একটা বিদ্বেষ কি জন্ম দেয় নতুন নতুন বিদ্বেষের? একটা একমাত্রিক ঘৃণা কি টুকরো টুকরো হয়ে অ্যামাইটোসিস প্রক্রিয়ায় কোষবিভাজনের মতো তৈরি করছে বহুমাত্রিক ঘৃণা? তা না হলে ধর্মীয় বিদ্বেষ কীভাবে জন্ম দিল নারীবিদ্বেষের? কেন গুজরাত দাঙ্গায় বলি হয় বিলকিস বানোর সম্ভ্রম, সন্তান, সম্পত্তি — সবকিছু?
২০০২ সাল। গুজরাতে তখন চলছে সাম্প্রদায়িক হিংসা। দাহোড় জেলার দেবগড় বারিয়া গ্রামে চালানো হল ভয়াবহ হামলা। ঐ গ্রামের বাসিন্দা বিলকিস বানো সহ তাঁর মা-বোনকে গণধর্ষণ করা হল। ভুলতে পারা যায় না — বিলকিস তখন পাঁচ মাসের গর্ভবতী ছিলেন। তিন কন্যা সহ তাঁর পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হল। একজন গর্ভবতী নারীকে গণধর্ষণ করা হল। তাঁর চোখের সামনে তাঁর বোন এবং এমনকি তাঁর মাকে গণধর্ষণ করা হল। অকল্পনীয় নৃশংসতায় একটি তিন বছরের শিশুকন্যার মাথা পাথরে পিষে হত্যা করা হল তার গর্ভবতী মায়ের চোখের সামনে। ১৯ বছরের বিলকিসকে গণধর্ষণ করে মৃত্যুর জন্য ফেলে রাখা হল।
যে ১৪ জনকে হত্যা করা হল, তার মধ্যে ৪ জন মহিলা এবং ৪ জন শিশু।
২০০৮ সালে বিশেষ আদালত মোট ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা দিল। কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো আদালতকে জানাল যে, এটি একটি “বিরলতম ঘটনা”। তাই ঐ মামলায় দোষী সাব্যস্ত ১১ জনের মধ্যে তিন জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আবেদন জানাল সিবিআই। মোট ১২ জনের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবনের রায় দিয়েছিল ঐ বিশেষ আদালত।
২০১৭ সালে বিলকিস বানোর গণধর্ষণ এবং তাঁর পরিবারের ১৪ জনকে হত্যার ১৫ বছর পর বম্বে হাইকোর্ট ২০ জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করল। প্রমাণের অভাবে ট্রায়াল কোর্ট ৭ জন অভিযুক্তকে খালাস দিয়েছিল। বম্বে হাইকোর্ট রায় দিল — ঐ ১১ জন অভিযুক্তের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্য।
সময় হয়েছে সনাতন ধর্মগ্রন্থ ঘেঁটে দেখার — কোন ধর্মগ্রন্থ ঘোষণা করেছে অন্য ধর্মের নারীর ধর্ষণই ধর্ম? “ভালো সংস্কার” বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে?
গোধরা সাব-জেলের সামনেই মালা এবং মিষ্টি নিয়ে ধর্ষকদের মুক্তি উদযাপন করা হল। পরে সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করল — জালিয়াতি করে ঐ ধর্ষকদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কারণ, ধর্ষকদের মুক্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক্তিয়ারই ছিল না গুজরাত সরকারের।
গণধর্ষণকারীদের এভাবে শংসাপত্র আর সম্বর্ধনা পাওয়ার ঘটনা কি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় না যে, ধর্মীয় বিদ্বেষের গর্ভে আসলে প্রতিপালিত হচ্ছে নারীবিদ্বেষের ভ্রূণ?
উন্নাও, ২০১৭। উত্তরপ্রদেশের উন্নাওতে ধর্ষিতা হলেন এক দলিত মহিলা। আবার পাঁচজন পুরুষ বনাম একটি মেয়ে। প্রহসন এই যে, বিচারালয়ে যাওয়ার পথেই তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। নব্বই শতাংশ পুড়ে যাওয়ার পরেও তিনি এক কিলোমিটারের বেশি পথ হেঁটেছিলেন। সফদরজং হাসপাতাল তাঁর মৃত্যুর সাক্ষী থাকল।
কাঠুয়া, ২০১৮। জম্মু-কাশ্মীরের কাঠুয়া শহরের কাছে একটি জঙ্গলে মুসলিম যাযাবর উপজাতির একটি মেয়েকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। মেয়েটির বয়স আট। সেই অভিযুক্তদের সমর্থনে এবং তাদের রক্ষা করার দাবিতে আয়োজিত হয়েছিল সমাবেশ।
মণিপুর, ২০২৩। মণিপুরের জনসংখ্যা ৩৫ লক্ষ। এই জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি প্রধানত হিন্দু মেইতেই সম্প্রদায়ের, যারা মূলত রাজধানী ইম্ফল এবং তার আশেপাশের সমৃদ্ধ উপত্যকার বাসিন্দা। নাগা এবং প্রধানত খ্রিস্টান কুকি-জো উপজাতিরা মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে বাস করে। সরকারি চাকরি এবং শিক্ষায় মেইতেইদের জন্য সংরক্ষণ সম্প্রসারণের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে মণিপুরে জাতিগত সংঘাত শুরু হল। মেইতেই এবং কুকি-জো উপজাতির মধ্যে সে সংঘাত বাড়তে থাকল। দুর্বোধ্য কারণে ২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুরে জারি করা হল ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা।
এর মধ্যেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হল এক অকল্পনীয় নারী নির্যাতনের ভিডিও। জানা গেল — দু’জন মহিলাকে প্রায় এক হাজার জন লোকের ভিড় গণধর্ষণ করেছে। এতটা নৃশংসতা কোন স্তরের জাতিবিদ্বেষ থেকে জন্ম নিতে পারে? সত্যিই কি জাতিবিদ্বেষ? জাতিবিদ্বেষের মুখোশ পরে নারীবিদ্বেষ নয় তো?
মণিপুরে কুকি আর মেইতেই জনজাতির মধ্যে সংঘর্ষ হল। সেখানে বিরোধ কিন্তু হিন্দু আর মুসলিমদের মধ্যে নয়। জাতিদাঙ্গা সেখানে হিন্দু আর খ্রিস্টানদের মধ্যে। সংঘর্ষ হল দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী গোষ্ঠীর মধ্যে, কিন্তু তার মধ্যে নারী নির্যাতন ঢুকে পড়ল কীভাবে? নারী সেখানে শুধু গণধর্ষিতাই হলেন না। তাঁদের মর্যাদা ছিন্নভিন্ন করে আনন্দোল্লাসে মাতল বর্বরের দল। এই উল্লাস কেন? এ কি কেবল জাতিবিদ্বেষের প্রতিফলন?
এবার আবার সেই অ্যামাইটোসিস কোষবিভাজনের কথা ভাবতেই হচ্ছে। জীববিদ্যার ছাত্রছাত্রীরা জানেন — অ্যামাইটোসিস প্রক্রিয়ায় মাতৃকোষ বিভক্ত হয়ে সরাসরি দুটি অপত্য কোষ সৃষ্টি করে। এই ধরনের কোষবিভাজন প্রক্রিয়া প্রধানত নিম্নশ্রেণির জীবে — যেমন ব্যাকটেরিয়া, অ্যামিবা ইত্যাদিতে — দেখা যায়। কোনো মাধ্যমিক পর্যায় থাকে না বলেই এটি প্রত্যক্ষ কোষবিভাজন।
বিলকিস ধর্ষণের নৃশংসতাকে যদি জাতিদাঙ্গা চলাকালীন বিদ্বেষের একটা হঠাৎ বহিঃপ্রকাশ বলে ধরেও নেওয়া হয়, তা হলেও প্রশ্ন থেকে যায় — সেই ধর্ষণ না হয় সাম্প্রদায়িক ঘৃণার দ্বারা পরিচালিত ছিল, কিন্তু তাঁর শিশু কন্যার নির্মম হত্যা? কী ব্যাখ্যা তার?
এসব দেখে অ্যামাইটোসিস প্রক্রিয়ায় ঘৃণার কোষবিভাজন এবং কোষসংখ্যা বৃদ্ধির তত্ত্বটিকে আর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভুরি ভুরি উদাহরণ চারপাশে। ধর্মীয় বিদ্বেষ ধর্মের গণ্ডির সীমানায় আটকে থাকে না। এর মারণ অভিঘাত “ওরে সবুজ, ওরে আমার কাঁচা”দের জীবন ও চরিত্র — দুয়ের উপরেই পড়তে বাধ্য।
কনসিক্যুয়েনশিয়াল ড্যামেজ আর কোল্যাটেরাল ড্যামেজ আদতে কিন্তু এক নয়। সমাজের উপর দুটির অভিঘাতও এক নয়। ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ঘৃণার মুখের ওপর সজোরে দরজা বন্ধ করার সাহসটুকু না দেখালে, অচিরেই সেই কাটা খালের ঘোলা জল থেকে ভুস করে মাথা তুলবে নারীবিদ্বেষের সুযোগসন্ধানী কুমীর। অতঃপর শিশুবিদ্বেষের মতো বিকৃতমনস্ক সিরিয়াল কিলার।
এত রকম বিদ্বেষে দুষ্ট বাতাসে শ্বাস নেওয়ার জন্য অক্সিজেন থাকবে তো?
লেখক কাটোয়া শহরের বাসিন্দা — কবিতা,গল্প, উপন্যাস লিখতে ভালোবাসেন। ছোটবেলায় স্কুলে পড়তে গল্প দিয়ে লেখা শুরু — বর্তমানে আরও আনন্দ, সানন্দা ব্লগ কবি সম্মেলন, কবিতাপাক্ষিক, আরম্ভ, ধুলামন্দির, অক্ষর ওয়েব, দৈনিক বজ্রকন্ঠ, দৈনিক সংবাদ, তথ্যকেন্দ্র, যুগশঙ্খ, আবহমান, অপরজন, কৃত্তিবাসী ওয়েব, ম্যাজিক ল্যাম্প, জয়ঢাক, অংশুমালী, প্রভাতফেরী, দৈনিক গতি প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে অন্তরে আলো জ্বলে, শিশিরের ছৌ (কবিতা সংকলন), তিন-এ নেত্র সহ আরও অনেকগুলি বই প্রকাশিত হয়েছে।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।