জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন' বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য রচনা। ১৯৩৪ সালে প্রথমবার প্রকাশিত এ কবিতা বাংলা পাঠকের মনে এত গভীর রেখাপাত করেছে যে 'বনলতা সেন' নামটি হয়ে উঠেছে এক ধ্রুপদী রূপক — যা প্রেম, প্রশান্তি ও আশ্রয়ের প্রতীক।
এটি একটি পুরুষধর্মী প্রতীকি কবিতা। সংসারের দায়ভার বহন করতে করতে পুরুষ হয়ে ওঠে ক্লান্ত পথিক। আয়-উপার্জনের জন্য তাকে ছুটতে হয় বহু জায়গায়, করতে হয় অমানুষিক পরিশ্রম। কিন্তু এত পরিশ্রম করেও সে হয়তো সংসারে প্রকৃত মূল্য পায় না। অবুঝ যান্ত্রিক সংসারজীবনে তখন বহু পুরুষ উদাসীন হয়ে পড়ে। সেই ক্লান্তি ও অবহেলা হাজার বছর ধরে পথ হাঁটলেও শেষ হয় না যেন। দায়িত্ব পালনে চিন্তায় সে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
জীবনের নানান ওঠা-পড়া যেন সফেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মত। শক্তিশালী ও কঠিন গর্জনমান ঢেউগুলো যেন পুরুষ জীবনের কঠিন সংগ্রাম, যা তাকে মন ও শরীরে আঘাত করে। সে অনেক দুঃখ পায় এবং হতাশ হয়। একসময়ে সে সংসারের হাল ছেড়ে দিয়ে বাস্তব ও কঠিন জীবনসংগ্রাম থেকে বেরিয়ে দুদণ্ড শান্তির অন্বেষণের আশায় বেরিয়ে পড়ে।
নারী অন্বেষণ পুরুষের প্রকৃতিগামী। সংসারী ক্লান্ত পুরুষ তখন তার চিত্রকল্প ছায়ায় রচিত 'বনলতা সেন'-কে খোঁজ করে। বনলতা সেন পুরুষের কল্পাবিষ্ট প্রেম। তা অনেক সময় বাস্তবধর্মীও হয়ে ওঠে, যা সমাজে 'পরকীয়া' বলে প্রচলিত। যেহেতু তা সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়, তাই সে অন্ধকারে — অর্থাৎ গোপনে, চুপি চুপি সেই কার্যটি কখনও বা সম্পন্ন করে। ভালোবাসার কাঙালিপনায় ও অন্ধকারের মাদকতায় বনলতা সেনকে সে দুদণ্ড শান্তির সন্ধানে ভালোবেসে ফেলে। বনলতা সেনের আকর্ষণীয়, অন্ধকারাচ্ছন্ন বিদিশার নিশাকেশরাশি আর শ্রাবস্তীর কারুকার্যময় মুখমণ্ডল তাকে প্রেমাবিষ্ট ও উত্তাল আবেগে মোহিত করে তোলে।
বহু বছরের সাংসারিক জীবনে স্ত্রী তখন কল্পনাপ্রবণ পুরুষের অভ্যাসে দাঁড়ায়। সে তার কল্পনার নারীর খোঁজ পায় বনলতা সেনের প্রেমে-কল্পে, যার অবস্থান সংসারের মত কঠিন বাস্তবে নয় বরং অলীক স্থান দারুচিনি দ্বীপে। তার সবুজ প্রেম তখন বিম্বিসার ও অশোকের (চণ্ডাশোক) ধূসর জগৎ (রক্তাক্ত কলিঙ্গ যুদ্ধের শোকময় ভয়াবহতা) ছাপিয়ে অলীক দারুচিনি দ্বীপে অবস্থান করে। অন্ধকারের আবেশে বনলতা সেনের সাথে পুরুষটির একটি অনিন্দ্য সুন্দর গল্পগাথা তৈরি হয়, যা নিবিড় অন্ধকারে জোনাকির আলোর মতো ঝিলমিল করে।
আসলে যখন সংসারের সব রং নিভে যায় — অর্থাৎ সংসারের আনন্দযজ্ঞ বা আনন্দের আবহ, তখন ক্লান্ত পুরুষের পথিক জীবনকাহিনি কালো রঙে লেখা পান্ডুলিপির মতো স্থূল ও অসার হয়ে যায়। যা শুধুই শাব্দিক — তাই বর্ণহীন ও আবেগহীন। তবু তো সে মানুষ; তাই দায়িত্বশীল স্ত্রী ও সন্তানের জন্য সন্ধেবেলায় পাখিদের মতো নিয়ম করে ঘরে বা নীড়ে ফেরে। কিন্তু পাখির নীড়ের আকারের চোখজোড়া মনমোহিনী দৃষ্টির বনলতা সেনকে সে ভোলে না। কারণ সে তাকে বলেছে — "এতদিন কোথায় ছিলেন?" — যেন সে কতকালের চেনা সেই পুরুষের। যে বনলতা সেন হাল-ভাঙা দিশাহারা নিঃস্ব ভালোবাসার নাবিককে তার পাখির বাসার মতো ছোট্ট ঘরে বৃহৎ স্থান দিয়েছে প্রকৃত প্রেমিকার মতো।
জীবনানন্দ তার এই কবিতায় পুরুষের দিনযাপনের নেগেটিভ দিক দেখিয়েছেন। কল্পনাবিলাসী পুরুষ সংসারের তিক্ত, একঘেয়ে জীবন মানতে অবশেষে নারাজ হন। স্ত্রীর যান্ত্রিক ভালোবাসা সময়ে-অসময়ে দুঃসহ ওঠে তার কাছে। অথচ এই সাংসারিক ভাঙন শিশিরের শব্দের মত প্রায় নীরবে দাম্পত্যজীবনে চলে আসে। দাম্পত্য সুখ হঠাৎ উধাও হয় নানা কঠিন সমস্যার কারণে — 'ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল'।
অশান্ত সমুদ্রের মতো জীবনে পুরুষের ক্লান্ত প্রাণ তখন চায় গোপনে নিভৃত একটি স্বল্প-সময়কারী সরস আবেগময় 'প্রেমিক জীবন' যাপন করতে — যা সাংসারিক জীবনবহনকে পজিটিভ করে তুলতে সাহায্য করবে। যা নিরন্তর, যা আবহমান, যা কোনওদিন ফুরাবে না — পারস্পরিক ও নিকটতম হবে, যেখানে সাংসারিক পাঁচালীর গঞ্জনা থাকবে না।
তাই শেষ লাইনে কবি বললেন —
"থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।"
লেখিকা বিশেষভাবে কবিতা, স্ক্রিপ্ট, ছোটগল্প ও রিভিউ লেখায় পারদর্শী এবং সৃজনশীল কাজের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা। বহু বছর ধরে তিনি সৃষ্টিশীলতার নানান ক্ষেত্রকে আপন করে চলেছেন। একসময় তাঁর নিজস্ব একটি মাসিক পত্রিকা ছিল; বর্তমানে তিনি একটি সংগীত ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত। ছবি আঁকেতেও তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। মানবিকতা তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি পরোপকারী, সেবামূলক কাজে বিশ্বাসী এবং অসহায় মানুষের পাশে থেকে তাঁদের ইতিবাচকভাবে অনুপ্রাণিত করার সাধনায় ব্রতী।