ভারতের শতবর্ষের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় — রাজনীতি কোনো নিশ্চল কাঠামো নয়। বরং তা সময়, সমাজ ও জনগণের চেতনার সঙ্গে পাল্টে যায়। আজকের ভারত এক বিচিত্র দ্বন্দ্ব ও সম্ভাবনার দেশ, যেখানে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান ও বামপন্থার অস্তিত্বসংকট দুইই সহাবস্থান করছে। এ অবস্থায় নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক ভূমিকা ও প্রত্যাশা এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, যা পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিকাঠামোকে প্রশ্ন করছে, পরিবর্তনের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস, যার প্রতিষ্ঠা ১৯২৫ সালে নাগপুরে। প্রথমদিকে স্বদেশি ও সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধারকে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়ে পথচলা শুরু হলেও পরবর্তীতে এর রাজনৈতিক রূপ প্রকাশ পায় জনসঙ্ঘ ও পরে ভারতীয় জনতা পার্টির মাধ্যমে। ১৯৮০ সালে বিজেপি প্রতিষ্ঠিত হলেও, রাজনৈতিক মাইলফলক হিসেবে ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস, ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গা, এবং ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতালাভ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই রাজনৈতিক উত্থানকে কেবল নির্বাচনী সাফল্য বললে ভুল হবে। হিন্দুত্ববাদের মধ্যে বহু নাগরিক এক ‘আত্মপরিচয়ের আশ্রয়’ খুঁজে পেয়েছেন। ভারতের বহুযুগের উপনিবেশ-বিরোধী ইতিহাস, আত্মনির্ভরতার আকাঙ্ক্ষা, জাতীয় গৌরব ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য — এই অনুভূতিগুলিকে এক সংগঠিত রাজনৈতিক ভাষায় রূপান্তর করতে পেরেছে এই ধারা। মোদীর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, মিডিয়া ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক মাধ্যমের বিস্তার এই ভাষাকে আরও প্রভাবশালী করে তুলেছে।
তবে এই সফলতার মধ্যেও রয়েছে বিপদসংকেত। ধর্মনিরপেক্ষতার মূলে আঘাত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা, শিক্ষার পাঠ্যক্রমে ইতিহাস বিকৃতি, এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর একরকম দখলদারি — এই সবই আজ বাস্তব চিত্র। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন থেকে শুরু করে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলোপ — প্রতিটি পদক্ষেপ এক নতুন রাষ্ট্র ধারণার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ ধারণাটি প্রশ্নবিদ্ধ।
অন্যদিকে, ভারতীয় রাজনীতিতে একসময় বামপন্থার গৌরবময় অবস্থান ছিল। স্বাধীনতার পরে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সংগঠন, জমি আন্দোলন, শিক্ষার অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্যবাদ — এইসব প্রশ্নে বামপন্থী দলগুলির অবদান অস্বীকার করা যায় না।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে, ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনকাল নানা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। অপারেশন বর্গা, তিনস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষায় সংস্কার — এসব পদক্ষেপের ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে।
তবুও সেই শাসনের শেষ দশকে বামপন্থা এক কাঠামোগত জড়তা ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে শিল্পায়নের নামে কৃষিজমি অধিগ্রহণ এবং তার বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলনের দমন, রাজনীতিকে দলে দলে ভাগ করে দেওয়ার প্রবণতা, ও শাসন যন্ত্রে দলীয়করণের চূড়ান্ত রূপ — এসবই বামপন্থার পতনের পথ প্রশস্ত করে। রাজনীতির মাঠে আজকের বামপন্থা আত্ম-পর্যালোচনা ও আধুনিকীকরণের অভাবে প্রায় অস্তিত্ব সঙ্কটে। কেরালা ছাড়া দেশে আর কোথাও বামপন্থী শাসন দৃশ্যমান নয়।
এই দুই ধারার রাজনীতির বাইরে, নতুন প্রজন্ম এক নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করছে। তারা কেবল ভোট ও প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট নয় — তারা চায় প্রতিফল, জবাবদিহিতা ও দৃশ্যমান উন্নয়ন। ছাত্র-যুবদের কাছে কর্মসংস্থান, পরিবেশ রক্ষা, নারী নিরাপত্তা, তথ্যের স্বাধীনতা ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র কাঠামো — এই বিষয়গুলো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। দল নয়, নীতি ও কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে তারা তাদের অবস্থান স্থির করতে চায়।
এই প্রজন্ম ধর্মীয় মেরুকরণে আকৃষ্ট হয় না সহজে, আবার বাম মতাদর্শের কঠোর জড়তায়ও নিজেকে খুঁজে পায় না। তারা নিজের মতো করে, তথ্য যাচাই করে, নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করতে আগ্রহী। একদিকে আত্মপরিচয়ের সংকটের উত্তরে তারা স্বদেশের ঐতিহ্য খোঁজে, অন্যদিকে মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবিকতার ভাষা খোঁজে অন্যতর পথে।
তাই এখন প্রশ্ন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয় — প্রশ্ন আদর্শের পুনর্নির্মাণের। হিন্দুত্ব যদি ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও ন্যায়ের ধারক হতে না পারে, তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বামপন্থা যদি আধুনিক কর্মসংস্কৃতি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি ও উদার গণতন্ত্রের ভাষা না আয়ত্ত করতে পারে, তাহলে তা হবে নিছক অতীতচর্চা।
ভারতবর্ষের আগামী রাজনৈতিক ভূগোল রচনা করবে সেই প্রজন্ম, যারা নিজের চোখে দেখে, নিজের কান দিয়ে শোনে এবং নিজের হাতে নির্মাণ করতে চায় — এক মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক, উন্নয়নমুখী ও বৈচিত্র্যকে সম্মানজনক রাষ্ট্র। শাসকের হাতে থাকবে রাষ্ট্রশক্তি, কিন্তু সমাজের হাতে থাকবে তার বিবেক। এবং সেই বিবেকের নতুন নামই হবে — নাগরিকতাবোধ।