Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
দেবদাসী প্রথা — ধর্মের শেকড় বনাম শোষণের বাস্তবতা
দেবদাসী প্রথা — ধর্মের শেকড় বনাম শোষণের বাস্তবতা

"আমি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার আগে আমার চার ভাই ছিল। মা পঙ্গু ছিলেন। তাই আমাকে ভগবানের কাছে সমর্পিত করা হয়।"

— গলাম্মা


"আমি যখন ১০ বছর বয়সের ছিলাম তখন আমার বোঝার মতো বয়েস ছিলনা কি হচ্ছে আমার সঙ্গে। আমি পরিবারের একমাত্র সন্তান ছিলাম।"

— উলিগাম্মা


"আমার যদি একজন হাজব্যান্ড থাকতো তাহলে সে আমাকে দেখতো। আমাকে নিজেকেই সবকিছু করতে হয়। যেসমস্ত লোকেরা আমার কাছে আসে তারা আমাদের দায়িত্ব নেয় না।"

— সিদ্ধাম্মা


উপরিউক্ত বক্তব্য পড়ে পাঠকবৃন্দের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে — কারা এরা, যাদের কথা বলা হচ্ছে, আর আমি আসলে কী বলতে চাইছি। উত্তর হলো — দেবদাসী। এক প্রাচীন প্রথা, যা দুর্ভাগ্যবশত আজও বিদ্যমান। বিচারপতি রঘুনাথ রাওয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্র প্রদেশেই প্রায় ৮০০০০ দেবদাসী রয়েছেন। কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ু এবং মহারাষ্ট্র মিলিয়ে আরও প্রায় ৭০০০০ নারী আজও দেবদাসী হিসেবে জীবন কাটাচ্ছেন। এবার স্বভাবতই মনে প্রশ্ন আসবে এই দেবদাসী প্রথাটা আসলে কি? আসুন জেনে নিই সবিস্তারে।

ভারতে দেবদাসী শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো 'দেবতার দাসী', অর্থাৎ যে নারী তার সারাজীবনের জন্য ভগবান বা মন্দিরে নিবেদিত। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে — 'দেব' মানে ভগবান এবং 'দাসী' মানে সেবিকা।

একাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতের মন্দিরগুলোতে এই প্রথার ব্যাপক প্রচলন ছিল। তামিলনাড়ুর তাঞ্জোর (বর্তমান তাঞ্জাবুর) মন্দিরে প্রায় ৪০০ দেবদাসী এবং গুজরাটের সোমেশ্বর শ্রীন মন্দিরে প্রায় ৫০০ দেবদাসী নিবেদিত ছিলেন। সি. এস. মুরুগেসান তাঁর 'বরলাট্রিল দেবদাসিগল' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে দেবদাসী প্রথার উল্লেখ রয়েছে পদ্ম পুরাণে। সেখানে বলা হয়েছে, দেবদাসীরা আসলে দেবতার স্ত্রী, যারা পৃথিবীতে জন্ম নিতেন ভগবানের পূজা ও সেবা করার জন্য। কর্ণাটকের গোকাক অঞ্চলে দেবী ইয়েলাম্মার পূজা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। সেখানে কিশোরী মেয়েদের দেবী ইয়েলাম্মার কাছে নিবেদিত করা হতো। আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দেবীর সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হতো। পরবর্তীতে তারা আর কোনো পুরুষকে বিয়ে করতে পারতো না। বাস্তবে তাদের জীবন শেষ পর্যন্ত যৌনকর্মীর মতো হয়ে উঠত। ৫-৬ বছর বয়স থেকেই মেয়েদের এই 'বিবাহ' দেওয়া হতো।

এই মেয়েরা সাধারণত অশিক্ষিত, দরিদ্র, দলিত পরিবার থেকে আসত। বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছেই তাদের জীবন শুরু হতো একধরনের 'ধর্মীয় যৌনকর্মী' হিসেবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার নিজেরাই এই প্রথায় তাদের সন্তানকে ঠেলে দিত, কারণ তারা ভাবত এটি ভগবানের সেবা। সমাজও এতে তাদের উৎসাহিত করত। কিন্তু এর আড়ালে ছিল নির্মম শোষণ। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই প্রথমে এই কিশোরীদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৪০% ক্ষেত্রে এই সমাজপতিরাই প্রথম ভোগী হতো। পরে এই মেয়েদের বিক্রি করা হতো এবং শহরে পাচার করা হতো।

পুরাণে কথিত রেণুকার কাহিনী এবং ইয়েলাম্মার জন্মকথা
দেবী ইয়েলাম্মা, যাঁর প্রধান মন্দির কর্ণাটকের বেলগাভি জেলার সৌঁদত্তি শহরে অবস্থিত, তাঁকে বলা হয় 'সারা পৃথিবীর মাতা।' মহারাষ্ট্রের নান্দেড় জেলাতেও তাঁর একটি বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। পুরাণকথা অনুসারে, ত্রেতাযুগে রাজা রেণুক এবং রানি ভগবতী সন্তানহীন ছিলেন। অসংখ্য মানত করেও তাঁরা ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত রাজা শিবের কাছে সন্তানের আশায় প্রার্থনা করলে, শিব তাঁদের একটি কন্যাসন্তানের আশীর্বাদ দেন। কিছুদিন পরে রাজপ্রাসাদে জন্ম নেয় এক কন্যা, যার নাম রাখা হয় রেণুকা। তিনি ছিলেন অতুলনীয় সুন্দরী ও ভদ্র স্বভাবের।

একদিন জঙ্গল থেকে ফেরার পথে রেণুকা শুনলেন গাছের আড়ালে কেউ মন্ত্রোচ্চারণ করছেন। কাছে গিয়ে দেখলেন মহর্ষি জমদগ্নি শিবপূজায় নিমগ্ন। তাঁকে দেখে রেণুকা মুগ্ধ হয়ে পড়েন এবং বিবাহের প্রস্তাব রাখেন। প্রথমে মহর্ষি জমদগ্নি এই প্রস্তাব নাকচ করেন, কিন্তু পরবর্তীকালে মহর্ষি অগস্ত্যের মধ্যস্থতায় তিনি রাজি হন।

বিবাহের পরে আশ্রমে পৌঁছলে জমদগ্নি রেণুকাকে এক কঠিন পরীক্ষা দেন। তিনি পাহাড়ের পেছনের নদীর দিকে নির্দেশ করে বলেন — "ওখানে যাও, বালির কলস বানিয়ে তাতে জল ভরে নিয়ে এসো। যদি পারো, তবে আশ্রমে প্রবেশাধিকার পাবে।" রেণুকা সফলভাবে সেই কাজ সম্পন্ন করেন। এতে মুগ্ধ হয়ে জমদগ্নি তাঁকে আশ্রমে গ্রহণ করেন। সেদিন থেকে প্রতিদিন ভোরে রেণুকা জমদগ্নির পূজার জন্য বালির কলসে জল ভরে আনতে লাগলেন।

কিন্তু বহু বছর পর একদিন নদীতে স্নানের সময় রেণুকা এক গন্ধর্বকে তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে জলকেলি করতে দেখে নিজের ভাগ্যকে অভিশপ্ত মনে করেন। মনোযোগ বিঘ্নিত হওয়ায় তাঁর বালির কলস ভেঙে যায়, এবং আর তৈরি করা সম্ভব হয় না। ব্যথিত মনে তিনি আশ্রমে ফেরেন। দেরি দেখে ক্রুদ্ধ জমদগ্নি তাঁকে আশ্রমে প্রবেশে নিষেধ করেন। রেণুকা যতই অনুনয় করুন না কেন, জমদগ্নির রাগ প্রশমিত হয় না। বাধ্য হয়ে তিনি জঙ্গলে আশ্রয় নেন। কিছুদিন পর ফের আশ্রমে ফিরলে, জমদগ্নি আবারও রুষ্ট হন এবং চার ছেলেকে নির্দেশ দেন মায়ের শিরশ্ছেদ করতে। চারজনই অস্বীকার করে। এসময় আশ্রমে ফেরেন তাঁদের পঞ্চম পুত্র পরশুরাম। জমদগ্নি তাঁকেই আদেশ দেন, এবং পিতার কথা রাখতে পরশুরাম রেণুকার শিরশ্ছেদ করেন।

জমদগ্নি তাতে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে পরশুরামকে বর দেন — তিনি যা চাইবেন তাই পূর্ণ হবে। পরশুরাম তখন মায়ের জীবনের পুনরুদ্ধার প্রার্থনা করেন। কথিত আছে, শিরশ্ছেদের সময় আরেকজন নারী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন, এবং পরশুরামের আঘাতে তাঁরও শিরশ্ছেদ হয়। জমদগ্নির বরফলে তাঁদের জীবন ফিরলেও দেহ-শিরের অদলবদল ঘটে। যাঁর শরীর ছিল রেণুকার আর মাথা অন্য নারীর, তাঁকে জমদগ্নি নিজের পত্নী হিসেবে গ্রহণ করেন। আর যাঁর শরীর অন্য নারীর হলেও মাথা ছিল রেণুকার, পরবর্তীকালে তিনি দেবী ইয়েলাম্মা নামে পূজিতা হন।

এইভাবেই দেবী রেণুকা 'ইয়েলাম্মা' বিশ্বমাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

ইয়েলাম্মার ধর্মীয় এবং যৌনবৃত্তির ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, সৌঁদত্তি প্রথমে পরিচালিত হতো এক জৈন রাজা দ্বারা। জৈন শাসনের আগেই স্থানীয় দলনেতারা ইয়েলাম্মাকে তাঁদের মাতা হিসেবে পূজা করতেন এবং মন্দিরে কুমারী মেয়েদের পুরোহিত হিসেবে নিয়োগ করতেন। অষ্টম শতাব্দীতে জৈন রাজারা ক্ষমতা দখল করলে তাঁরা ধর্মীয় আচার ও পাঠ পরিচালনার জন্য সন্ন্যাসিনীদের নিয়োগ করেন।

কিন্তু নবম শতাব্দীতে জৈন শাসনের পতনের পর শাক্তরা পুনরায় ইয়েলাম্মার মন্দিরের দখল নিয়ে নেয়। দশম ও একাদশ শতাব্দীতে শৈব রাজারা, যারা কাপালিক সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন, মন্দিরের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নেন। এই সময়ে পূর্বতন নারী পুরোহিতদের সরিয়ে তাঁদের স্থানে কাপালিক পুরুষ পুরোহিতদের বসানো হয়। দুর্ভাগ্যবশত, সেই পদচ্যুত নারী পুরোহিতদের ব্যবহার করা হতে থাকে পুরুষ পুরোহিতদের যৌন লালসা পূরণের জন্য। দ্বাদশ শতাব্দীতে বিরশৈব সম্প্রদায় ক্ষমতায় আসে। তাঁরা এইসব অপসংস্কার বন্ধ করে সংশোধিত নিয়ম চালু করেন। এসময় কাপালিক পুরোহিতদের সরিয়ে তাঁদের জায়গায় নিয়োগ করা হয় জঙ্গম পুরোহিতদের।

দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে সৌঁদত্তি রাজনৈতিকভাবে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী বিজয়াঙ্গার শাসকদের নিয়ন্ত্রণে আসে। তাঁরা মন্দিরকে বৈষ্ণব প্রথায় রূপান্তরিত করে ব্রাহ্মণ পুরোহিত নিয়োগ করেন। মন্দিরে স্থাপন করা হয় নানা বৈষ্ণব মূর্তি যেমন জমদগ্নি, দত্তাত্রেয় এবং পরশুরাম। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মণ পুরোহিতরাই মন্দিরের কার্যভার সামলান। ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে মন্দিরের কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে স্থানীয় নেতাদের হাতে চলে আসে। তাঁরা নিম্নবর্ণের পুরোহিত নিয়োগ করেন, যাঁরা 'জয়গগ্যা' এবং 'যোগ্গাম্মা' নামে পরিচিত ছিলেন। এঁরা দেবী ভগবতীর পূজা করতেন, প্রণামী সংগ্রহ করতেন এবং মন্দিরের সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করতেন। এই সময়ে আবারও অব্রাহ্মণ পুরোহিতদের সরিয়ে ব্রাহ্মণদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। ব্রাহ্মণরা মন্দিরে নতুন দেবমূর্তি স্থাপন করেন, এমনকি লক্ষ্মীর মূর্তিও প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু তাঁরা শুধু মূর্তিস্থাপন করতেই সক্ষম হয়েছিলেন। এ সময় ইয়েলাম্মার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় রেণুকা।

এই ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বোঝা যায়, সৌঁদত্তি মন্দিরের ইতিহাস আসলে একাধিক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের হাতবদল, ক্ষমতার লড়াই এবং প্রথাগত আচার-অনুষ্ঠানের রূপান্তরের ইতিহাস।

ইয়েলাম্মা তথা রেণুকার নানা প্রচলিত কাহিনী ও ইতিহাস
ইয়েলাম্মার সঙ্গে যৌনবৃত্তির সম্পর্ক নিয়ে নানা ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে এর পেছনে একটি গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। ইয়েলাম্মা একায়া এবং যোগায়ার জন্য চর্মরোগ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন, এবং তাঁদের পবিত্র মতবাদ ইয়েলাম্মাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি কিছু নারীদের নিজের আশ্রয়ে নেন, যারা শপথ নেয় মানুষের মধ্যে তাঁর মাহাত্ম্য প্রচার করার। ইয়েলাম্মার মৃত্যুর পর মানুষের বিশ্বাস জন্মায় যাঁরা তাঁর নাম নেবে, তাঁরা জীবনের সব অসুবিধা অতিক্রম করতে সক্ষম হবে। এই শিষ্যরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিচিত হয় 'ইয়াল্লাপ্পা' ও 'ইল্লাব্বা' নামে। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইয়েলাম্মার মাহাত্ম্য বিশ্বব্যাপী প্রচার করা। এরা প্রচারের সময় সঙ্গে রাখত চৌরি (চুলের গোছা), ধাতব হাঁড়ি, ঝুড়ি ও দেবীর ছবি। এদের নেওয়া শপথগুলি পরবর্তীকালে শুধুমাত্র নিয়ম হিসেবে পরিচিত হয়, ইতিহ্য নয়। শপথ মূলত তিনটি উপাদান নিয়ে গঠিত ছিল —
▪ দেবীর কাছে প্রার্থনা অসুবিধা থেকে মুক্তির জন্য
▪ দেবীর কাছে বরলাভের জন্য নিবেদন
▪ প্রতিদানে মানত হিসেবে কোনো উপহার দেওয়ার অঙ্গীকার
এই মানত আবার দুভাগে বিভক্ত ছিল — একটি সারাজীবনের জন্য, অন্যটি সাময়িক।

নিবেদনের সূচনা হতো ইয়েলাম্মার কাছে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে। কখনও মানত করা হতো কন্যাসন্তান জন্মালে তাঁকে দেবীর কাছে নিবেদিত করা হবে। যখন কোনো মেয়েকে মন্দিরে নিবেদন করা হতো, নানা পূজা-অর্চনার পর বিশ্বাস করা হতো ইয়েলাম্মা একজন পুরুষকে পাঠিয়েছেন, যিনি সেই মেয়ের জন্য অপেক্ষা করতেন। পরিবার তখন মেয়েটিকে সেই পুরুষের হাতে সমর্পণ করত উপহার হিসেবে। ধারণা ছিল, এভাবে পরিবার দেবীর আশীর্বাদ পাবে এবং স্বচ্ছল জীবনযাপন করবে।

এই সময় অর্থ লেনদেনও হতো। সম্পর্কের সময়কাল নির্ভর করত সেই পুরুষ ও মেয়ের পরিবারের সিদ্ধান্তের উপর। কখনও মেয়েটি সারাজীবনের জন্য পুরুষটির সঙ্গিনী হয়ে থাকত, আবার কখনও সম্পর্ক স্থায়ী হতো এক রাত, এক সপ্তাহ বা সর্বাধিক এক মাস। এই প্রথাকেই বলা হতো 'দৈবিক যৌনবৃত্তি।' সম্পর্ক ভেঙে গেলে কখনও পুরুষ মেয়েটিকে ছেড়ে দিত, আবার কখনও মেয়েটিই পুরুষকে ত্যাগ করত। ঐতিহ্য অনুযায়ী, মেয়েটির বৈধব্য দশা চলতে থাকত যতক্ষণ না সে আরেকজন পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করত। নিবেদনের পর থেকে সমস্ত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করত সেই মেয়েই। এসময় মন্দিরের অধ্যক্ষ ও পুরোহিতরাও নিজেদের ভাগের অর্থ গ্রহণ করত।

এই যৌনবৃত্তির অন্যতম চিহ্ন গলায় পরা বিশেষ ধরনের মালা, বা 'বীডস'-এর হার। এগুলো তিন ধরণের যৌনবৃত্তির প্রতীক —
▪ গতি মুত্তু: এই মালা যারা পরে তারা নিজেদের কুমারীত্ব ভগবানকে উৎসর্গ করত। মাসিক শুরু হলে বিশেষ আচার শেষে তারা একজন পুরুষ সঙ্গী পেত, যে তাদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করত এবং পুরোহিতদের জন্য অর্থ উপার্জন করে।
▪ সুলে মুত্তু: এই মালা যারা পরে তারা শুরু থেকেই বাণিজ্যিকভাবে যৌনবৃত্তি করে।
▪ জোগতি মুত্তু: এই মালা যারা পরে তারা ধর্মীয় ভিখারি হিসেবে জীবনযাপন করে।
এভাবে অনেক যৌন-অক্ষম ছেলে-মেয়েও ভগবানের কাজে যুক্ত হয় ভিখারি হিসেবে। এই ব্যবস্থার মধ্যে কিছু পুরুষ ও নারী বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধান করত। যেমন, পুরুষরা নারীর পোশাক পরে। এদের বলা হতো ইয়াল্লাপ্পা ও ইল্লাব্বা। ধারণা করা হয়, এ প্রথা শুরু হয়েছিল তখনই, যখন নারী পুরোহিতদের বদলে পুরুষ পুরোহিত নিয়োগ করা হয়। অন্য দাসীদের মতো এরাও গান গেয়ে ও নৃত্য প্রদর্শন করে ইয়েলাম্মার গুণগান করত এবং অর্থ উপার্জন করে।

দৈবিক যৌনবৃত্তি বনাম দেবদাসীর বাস্তব কাহিনী
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যে যৌনবৃত্তিকে পবিত্র বলেই গণ্য করা হতো। পরে এই প্রথা নানা দেবদাসী সম্প্রদায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। মোহর, মাং দেওয়ানি এবং চম্ভার সম্প্রদায়ে এইপ্রকার যৌনবৃত্তি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে তাদের পরিবারগুলো এটিকে প্রকৃত আয়ের উৎস হিসেবে মেনে নিত। শুধু ধনী লোকদের ভোগলালসাই মেয়েদের এই প্রথায় টেনে আনে তা নয়, এর পেছনে আরও নানা কারণও ছিল যেমন পরিবারে ছেলের অভাব, অতিরিক্ত কন্যাসন্তান, মা বা দিদি আগেই দেবদাসী হওয়া, কিংবা শুষ্ক জটা, সাদা চুল, কুষ্ঠরোগ বা মানসিক সমস্যা থাকা। তখন বলা হতো, ইয়েলাম্মা সেই মেয়েকে নিজের কাছে ডাকছেন। অনেক সময় পরিবারগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে এসব নকল চিহ্ন তৈরি করত টাকা রোজগারের পথ হিসেবে।

এই নিবেদন অনুষ্ঠান সব সময় ধনী লোকদের দ্বারা পরিচালিত হত না; প্রায়ই বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানো মেয়েদের ভোগের মাধ্যম হিসেবেও তা ব্যবহৃত হতো। আরও একটি প্রথা ছিল 'যোগিনী সিস্টেম। এই নিয়মে মেয়েরা বয়ঃসন্ধির আগেই দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতো, আর বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছে যৌনবৃত্তিতে প্রবেশ করত। 'বাসাভি সিস্টেম' অনুযায়ী মেয়েদের একাধিক দেবতার কাছে নিবেদিত করা হতো, কিন্তু সেখানেও তারা বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছেই যৌনবৃত্তি গ্রহণ করত। তবে সপ্তাহে দুদিন ইয়েলাম্মার নামে ভিক্ষা করতে হতো। প্রাচীন সামাজিক নিয়মানুযায়ী যুবতী মেয়েরা, যারা মাতঙ্গি নামে পরিচিত, রাজার কাছে নিবেদিত হতো, কারণ রাজাকে মানুষরূপী ভগবান ধরা হতো। আজ সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে সেই একই মেয়েরা ইয়েলাম্মার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়।

দেবদাসীরা স্কুলে যেতে পারে না, শিক্ষার অভাবে তারা নামটুকুও লিখতে জানে না। বিয়েও হয় না তাদের। নাচগান করে তারা মোটামুটি ১৫০০ টাকা রোজগার করে। খুব ছোট বয়সে জোরপূর্বক এই পেশায় নামতে হওয়ায় তাদের অন্য কোনো পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। শেষ বয়সে গিয়ে ভিক্ষা করেই দিন কাটাতে হয়। অশিক্ষার কারণে প্রায়ই শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হয় তারা। এই ব্যবস্থা দক্ষিণ ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। যদিও সময়ের সঙ্গে এই প্রথার সামাজিক-অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়েছে, তবু এই যৌনবৃত্তির চাহিদা আজও রয়ে গেছে।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
2.7 7 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top