ছোট থেকেই ইতিহাস বইয়ের পাতায় পড়া দাক্ষিণাত্যের ইতিহাস আমায় টানতো। দক্ষিণ ভারতের স্থাপত্য, ইতিহাস, সাম্রাজ্য সোনায় মোড়া প্রাচীনত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বহুযুগ ধরে। সেরকম একটি প্রাগৈতিহাসিক এবং মহাকাব্যিক স্থান হলো কর্ণাটক রাজ্যের বাগলকোট জেলার শহর বাদামি, আইহোল ও পট্টাডাকাল। বাদামি গুহা মন্দিরগুলি আইহোল - বাদামি - পট্টাডাকাল -এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্গত।
২০২৪ এ দুর্গাপুজোর ঠিক পরে আমার সৌভাগ্য হলো এহেন অতীতকে ছুঁয়ে দেখার। পরিবারের সঙ্গে রওনা হলাম কর্ণাটক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। আমাদের বেড়ানোর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ঐতিহাসিক স্থানগুলি ঘুরে দেখার এবং শেষে আরব সাগরের নির্জন কোনো গ্রামে সময় কাটানো। শালিমার স্টেশন থেকে ভাস্কো দা গামা (১৮০৪৭ অমরাবতী এক্সপ্রেস)-এ হসপেট হয়ে প্রথমে আমরা ঘুরে দেখলাম হাম্পি। হাম্পির পরের গন্তব্য ছিল বাদামি - আইহোল - পট্টাডাকাল।
বাদামি শহরটি মহাকাব্যের অগস্ত্য কিংবদন্তির সাথে যুক্ত। এখানে রয়েছে অগস্ত্য মন্দির এবং হ্রদ। যা এক কথায় ভারী মনোমুগ্ধকর। সূর্যাস্তের সময় হ্রদের জলে পা ডুবিয়ে বসলে মাছেরা এসে আপনাকে সঙ্গ দেবে। পাহাড়ের মাথায় সূর্যাস্ত জানান দেবে অতীতের রহস্যময় কোনো সন্ধ্যার কথা। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, ঋষি অগস্ত্য এই হ্রদ তৈরি করেছিলেন। এই হ্রদের জলে নাকি রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা রয়েছে।
পাশেই রয়েছে বাদামি দুর্গ ও মিউজিয়াম। দুর্গটি খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চালুক্য রাজবংশের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দুর্গের উপরে রয়েছে একটি কামান এবং শিব মন্দির। দুর্গের ছাদ থেকে পুরো বাদামি শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। দুর্গে ওঠার পাহাড়ি পথে আপনার সঙ্গী হতে পারে গোলাপি কাগজ ফুলের শোভা।
বাদামি গুহা মন্দিরগুলি হিন্দু এবং জৈন ধর্মের ভাস্কর্য নির্মাণের অংশ। যেখানে হিন্দু মন্দির গুহা গুলিতে রয়েছে হরি-হর, অর্ধনারী শিব, মহিষমর্দিনী, দ্বিবাহু গণেশ এবং নটরাজ। প্রত্যেকটি গুহা স্বতন্ত্র এবং সামনে রয়েছে খোলা বারান্দা। পাশাপাশি ছড়িয়ে রয়েছে আরও কিছু গুহা মন্দির যেগুলিতে রয়েছে জৈন এবং বৌদ্ধ ভাস্কর্য। গুহাগুলিতে বানর, চামচিকার বাস।
বাদামি ঘুরে আমরা পরের গন্তব্য গিয়েছিলাম আইহোল এবং পট্টাডাকাল। মালপ্রভা নদীতীরে অবস্থিত আইহোলে রয়েছে ১০০ টির ও বেশি মন্দির। এই মন্দিরগুলিও চালুক্য রাজাদের নির্মিত। চতুর্থ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর শিলালিপি এবং হিন্দু গ্রন্থগুলিতে আইহোলকে আইয়াভোল এবং আর্যপুরা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই জায়গার ইতিহাস এত বড়ো যে এক ভ্রমণ বৃত্তান্তে তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া থাকার জন্য আমরা খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম তবে ইতিহাসের যে অমোঘ টান, তা উপেক্ষা করি কীকরে!
মনে পরে ইতিহাস বইতে পড়া আইহোল প্রশস্তির কথা? আইহোল প্রশস্তি রচনা করেন জৈন কবি রবিকীর্তি। তিনি চালুক্য রাজবংশের দ্বিতীয় পুলকেশীর সভাকবি ছিলেন। এই প্রশস্তিটি ৬৩৪-৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয়েছিল। এটি কর্ণাটকের আইহোলের মেগুতি জৈন মন্দিরে পাওয়া যায়।
পট্টাডাকাল বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী জায়গাগুলির মধ্যে একটি। এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা পেয়েছে। ইউনেস্কো একে 'উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের স্থাপত্যের একটি সুরেলা মিশ্রণ' বলে উল্লেখ করেছে। এখানকার মন্দিরগুলি দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। মন্দিরগুলিতে নানা হিন্দু পুরাণের অংশ চিত্রিত রয়েছে। যা গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে আমাদের সামনে বর্ণিত করে।
বাদামি - আইহোল - পট্টাডাকাল ঘুরে দেখতে হলে সবচেয়ে ভালো থাকার জায়গা ময়ূরা চালুক্য বাদামি (KSTDC)। আমরা এখানেই রাত্রিবাস করে পরের গন্তব্য যোগ জলপ্রপাত দেখতে এগিয়ে যাই। যদি প্রাচীন ইতিহাস, পাহাড়, গুহা আপনার পছন্দের হয় তবে অবশ্যই দক্ষিণ ভারতের এই জায়গা ঘুরে আসতে পারেন। এক ইতিহাস পাহাড় জমাতে পারেন স্মৃতির মণিকোঠায়।