দুপুরে রোদ ঝলমলে গরম, সন্ধেয় ঝমঝম বৃষ্টি বা রাতে রাস্তায় জ্যাম — এই সবকিছুর মধ্যেও আমাদের দরজায় খাবার, জুতো, বই কিংবা ওষুধ পৌঁছে যায় ঠিক সময়ে। কে নিয়ে আসে? মুখে মাস্ক, পিঠে ব্যাগ, একহাতে ফোন, আর আরেক হাতে ডেলিভারির প্যাকেট — একজন ডেলিভারি ম্যান। শহরের এই এক নতুন 'অদৃশ্য সেনা', যাঁরা প্রতিদিন আমাদের জীবনের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করলেও, তাঁদের অস্তিত্ব প্রায় সর্বক্ষণ উপেক্ষিত থাকে।
ডেলিভারি ম্যানদের কোনো নির্দিষ্ট অফিস টাইম নেই। কেউ সকাল ৮টা থেকে শুরু করেন, কেউ আবার রাত ১১টায় শেষ করেন না। রোদ, বৃষ্টি, ধুলো, ভিড়, দুর্ঘটনার ভয় — সবকিছুর মধ্যেও তাঁরা পেছনে ফিরতে পারেন না। কারণ প্রতিটি ‘ডেলিভারি টাইম’ মানে একটি রেটিং, একটি ইনসেন্টিভ, একটি টার্গেট। অনেক সময় তাঁদের বিরতি বলতে মোবাইলে “অ্যাপ অফ” করে ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সামান্য জল খাওয়া বা পাউরুটি খাওয়া।
বহুক্ষেত্রেই দেখা যায়, একজন ডেলিভারি কর্মী দিনে ১০–১৪ ঘন্টা খেটে দৈনিক আয় করেন গড়ে ৪০০–৬০০ টাকা। এর মধ্যে থেকে যান খরচ, ফোনের রিচার্জ, অ্যাপের লেট ফাইন, মাঝে মাঝে গ্রাহকের খারাপ রেটিংয়ের শাস্তি — সব কেটে গেলে হাতে থাকে সামান্য কিছু। অথচ যাঁরা ঘরে বসে এক ক্লিকে খাবার বা পণ্য অর্ডার করেন, তাঁদের কাছে সময়মতো ডেলিভারি না হওয়াটা একধরনের অধিকার লঙ্ঘন মনে হয়।
এই পেশার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো নিরাপত্তাহীনতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডেলিভারি ম্যানদের চাকরি স্থায়ী নয়—কোনো PF নেই, স্বাস্থ্যবিমা নেই, কোনো দুর্ঘটনায় সংস্থার দায়িত্ব নেই। এমনকি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলেও কোম্পানিগুলি দায় নিতে চায় না। অনেক সময় দেখা যায়, তাঁদের বাইক ভেঙে গেলে একদিনের উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়, অথচ ঋণের EMI, বাড়ি ভাড়া, সংসার—চলতেই থাকে।
যাঁরা বাইকে বসে একের পর এক অর্ডার ডেলিভারি করে চলেন, তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করে কোম্পানির অ্যাপ। কোন অর্ডার তাঁকে নিতে হবে, কখন বিরতি নেওয়া যাবে, কোন এলাকায় যেতে হবে — সব কিছুই নির্ধারণ করে সেই অ্যালগরিদম। একধরনের ‘ডিজিটাল নজরদারি’ —যেখানে মানুষটি আর মানুষ নয়, হয়ে যায় শুধু ডেলিভারির একটি ‘ইউনিট’। এখানে ভুল করা মানে রেটিং কমে যাওয়া, আর রেটিং কমলেই পরবর্তী ইনসেন্টিভ কাটা পড়ে।
ডেলিভারি ম্যানদের প্রতি অনেকেই দুর্ব্যবহার করেন — দেরি হলে চেঁচামেচি, রেটিং কমিয়ে দেওয়া, কখনও বা দরজা না খুলেই খারাপ মন্তব্য। অথচ আমরা কেউ ভাবি না, তিনি হয়তো ওই সময় আরেকটা ডেলিভারি শেষ করে দৌড়ে এসেছেন, বা রাস্তায় জ্যামে পড়েছিলেন। মানবিকতার অভাবই যেন আজকের সমাজে সবচেয়ে বড় অমানবিকতা।
অনেক বড় বড় কোম্পানি ডেলিভারি ম্যানদের স্বনিযুক্ত (self-employed) বলেই চিহ্নিত করে — যাতে তারা শ্রমিক আইনের অধীনে না পড়ে। এর ফলে তাঁদের দাবি-দাওয়া ততটা গুরুত্ব পায় না। ইউনিয়ন গড়তে গেলেও বাধা আসে, বরখাস্তের ভয় দেখানো হয়। আর এই গোটা প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা বা ইচ্ছাকৃত নীরবতা কাজ করে। অথচ এই কর্মীরা হলেন আমাদের “লোয়ার ইকোনমিক স্পাইন”।
ডেলিভারি ম্যানদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার। তাঁরা দয়া পাওয়ার মানুষ নন — তাঁরা সম্মান পাওয়ার যোগ্য। সময়মতো খাবার বা পণ্য পাওয়াটা আমাদের অধিকার হতে পারে, কিন্তু সেই সেবা যে মানুষটি দিচ্ছেন, তাঁর জীবন, পরিশ্রম, ঝুঁকি ও আত্মসম্মানও একইরকম মূল্যবান। তাঁদের শুধু “ধন্যবাদ” বললেই হবে না — চাই নীতিগত বদল, সামাজিক সংবেদনশীলতা, আর একটুখানি সহানুভূতির জায়গা। কারণ, ওঁরা না থাকলে হয়তো আমাদের সুবিধে এক ক্লিকে থেমে যেত, কিন্তু ওঁদের কাজ থামলে থমকে যায় একটা গোটা প্রান্তিক জীবনের চাকা।
লেখিকার জন্ম এবং ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা দূর্গাপুর টাউনশীপে। স্নাতক বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রানীগঞ্জ উইমেনস কলেজে। বিবাহসূত্রে ১৯৯৬ সাল থেকে কলকাতা নিবাসী। লেখার প্রতি আগ্রহ সেই ছোট থেকেই । তা সে উপন্যাস হোক বা ছোটগল্প কিম্বা আর্টিকেল। ভালোবাসেন তাঁর লেখার মধ্যে সমাজের বিভিন্ন দিকের ছবি ফুটিয়ে তুলতে।