১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে কলকাতার টাউন হল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো স্বদেশী আন্দোলন। দেশীয় উৎপাদনের উপর নির্ভর করে বিদেশী পণ্যের আমদানি রোধ করার জন্য ব্রিটিশদের তৈরি জিনিস বয়কট করার ডাক দিলেন ভারতীয় নেতারা। শিখ নেতা রাম সিং কুকা যদিও সেই ১৮৭১ সালেই ব্রিটিশ কাপড়ের পরিবর্তে খদ্দর ব্যবহারের প্রচার করেছিলেন। ১৯০৫ থেকে এবার কবি, সাহিত্যিকদেরও কলমে কলমে, মিছিল মিটিংয়ের স্লোগানে ধ্বনিত হল স্বদেশী দ্রব্য গ্রহণ করে বিদেশীকে বর্জন করার আহ্বান। রজনীকান্ত সেন-এর লেখা, "মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই..." তখন বাঙালি যুবক যুবতীদের মন্ত্র; রবীন্দ্রনাথ-এর "একলা চলো রে..." সারা দেশের অনুপ্রেরণা। আধুনিক শিল্পের স্বদেশী বিকাশ ঘটাতে একে একে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল। ১৯০৬ সালের আগস্ট মাসে হুগলীতে 'বঙ্গ লক্ষ্মী কটন মিল' প্রতিষ্ঠিত হলো। অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, সাবান, দেশলাই, সিগারেট প্রভৃতি বাণিজ্যিকভাবে স্বদেশে উৎপন্ন করার উদ্যোগ সফল হলো। ১৯২১ সালের ৩১ জুলাই মুম্বাইয়ের পারেলের এলফিনস্টোন মিল কম্পাউন্ডে ১,৫০,০০০ ব্রিটিশ কাপড় পুড়িয়ে মহাত্মা গান্ধী এই আন্দোলনকে আরও জোরদার করলেন। ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্য ও গর্বের অনুভূতি জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি দেশবাসীকে ব্রিটিশ বস্ত্র বর্জন করে খাদি ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। ঘরে ঘরে শুরু হলো চরখা কাটা।
রাজশাহীতে থাকা দুই ভাই ননীগোপাল এবং শঙ্করাচার্য মৈত্র এই সময়টার মধ্যে দিয়ে বড় হচ্ছিলেন, স্বাভাবিক ভাবেই স্বদেশী আন্দোলনের অনুপ্রেরণা বুকে নিয়ে। '৩০-এর দশকে স্বদেশী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সে'সময়ও চিঠিপত্র, ম্যানিফেস্টো লেখা ও অন্যান্য দরকারী কাজ সারার জন্য ব্যবহার করতে হত বিদেশি কালি। গান্ধিজি বেঙ্গল কেমিক্যালসের অবসরপ্রাপ্ত রসায়নবিদ সতীশচন্দ্র দাশগুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে একটি স্বদেশী কালি প্রস্তুত করতে অনুরোধ করেন। সতীশচন্দ্র ১৯৩২ সালে 'কৃষ্ণধারা' নামে একটি কালি আবিষ্কার করেন, বাণিজ্যিক ভাবে সেই কালি তৈরির ফর্মুলা এবং ফরমান দুই মৈত্র ভাই পেলেন স্বয়ং সতীশচন্দ্রের কাছ থেকে।
বাবা অম্বিকা চরণ মৈত্র এবং মা সত্যবতী মৈত্র দুজনেই ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। মা-এর আশীর্বাদ ও বাবার আজীবনের সঞ্চয়কে মূলধন করে দুই ভাই ১৯৩৪ সালে রাজশাহীতে খুললেন অখণ্ড ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক কালির কারখানা — ‘সুলেখা ওয়ার্কস’। শোনা যায়, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নাকি এই কালির নাম 'সুলেখা' রেখেছিলেন। এক বিজ্ঞাপনে তিনি এই কালিকে 'কলঙ্কের চেয়েও কালো' বলে উল্লেখ করেছিলেন।
মহাত্মা গান্ধী, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায়, বাঁটুল-দি-গ্রেট আর হাঁদা-ভোঁদার স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথ-এর মতো কিংবদন্তিরা সুলেখার কালির কলম দিয়ে লিখতেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখা শুরু করার আগে অন্তত এক হাজার বার সুলেখা কালি দিয়ে দেবী কালীর নাম লিখতেন। হাসান আজিজুল হক এই বিখ্যাত কালি দিয়ে লিখেছিলেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস 'আগুন পাখি'। বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় যে শুধু এই কালি দিয়ে লিখতেন তাই-ই নয়, তাঁর লেখা বই 'সমদ্দারের ছবি' তে এই কালির উল্লেখ আছে। 'জন অরণ্য' চলচিত্রের একটি পরীক্ষার হলে গণ-টোকাটুকির দৃশ্যে তিনি দেখিয়েছিলেন 'সুলেখা'র কালির বোতল টেবিল থেকে টেবিলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 'জয় বাবা ফেলুনাথ'-এ তো স্বয়ং জটায়ু সুলেখার কালি দিয়ে লিখছিলেন।
একে তো স্বদেশের উৎপাদন, তার উপর ইংরেজদের চ্যালেঞ্জ করে ব্যবসা, ফলে মৈত্র ভাইদের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে ওঠে বাঙালি যুবকরা। দুই ভাই দ্রুত বুঝতে পারেন যে কলকাতায় স্বদেশী কালির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং তাই, ১৯৩৬ সালে সুলেখা কলকাতার মহাত্মা গান্ধী রোডে একটি শোরুম খোলেন। ১৯৩৮ সালে, বউবাজার অঞ্চলে একটি নতুন সুলেখা কারখানা খোলা হয়, যা পরের বছর কসবাতে এবং ১৯৪৬ সালে যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের দক্ষিণে লিজ নেওয়া একটি জমিতে স্থানান্তরিত হয়।
জমিটি পরে কিনে নেওয়া হয় এবং সুলেখার একটি দোকান ২০২৫ সাল পর্যন্ত সেখানে গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। যাদবপুরের ওই অঞ্চলটি এখনো ‘সুলেখা মোড়’ নামেই পরিচিত।
সেই বছরই, অর্থাৎ ১৯৪৬ সালে সুলেখা একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয়। পরের বছর দেশ স্বাধীন হল, সে সময় সুলেখার স্লোগান ছিল, "স্বদেশী শিল্পই জাতির মেরুদণ্ড, স্বাধীন ভারতে বিদেশী কারখানা ক্ষতিকর।"
১৯৪৮ সালের শেষ নাগাদ সুলেখার বার্ষিক টার্নওভার ভারতীয় মুদ্রায় এক লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা সে'যুগের হিসাবে অবিশ্বাস্য পরিমাণ ছিল!
১৯৬৮ সালের পর থেকে এই কালি নিয়মিতভাবে মধ্য ও দূর প্রাচ্য, ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া সহ নানা দেশে রপ্তানি হতে শুরু করে। একটি বিশাল অর্ডারের গ্লোবাল টেন্ডারে বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার) সরকার আমেরিকা, ইউরোপ এবং চীনের তৎকালীন নামকরা কোম্পানিদের বাদ দিয়ে সুলেখাকে বেছে নেয়।
১৯৮১ সালে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কালি কারখানা স্থাপনের জন্য UNESCO সুলেখাকে নির্বাচিত করে। পরের বছর কেনিয়াতে প্রথম কালি কারখানা স্থাপিত হয়। এই কোম্পানির উৎপাদিত কালির উচ্চমানের জন্য কেনিয়া সরকার দেশে অন্যান্য কালির আমদানি নিষিদ্ধ করে।
MODE-এর জরিপে ১৯৮৪ সালে পূর্ব ভারতে সুলেখার ৮৯% মার্কেট শেয়ার ছিল। কিন্তু বাজারে ততদিনে বল পেনের আগমন হয়ে গেছে, ফাউন্টেন পেনের কালির চাহিদা কমেছে। অনেক চড়াই-উতরাই, মামলা-মোকদ্দমা, ষড়যন্ত্রের পরিণতিতে ১৯৮৮ সালে প্রথম বার ঝাঁপ বন্ধ করতে বাধ্য হয় সুলেখা।
২০২০ সালের লক ডাউনের সময় হঠাৎ কয়েকজন সুলেখা কালি-প্রেমী, 'সুলেখা ইঙ্ক লাভার্স' নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ শুরু করে সুলেখা কর্তৃপক্ষকে বারবার আবেদন করতে থাকেন এই কালি ফিরিয়ে আনার জন্য। ভারত ও বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইতিবাচক সাড়াও পাওয়া যায়। এই উদ্যোগে সুলেখা কালির কর্তৃপক্ষও নড়েচড়ে বসেন, এবং পুনরায় এই কালির উৎপাদন শুরু করেন। এই আবেগ সুলেখা কালিকে আরেকবার তার জন্মস্থান বাংলাদেশেও ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
এই মুহূর্তে সুলেখা ব্র্যান্ডের অধীনে নানা ধরণের ফাউন্টেন পেন, কালি, নোট বুক, পাট ও চামড়ার পেন কেস ও গিফট আইটেমের সম্ভার রয়েছে। এরমধ্যে স্বদেশী, স্বরাজ এবং স্বাধীন নামক কালির রেঞ্জগুলি নাকি কোম্পানির সূচনার যুগের সেই একই উপাদান ব্যবহার করে স্থানীয় মহিলাদের দ্বারা হাতে তৈরি করা হচ্ছে, যদিও কালি তৈরির পদ্ধতিটি টেকনিশিয়ানদের তত্ত্বাবধানে আরও নিখুঁত ডবল-ফিল্টারেশন-এর মধ্যে দিয়ে যায়। কলেক্টর্স এডিশনের প্যাকেজিংগুলি যেন ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে। যামিনী রায়-এর আর্টপ্রিন্ট ব্যবহার করা কালির প্যাকেজিংগুলি বিশেষ নজর কাড়ে।
যামিনী রায় তাঁর প্যালেটকে সাতটি রঙের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। এর মধ্যে সাদা বাদে বাকি ছয়টি রঙের কালি দিয়ে সুলেখা বিশেষ এই সিরিজটি বের করেছে। স্বরাজ সিরিজে এদিকে আবার আছে ১২ টি পৃথক শেড! বাঙালি ফুটবল প্রেমীদের জন্য রয়েছে আবেগ নামের সিরিজ।
২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলাতে সুলেখা একটি ষ্টল দিয়েছিলো। সেখানে ফাউন্টেন পেন এবং কালি প্রেমীদের যে বিশাল ভিড় হয়, তা স্টলে ধরে রাখা যায় নি। এই কালির কথা উঠলে বাঙালি নস্ট্যালজিক না হয়ে পারে না এমনই তার বিস্তৃতি, ইতিহাসের পাতায় এমনই তার গুরুত্ব। শুধু বাংলা নয়, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে স্বদেশী আন্দোলন ও বাঙালির চেতনায় (বলা ভালো বাঙালির ব্যবসায়িক চেতনায়) গভীর দাগ ফেলা এই ফাউন্টেন পেনের কালির রোমাঞ্চকর কাহিনি।
যেসব জিনিস হারিয়ে যায়, তার সবকিছু ফিরে আসে না ঠিকই। কিন্তু কিছু কিছু তো আসে। যার মধ্যে এই সুলেখা কালি। যা আজও আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় এক প্রৌঢ় বাঙালি রসায়নবিদ, ও দুই তরুণ বাঙালি উদ্যোক্তার দেশপ্রেম আর গভীর স্বদেশ চেতনার সঙ্গে।
বিভিন্ন ম্যাগাজিন এবং সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে লেখালেখির সাথে যুক্ত রিমলি রায় (সান্যাল) দীর্ঘ উনিশ বছর বাংলা টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির সুপরিচিত মুখ ছিলেন। আলফা বাংলা (এখন জি বাংলা) আয়োজিত সোনার সংসার সম্মানে সেরা শিশুশিল্পী নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি বহুমুখী প্রতিভাশালী রিমলি আবৃত্তিতে পরপর তিনবার ডিস্ট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ন।