কোনো নির্দিষ্ট কবিতায় সরাসরি পৌঁছতে কবির নামের ওপর ক্লিক করুন —
কালের কোপে
উপাসক
তাকে দেখেছিলাম বছর পনেরো আগে
কি তেজ, কি জেদ, কি বিশ্বাস, কি হুঙ্কার
সাহস - সে যেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ডরায়
দৃঢ়তা - ওই যেন কাঁপে হিমালয়
"আমিই রাজা! এ রাজত্ব আমার
আমার রাজনীতির মুগুর চালালে
তোরা সব কটা হবি চুরমার"
সবাই যে তাকে সমীহ করত – তা নয়
কেউ ভয়ে, কেউ ঘৃণায়
কেউ লজ্জায়, আবার কেউ বা সম্পর্ক রক্ষায়
মোট কথা - কিছুতেই কিছু করে সে যেন অক্ষুণ্ণ রয়
তবে সময় বয়েছে
খেলেছে আপন মনে খেলা
ঢলেছে বেলা – এসেছে নিশি, ঢের বিশ্বাসী
কি করুণ তার মুখমন্ডল
বিস্বাদের গন্ধ মেখে
মলিনতার চাদর ঢেকেছে তার অস্তিত্ব
সে ধরেছে ধীর গতি – মাথা নত বিবেকের চোখে
সে আজ সন্ত্রস্ত – মহাকালের কোপে
তবু চলেছে, চলতে হচ্ছে
অন্যায়- গ্লানি- অসাধু পিশাচিনি
ছাড়া নেই তার কোনো সঙ্গিনী
ছলে-বলে-কৌশলে যে ভেবেছিলো করবে বিশ্বজয়
বাঁচার খেলায় আজ সে পরাজিত - শুধুই করে 'বাঁচার' অভিনয়।
লেখক কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়, কাশীপুরের ছাত্র ছিলেন। সেখান থেকে তারাতলার একটি ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কয়েক বছর চাকরির পর আইন নিয়ে পড়াশোনা করে বর্তমানে ওকালতি পেশায় নিযুক্ত। ছোটবেলায় পাঠ্যস্তরে কখনও বাংলা না পড়লেও ঘরে মায়ের কাছেই বাংলা শেখা, আর সেই ভাষাতেই লেখালেখির নেশা। চারপাশের দৈনন্দিন ঘটনার প্রতিক্রিয়াই কলমের আঁচড়ে পাতার ভাঁজে ভাঁজে প্রকাশ পায় — সৃষ্টি হয় নতুন কিছু।
বউ কথা কও
রমা মিস্ত্রী
তোকে একটু জড়িয়ে ধরবো
আলতো করে বুকে!
মাখবো গায়ে সারা শরীর
মত্ত হবো সুখে।
বাবলা কাঁটা বিঁধবে পায়ে
জাপটে ধরে গা
বুকের উপর নিবি তুলে
সমাজ ভুলে যা-
নিবিড় হাতে চুল সরাবি
আঙুল গুলো দিয়ে।
মুছিয়ে দিবি চোখের জল
দুঃখ গুলো ভুলে।
বাঁধবি আরো গাঢ় করে
আলিঙ্গনের জালে,
বউ কথা কও ডাকবে তখন
ডালিম গাছের ডালে।
ভোর সন্ধ্যায় তুলসী তলায়
দেখবি আঁচল তুলে
পড়বি কোন মায়াজালে
আমায় তুই ভুলে।
ভালোবাসা বলতে
প্রভাকর দে
তোমার ভালবাসা বলতে,
আছে শুধু –
কতখানি হাতেগোনা কবিতা
আর একরাশ শূন্যতা।
হোঁচট খেয়েছি যদিও এ পথ চলতে,
পেয়েছি শুধু –
বৃথা সব হাস্যকর সান্ত্বনা,
আর মিথ্যে প্রতিশ্রুতির বন্যা।
জ্বালিয়েছি বহুকষ্টে আবারও জীবনের সলতে,
দেখেছি শুধু –
মুখ বাঁকানো হাসির বাধ্যকতা
আর পুরানো সাজানো গল্পের পূর্ণতা।
আর ইচ্ছে নেই হেলতে–দুলতে,
জানি এগুলো শুধু –
ক্ষণিকের হাসির পিছনে লুকানো কান্না,
আর হিসেব না মেলা রাশি রাশি বাসনা।
শুধু কবিতার জন্য
উজ্জ্বল সামন্ত
কখনো বর্ণ বা শব্দের প্রেমে পড়ে দেখা,
সাদা পাতায় মনের অনুভূতি, কালির ছোঁয়া,
কবিতা গল্প প্রবন্ধ বা উপন্যাস এ ভরছে পাতা,
অনুভূতি আবেগ দৃষ্টিকোণে কল্পনা বাস্তব আঁকা।
অতৃপ্ত চোখে তৃপ্তির হাসির ঝলকে উষ্ণ শুভেচ্ছা,
অমৃতের স্বাদ যখন পৃষ্ঠা জুড়ে থাকে তৃপ্ত ইচ্ছা।
শব্দেরা বাঁধ ভাঙে ও গড়ে উচ্ছ্বাস আর আবেগে,
গভীরতা কখনো মাপতে চায় শব্দের নাব্যতা কে!
শুধু কবিতার জন্য মুহূর্ত অপেক্ষায় মনের আলিঙ্গন,
কলমের কালিতে আবেগ অনুভূতি, শব্দের সিঞ্চন।
শুধু কবিতার জন্য আরও কিছু দিন বাঁচার ইচ্ছা,
কবিতায় ভাঙি কবিতায় গড়ি, শব্দের ফুলশয্যা!
কবিতা এক চিলতে রোদ্দুর, অন্ধকারের বুক চিরে,
সুখ, দুঃখ, বিরহ, মিলনের আহ্বান,জীবনের সংস্পর্শে।
শব্দেরা স্বাধীন কলমের আঁচড়ে গদ্য অথবা পদ্যে,
কবিতা যখন জীবন্ত হয়ে ভেসে ওঠে হাজারো কন্ঠে।
শব্দের প্রেমে ছন্দের তালে কত কি ভাবনা বন্দী,
কবিতা যেন চির যৌবনা প্রেম, কবিও আমৃত্যু সঙ্গী।
কল্পনা আবেগ বিবেক অনুভূতি মিলনের সংমিশ্রণ,
শুধু কবিতার জন্য জীবনের খোঁজ, ভাষার নিমন্ত্রণ।
কলমে আছে আগুনের ছোঁয়া, কবিতায়!
কলমে আছে বিরহ, প্রেমের পরশ, বর্ণনায়।
কলমের ধর্ম সত্য লেখা, যতই রাঙাও চোখ !
কলমে আঁচড়ে খুঁজে ফিরি প্রেম, মানবতা ও ঈশ্বর...
লেখক কবি, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী। শৈশব থেকেই নাটকের মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বাণিজ্যে স্নাতক ও এমবিএ ডিগ্রিধারী। ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রকের উদ্যোগে আয়োজিত Azadi ka Amrit Mahotsav–এর Desh Bhakti Geet Competition-এ পূর্ব বর্ধমান জেলায় জেলা স্তরের বিজয়ী এবং রাজ্য স্তরের প্রতিযোগিতায় সম্মানপ্রাপ্ত। তাঁর স্বরচিত কবিতা, অনুগল্প, গল্প, প্রবন্ধ ও অনু-উপন্যাস জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সর্বভারতীয় সমাজ বন্ধু সম্মাননা (২০১৯–২০) সহ বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় সংবর্ধিত। বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখালেখি করেন; ডেইলি হান্ট-এ প্রকাশিত তাঁর লেখার সংখ্যা ৬৭-রও বেশি। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে তিনটি একক কাব্যগ্রন্থ, একটি গল্পগ্রন্থ, একটি উপন্যাস ও পাঁচটি যৌথ কাব্যগ্রন্থ। পেশাগত জীবনে নারী, শিশু উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণ দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন — এক হাজারেরও বেশি নাবালিকাকে শিক্ষার আলোয় ফিরিয়ে আনার কাজে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। কলমের আঁচড়ে সমাজ ও পাঠকের মনে স্থায়ী ছাপ রেখে যাওয়াই তাঁর লেখার অভীষ্ট।
পিয়া ভোলো অভিমান
গোবিন্দ মোদক
রং-তামাশার রোয়াক জুড়ে
বিয়ান-বাড়ি ছ'বার ঘুরে
জমলো যখন নেশা,
আমি তখন আমিতে নেই
মনের মধ্যে তা থেই থেই
নাচা-ই যেন পেশা!
তিনিই নাচান আমি নাচি
তার মধ্যেই মরি ও বাঁচি
শরীর ঘূর্ণিপাকে,
স্বপন দেখি রাত্রে-দিনে
বাঁচি কিসে তাকে বিনে
হাতছানি দেয়, ডাকে!
নিশির অমোঘ ডাকে চলি
নিজের মনেই কথা বলি
শরীরটা বিবশ,
হঠাৎ চোখের সরলো ছায়া
আসরেতে নামলো জায়া-
ভাঙবো তোমার রস!
এই বয়সেও বে-আক্কেলে
বিয়ে করা বউকে ফেলে
বিয়ান নিয়ে ঘোরা!
এর ওষুধ আমিই জানি
বন্ধ তোমার দানা-পানি
ভাঙবো দাঁতের গোড়া!
দোহাই দোহাই বউটি আমার
গা ছুঁয়েই বলছি তোমার
সেসব কিছুই নয়!
থেকো নাকো গোমড়া মুখে
অভিমানটা ভর্তি বুকে
ওতেই আমার ভয়!
বোলো না কথা ব্যাঁকা ব্যাঁকা
তার চেয়ে দাও খুন্তি ছ্যাঁকা
চোখের মারণ বাণ,
দিব্যি কেটে বলছি শোনো
‘ইন্টু-মিন্টু’ নেইকো কোনো
ভোলো অভিমান!
নইলে আমি যাবো ভেসে
শেষ বয়সে হেথায় এসে
কেসটা যখন পাতি,
তাও যদি না ক্ষমা করো
বাক্যবাণে আমায় ভরো
হবো আত্মঘাতি!
ছিঃ ছিঃ তুমি আমার পতি
হয়ে গেলে তোমার ক্ষতি
বিধবা আমি হবো!
সে দুঃখ সইবো কিসে
থাকবো দু’জন মিলে মিশে
প্রেমিক হয়েই রবো।
বউয়ের কথায় জুড়ায় প্রাণ
বৌ-ও ভোলে সব অভিমান
বিয়ান কথা ভুলে,
দরজা তখন বন্ধ করি
বৌকে একটু আদর করি
সটান কোলে তুলে!
লেখক ‘কথা কোলাজ’ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক, জন্ম নদীয়া জেলায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.কম ডিগ্রিধারী এই প্রচারবিমুখ, আত্মমগ্ন মানুষটি ছোটবেলা থেকেই কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, রম্য রচনা, উপন্যাস এবং ছোটদের জন্য ছড়া-কবিতা ও গল্প লিখে চলেছেন। নানা বিষয়ে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি লেখা দেশ-বিদেশের অসংখ্য পত্র-পত্রিকা ও দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫টি। পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।
ঈশ্বর তর্পণ
স্বপন চক্রবর্তী
মানুষটি খর্বাকৃতি ছায়াটি দীর্ঘ অতি
তিনি মোর ঈশ্বরচন্দ্র,
বিদ্যাসাগর যিনি করুণার সিন্ধু তিনি
কণ্ঠস্বর বুঝি মেঘমন্দ্র।
বিধবাবিবাহ হবে ভাবেনি ত’ কেহ ভবে
রূপকার তিনি ঈশ্বর,
বজ্রকঠিন হিয়া জ্বালায় সমাজে দীয়া
কীর্তি তাঁর অবিনশ্বর।
বাল্যবিবাহ প্রথা বহুবিবাহের ব্যথা
পীড়া দিত বিদ্যাসাগরে,
গরজে ওঠেন তিনি বরমাল্য গলে জিনি’
স্ত্রী শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তরে।
তিনিই ত’ কাণ্ডারী ঈশ্বরীয় ভাণ্ডারী
বাংলা ভাষার পাকশালে,
বর্ণ সাথে পরিচয়ে ভাষার শৃঙ্গ জয়ে
কথামালা পরালেন গলে।
ইংরাজী ও সংস্কৃত সবেতেই সংহত,
ব্যক্তিত্ব ছিল অমলিন,
দাপুটে বিদেশী জাতি তারাও স্বীকারে নতি
চরিত্রটি বজ্রকঠিন।
ঝাঁপ দেন দামোদরে মাতৃবাক্য রক্ষা তরে
ভক্তির অনন্য পরাকাষ্ঠা,
বীরসিংহের বীর সংকল্পে তিনি ধীর
কর্মেতে অবিচল নিষ্ঠা।
দয়ার সাগরও বটে দানধ্যান অকপটে
হৃদয়টি যেন সিন্ধুসম,
সত্য তিনি ঈশ্বর আজও তাই ভাস্বর
বিদ্যাসাগর পুরুষোত্তম।
অমৃতের পুত্র যিনি অমর ঈশ্বর তিনি
ঋষিরূপ প্রজ্ঞা অনুসঙ্গ,
তিনি এক মহীরূহ একাই রচেন ব্যুহ
অরি সবে হয় ছত্রভঙ্গ।
হায়রে বাঙালী জাতি বাস্তবে খর্বাকৃতি
ছায়াটিও আরও যেন খর্ব,
দুছত্র বিদেশী ভাষা তাহাতে মগজ ঠাসা
তবুও কতই না গর্ব।
ভুলেছ সংস্কৃতি আত্মবিস্মৃত জাতি
অবজ্ঞা মাতৃভাষা সনে,
ঈশ্বরচন্দ্রে তাই তোমাদের মতি নাই
মনুষ্যত্বের আজি উদ্বোধনে।
মোদের সকল কাজে সমাজ সেবার মাঝে,
ঈশ্বর সতত প্রোজ্জ্বল,
বিস্মৃত আজি যারা ক্ষমা নাহি পাবে তারা
অকৃতজ্ঞ অকৃতীর দল।
দ্বিশতক অতিক্রান্ত তথাপি অভ্রান্ত
তাঁর স্পর্শে আজো শিহরিত,
বিনম্র শিরে এবে তর্পণ করি দেবে
হে ঈশ্বর, আপনিই ঋত।
মহাভারতের স্বাধীনতা
সামসুজ জামান
মন্ত্রপূত একটা বাণী – সোনার চেয়েও অনেক দামী
বলছি আমি সত্যি কথা।
ভাবতে পার যত চাওয়া-পাওয়া আছে এই দুনিয়ায় —
সবার শীর্ষে মাথার মণি স্বাধীনতা।
এক পা নয়, দু’পা নয়,
বীরের মত পা রাখলাম স্বপ্নসম স্বাধীনতার ঊনআশিতে।
তবুও দেখি স্বাধীনতার ফুল ফোটে নি,
সব মানুষের ঘর ভরেনি স্বাধীনতার স্বপ্ন গীতে।
অন্ন চাই, বস্ত্র চাই,
চাই যে শুধু মাথাগোঁজার একটুখানি আপন ঠাই।
শুধু সেটুকু পাবার আশায়
কত লোক যে চোখের জলে বুক ভাসায়।
লক্ষ কৃষাণ পায় না খেতে,
অথচ তারাই সব মানুষের অন্নদাতা।
তোমায় আমায় বাঁচিয়ে রাখে
তারাই হল তোমার-আমার পরিত্রাতা।
লক্ষ শ্রমিক খামার ক্ষেতে, বন্দরে, কল-কারখানাতে
কোটি কোটি মজুর কুলি
এক মুঠো ভাত জোগাড় করতে জনারণ্যে ঘুরে মরে।
আমার প্রাণের ভারত-মা যে, সোনার স্বপ্নে গড়া এ দেশ।
মায়ের মুখে কিছুতে আমরা লাগতে দেব না কলঙ্ক রেশ।
কেড়ে নেবে না কেউই কারোর চলার বলার স্বাধীনতা।
সবার আদরে থাকবে দেখো রানীর মতন ভারতমাতা।
ভেদ থাকবে না কোন কর্মের,
বিবাদ ঘুচবে জাত ধর্মের,
নবারুণ উঠে সোনার আলোয় ভরে দেবে
তাই থাকবে না কেউ অন্ধকারে।
'জগৎ সভার শ্রেষ্ঠ আসন' পেতে আমাদের নেই দেরী নেই।
সংকল্প হোক বজ্র-কঠিন,
অটুট দীপ্তি মনের যেন হারায় না খেই।
সব ভরা আছে
আমাদের এই “মহাভারতে” দেশমাতৃকার অমূল্য বরে।
ফোটেনি যে ফুল আমাদের দোষে,
সে ফুল ফোটাবো প্রাণপণ সংকল্প জোরে।
লেখক স্বাধীনতা সংগ্রামী খলিলুর রহমান ও সেতারা বেগমের পুত্র, পূর্ব বর্ধমানের টোলা গ্রামে জন্ম। বাংলা ও শিক্ষা তত্বে স্নাতকোত্তর এবং বি.এড ডিগ্রিধারী এই শিক্ষাবিদ দীর্ঘদিন আন্দামানে শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষকতা ও অনুবাদ ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশস্তিপত্রে সম্মানিত হন। CBSE-র ইংরেজি ও হিন্দি পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনুবাদের জন্যও তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত হলেও সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে তাঁর অটুট সম্পর্ক রয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১৭; তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় আকাশবাণী, দূরদর্শন ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।
আজকের নারী
কাজী সেরিনা খাতুন
পুরুষতন্ত্র বলে নারী মানে
শুধু গৃহস্থালীর কাজ ।
মুখ বুজে সওয়া গৃহকর্মনিপুনা
তবেই ভালো মেয়ের তাজ ।।
ভাতের হাঁড়ি পায়ের নূপুর
দুগাছা চুড়ির মাপ ।
এর বেশি বুঝলে যেন
সাহস দেখানো পাপ ।।
আজকের নারী অনেক স্বাধীন
মধ্যযুগীয় ভাবনায় কোপ ।
দশভুজায় সামলায় ঘর বাহির
অন্যায়ের বিরুদ্ধে তোপ ।।
নারীর আলোতেই নতুন প্রজন্ম
সভ্যতার অগ্রগতি ।
শক্তি আর কোমলতার বন্ধনে
পরিবর্তনের আগ্নেয় জ্যোতি ।।
রান্নার গুঁড়োতেই থেমে নেই সে
কেউ পাইলট,কেউ বা কবির কলম ।
কারো হাতে আদালতের রায়
কেউ বা বিদ্রোহী বল্লম ।।
কেউ বা ঘাঁটে ইতিহাসের কঙ্কাল
বিজ্ঞান ল্যাবের আলো ।
পুরোনো মানচিত্র বদলে দিয়ে
মুছছে অতীতের কালো ।।
সকালের রুটি অফিসের রিপোর্ট
সময়কে সযত্নে সাজায় ।
ক্লান্তিহীন পদচারণায়
অন্ধকারে আলো জাগায় ।।
কপালের টিপে অগ্রগতির অগ্নিশিখা
আগামীর প্রতিশ্রুতি ।
নিজের পরিচয় নিজেই লেখে সে
নতুন দীগন্তে অনুপ্রেরণার মূর্তি ।।
শেষ পাতার আগে
পিয়ালী কানুনগো
সবাই যখন চলে গেল,
ঘরটা তখন নিঃশব্দ।
মেঝেতে ছড়ানো কথার টুকরো,
ভাঙা প্রতিশ্রুতি আর অপূর্ণ বাক্য।
দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের শেষ পাতায় লেখা —
উপসংহার।
সে পাতাটা ছিঁড়ল না।
জানত, এখানেই সব কিছুর মানে লুকিয়ে আছে।
যা বলা হয়নি, যা বোঝানো যায়নি,
সেসবের ভার এই এক শব্দে।
দরজা বন্ধ করার আগে
সে একবার পিছনে তাকাল।
বুঝল, উপসংহার মানে বিদায় নয়;
উপসংহার মানে —
নিজের সঙ্গে শেষবার সৎ হওয়া।
তারপর সে বেরিয়ে গেল—
হালকা পায়ে,
কিন্তু গভীর সিদ্ধান্ত নিয়ে।
চাওয়া পাওয়া
দামিনী
যৌবনে ছারখার
জীবনের মোহ
সম্ভোগ বেঁচে থাকে,
মরে আগ্রহ।
সুখ যায় জ্বলে–পুড়ে,
বেঁচে থাকে ক্লেশ
প্রণয়ীর ভাগ দিয়ে
আমি নিঃশেষ।
অধিকার যেন আজ
মুঠোভরা বালি
স্মৃতি করে উপহাস,
দেয় হাততালি।
সহজিয়া মন শুধু
ভালোবাসা চায়
তবুও তো বারবার
পাশা উল্টায়!
আবেগের মেঘ যেন
দূষণের ধোঁয়া;
দু'চোখ ভেজায় শুধু,
দেয় না তো ছোঁয়া।
চাওয়া–পাওয়া বেঁধে রাখি
ভাবনার ঘরে;
পায় যদি পূর্ণতা —
দেবতার বরে।
ভয় পাবো না
অসীম কুমার মজুমদার
ছোট বেলায় ঘুরতে ঘুরতে ছাদে
প্রশ্ন করতে, "কী হবি তুই?"
ছুঁড়ে ফেলে দিস বই।
আমি বলতাম ঘুড়ি হতে চাই
বড় ঘুড়ি হবো
তুমি ধরে থাকবে লাটাই
উড়িয়ে দেবে আকাশে আমায়
অনেক দূরে চলে যাবার ছুতো
আরও ঘুড়ি থাকবে সেখানে
ভয় পাবো না
দেখবো যখন তোমার হাতেই সুতো।
কতো বন্ধু উড়বে আকাশে
পেটকাটি,মুখপোড়া, মোমবাতি
তোমার টানে দেবো ওদের গুতো
কখনও গোত্তা খেয়ে নামিয়ে দেবে নিচে
যখন কেউ কাটতে আসবে সুতো
ভয় পাবো না
দেখবো যখন তোমার হাতেই সুতো।
কখনও আবার লেজ লাগানো ঘুড়ি
কেউ হয়তো ওড়াবে ছাদ থেকে
আমারও একটা লেজ লাগিয়ে দিও
বই ছিঁড়ে ভাতের আঠা দিয়ে
বইতে শুধু হাজি বাজি লেখা
পড়তে হলে তুমিই পড়ে নিও।
আমি শুধু আকাশে উড়তে চাই
ভয় পাবো না
দেখবো যখন তোমার হাতেই সুতো।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপিয়ে ওঠো যদি
তোমার যদি শরীর ক্লান্ত লাগে
অন্য কাউকে দিও না হয় লাটাই
বুঝিয়ে দিও ধরবে কেমন করে
প্রথম প্রথম ভুল হবে হয়তো
আস্তে আস্তে ছেড়ে দিও সুতো
ভয় পাবো না
দেখবো যখন অন্য কেউ ঠিক তোমারই মতো।
হন্যমান শরীরে
সুদীপ ঘোষাল
মরণ গো, তোমার কিসের এত তাড়া?
একা একা পৌঁছে যাব কবরখানার মাঠ
আগুন শিখায় উঠবে শ্যামরায়ের হাসি
সবুর কর হে সখা শ্যামসোহাগে কাটুক ক্ষণকাল
আঁধার হাতড়ায় মৃত্যু মিছিল একটু সবুর কর,
সেবা করি, সারিয়ে তুলি স্বপ্নের মিছিল,
এস মহামতি জীবক, মহম্মদ, ধার নিই মন,
জ্ঞান,গরিমা ও সরল জীবন
মায়ের কোলজুড়ানো বীর সন্তানে,
দেশে দেশে ছেয়ে যাক সেবাব্রতীর আলাপ
মনের পাত্র ভরুক খুশির খেয়াল এস বুদ্ধ,
এসো শ্যামরায়, তুলে ধর মোহনবাঁশীর বেহাগ
আশ্রিতজনের অপেক্ষার আড়ালে নেমে আসুক
ভীম মহাবেগে নতুন সকাল
ঘরে ঘরে আঁকি আলপনা
মন্দির, মসজিদ আর গীর্জার আলোয়
ভরে যাক জীবনের না পাওয়ার বিকেল
এস হে কবি
ব্রজবুলি কথা লেখ নক্সীকাঁথার পাতায়
খুলে যাক কালো মুখোশ, মন ভালো করা বাতাসে
হতাশার শিকল ছিঁড়ে একদিন
ফিরবে আলোর জীবন
একটু সবুর কর হে সখা, এত কীসের তাড়া?
বাকি থেকে গেল কত অজানা গানের রাত।
লেখক কাটোয়া শহরের বাসিন্দা — কবিতা,গল্প, উপন্যাস লিখতে ভালোবাসেন। ছোটবেলায় স্কুলে পড়তে গল্প দিয়ে লেখা শুরু — বর্তমানে আরও আনন্দ, সানন্দা ব্লগ কবি সম্মেলন, কবিতাপাক্ষিক, আরম্ভ, ধুলামন্দির, অক্ষর ওয়েব, দৈনিক বজ্রকন্ঠ, দৈনিক সংবাদ, তথ্যকেন্দ্র, যুগশঙ্খ, আবহমান, অপরজন, কৃত্তিবাসী ওয়েব, ম্যাজিক ল্যাম্প, জয়ঢাক, অংশুমালী, প্রভাতফেরী, দৈনিক গতি প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে অন্তরে আলো জ্বলে, শিশিরের ছৌ (কবিতা সংকলন), তিন-এ নেত্র সহ আরও অনেকগুলি বই প্রকাশিত হয়েছে।
শিশু
সব্যসাচী ভট্টাচার্য্য
এদেশে অন্নের অভাব,
রুটি নেই, বস্ত্রে গোলামীর দাগ;
ভাষাহীন তোমাদের আজব বিকৃত সমাচার!
পিতা :
চাষে ভাগ্য ফেরে না আর,
কাঠের খাঁচা রক্ত দিয়ে আঁকি;
তোমার প্রশ্নে কাঁপে গোটা পৃথিবী!
মাতা :
ওরে খোকা ওসব বলতে নেই,
ঠকে শিখি মিথ্যে হরতালে;
দাঁত দাঁত চাপ, মৃত্যু পাবি প্রশ্নের উত্তরে!
শিশু :
কিসের তবে জীবনবোধ,
প্রাণ যাবে যাক তবু নই রাজি তোমাদের বোকামিতে;
আমি দুর্দম, চলি না কারোর নিষেধে!
প্রধান :
ওরে বেটা সামলা তোর সন্তানের মুখ,
কেমন করে পেলো সত্যি বলার অসুখ??
শিশু :
স্বচক্ষে যা দেখি তাই বলি, নির্ভয়;
সবাই সব মেনে নিলেও
এ বান্দা মেনে নেওয়ার বান্দা নয়!
পিতা :
ওরে থাম, মিথ্যেকে মেনে নে সত্যি বলে;
ঘুষের বিনিময়ে এখানে সভ্যতা সংস্কৃতি চলে!
মাতা :
ক্ষমা করে দাও হে প্রধান,
এ যে বালক শিশু নির্বোধ;
জানি না কে জ্বালালো ওর জীবনবোধ!
শিশু :
যে দেশে চাষী পায় দড়ি,
প্রজা লাঞ্ছিত বারবার;
সেই প্রধানের কাছে ক্ষমা চাওয়ার নেই দরকার!
প্রধান :
তবে তোকে এইবার নিয়ে যাই কোতোয়ালি থানায়,
বুঝবি এবার ক্ষুদিত পেটে প্রশ্ন করা ভুল;
ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে গুনবি ভুলের মাসুল!
পিতা :
যা শাস্তি হবে, তা আমার হোক;
এর যে এখন চলে সবে শিশুকাল!
মাতা :
তুমি নিষ্ঠুর নও আমি জানি প্রধান,
মিনতি করি ছেড়ে দাও ওকে;
রাখো এই নারীর অনুরোধের মান!
প্রধান :
আজ একে ছেড়ে দিলে,
বাড়বে আরও সবার সাহস, প্রশ্ন করতে শিখবে;
একে শাস্তি দিলে তবেই তো সবাই বুঝবে!
শিশু :
তোমার অস্ত্রে ভয় নেই মোর,
তোমার মিথ্যে তেজের ধার ধারি না আমি;
আমায় শাস্তি দিতে পারো, বন্দী করো আমায়;
তবুও সেটা হবে না তোমাদের জন্য ভালো!
বিত্তশালী :
কি বলো হে শিশু??
এই দেশে কেউ ভালো নেই??
এইতো আমি দিব্যি সুখেই আছি,
দামী টুথব্রাশ, দামী বাড়ি দামী গাড়ি;
তিনটে চাকর আর একশ কর্মচারী!
শিশু :
এই প্রথা চলে আসছে বহুকাল ধরে,
শাসক লুট করে ভাগ করে দেবে তোমাদের তরে;
তোমরা পুষে রাখবে কিছু চাকর কর্মচারী,
আকালে আগলে রাখবে তোমাদের বিপুল বৈভব!
পিতা-মাতা একসঙ্গে :
এবার উঠবে বোধয় মহা প্রলয়,
শুনি সেই মহাকালের বীণার সুর;
তবে জাগ্রত হোক কণ্ঠ সবার, এই শিশু কালের কণ্ঠ!
প্রধান :
ওহে উর্দি পরা লোক, নিয়ে চলো একে বেঁধে,
এর বিচার হবে আজ শাসকের দরবারে!
শাসক :
একি কাণ্ড হে প্রধান,
কেন এই শিশুর কোমরে দড়ি??
কোতোয়াল এই শিশুর কি এমন বাড়াবাড়ি??
প্রধান :
হুজুরের সামনে আমি ক্ষুদ্র একজন,
তবু অভয় দিলে বলি এই শিশুর অন্যায়,
এই শিশু প্রশ্ন তোলে, আপনার বিচার ব্যবস্থায়!
শাসক :
বটে, বটে, বটে,
এতো সাহস এই শিশুর,
আজ এর বিচার হবে প্রকাশ্যে!
শিশু :
আমি নই ভীতু, শাস্তি আমার অভিপ্রেত;
তবে শুনতে পাও শাসক রুদ্রের বীণ??
নীরবে চুমি আমি মৃত্যু, রেখেছি রক্ত ঋণ!
আমার প্রাণ কাঁদে ওই হতভাগ্য মানুষের তরে,
যারা এই শাসকের দরবারে মূর্ছিত বারবার;
সব অধিকার হারিয়ে শোনে মৃত্যুর ঝঙ্কার!
শাসকের দূত :
সারা দেশের মানুষ এসেছে আপনার দরবারে,
দিচ্ছে মিথ্যে সভ্যতা ভাঙার ডাক;
এই শিশু নিয়ে এলো কোন অভিশাপ??
শাসক :
কি বলো হে দূত??
পারবে না আমাদের লোক ওদের আটকাতে??
তবে কেন পুষি এইসব গরু গাধাদের??
শাসকের দূত :
ক্ষমা করুন হে ছত্রপতি,
আজ ওদের হাতেই যে মৃত্যুর পরোয়ানা!
গান :
কাঁপছে দেশের সিংহাসন,
ভাসিয়ে প্রশ্নের নৌকা;
এবার শাসক হবে তোমার সাথে,
নির্ভীক এক শিশুর দেখা!
প্রজারা পাবে সাত রাজার ধন,
বন্ধ হবে ভূতের যতো নাচন কোদন;
চোর ডাকাতের হবে সর্বনাশ,
খুলবে এবার শিশু কণ্ঠের বাঁধন!
এবার শাসক যাবে বিসর্জন,
মালিক হবে সব হারানো লোক;
এবার শাসক যাবে অস্তাচলে,
দেখবে কেমনে সবাই সত্যি কথা বলে;
এবার শাসক নেবে -- বিদায়,
মানবে শাসকের হিংস্রতা পরাজয়!
শিশু :
এই দৃঢ় হাতিয়ার আসলে কণ্ঠ,
প্রশ্ন করি পৃথিবীর ডাকঘর থেকে;
হাজার বছরের দাসত্ব ভাঙবো রক্তিম কলরবে!
শোনো হে শাসক আজ মুক্তির দাবিতে,
পাঞ্চজন্য ধ্বনি বাজে পাখিদের গানে;
এই মহাঝড়ে নতুন দিন আসবে আগামীতে!
শাসক :
ক্ষমা করে দাও, যদি পাই আর একটা শেষ সুযোগ;
মোর প্রাণ চাই ভিক্ষা তোমার কাছে;
সব দেবো বিলিয়ে প্রতিটা ঘরে!
শিশু :
এই মিথ্যে ভাষণে লাভ নেই আর,
তোমার হবে এবার সর্ব সমক্ষে তিরস্কার!
দৈব কণ্ঠ :
সকল প্রজাই আজ নিজের মালিক হবে,
উপবাসী সব লোক খেতে পাবে!
শিশুরা মাতৃক্রোড়ে খেলা করে,
শিশুরা জন্মায়;
শিশুরাই আসলে মুক্তির গান গায়!
বিবেকের আতসকাঁচ
সোমনাথ লাহা
অনাকাঙ্খিত সুপ্ত ইচ্ছাগুলো যখন মাথাচাড়া দেয়
কাটাছেঁড়ায় ফালাফালা হয় সমাজের মুখ...
মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মুখগুলো
দাঁত-নখ বের করে থাবা বসায় অবলীলায়
সত্যি-মিথ্যের দাঁড়িপাল্লা বদলায় অজান্তেই
মানদণ্ডের লাঠি ভূলুন্ঠিত হয় নিমেষেই...
আপোসের হাত ধরে চলে ক্ষমতার অলিন্দে হাঁটা
কুক্ষীগত করে রাখা সবকিছু দিয়ে
ভরকেন্দ্রে চলতে থাকা চোরাস্রোতের ধারা
মূক-বধির সমাজ তখন হাতড়ায় ভাষা
লাঞ্ছিত নারীর চরিত্র নিয়ে ওঠে প্রশ্ন
কানাকানি-ফিসফাসের মাঝে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে
প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তারপর আবার স্তিমিত হয়
সময়ের বালুচরে ঢাকা পড়ে যায় কত প্রশ্ন
নতুন সমস্যার ভিড়ে চাপা যায় পুরোনো ক্ষত
বিশ্বাস টলমলিয়ে ওঠে বারংবার...
বিবেকের আতসকাঁচে রেখাপাত হয়
চাকচিক্যের মোড়কে চশমায় ঢাকা পড়ে
চেনা মুখ কেন বদলে যায় প্রতিবার
মনের অগোচরে জমাট বাঁধা অন্ধকারে
যদি প্রশ্ন করি, পাবো কি সাড়া!
তুমি-আমি সবাই কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছি
অবিরত ক্লান্ত হচ্ছি পথ চলতে চলতে
যদি পারতাম, যদি হতো এমনে ভর দিয়ে
আর কতদিন এভাবেই চলত হবে!
নতুন সমাজ উঠবে গড়ে কবে দিনের শেষে
সূর্যের রক্তিম আলোর আভায় মেখে।
অপরাহ্নশিল
ডা. ইন্দ্রজিৎ রায়
অপরাহ্ন বলে যে সময়
তা ঘড়ির ভেতরে থাকে না
তা থাকে মানুষের শরীরের মাঝখানে
যেখানে ক্লান্তি বিশ্রাম নেয়
আর ইচ্ছেরা কথা বলা বন্ধ করে
আলো তখন ধীরে নামে
কোনো দিক চেনে না
ছায়াগুলো লম্বা হয়
কিন্তু অর্থ খুঁজতে চায় না
সবকিছু শুধু থাকে
সে দাঁড়িয়ে ছিল
কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় নয়
আবার ঠিক সেখানেই
যেখানে দাঁড়িয়ে থাকলে
যাওয়া আর না যাওয়ার মধ্যে
একটা নিঃশব্দ ফাঁক তৈরি হয়
কেউ তাকে দেখেনি
তবু সে বহন করছিল
অনেক মানুষের না বলা দিন
অর্ধেক রেখে দেওয়া ভাবনা
আর এমন সব ক্লান্তি
যার কোনো মালিক নেই
তার মুখে দুঃখ ছিল
কিন্তু কান্না ছিল না
এমন দুঃখ
যা চিৎকার করে না
শুধু ভেতরে ভেতরে ভারী হয়
হঠাৎ সে নিজের হাতের দিকে তাকাল
এই হাত দিয়েই একদিন
কিছু ধরা হয়েছিল
কারও উপস্থিতি
কারও ভরসা
কারও নীরবতা
এখন হাত দুটো ফাঁকা
তবু ফাঁকাটা সম্পূর্ণ নয়
ফাঁকার ভেতরেও
এক ধরনের স্মৃতি থাকে
যা নামহীন
কিছু ডাক ছিল
কিন্তু নাম ধরে নয়
চলার ইঙ্গিত ছিল
কিন্তু তাড়া ছিল না
সে গেল না
কারণ সব চলাই প্রয়োজন নয়
কিছু থাকা
নিজেকে ভেঙে না ফেলার চেষ্টা
তার মনে পড়ল
অনেক কিছু একসময়
নিজের ছিল বলে মনে হয়েছিল
পরে বোঝা গেছে
সেগুলো শুধু পাশে ছিল
সময় যতটুকু অনুমতি দিয়েছিল
হাওয়া বদলাল
কোনো নাটক ছাড়াই
শুধু বোঝালো
সব বদল মানে ক্ষতি নয়
সে ভাবল
যা চলে যায়
তা কি সত্যিই চলে যায়
নাকি আমাদের ভেতরে
অন্যভাবে থেকে যায়
আলো তখন পাতলা
ভাঙছে না
শুধু নরম হচ্ছে
যেন দিন নিজেই বুঝে নিয়েছে
সবকিছু স্পষ্ট হওয়া
মানুষের কাজ নয়
সে দাঁড়িয়ে রইল
কোনো সিদ্ধান্তের জন্য নয়
শুধু এই বিশ্বাসে
সব প্রশ্নের উত্তর দরকার হয় না
কিছু প্রশ্ন
মানুষকে মানুষ রাখে
অপরাহ্ন নামে এই সময়
শেষ পর্যন্ত কোথাও যায় না
এটা থেকে যায়
ভেতরের সেই জায়গায়
যেখানে আমরা
নিজের কাছেই
একটু অচেনা হয়ে থাকি
লেখকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বর্ধমান শহরে। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি তাঁর ঝোঁক। শব্দকে তিনি কেবল প্রকাশের বাহন নয়, মনে করেন আশ্রয় — ভেতরের আলো ও অন্ধকারকে নীরবে প্রকাশ করার এক মাধ্যম। পদার্থবিদ্যায় অধ্যয়ন ও এমবিএ (সিস্টেমস) সম্পন্ন করার পর গবেষণার মাধ্যমে ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত থেকে নীতি নির্ধারণ, উন্নয়ন প্রকল্প, তথ্যের অধিকার আইন ও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সংক্রান্ত কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বরিষ্ঠ উন্নয়ন আধিকারিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়-অধীন মহাবিদ্যালয়সমূহের ভারপ্রাপ্ত পরিদর্শক। এই বহুমাত্রিক প্রশাসনিক পরিচয়ের আড়ালে তিনি এক নীরব শব্দসংগ্রাহক — যিনি কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধে মানুষের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতার স্থাপত্য খুঁজে ফেরেন।