সত্তরের দশকে কলকাতা ময়দানে টালিগঞ্জ অগ্রগামী, রেলওয়ে এফসি, এরিয়ান্স থেকে তিন প্রধানকে যে স্বতঃস্ফূর্ত উন্মাদনা চোখে পড়ত, ইদানীং সেই স্পিরিট অনেকাংশে ম্রিয়মান। শুধু আইএসএলে দুই প্রধানের টিমে বাঙালি প্লেয়ারের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ফেসবুকে সমর্থকদের দ্বৈরথ একমাত্র সম্বল। ভারতীয় ফুটবল কি আদৌও এগোচ্ছে?
'৯২ এ ফিফা ক্রমতালিকায় ভারত ছিল ১৪৩ নম্বরে। তারপর মোবাইল, ল্যাপটপের জয়যাত্রা, সংসদ ভবনে জঙ্গি হামলা, ২৬/১১, ক্রিকেটে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়, ডিমনিটাইজেশন, বিচিত্র ঘটনা পরম্পরায় আজ আমরা বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে ব্রতী। তবু ২০২৫ সালে আমরা দাঁড়িয়ে ১২৭এ। ভারতের ফুটবলপ্রেমী হিসেবে তো বটেই, বাঙালি হিসেবে কজন গর্ব করে বলতে পারব, "সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল"?
কলকাতার বড়ো ক্লাবে ইনভেস্টর সমস্যা মিটলেও মাথায় সেই বিদেশী কোচ, প্রশাসনিক গদি দখলের জন্য রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া। আইএসএল জিতলেই ছদ্ম ধারণা হচ্ছে যেন আমরা বিশ্বকাপ জিতে ফেলেছি। আদতে সামগ্রিক উন্নতি কই? ফুটবল অ্যাকাডেমি থেকে তরুণ প্রতিভার জন্ম হচ্ছে কই? চুনী, পিকে, শৈলেন, সমাজপতিদের বাংলা থেকে কজন যোগ্য উত্তরসূরি জাতীয় মানচিত্রে দাগ কাটছে? প্রতিভার অন্বেষণের জন্য জেলায় কিছু ডেভেলপমেন্ট লিগ হলেও তার ফলোআপ হয়না, স্পটাররা খুব দায়সারা কাজকর্ম করেন, আর বিকশিত প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের অধিকাংশ নিম্ন মধ্যবিত্ত, তাই অন্নসংস্থানের জন্য চাকরি মূল লক্ষ্য। তাই ক্লাব ছাপিয়ে দেশের জন্য ভালো খেলা, এই স্বপ্নের সলিলসমাধি ঘটছে।
ওদিকে ভারতীয় ফুটবলের মসনদে স্প্যানিশ মানেলো মার্কুয়েসকে বসানো মাত্র ওঁকে ভারতের অ্যালেক্স ফার্গুসন অভিহিত করা হল, কারণ দুজনেই ক্লাব ও দেশের কোচিং একসাথে করার বিরল নজির অর্জন করেছেন। তবু এখনও দলের হতশ্রী পারফরমেন্সের বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি, সমর্থকদের মনে বিজয়ন ২, ভাইচুং ২ এর প্রতীক্ষা! দেশের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়া সুনীল ছেত্রী বাধ্য হন অবসর ভেঙে ফিরে আসতে, আর তাঁর শ্মশ্রুপিতা, ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সফল প্রশিক্ষক সুব্রত ভট্টাচার্য আফসোস করেন কেন তাঁর অভিজ্ঞতাকে কেউ কাজে লাগাচ্ছে না!
প্রণম্য রহিম সাহেব, অমল দত্ত, নৈমুদ্দিনের জমানা আজ বিস্মৃত প্রায়, আর্মান্দো কোলাসো কিংবা সঞ্জয় সেনরাও জাতীয় ক্ষেত্রে ব্রাত্য। প্রিয়রঞ্জন থেকে প্রফুল্ল প্যাটেলের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অলংকৃত পদে প্রাক্তন খেলোয়াড় কল্যাণ চৌবের অন্তর্ভুক্তি আশার আলো জালিয়েছিল। কিন্তু উন্নতিসাধনে ব্যর্থ ফেডারেশনের বদান্যতায় ভারতীয় ফুটবল দল একই তিমিরে, আজও আমরা বিশ্বকাপের জন্য উপযুক্ত নই, যদিবা আয়োজক হিসেবে আমাদের ভাগ্যে কখনো শিঁকে ছেড়ে।
আইএসএল নামক জমকালো প্ল্যাটফর্মে বিদেশী কর্তৃত্বের মাঝে ঢাকা পড়েছে বাংলা, গোয়া, পাঞ্জাব, উত্তরের প্রতিভা, ফেডারেশন কাপও অন্ধকারাচ্ছন্ন। আইএফএতে প্রদ্যুত দত্তের উত্তরপ্রজন্ম আবার একধাপ এগিয়ে অনন্য কীর্তি স্থাপন করেছেন, গতবারের কলকাতা লিগের নিষ্পত্তি না ঘটিয়ে এবছরের আড়ম্বরপূর্ণ লিগ শুরু করে দিয়েছেন!
মেওয়ালাল, বলরাম, পি কে, জার্নাল সিং দের অলিম্পিক বা এশিয়াডে সাফল্য নিয়ে চর্চা হয়না, গোষ্ঠ পালের কিংবদন্তি মানুষও শুধুই ময়দানে মূর্তি আর রাস্তার নামেই সীমাবদ্ধ। নগেন্দ্রপ্রসাদ থেকে মন্মথনাথ রায়চৌধুরী, এঁরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার কতখানি আজ বাস্তবায়িত হয়েছে? সাবির, সুরজিৎ, হাবিব, প্রসূন, থঙ্গরাজ, কম্পটনের পরবর্তীতে সত্যজিৎ, দীপেন্দু, সুব্রত পালের মতো অনেকেই সাফল্য পেয়েছেন। কিন্তু তারপর একটা লম্বা শূন্যতা চোখে পড়ছে।
প্রতিভার অভাব নেই, শুধু দরকার সাফল্যের সঠিক চালিকাশক্তি, তবেই ক্লাব ফুটবলের মধ্যে দিয়ে জাতীয় মানচিত্রে উন্নয়ন হবে। ফুটবলের উন্নতির জন্য প্রশ্ন অনেক, উত্তরও অনেকাংশে জানা, তবু বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?