Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
যে রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় এক হয়ে যায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়
যে রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় এক হয়ে যায় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়

পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার উত্তরাংশে অবস্থিত ছোট্ট শহর চাঁচল। মহানন্দা নদীর কোল ঘেঁষে বিস্তৃত এই অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকে ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র রূপে বিবেচিত হতো। এখানে অবস্থিত চাঁচল রাজবাড়ি ছিল দীর্ঘদিন রাজাদের আবাসস্থল, যাদের শাসন ও পরিচালনায় অঞ্চলটি সুশাসিত ও সমৃদ্ধ ছিল। চাঁচলের রাজাদের বংশপরম্পরা শুরু হয় সপ্তাদশ শতাব্দীর শেষভাগে, প্রধানত রামচন্দ্র রায় চৌধুরী নামক এক শক্তিশালী রাজা দ্বারা, যিনি মালদহসহ আশপাশের অনেক এলাকায় শাসন করতেন। লোকমুখে শোনা, চাঁচলের রাজারা ছিলেন প্রজার আপনজন। তাই প্রজারাও এই রাজপরিবারকে যারপরনাই শ্রদ্ধা করতেন, এর পরবর্তী প্রজন্ম রাজবাড়ির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে রাজা শরৎচন্দ্র রায় চৌধুরী চাঁচল রাজবাড়ির দুর্গাপূজার নিয়মাবলী প্রতিষ্ঠা করেন এবং এক স্থায়ী মন্দির নির্মাণ করেন, যা আজও ওই অঞ্চলের লোকজ ঐতিহ্যের প্রাণবিন্দু হিসেবে দণ্ডায়মান।

চাঁচল রাজবাড়ির দুর্গাপূজাকে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বললে ভুল বলা হয়, ৩৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই উৎসব কেবল রাজবংশের রাজকীয় জীবনধারার অংশরূপে নয়, বরং সারা এলাকার মানুষের জীবনের সামাজিক মেলবন্ধনের প্রতীকী রূপে উন্মীলিত। দশমীর দিন প্রতিমার বিসর্জন বা ভাসান। শহর থেকে গ্রাম, অগণিত মানুষের ভিড়ে, ঢাকের শব্দে ও প্রদীপের আলোর ঝলকে, দেবী চণ্ডীর পাথেয় যেন সম্পূর্ণ হয় অনিন্দ্যসুন্দরতা ও মানবিক একাত্মতায়।

এই প্রসঙ্গের আরেকটি অনন্য দিক হলো বিসর্জনের পথে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের আলোকবর্তিকা হিসেবে লন্ঠন হাতে পালন। এমন দৃশ্য ভারতে বিরল। চাঁচলের আশেপাশের মুসলিম পরিবারগুলি সঙ্গে বসবাস করে শাশ্বত সম্প্রীতির চিত্র হয়ে ওঠে। দশমীর রাতে হাতে লন্ঠন নিয়ে প্রতিমার পথ প্রদর্শনে, যেন জানিয়েই দেন — ঐতিহ্য ও ভক্তি ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে মানবতাকে স্পর্শ করে। এ ঐক্যশীল আচরণ মালদা জেলা তথা পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যে এক মাইলফলক।

এই সম্প্রীতি কেবল তাৎক্ষণিক নয়, মহামারি কিংবা সংকটকালেও মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝের পারস্পরিক বন্ধন মজবুত রাখে। বহুকাল আগে চাঁচল সংলগ্ন একটি গ্রাম সাহুরগাছি বা সাওরগাছিতে ভয়াবহ মহামারির প্রকোপ দেখা যায়, সে অঞ্চলে তখন মুসলিম সম্প্রদায়ের আধিক্য ছিল, ক্রমে এই মহামারি গ্রাস করতে থাকে গ্রামটিকে, এমন সময় মা চণ্ডী, মুসলিম সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিতে স্বপ্নাদেশ দিলেন, ঠিক তারপরই পত্তন ঘটলো চাঁচল রাজবাড়ির এই পূজায় মুসলিম সম্প্রদায়ের লণ্ঠনযাত্রার। এর পর সেই মহামারি উধাও হয়ে গেলো, এবং এই রীতি পালিত হতে থাকলো বছরের পর বছর ধরে, সমসাময়িক ভারতের বহু জায়গায় এমন দৃশ্য বিরল।

দুর্গাপূজার দশমী মধ্যে আরেকটি বিখ্যাত রীতি হল নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো। নীলকণ্ঠ বা Indian Roller পাখি তার উজ্জ্বল নীল ও সবুজ রঙের জন্য পরিচিত। হিন্দু পুরাণ অনুসারে মহাদেবকে 'নীলকণ্ঠ' বলা হয়, কারণ একবার অমৃত লাভের উদ্দেশ্যে দেবতা ও অসুরেরা অমৃত প্রাপ্তি হেতু ক্ষীর সাগর মন্থন করে, সমুদ্র মন্থনে যেমন ঐরাবত, কৌস্তুভমণি ইত্যাদি উঠে এসেছিল, তেমনই কিন্তু শেষে উঠে আসে এক ভয়ংকর বিষ, যার নাম হালাহল বা কালকূট। এই বিষ এতই শক্তিশালী ছিল যে, তার তেজে পুরো সৃষ্টিই ধ্বংস হয়ে যেতে পারত। তখন সমস্ত দেবতা শিবের শরণাপন্ন হন। শিব, করুণারই এক প্রতিমূর্তি, তিনি সমস্ত প্রাণ রক্ষা করার জন্য সেই বিষ নিজেই পান করলেন। বিষ তাঁর গলায় আটকে যায়, এবং গলা নীলবর্ণ ধারণ করে।

ঐতিহাসিক বিশ্বাস, দশমীর দিনে নীলকণ্ঠ পাখি আকাশে উড়ে গিয়ে কৈলাস গিয়েছিলেন দেবী দুর্গার ফিরে আসার খবর মহাদেবকে পৌঁছে দেয়। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে চাঁচল রাজবাড়িতে দীর্ঘদিন প্রকৃত নীলকণ্ঠ পাখি উড়ানোর রীতি ছিল। তবে বর্তমানে বন দপ্তরের নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রকৃত পাখি উড়ানো হয় না, বরং মাটির তৈরি প্রতীকী নীলকণ্ঠ পাখি ব্যবহার হয়।

এই রীতি শুধু চাঁচল রাজবাড়িতে নয়, কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ি, হাওড়ার আন্দুল রাজবাড়ি সহ বিভিন্ন মধ্যবঙ্গে বনেদি বাড়িগুলোতেও দেখা যায়। যদিও প্রকৃত পাখি কম উড়ানো হলেও, প্রতীকী পাখি উড়ানোর রীতি এখনও চলছে, যা বাংলার স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সার্বিকভাবে চাঁচল রাজবাড়ির ভাসান, মানবজীবনের একটা অংশের অনেক কিছু বহন করে, এ উৎসবের মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে শতবর্ষের সাংস্কৃতিক একাত্মতা, ধর্মীয় ভক্তি এবং মানুষের অন্তরের মানবিক স্পন্দন। তাঁর মাধ্যমে চাঁচল রাজবাড়ি আজও বাঙালির হৃদয়ে এক স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে রয়েছে। যদিও এখনকার প্রজন্মে লন্ঠনের জায়গা নিয়েছে কূপি এবং ফোনের ফ্ল্যাশলাইট, তবুও বিশ্বাস তো সতত প্রবাহিত।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
4.4 25 ভোট
স্টার
guest
5 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top