Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
নিশীথের নিশাত
নিশীথের নিশাত

বসিরহাট শহরতলির কর্মব্যস্ততা যেখানে শেষ হয়, ঠিক সেখান থেকেই যেন শুরু হয় এক আদিম নিস্তব্ধতা। আমার কর্মস্থল থেকে গ্রামের বাড়ির দূরত্ব তেইশ কিলোমিটার। প্রত্যন্ত গ্রামে আমার বাড়ি, যেখানে সন্ধ্যার পর গণপরিবহন বলে কিছু নেই। অফিস থেকে প্রায়ই রাত করে ফিরি, তাই আমার বাহন বলতে ওই একখানা ১৫০ সিসির মোটরবাইক।

সেদিন অফিস থেকে বের হতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। শীতের রাত। হালকা কুয়াশার চাদরে মোড়া রাস্তাঘাট। বসিরহাট মূল শহর ছাড়িয়ে কিছুটা এগোতেই বিপত্তি। বাইকের পেছনের চাকাটা আচমকা টলমল করে উঠল। বুঝলাম, পাংচার।

আশেপাশে জনমানুষের চিহ্ন নেই, কেবল দূর থেকে ভেসে আসছে শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক আর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা সঙ্গীত। অগত্যা বাইক ঠেলে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যখন পাইকপাড়ায় পৌঁছালাম, তখন ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁইছুঁই। সৌভাগ্যবশত, এক পরিচিত গ্যারেজ মিস্ত্রি তখনও দোকান বন্ধ করেনি।

বাইক যখন ঠিক হল, রাত তখন আরও গভীর। শীতের রাতে গ্রামবাংলা তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। রাস্তায় আমি একা। বাইকের স্পিডোমিটারে কাঁটা সত্তর ছুঁয়ে ফেলেছে। যখন কাটকাটা স্কুল মোড় পেরিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি ফাঁকা রাস্তায় এক মহিলা হাত তুলে দাঁড়িয়ে। এত রাতে, এত নিঝুম পথে একা একজন মেয়ে! মনটা কেমন চমকে উঠল। যুক্তি আর আবেগের দ্বন্দ্বে শেষমেশ বাইক থামালাম। হেলমেটের কাঁচ তুলে তাকালাম মেয়েটির দিকে। হেডলাইটের ম্লান আলোয় তাকে দেখে মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। অপরূপ সুন্দরী, দীর্ঘাঙ্গী, ছিপছিপে গড়ন। তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু সেই ক্লান্তি তার সৌন্দর্যকে ম্লান করতে পারেনি।

অনুরোধের সুরে সে বলল, "দাদা, কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরছি। ট্রেন দেরি হওয়ায় অনেক রাত হয়ে গেছে। ভ্যাবলা স্টেশনে নেমে টোটোতে পাইকপাড়া পর্যন্ত আসতে পেরেছি। তারপর অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো গাড়ি পাইনি। তাই হেঁটে হেঁটে এখানে পৌঁছেছি। দয়া করে, আমাকে একটু লিফট দেবেন?"
"তোমার বাড়ি কোথায়?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"পিফা বাজার পার হয়ে যে বড় বাগান আছে, তার পাশের বাগানবাড়িতে নেমে যাব।"

আমি রাজি হলাম। মেয়েটি বাইকের পিছনে উঠল। আবার ছুটতে শুরু করলাম। তেঁতুলতলার কাছে রাস্তার সেই কুখ্যাত উঁচু বাম্পারটা পার হতে গিয়ে কড়া ব্রেক কষতে হল। অজান্তেই মেয়েটির হাতের আলতো স্পর্শ লাগল আমার পিঠে। এক অদ্ভুত, হিমশীতল শিহরণ খেলে গেল মেরুদণ্ড দিয়ে। মনে হল, কোনো জ্যান্ত মানুষের স্পর্শ নয়, যেন এক টুকরো বরফ আমার পিঠ ছুঁয়ে গেল। ভাবলাম, শীতের রাতে এত জোরে বাইক চালানোয় হয়তো মেয়েটির শরীর জমে গেছে।

পিফা বাজার পেরিয়ে সেই বড় বাগান আর দুর্ভেদ্য অন্ধকার অঞ্চলে এসে গাড়ি থামালাম। জায়গাটায় কেমন যেন গা ছমছমে ভাব। মেয়েটি নেমে ধন্যবাদ জানাল। "দাদা, আপনি আমার অনেক উপকার করলেন। ওই যে বাড়িটা দেখা যাচ্ছে, ওখানেই আমি থাকি। আমার বাবা-মা কেউ নেই। আপনি একদিন আসবেন আমাদের বাড়িতে, খুব খুশি হব।"

তাকে বিদায় জানিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলাম।

বাড়ি ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম, কিন্তু ঘুম আর আসছিল না। মনটা অদ্ভুত এক অস্থিরতায় খচখচ করতে লাগল। মেয়েটি যে বাগানবাড়ির কথা বলেছিল, তার চারপাশে ঘন আগাছার জঙ্গল — কোথাও কোনো জনমানুষের ছায়া নেই। আশপাশে ওই বাড়িটা ছাড়া আর একটিও বসতি নেই। অথচ তখন এসবের কিছুই আমার মাথায় আসেনি!

পরদিন ছিল ছুটি, তাই অফিসে যাইনি। সোমবার অফিসে যাওয়ার পথে সেই জায়গায় গিয়ে দেখলাম — বাড়িটি সত্যিই জরাজীর্ণ, অবহেলিত। এখানে কোনো মানুষ থাকতে পারে বলে মনে হয় না। আশপাশে খোঁজ নিয়ে জানলাম, বহু বছর ধরে বাড়িটি পরিত্যক্ত। বাড়ির মালিক থাকেন চৌমাথায়। বহু আগে একটা বাগানবাড়ি বানিয়েছিলেন এখানে। প্রথম প্রথম লোকজন থাকত, পরে অজানা কারণে আর কেউ থাকে না।

বাড়ি ফেরার পথে বাড়ির মালিকের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি জানালেন, "বাড়িটা আমি বাগানবাড়ি হিসেবে তৈরি করেছিলাম। ভাড়াও দিয়েছিলাম। কিন্তু যারা থেকেছে, তারা রাতে অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠস্বর শোনে, বাড়ির চারদিকে ছায়ামূর্তি ঘোরাঘুরি করতে দেখে। অনেকে ভয় পেয়েছে। সেই থেকে বাড়িটার বদনাম হয়ে আছে। কেউ আর থাকে না। বেশ কয়েক বছর ধরে পড়ে আছে ভুতুড়ে বাড়ি হিসেবে।"

গত পরশুদিনের ঘটনার কথা মালিককে কিছুই বললাম না। অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে আমার আগ্রহ বহুদিনের — বরং মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, এই বাড়িটাই ভাড়া নেব। একা থাকব এখানে; এই নীরব রহস্যের শেষ সত্যটা খুঁজে বের করেই ছাড়ব।

ইউটিউবে ভৌতিক গল্প আমার নিত্যসঙ্গী — রোজ রাতে একটা গল্প না শুনলে ঘুমই আসে না। ভূত আছে কি নেই, সেই তর্কের চেয়ে রহস্যের গভীরে ডুব দেওয়াই আমার কাছে বেশি রোমাঞ্চকর। অতিপ্রাকৃত নিয়ে ইতিমধ্যেই কয়েকটা প্রবন্ধ লিখেছি — হয়তো এখানেই নতুন লেখার রসদ পেয়ে যাব।

পরদিন মালিকের সঙ্গে আবার দেখা করলাম, বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ব্যাপারে কথা তুললাম। তিনি হতবাক। "সব শুনেও আপনি ওখানে?"
"হ্যাঁ," আমি দৃঢ়স্বরে বললাম। "কত ভাড়া নেবেন?"
তিনি বললেন, "আপনি যদি একমাস টিকে থাকতে পারেন, তবে ভাড়া নিয়ে কথা হবে। এই একমাস বিনামূল্যে থাকুন।" অবশ্য সতর্ক করে দিলেন, কোনো অঘটন ঘটলে তিনি দায়ী থাকবেন না।

পরপর দু’দিন অফিসে ছুটি নিয়ে দু’জন মজুরসহ বাড়িটা পরিষ্কার করতে গেলাম। বাড়িটা ঘুরে দেখলাম — দুটি শোবার ঘর, একটি রান্নাঘর, একটি বাথরুম, আর ছাদে ওঠার জন্য একটি সিঁড়ি রয়েছে। উঠোনের এক কোণে একটি নলকূপও আছে, যদিও তা সম্পূর্ণ অকেজো। কলমিস্ত্রিকে ডেকে সেটাও ঠিক করিয়ে নিলাম।

পরদিন বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সব জিনিস কিনে আনলাম — খাট, বিছানার চাদর, কম্বল, মশারি, হাঁড়িকুড়ি থেকে শুরু করে গ্যাসের চুলা পর্যন্ত। সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে নিলাম। সমস্যা একটাই — এখনই বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া যাবে না; কমপক্ষে পনেরো দিন লাগবে। তাই মোমবাতি আর টর্চ কিনে রাখলাম। মোবাইল আর টর্চ অফিসেই চার্জ করে নিলে — এই কয়েকটা দিন কোনোভাবে কাটিয়ে নেওয়া যাবে।

দুপুরে ভাত, আলুসেদ্ধ, মুসুরির ডাল আর ডিমের অমলেট বানিয়ে খেয়ে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমও এসে গেল। বিকেলে উঠে বাগানের চারদিকে একটু ঘুরে দেখলাম — অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না। বরং জায়গাটা বেশ ভালোই লাগল। মনে মনে ঠিক করলাম, এখান থেকেই অফিস করব। যদি এই বাড়িতে ঠিকমতো টিকে যেতে পারি, তাহলে পরিবারসহ এখানেই চলে আসব। তাছাড়া এখান থেকে অফিসের দূরত্বও কম, আর পাশেই মূল সড়ক থাকায় যাতায়াতও সুবিধাজনক।

শীতকাল বলে ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এল। ঘরে ফিরে মোমবাতি জ্বালালাম। চা বানিয়ে বারান্দার চেয়ারে গিয়ে বসলাম। বাইরে একটানা ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে চলেছে, দু-একটা রাতপাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই পরিবেশ ভয়ের বদলে আমাকে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন করল।

চা শেষে টর্চ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠলাম। শুক্লপক্ষের চাঁদের আলো এসে পড়েছে, জ্যোৎস্নার আলোয় সেই পোড়োবাড়ি আর জঙ্গল এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। বেশ ভালো লাগছিল। খানিকক্ষণ পর নিচে এসে রাতের খাবার বানালাম — রুটি আর সয়াবিন-আলুর তরকারি। খেয়ে বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। হঠাৎ এক তীব্র অথচ সুগন্ধে ঘুম ভেঙে গেল। কোনো সাধারণ সুগন্ধি নয়, এ যেন বহু পুরনো কোনো দামি আতরের গন্ধ। ঘরটা অন্ধকার থাকার কথা, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, সারা ঘর এক স্নিগ্ধ নীলাভ আলোয় ভরে গেছে। একটা মিহি গলায় অতীব সুন্দর নারীকণ্ঠের গানও শুনতে পেলাম। গানটা অনেকটা গজল বা সুফি কাওয়ালির মতো। সুরটা যেন বাতাসের সঙ্গে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমি উঠে বসলাম। বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে। ভয়? না, ঠিক ভয় নয় — এক চরম বিস্ময়।

সিঁড়ি দিয়ে কারও নামার শব্দ। ছম... ছম... নূপুরের আওয়াজ। আমার ঘরের দরজা আলতো ভেজানো ছিল। আমাকে আরও বিস্মিত করে দরজা ঠেলে সেই মিহি কণ্ঠের অধিকারিণী রানীর সাজে ঢুকল আমার ঘরে। তাকে দেখে অবাক হলাম — এ তো সেই বাইকে লিফট চাওয়া মেয়ে! তার সারা অঙ্গে নীলাভ আলোর বিচ্ছুরণ, মাথায় চিকচিক করছে অতীব সুন্দর এক সোনালি রঙের হিজাব। শান্ত স্মিত হেসে বলল, "আমি খুব খুশি হয়েছি। আপনি আমার কথা রেখেছেন, আমার বাড়িতে এসেছেন।"

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এটা কি স্বপ্ন? নাকি মায়াবিভ্রম? একটু সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করলাম — "তুমি? তুমি কে? দিনের বেলায় তো তোমাকে দেখিনি! আমি তো ভাবলাম বাড়িটা খালি।"

সে খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো অশুভ ইঙ্গিত নেই, আছে এক ঝরনার মতো পবিত্রতা। "আমি নিশাত," সে বলল। "আমি এখানেই থাকি। কিন্তু দিনের আলো আমার জন্য নয়। আমি আড়াল থেকে তোমার — সরি, আপনার — সব কার্যকলাপ দেখেছি। আপনি খুব সাহসী।"
"বেশ তো, তুমি আমাকে তুমি করেই বলো," আমি বললাম।

নিশাত বলে চলল — "আমি তোমাদের মতো মানুষ নই, তবে তোমাদের ধারণা অনুযায়ী ভূতও নই। আমি বা আমরা তোমাদের মতোই স্রষ্টার সৃষ্ট ভিন্ন এক সত্তা। আমাদের নিজস্ব জগৎ আছে এই পৃথিবীতে। তবে আমরা যেহেতু সূক্ষ্ম দেহের অধিকারী এবং যেকোনো রূপ নিতে পারি, আবার মিলিয়েও যেতে পারি, তাই নিজেদের জগৎ থেকে অনেক সময় তোমাদের জগতে এরকম পরিত্যক্ত স্থানে বসবাসও করি।"
"তোমার খাওয়া-দাওয়া হয়নি তো? কিছু খাবে?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে কোনো উত্তর না দিয়ে এক ইশারা করল। হঠাৎ দেখলাম আমার সামনে বিভিন্ন টাটকা ফল দিয়ে সাজানো একটা রুপোর থালা এসে হাজির।

"এই তো আমার খাবার," হেসে বলল সে। "নাও, এবার আমরা দুজনে মিলে একসাথে খাই।"

মেয়েটি একটা ফল কাটার ছুরি নিয়ে ফল কাটতে বসল। তারপর সেগুলো আমার সামনে নিয়ে নিজে ও আমাকে খাওয়াল। সুন্দরী সেই রমণী সত্যিই খুব সুন্দরী। তার রূপ ও নম্র আচরণ আমাকে মোহিত করে দিল।

এরপর নিশাত বলল — "চলো, এবার একটু ছাদে গিয়ে গল্প করি।"

আমি তাকে অনুসরণ করে ছাদে গেলাম। চন্দ্রালোকে নিশাতকে অতীব আকর্ষণীয় লাগছে — রুপোলি রঙের চুড়িদার, বেগুনি ওড়না, আর তার চারদিকে হালকা নীলাভ আলো, যেন হুর বা পরীর মতো।

"বাড়ি তো ভাড়া নিয়েছ, থাকবে তো আমার সঙ্গে এখানে, তোমার কোনো অসুবিধা নেই তো?" সে জিজ্ঞেস করল।
"একদিন আসার নিমন্ত্রণ করেছিলে, শেষমেশ আপাতত এক মাসের অতিথি হয়ে গেলাম," আমি বললাম।
"কাল তো তোমার অফিস। আমি শেষরাতে তোমার জন্য সকালের নাশতা ও অফিসের টিফিন বানিয়ে দেব। রাতের রান্নাও আমি নিজেই করে দেব। কাল থেকে তুমি নিশ্চিন্তে অফিস যাবে। আর হ্যাঁ, আমার কথা কাউকে বলবে না। এতে আমাদের উভয়ের মঙ্গল হবে।"

এরপর নিজেদের পরিচয়, অতীত, নানা গল্প নিয়ে অনেকক্ষণ আড্ডা চলল।

"চলো নিচে চলো," সে বলল। "তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে আমি রান্নাঘরে যাব।"
"তুমি ঘুমাবে না?" অবাক হয়ে বললাম।
"আমার ঘুমের সময় তো তোমাদের জগতে দিনের বেলা। চিন্তা কোরো না, তুমি অফিসে চলে গেলে আমি ঘুমিয়ে নেব।"

নিচে এসে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘুমের জন্য খাটে শুয়ে পড়লাম। নিশাত আমার পাশে বসে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। ম্যাজিকের মতো আমার দুচোখে ঘুম চলে এল। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম।

সকালে যখন ঘুম ভাঙল, ঘড়িতে আটটা বাজে। তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। চোখ কচলে দেখলাম পাশে কেউ নেই। সারা ঘর খুঁজলাম, কিন্তু নিশাতের কোনো দেখা নেই। রান্নাঘরে গিয়ে দেখি আমার জন্য সকালের নাশতা আর টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার সাজানো আছে। বুঝলাম গতরাতে আমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা ঘোর বাস্তব। আমি যে অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে ছিলাম, তা পেয়ে গেছি। এ সম্পর্কে আমার গবেষণার রসদ পেয়ে গেছি। স্নান সেরে অফিসের পথে রওনা দিলাম।

রাতে বাড়ি ফিরে দেখি ঘরে আগে থেকেই মোমবাতি জ্বালানো আছে। ব্যাগ রেখে পোশাক পরিবর্তন করছি, এমন সময় শুনলাম রান্নাঘর থেকে নিশাতের কণ্ঠ, "হাতমুখ ধুয়ে সতেজ হয়ে নাও, আমি তোমার জন্য চা তৈরি করছি।"

বাথরুমে গিয়ে সতেজ হয়ে ঘরে এসে দেখি নিশাত হাতে চায়ের কাপ। আমার দিকে মুচকি হেসে বাড়িয়ে দিল।

"কোথায় কী আছে তুমি সবকিছু এত সুন্দরভাবে খুঁজে নিয়ে আমার সামনে পরিবেশন করছ," চা খেতে খেতে আমি অবাক হয়ে বললাম। "সত্যিই অবাক হয়ে যাচ্ছি।"
"ভেবে নাও এটাই আমার অলৌকিকত্ব," সে হেসে বলল। "রাতের খাবার তৈরি রাখা আছে। সুতরাং এখন শুধু গল্প করব।"

তাকে নিয়ে জ্যোৎস্নায় ভরা ছাদে গেলাম। সেই অদ্ভুত নীলাভ আলো আর সেই অতীব সুন্দর আতরের গন্ধ আজও পেলাম। পরিবর্তনের মধ্যে মেয়েটির আজ সবুজ চুড়িদার আর আকাশি রঙের ওড়না। মাথায় সেই সোনালি রঙের হিজাব।

"তোমাদের জগৎ কেমন?" চাঁদের আলোয় বসে আমি জিজ্ঞেস করলাম। "তুমি সেই জগতে যাও না কেন?"
"যাই না কখন বললাম?" সে রহস্যের হাসি হেসে বলল। "সুযোগ পেলেই সেখানে ঘুরে আসি। আমার মানুষের জগৎ ভালো লাগে, মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালো লাগে। তাই বারবার ফিরে আসি।"

"সেদিন যে বলেছিলে কলকাতা থেকে ট্রেনে ফিরতে দেরি হয়েছে," আমি বললাম, "তাহলে কি তুমি সত্যিই কলকাতায় যাওনি?"
সে খুনসুটির স্বরে বলল — "তুমি কি মনে করো তোমাদের চারদিকে ঘনবসতি এলাকায় সবাই তোমাদের মতো মানুষ ঘুরে বেড়ায়? ওই মানুষের ভিড়ে আমরাও মিশে যাই, তোমরা ধরতে পারো না। যেই না ধরা পড়ার উপক্রম হয়, আমরা বাতাসে মিলিয়ে যাই। ব্যস, ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাই। আমরা ইচ্ছা করলে তবেই কেউ আমাদের প্রত্যক্ষ করতে পারে, বুঝলে মিস্টার?"

অতিপ্রাকৃত নিয়ে আগ্রহের বশে আমি জিজ্ঞেস করলাম — "আমাদের এখানে যেমন মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ আছে, আছে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, ভাষা — তোমাদের জগতেও কি তাই?"
নিশাত জানাল, "একদম। আমাদের জগতেও মানুষের মতো ভালো-মন্দ, বিভিন্ন জাতি ও গোত্র এবং ভাষাভাষী আছে। তবে আমাদের মধ্যে মন্দের ভাগটাই বেশি। আমরা অলৌকিক ক্ষমতাবলে যেকোনো ভাষায় পারদর্শী। আমরা দীর্ঘায়ুর অধিকারী — এক একজন প্রায় পাঁচ-ছয়শো বছর পর্যন্ত বাঁচে।"

আমি তাদের সত্তা সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহ প্রকাশ করলাম।

একটু নীরবতার পর সে বলল, "জানো? আমাদের পূর্বপুরুষরা এই পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই ছিল — সেই ডাইনোসর যুগেও। কিন্তু যেহেতু আমরা অপরাধপ্রবণ, তাই নিজেদের মধ্যে সর্বদা হিংসা, মারামারি, অপরাধ — এমন কোনো পাপকাজ ছিল না যে আমরা করিনি। ফলে স্রষ্টা ক্রুদ্ধ হয়ে আমাদের নির্বাসিত করেছিলেন সমান্তরাল ভুবনে। তবুও আমরা আসি — বাতাস হয়ে, ধোঁয়া হয়ে, কখনো মানুষ বা অন্য প্রাণীর রূপ ধরে।

যদিও আমরা এই জগতে আসতে পারি বা বিচরণ করতে পারি, কিন্তু পূর্বের মতো কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারি না বা আমাদের রাজত্ব কায়েম করতে পারি না। অশরীরী বা অন্য কোনো রূপে আমরা প্রকাশ পেতে পারি এই জগতে। এ ছাড়া পৃথিবীতে মানুষের কোনো ক্ষতি করা বা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো অধিকার আমাদের দেওয়া হয়নি। যদিও কিছু দুষ্ট সত্তা মাঝেমধ্যে ক্ষতি করতে উদ্যোগী হয়, কিন্তু ক্ষমতার কাছে তারা মানুষের সঙ্গে পেরে ওঠে না। কারণ মানুষ হলো সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তাই তোমাদের বিজ্ঞানও আমাদের সত্তাকে বিশ্বাস করে না।"

"যাই হোক," নিশাত আবার বলল, "আমি তোমাকে আমাদের জগতে নিয়ে যাব। আমাদের বাদশা খুব ভালো, এবং তোমাদের সত্তাকে ভালোবাসেন। তাঁর সঙ্গে দেখাও করাব।"
আমি জিজ্ঞাসা করলাম — "তোমাদের জগত দেখতে কেমন?"

নিশাত চোখ দু’টি আলতো করে বন্ধ করে বলল, "ছবির মতো অপূর্ব। আমাদের জগতে আকাশ সবুজাভ দীপ্তিতে ভরা, নদীগুলো দুধের মতো সাদা, চারদিক নীলাভ আলোর কোমল ঝলক। সেখানে কখনো পুরোপুরি দিন নামে না, আবার রাতও নামে না — এক অদ্ভুত সুধাময় আলোয় ভাসতে থাকে সবকিছু। কিন্তু মারামারি, অনাচার, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও নিজেকে সেরা প্রমাণ করার পূর্বের সেই ভাইরাস এখনও আমাদের মধ্যে বিদ্যমান।
"অহংকারই আমাদের সত্তার পতনের মূল কারণ। এই ঔদ্ধত্য আর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের বাসনাতেই আমরা অতীতে অগণিত অন্যায়, পাপ ও অনাচারে লিপ্ত হয়েছিলাম। সেই অপরাধের ফলেই আমাদের এই পৃথিবী থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। তবুও দুঃখের বিষয় — আমাদের অনেকেরই এখনো শিক্ষা হয়নি। যাক, আমরা যে রাজার অধীন, তিনি অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও সদাচারী স্বভাবের। তাই তোমাকে আমাদের জগতে নিয়ে যেতে তাঁর অনুমতি পেতে কোনো অসুবিধা হবে না।"

আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম নিশাতের কথা। তার মা-বাবা তাদের জগতে থাকেন। যেহেতু এই জগতে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই, তাই সে সেদিন বলেছিল তার মা-বাবা নেই।

"চলো," নিশাত নরম স্বরে বলল, "অনেক রাত হয়ে গেছে। কাল আবার তোমার অফিস — তাড়াতাড়ি ঘুমানো দরকার।"

নিচে ঘরে নেমে এসে আগের দিনের মতোই সে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল।

এভাবেই কেটে গেল একের পর এক দিন। নিশাতের সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত জীবন শুরু হল। প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে তার হাতে তৈরি খাবার খেয়ে যেতাম, রাতে ফিরে তার সঙ্গে ছাদে বসে গল্প করতাম। ধীরে ধীরে সেই পরিত্যক্ত বাগানবাড়ি হয়ে উঠল আমার আশ্রয়, আর নিশাত হয়ে উঠল আমার এক অদ্ভুত সঙ্গী।

একদিন নিশাত বলল, "তুমি তো একমাস টিকে গেলে। এখন তোমার পরিবারকে নিয়ে আসবে?"
আমি হেসে বললাম, "তাদের সঙ্গে তো তোমার কথা বলা যাবে না!"
নিশাত মুচকি হেসে বলল, "তুমি ঠিক করে নাও কী চাও। আমি তো এই বাড়িতেই থাকব। তুমি চাইলে তোমার পরিবার নিয়ে এসো, আমি আড়ালে থাকব। আবার চাইলে একাই থাকো আমার সঙ্গে।"

সেদিন অনেকক্ষণ ভাবলাম। এই অতিপ্রাকৃত সত্তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আমি কি সত্যিই এই দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকব? কিন্তু নিশাতের সঙ্গে কাটানো প্রতিটা রাত আমাকে আরও বেশি করে তার জগতের প্রতি আকৃষ্ট করছিল। তার গল্প, তার অলৌকিকতা, তার সঙ্গ — সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মায়ার জাল বুনছিল আমার চারপাশে।

আজও সেই বাগানবাড়িতে থাকি। নিশাত আমার সঙ্গেই আছে। অফিসের সহকর্মীরা মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করে, "একা একা থাকো? ভয় লাগে না?"
আমি হেসে বলি, "না, আমার কোনো ভয় নেই।"

তারা জানে না, আমি আসলে একা নই। প্রতি রাতে জ্যোৎস্নার আলোয় ছাদে বসে এক অচেনা জগতের গল্প শুনি। প্রতি সন্ধ্যায় ফিরে আসি সেই নীলাভ আলো আর আতরের সুগন্ধে ভরা ঘরে। প্রতি রাতে ঘুমাই এক অতিপ্রাকৃত সত্তার যত্নে।

অতিপ্রাকৃত নিয়ে আমার যে কৌতূহল ছিল, তার উত্তর আমি পেয়ে গেছি। কিন্তু এই উত্তর কাউকে বলতে পারি না। কারণ নিশাত বলেছে, "আমাদের গোপনীয়তাই আমাদের সুরক্ষা।"

হয়তো একদিন নিশাত আমাকে তার জগতে নিয়ে যাবে। সেই অচেনা রাজ্যে, যেখানে মানুষের মতোই এক সত্তা বাস করে — ভিন্ন নিয়মে, ভিন্ন ক্ষমতায়। সেদিনের অপেক্ষায় আমি প্রতিদিন ফিরে আসি আমার বাগানবাড়িতে, নিশাতের কাছে।

এই গল্প শেষ হয়নি। এটা আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের শুরু মাত্র।

মানুষের জ্ঞান সীমিত। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমরা কতটুকুই বা জানি? হয়তো আমাদের চারপাশে এমন অনেক সত্তা বিরাজ করে যাদের আমরা দেখতে পাই না, অনুভব করতে পারি না। নিশাতের গল্প হয়তো কল্পনা, হয়তো বাস্তব — তা বিচার করার দায়িত্ব পাঠকের।




আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

বিস্তারিত নিয়ম

একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।

আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top