মেকআপ রুমে বসে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে ময়ূরাক্ষী। ভয় করছে তার। বিভিন্ন রকম ভাবনা ভিড় করে আসছে মাথায়। হঠাৎই অর্গানাইজারদের ঘোষণা শুনে চমক ভাঙে তার। উঠে পড়ে সে। নিজের শিক্ষাগুরু ও ভগবানকে স্মরণ করে এগিয়ে যায় মঞ্চের দিকে। যত এগিয়ে যায়, ততই তার মনের মধ্যে দানা বাঁধতে থাকে ভয় — হেরে যাওয়ার ভয়, নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়, সর্বোপরি অসফল হওয়ার ভয়। হঠাৎই চোখে পড়ে, দূরে মঞ্চের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তার মা। চোখে তাঁর হাজার স্বপ্নের ঝলকানি। নিজেকে মৃদু ধমক দেয় ময়ূরাক্ষী, শুধু শুধু ভয় পাওয়ার জন্য। মঞ্চের মাটিতে হাত ঠেকিয়ে সেই ধুলো মাথায় স্পর্শ করে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যায় মঞ্চের উদ্দেশ্যে।
ময়ূরাক্ষী সেনগুপ্ত — কলকাতার নামকরা ওড়িশি নৃত্যশিল্পী। অত্যন্ত কম বয়সেই খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছে সে। আজ কলামন্দিরে তার একক অনুষ্ঠান। মঞ্চে ওঠার পর হাততালিতে ফেটে পড়ে অডিটোরিয়াম। দীর্ঘ ছয় মাস স্বেচ্ছা নির্বাসনের পর আজ আবার মঞ্চে পদার্পণ। আজ একক নৃত্য পরিবেশন করবে ময়ূরাক্ষী।
শুরু হল অনুষ্ঠান। একক নৃত্যশৈলীতে মুগ্ধ জনতা। এক দেবদাসীর ভূমিকায় ময়ূরাক্ষী যেন নিজের সবটুকু নিংড়ে দিতে উদ্যত। তার মুখভঙ্গি, তার মুদ্রা, তার চোখ — সব যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে এক অদ্ভুত সফল নারীর বার্তা দিয়ে গেল, যে আমৃত্যু তার নৃত্যে মুগ্ধ করে চলল তার পূজ্য দেবতাকে। ময়ূরাক্ষীও যেন ওই দেবদাসীর চরিত্রে একাত্ম হয়ে মুগ্ধ করে চলল তার দর্শকদের। বহু বার তার নাচ দেখলেও আজকের ময়ূরাক্ষী যেন অতুলনীয়।
নৃত্য পরিবেশনা শেষ হল। দেবদাসীর প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়ল তার দেবতার পদতলে। দর্শকদের অজান্তেই ময়ূরাক্ষীও মঞ্চে জ্ঞান হারাল। তড়িঘড়ি পর্দা নামিয়ে দেওয়া হল। ছুটে এলেন ময়ূরাক্ষীর মা।
মেকআপ রুমের ভেতর কান্নাজড়ানো স্বরে মিসেস সেনগুপ্ত বলে উঠলেন, "মাম, আর কেন? অনেক তো হল। এবার বাড়ি চল। এই ধকল নিতে পারবে না তোর শরীর।"
"মা, আমার শেষ কাজটা বাকি আছে। যাবার আগে সেটা আমায় করে যেতেই হবে।"
কথাগুলো বেরিয়ে এল কর্কট রোগে আক্রান্ত কঙ্কালসার চেহারায় পরিণত হওয়া ময়ূরাক্ষীর মুখ থেকে। তাকে আজ চেনার উপায় নেই।
মাইক্রোফোন হাতে বলতে শুরু করে ময়ূরাক্ষী, "আপনারা আমায় দেখে অবাক হচ্ছেন, জানি। এই কারণেই গত ছয় মাস আমি লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলাম। আমি ক্যান্সারে আক্রান্ত। আর হয়তো বড়জোর পনেরো-কুড়ি দিন আমার আয়ু। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে চাই। আমি বাঁচতে চাই আমার শিল্পের মাধ্যমে। আমি বাঁচতে চাই আমার স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে। তাই আজ এই শেষবারের মতো নিজেকে নিজের শৈল্পিক সত্তার হাতে সঁপে দিয়েছি। আমিও ওই দেবদাসীর মতোই নিজের ভগবানের পায়ে নিজেকে নিয়োজিত করেছি আজ। আমার সারাজীবনের রোজগার আমি আমার ইনস্টিটিউটে আমার ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের জন্য দিয়ে গেলাম। আমার স্বপ্ন-উড়ানের কাণ্ডারি তারাই। তাদের মধ্যেই বেঁচে থাকব আমি, আমার শিল্পীসত্তা।"
একটু আগেই যে অডিটোরিয়াম হাততালিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল, সেখানেই এখন পিনপড়া নীরবতা। দর্শকদের চোখে জল। বছর পঁয়ত্রিশের এই অসমসাহসী লড়াকু মানুষটার জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছেন কর্মকর্তারা। হঠাৎই কিছু বোঝার আগেই চেয়ারে বসা অবস্থায় ঢলে পড়ল ময়ূরাক্ষী। তড়িঘড়ি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল তাকে। আস্তে আস্তে খালি হয়ে গেল অডিটোরিয়াম। পিছনে পড়ে রইল একটা আবছায়া কথার রেশ আর একজন শিল্পীর দেখা স্বপ্ন।
একজন মৃত্যুপথযাত্রী শিল্পী তার স্বপ্নের রঙে রাঙিয়ে দিয়ে গেল আরও অনেক মানুষকে। আর তার সাক্ষী হয়ে রইল এক ভাবলেশহীন মঞ্চ। এগিয়ে চলল ময়ূরাক্ষী সেনগুপ্তের স্বপ্ন-উড়ান।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।