আমার যেমন এক সত্তা আছে — যা আমার জীবন তথা জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। আমার অনুভব তথা দিনলিপিকেও নিয়ন্ত্রণ করে। তেমন করেই এই সময়ের কালপুরুষের কাছেও, কলকাতার একটা সত্তা আছে। যে আজন্ম কাল ধরে তার চরিত্রকে মানবিকতার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মানব জীবনকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে বা বলা ভাল আঁকড়ে ধরেছে এবং আগামীতেও ধরবে।
কিন্তু হঠাৎ করেই আমি কেন আজ তাকে নিয়ে এতটা মাথা ঘামাচ্ছি! কী দায় পড়ল আমার? সত্যি তাই, দায়!
এই শব্দটা কিছুটা দায়সারা গোছের। যে বারেবারে মাথার মধ্যে এসে সবকিছু গোলমাল করে দেয়। নাইন্টিসের 'গোলমাল' ছবির মত — যেখানে চাকরির স্বার্থে ছেলের বয়সী রামপ্রসাদকে একই সঙ্গে তার ইগো (তার নিজ সত্তা) আর অল্টার ইগো (যা সে নিজে নয়) এই দুই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। এখানেও ঠিক তেমনই।
অর্থাৎ ফেলুদার ভাষায় কোনো বিষয়কে কাল্টিভেট করতে যে দৃষ্টিভঙ্গি বা দৃষ্টিশক্তি লাগে, এখানেও সেইভাবেই আমাদের এগোতে হবে বিষয়টিকে বুঝতে হলে।
জীবন ও কলকাতা একে অপরের পরিপূরক। আমি কেন বলছি এই কথাটা?
কারণ জীবনে তুমি ভাববে এক, আর বাস্তবতা গল্প লিখে চলে আর-এক। অর্থাৎ — এই ego আর alter ego-র মতই ব্যাপারটা।
তোমাকে আমাকে সর্বদায় সে বলে চলেছে জীবনের সেই সত্য গল্পটাকেই
রবি ঠাকুর যে দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবনকে দেখেছেন সত্যজিৎ কি সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে খুঁজে পেয়েছিলেন? উত্তরে বলতে হয় হয়তো-বা হ্যাঁ।
আবার কবি নজরুল যে দৃষ্টিভঙ্গিতে কলকাতাকে আঁকতেন, তা কি আমরা আমাদের ক্যানভাসে আঁকতে পেরেছি! প্রশ্ন যে থেকেই যায় প্রতিবারে! প্রতিটা সভ্যতার ইতিহাসে। নতুন সূচনার সৃষ্টির তরে। সভ্যতার অন্ধ আকাশে মানবতাকে প্রশ্ন করে সে বারেবারে।
নাকি তারা বারেবারে ফিরে আসে তোমার-আমার মন নামক ভাঙা দরবারে, তাদের নাগালহীন উদ্দেশ্যকে আমাদের সম্মুখে তুলে ধরতে?
জীবন ও কলকাতার মাঝে যাপন, অনেকটা অর্থহীন বা বলা ভাল একঘেয়ে, ময়লা। আবার তাতে প্রাণের আনন্দময় উদ্বেলও আছে একাধারে।
চেতনা, অস্তিত্ব ও মায়া! এই তিন, জীবন ও কলকাতার কঙ্কালময় অস্থির গভীরে মিশে আছে প্রতিপদে।
চেতনা জীবনের এক প্রাণময় রস — যা প্রতিটা মুহূর্তের ব্যাপ্তিকে জানান দেয় আমাদের হৃদয়ে। তেমনই কলকাতার জনজীবন, রাস্তাঘাট, আকাশ, নদী, শ্রীহীন প্রকৃতি — সবই তার চেতনার অবক্ষয়ের অধ্যায়কে তুলে ধরে যে প্রতিমুহূর্তের ব্যবধান। নীরব প্রকাশ চেতনার — নিজের অগ্নিনিহিত সত্তার। যে সত্তা প্রতিটা মুহূর্তে যুদ্ধ করছে এই বাস্তব জগতকে মানিয়ে নিতে।
অস্তিত্ব — তার প্রাচীন দেওয়াল, ফাটল ধরা নদীর বাঁধ, মানুষের সঙ্গে মানুষের দুঃখের যে অধ্যায়, পলকহীন চোখের মাদকতায়, শেষ চুম্বনের আদরময় আবেশে, শূন্যহীন বসে থাকায়, না পাওয়ার যন্ত্রণায়, হারিয়ে যাওয়ার বেদনায়, ভালবাসাময় দুটো হাতের আঁকড়ে ধরায়, দুটো হাসি-মাখা ঠোঁটের নীরবতায়, মহাকালের নির্জীবতার — এই সবই তার অস্তিত্বের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে — প্রাচীন বটবৃক্ষের ন্যায়। তোমাতে-আমাতে সেই অস্তিত্বের চেতনাকে জানিয়ে দিতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় — আমরা এতোটাই ব্যস্ত তাকে দেখেও দেখি না। সে আজও আমাদের কাছে উপেক্ষিত। ঠিক, নিজেকে চেনার মত।
জীবন একইভাবে তার ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্বের রেখাকে স্মৃতির প্রলেপ দিয়ে মনে রাখে সভ্যতার নতুন প্রজন্মের স্বার্থে।
আর 'মায়া'। — জীবন মায়াময়! যা অনুভূতির পথে পথে লিখে রেখে যায়। নতুন-নতুন ইতিহাসের সেই পুরনো কথাই। যা আদি অনন্তকাল ধরে একইভাবে চলে আসছে, ও আসবে।
জীবনানন্দ জীবনের রূপকে দেখেছিলেন বাংলার পল্লী প্রকৃতির নরম ভালবাসায়। প্রেমের রূপকে ধরা দেওয়ার এক বৃথা চেতনায়। তাই তো, মনের ভাষা বোঝে আর কয়জন বল দেখি?
'তিলোত্তমা' — তোমাকে ভালবাসা যায়, কিন্তু তোমাকে রোমান্স করা বড়ই দায়! এই ভিড়-যানজট-শব্দ-মানুষের কোলাহলের মাঝে, কতবার ভেবেছি — তোমায় আর আমি ভালবাসবো না। তবু 'তুমি' যে তুমিই! তোমায় না ভালবেসে থাকতে পারিনে। তোমার অস্তিত্বের যে চেতনা তার মায়াতে, যে জড়িয়ে পড়েছি আমি — সে মায়াকে আর যে কোথাও পাইনি খুঁজে।
ভালোবাসি তোমায়, তুমিও আমাকে বোধহয়। তবু আমাদের মাঝে কিছুটা দূরত্ব রয়েই যায় — কিছু ভালবাসায় দূরত্বটা থাকতেই হয় ... না!
সেই কলকাতা আজ তার অস্তিত্বের অবক্ষয়ের পথে। ঠিক যেমন জীবন। চারিদিকে মানুষে মানুষে দ্বন্দ্ব। সরকার আজ অন্ধ। চেতনা হারিয়েছে তার পথ। বিবেক আজ মাটিতে লুটিয়ে ফেলেছে তার দল, এভাবেই সভ্যতার এক সংকটক্ষনে দাঁড়িয়ে সে আবারও। মাথা নত মানুষের ভয় শূন্য চিন্তের হবে কি উত্থান ...
চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর ...
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থ হতে সংগৃহীত)
লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতক। পরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে স্পেশালাইজেশন করে বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন। মানব মনোবিজ্ঞানে খুব আগ্রহী। ভালোবাসেন বই পড়তে ও সিনেমা দেখতে। এছাড়া যোগ এবং খেলাধুলাও রয়েছে তাঁর পছন্দের তালিকায়।