Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
মেঘ, পাহাড়, জঙ্গল আর অশান্ত নদী — আমাদের বান্দরবান অ্যাডভেঞ্চার

২০২০ সাল। বিশ্ব তখনও মহামারির ছায়ায় ঢাকা। তবু আমরা চার বন্ধু — আমি, আকাশ, অর্ণব আর শুভ, মিলেমিশে সিদ্ধান্ত নিই যে এবার পাহাড়ে একটা অ্যাডভেঞ্চারে বের হব। সেই সিদ্ধান্তই আমাদের নিয়ে যায় বাংলাদেশের অপার সৌন্দর্যে ঘেরা বান্দরবানে।

ঢাকা থেকে বান্দরবান যাত্রা
ঢাকা থেকে রাতের বাস ধরে আমরা বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। ভোরবেলা বান্দরবান বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে ঠান্ডা হাওয়ার মাঝে গরম চা আর পরোটা-সবজি দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিই। এরপর আমরা একটা সিএনজি-মাহিন্দ্রা রিজার্ভ করি থানচি পর্যন্ত যাওয়ার জন্য।

থানচির পথের আকর্ষণ চিম্বুক আর নীলগিরি
থানচি যাওয়ার পথে আমরা থামি চিম্বুক পাহাড় আর নীলগিরি ঘুরে দেখতে। চিম্বুক পাহাড়ের উপর থেকে নিচের সবুজ উপত্যকা দেখতে দেখতে মন যেন হারিয়ে যায়। আর নীলগিরিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমরা মেঘের রাজ্যে দাঁড়িয়ে আছি — মেঘ যেন আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে! এই দুইটি জায়গা আমাদের যাত্রার শুরুতেই এনে দেয় অপার আনন্দ। দুটোই যেন মেঘে ভরা স্বর্গ! পথে কয়েকটি আর্মি চেকপোস্টে আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি দিয়ে এন্ট্রি করতে হয়।

থানচি থেকে রেমাক্রি নৌকা যাত্রা
থানচিতে অপেক্ষায় ছিলেন আমাদের গাইড সূর্য-দা (সূর্য ত্রিপুরা)। খুব হাসিখুশি আর অভিজ্ঞ এই মানুষটি আমাদের পরবর্তী রোমাঞ্চকর যাত্রার সঙ্গী হন। থানচিতে এনট্রি শেষ করে আমরা প্রথমে মধ্যাহ্নভোজ সেরে নিই। এরপর সূর্য-দার নেতৃত্বে একটি নৌকায় চড়ে সাঙ্গু নদী ধরে যাত্রা শুরু করি রেমাক্রির উদ্দেশ্যে। চারপাশে ছিল পাহাড়, জঙ্গল আর পাহাড়ী অশান্ত নদী — সব মিলিয়ে যেন স্বপ্নের জগৎ!

রেমাক্রি থেকে নাফাখুম রাত্রিকালীন ট্রেকিং
সন্ধ্যা নামার কিছু আগে যখন আমরা রেমাক্রি পৌঁছাই, তখনই ফোনে কোনো নেটওয়ার্ক ছিল না। রেমাক্রি থেকে নাফাখুম পাড়া পর্যন্ত পথটুকু আমাদের পায়ে হেঁটে যেতে হয়। তবে এটি কোনো সহজ পথ ছিল না। সন্ধ্যা নামার পর অন্ধকারে ঝিরিপথ ধরে রেমাক্রি খালের পাশ দিয়ে ট্রেকিং করতে করতে আমরা পৌঁছাই নাফাখুম পাড়ায়। রাত্রির অন্ধকারে ঝর্ণার শব্দ আর অজানা গন্ধ আমাদের ভিতরে রোমাঞ্চ আর শিহরণ জাগিয়ে তোলে। অন্ধকার, পাহাড়ি জঙ্গল, পাথরের খাল — এটি ছিল জীবনের অন্যতম থ্রিলিং মুহূর্ত।

নাফাখুম পাড়ায় আদিবাসীদের আতিথেয়তা
রাত ৮টার দিকে আমরা নাফাখুম পৌঁছাই। নাফাখুম পাড়ায় আমরা রাত কাটাই স্থানীয় আদিবাসীদের ঘরে। সূর্য-দাই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেন এক আদিবাসী বাড়িতে। মুলি বাঁশের ঘর, সনের চাল, পাটের বিছানা, আর পাহাড়ি আবহ — সবকিছুই ছিল এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। রাতে আমাদের খাবার ছিল গরম গরম মুরগি, ডাল আর ভাত। প্রতিজনের খরচ ছিল ১৫০ টাকা, যা আমাদের কাছে একেবারে মনের মতো লেগেছে। থাকার খরচও ছিল প্রতিজন ১৫০ টাকা — একদম সাশ্রয়ী। খুব ক্লান্ত থাকায় খেয়ে আমরা তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি।

ঘুম ভেঙে মেঘে মোড়া সকাল
পরদিন ভোর ৪টার দিকে ঘুম ভাঙে, আর ঘুম ভাঙতেই দেখি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে কুয়াশা আর মেঘ। জানালার বাইরে পুরো গ্রামটাই ঢাকা সাদা চাদরের নিচে। এমন দৃশ্য আগে কল্পনাও করিনি — মনে হচ্ছিল যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য।

নাফাখুম ভ্রমণ ও পরবর্তী যাত্রা
সকালের নাস্তার পর আমরা যাই নাফাখুম ঝর্ণা দেখতে। সেখানে ঝর্ণায় গোসল করার অভিজ্ঞতা ছিল দুর্দান্ত। ঝর্ণার ঠান্ডা পানি, চারপাশে সবুজ আর পাহাড়ের হুংকার — সব মিলে যেন প্রকৃতির গহীনে হারিয়ে গিয়েছিলাম। অদ্ভুত এক প্রশান্তি!

এরপর আমরা আবার রেমাক্রি খাল ধরে হাঁটা শুরু করি জিন্নাহপাড়ার উদ্দেশ্যে। পথে আবার রেমাক্রি খাল ধরে একবার এপার, একবার ওপার হয়ে আগাতে হয়। দেখতে পাই ছোট ছোট পাহাড়ি গ্রাম, স্থানীয়দের মাছ ধরার দৃশ্য, আর পাহাড়ি শিশুদের প্রাণবন্ত হাসি। এবং ভাগ্যক্রমে গয়ালও দেখতে পাই!

জিন্নাহ পাড়ার শান্ত বিকেল
বিকাল ৪টার দিকে আমরা পৌঁছাই জিন্নাহপাড়া। সেখানে পৌঁছে মনে হচ্ছিল, যেন আরেকটি রূপকথার গ্রামে চলে এসেছি। এখানেও আদিবাসী পরিবারে থাকি। বিকেলে গ্রামের শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলি। কোনো বিদ্যুৎ নেই, নেটওয়ার্ক নেই — প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার আদর্শ জায়গা। নির্জন, শান্ত আর সহজ-সরল জীবনধারার মাঝে আমরা ছিলাম যেন অতিথি নয়, বরং একদিনের বাসিন্দা। রাতে গ্রামের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করে ঘুরে দেখি। এখানে প্রচুর পাহাড়ি মুরগি আর শুকর চোখে পড়ে। এরপর তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি।

দেবতা পাহাড়, আমিয়াখুম ও স্বপ্নের ঝর্ণা
সকালে ৭টায় ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা রওনা দিই আমিয়াখুম এর উদ্দেশ্যে। প্রথমে পৌঁছাই নিকোলাস পাড়া, সকাল ৯টার মধ্যে। এখানে দুই দিন পর নেটওয়ার্ক পেয়ে প্রথমেই আমরা পরিবারকে ফোন করি। তারপর শুরু হয় দেবতা পাহাড় নামা — একেবারে খাড়া আর দুর্গম পথ। নিচে নেমে আমরা ঘুরে দেখি ভেলাখুম, তারপর পৌঁছাই আমাদের স্বপ্নের গন্তব্য আমিয়াখুম। ঝর্ণার বরফঠাণ্ডা পানিতে গোসল করে জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি উপভোগ করি। এরপর আমরা আবার যখন জিন্নাহ পাড়ায় ফিরে আসি, তখন প্রায় বিকেল। ফেরার পথে আবার দেবতা পাহাড় চড়তে হয় — অভিজ্ঞতা কষ্টের হলেও স্মরণীয়। রাতের খাবার শেষে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি।

আবার বান্দরবানের উদ্দেশ্যে
পরদিন সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট সেরে শুরু হয় ফেরার ট্রেকিং। এবার আমরা আগের রেমাক্রি পথ ধরে না ফিরে, যাই পদ্দঝিরি হয়ে। পথে আমরা কিছুক্ষণ হরিশচন্দ্র পাড়ায় বিশ্রাম নিই এবং খাই পাহাড়ি পেপে — একদম তাজা, মিষ্টি আর সতেজ! পরে ট্রেকিং করে পৌঁছাই পদ্দঝিরি, সেখান থেকে বোটে করে থানচি। তারপর লোকাল বাসে করে বান্দরবান শহরে ফিরে আসি।

ফিরে আসা ঢাকা শহরে
রাত ৮:৩০টায় আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে বাসে উঠি এবং পরদিন ভোরে ঢাকায় পৌঁছাই — ক্লান্ত, তবু মনটা পরিতৃপ্তিতে ভরে ছিল অসংখ্য পাহাড়ি স্মৃতিতে।

উপসংহার
এই পুরো ভ্রমণটাই ছিল আমাদের জীবনের অন্যতম সেরা অ্যাডভেঞ্চার। পাহাড়, ঝর্ণা, নদী, ট্রেকিং আর আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি মিশে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা। এটা শুধু একটা ভ্রমণ ছিল না, এটা ছিল প্রকৃতিকে ছুঁয়ে দেখার, বন্ধুদের সাথে জীবনের গভীর স্মৃতি তৈরি করার একটা অভিজ্ঞতা।

বিশেষ টিপস: ভ্রমণে গেলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নিতে ভুলবেন না। কারণ পথে একাধিক আর্মি চেকপোস্টে সেটা লাগবে!




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
5 2 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top