরে প্রবেশ করতে পারেনি। বিদেশি সমাজে যেখানে দেব-দেবীর আরাধনা, আচার-অনুষ্ঠান বা সমষ্টিগত ধর্মীয় অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেখানে জৈন ধর্ম তার বিমূর্ত মুক্তির দর্শন দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়।

আরও একটি কারণ হলো বাণিজ্যিক সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সিল্ক রুট ধরে চীন, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গিয়ে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। কিন্তু জৈন সন্ন্যাসীরা কঠোর নিয়ম মেনে ভ্রমণ করতেন এবং জলযাত্রা এড়িয়ে চলতেন। ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে তারা কার্যত পৌঁছাতে পারেননি। জৈন ধর্মের বিস্তার মূলত ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছিল।

তবুও জৈন ধর্মের অবদান অস্বীকার করা যায় না। ভারতীয় শিল্প, স্থাপত্য ও সাহিত্যে জৈন প্রভাব আজও স্পষ্ট। দিল্লির কাছাকাছি খাজুরাহো ও মাউন্ট আবুর জৈন মন্দিরসমূহ অসামান্য শিল্পকীর্তি। জৈন সাহিত্য প্রাকৃত ভাষার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অর্থনৈতিক জীবনে জৈন সম্প্রদায় আজও ব্যবসা-বাণিজ্যে তাদের সৎ, কঠোর নীতিবদ্ধতা ও সমাজসেবামূলক কাজের জন্য সুপরিচিত।

সুতরাং বলা যায়, জৈন ধর্ম ভারতের ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যে এক অনন্য সংযোজন। তবে তার কঠোর জীবনপদ্ধতি, আবেগবর্জিত দর্শন ও সীমিত প্রচারক কার্যক্রমের জন্য এটি সর্বসাধারণের ধর্ম হয়ে উঠতে পারেনি। আর এ কারণেই ভারতের বাইরে জৈন ধর্ম প্রসার লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তা সত্ত্বেও জৈন ধর্ম অহিংসা, সত্য ও অপরিগ্রহের মাধ্যমে মানব সভ্যতাকে যে মূল্যবোধ দিয়েছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

সংকোচন: কারণ ও বিতর্ক
বৌদ্ধধর্মের ভারতে সংকোচনের কারণ একরৈখিক নয়; একে 'বহুকারণগত' বলে আখ্যায়িত করা হয় —
(১) রাজপৃষ্ঠপোষণ হ্রাস—গুপ্তোত্তর বহু অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্য পুনরুত্থান ও মন্দির-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অনেক জায়গায় দান–ভূমি টেনে নেয়
(২) সঙ্ঘের অলসতা/প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা—জনজীবন থেকে বিহার-কেন্দ্রিক দূরত্ব
(৩) তান্ত্রিকীকরণে আভ্যন্তরীণ দ্বিধা
(৪) উত্তর–পূর্ব ও পূর্ব ভারতে ১২শ শতক নাগাদ আক্রমণ–লুণ্ঠনে বিহার–বিশ্ববিদ্যালয় নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়া — এসবকে ইতিহাসবিদেরা আলোচনা করেছেন। নালন্দা–উদয়ন্তপুর প্রভৃতি কেন্দ্র ধ্বংসের পরিসর ও সময় নিয়ে নতুন গবেষণা সতর্কতা দেখাতে বলে — 'এক-ঘটনায় সম্পূর্ণ ধ্বংস' — ধারণাটি সরলীকৃত হতে পারে; বরং দীর্ঘমেয়াদি অবক্ষয় ও একাধিক আক্রমণের ধারা বিবেচ্য।

জৈনধর্মের ক্ষেত্রেও মধ্যযুগোত্তর সময়ে উত্তর–মধ্য ভারতে সংকোচন দেখা যায়; মুসলিম শাসনামলে নীতি–ভূমি–দানব্যবস্থার রূপান্তর, সমাজ–অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস এবং ভৌগোলিক সঙ্কোচনের ফলে গুজরাট–রাজস্থান–দক্ষিণে কেন্দ্রীভূত জৈন–সঙ্ঘ টিকে থাকে। তবু রাষ্ট্রীকূট–চালুক্য–হোয়সাল প্রভৃতি দক্ষিণ–পশ্চিমের পৃষ্ঠপোষকতায় জৈন সংস্কৃতি আরও কয়েক শতক সমৃদ্ধ থাকে এবং তীর্থ–স্থাপত্যে চূড়ান্ত উত্কর্ষে পৌঁছায়।

শিল্প–সাহিত্য–চিন্তা: দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার
বৌদ্ধধর্ম ভারতীয় ভাবনা–ভাষায় "করুণা–মৈত্রী–মধ্যমার্গ"কে জনপ্রিয় করে, যুক্তিবাদী তর্ক (অভিধর্ম, যোগাচার, মধ্য্যমক) ও প্রাসঙ্গিক নীতিশাস্ত্রে প্রভাব ফেলে; সংস্কৃত–পালি–প্রাকৃত সাহিত্য, নাট্য–চিত্র–সংগীতে তার উপস্থিতি সুস্পষ্ট। জৈন সাহিত্য (প্রাকৃত–অর্ধমাগধী–শৌরসেনী), আপ্তমীমাংসা থেকে আরম্ভ করে নীতিশাস্ত্র–কথাসাহিত্যে অনন্য; অহিংসা–অপরিগ্রহ–সত্যবাদ তাদের নাগরিক নৈতিকতার ভিত্তি। এই তাত্ত্বিক ঐতিহ্যের দৃশ্যমান প্রতীক আজও অজন্তা–এলোরা–সাঁচী–সারণাথ–শ্রবণবেলগোলা–পালিতানা–দিলওয়াড়া প্রভৃতি ঐতিহ্যস্থানে হাজির। অর্থনীতি–সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের রূপরেখা

বৌদ্ধ বিহার-নেটওয়ার্ক একধরনের 'শিক্ষা–আশ্রম অর্থনীতি' গড়ে তোলে—জমিদান, ভিক্ষাত্র, বণিক-সঙ্ঘের পৃষ্ঠপোষকতা, তীর্থ–পর্যটন ও গ্রন্থালয়-নির্ভর আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা; যা স্থানীয় বাজার, কারিগর, স্থপতি, চিত্রকর, শিল্পীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। জৈন তীর্থ–ট্রাস্ট ও গিল্ডভিত্তিক অর্থনীতি দাতব্যভিত্তিক বিদ্যালয়–ধর্মশালা–অন্নক্ষত্র স্থাপন করে; নির্মাণশিল্পে মার্বেল–পাথর–খোদাই–কাঠের কাজের বাজার গড়ে তোলে — একে ‘ধর্ম–বাজার–শিল্প’ সহাবস্থানের সুশৃঙ্খল উদাহরণ বলা যায়।

আধুনিককালে পুনরাবিষ্কার ও পুনরুজ্জীবন
ঔপনিবেশিক উনিশ–বিশ শতকে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা–টেক্সট সম্পাদনা–ধ্বংসাবশেষ খনন বৌদ্ধ–জৈন ঐতিহ্যকে নতুন করে দৃশ্যমান করে। স্বাধীনোত্তর ভারতে নালন্দা–সাঁচী–সারণাথ–অজন্তাসহ বহু স্থানের সংরক্ষণ ও বিশ্বঐতিহ্য মর্যাদা এই উত্তরাধিকারকে জনপরিসরে ফেরায়। অন্যদিকে, সামাজিক ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে বিশ শতকে ড. বি. আর. আম্বেদকর বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়ে নববৌদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলেন — ভারতীয় গণতন্ত্রে সমতা–করুণার কথোপকথনে বৌদ্ধ নীতির নতুন প্রতিধ্বনি দেখা যায়।

উপসংহার
বৌদ্ধ ও জৈন — দুই ধর্মের জন্ম একটি ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তনের কালে; আচার–যজ্ঞ–বর্ণতন্ত্রের কঠোরতা থেকে নীতিনির্ভর, বোধ–শীল–সমতাভিত্তিক এক জনধর্মের দিকে সরে আসা। তাদের বিস্তার সম্ভব হয়েছিল রাজপৃষ্ঠপোষকতা, বণিকপুঁজি ও আশ্রম–বিহারের নেটওয়ার্কে; শিল্প–স্থাপত্য–চিত্র–সাহিত্যে মৌলিক সৌন্দর্যচেতনা ও রূপভাষা গঠনে তারা অগ্রণী। অর্থনীতিতে তীর্থ–শিক্ষা–দান–নির্মাণের যে সহাবস্থান, সেটি স্থানীয় সমাজকে দীর্ঘকাল প্রাণবন্ত রেখেছে। পরবর্তীকালে রাজনীতির পালাবদল, প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা, প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্ম–সমাজের উত্থান ও বহিরাক্রমণ মিলিয়ে সংকোচন এলেও তাদের উত্তরাধিকার বিলুপ্ত হয়নি—ভারতীয় বৌদ্ধ–জৈন স্মারক, নীতিশাস্ত্র, দাতব্য–শিক্ষা ও শিল্প–আত্মায় সেই ছাপ আজও বহমান।

অতএব, ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম কেবল ধর্মীয় পথ নয় — এরা একই সঙ্গে নৈতিক রাজনীতি, নন্দনচেতনা, এবং সামাজিক–অর্থনৈতিক সংগঠনের এক বিকল্প কল্পনা, যার গুরুত্ব সমকালীন ভারতেও অনস্বীকার্য।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
4.5 13 ভোট
স্টার
guest
15 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top