ভেবে দেখুন, একটা তাল — কিন্তু সাইজে একটা আস্ত বড়ো কুমড়োরও ডাবল, আর ওজনে একটা ১০-১২ বছরের বাচ্চার সমান! শুনলে মনে হবে কোনো সাইন্স-ফিকশন মুভির গল্প, তাই না? কিন্তু আমাদের এই পৃথিবীতেই এমন একটা অদ্ভুত গাছ আছে, যার নাম কোকো দে মের (Coco de mer)।
গল্পটা শুরু করা যাক কয়েকশো বছর আগে থেকে। তখনো মানুষ জানত না যে সেশেলস বলে ভারত মহাসাগরে কোনো সুন্দর দ্বীপপুঞ্জ আছে। কিন্তু মালদ্বীপ বা ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র সৈকতে মাঝে মাঝেই বিশাল সাইজের, অদ্ভুত দেখতে কিছু তাল বা নারকেলের মতো ফল ভেসে আসত। সাধারণ নারকেলের মতো গোল নয়, মাঝখান থেকে দু-ভাগে ভাগ করা।
যেহেতু ডাঙার কোনো গাছে এমন ফল কেউ কোনোদিন দেখেনি, তাই তখনকার নাবিকরা ভাবতেন — সমুদ্রের একদম তলদেশে বুঝি কোনো জাদুকরী বন আছে, আর এগুলো সেই জলের তলার গাছের ফল! এই বিশ্বাস থেকেই ফরাসিরা এর নাম দিয়েছিল 'কোকো দে মের', যার সোজা বাংলা করলে দাঁড়ায় 'সমুদ্রের নারকেল'। পরে অবশ্য ১৭৬৮ সালে ফরাসিরা সেশেলস দ্বীপে গিয়ে আসল গাছটার খোঁজ পায় এবং ভুল ভাঙে।
পাম প্রজাতির কোকো দে মের কিন্তু যে সে তালগাছ নয়, রীতিমতো গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এ নাম তোলার মতো কাণ্ডকারখানা এর। এর একটা বীজের ওজনই হতে পারে প্রায় ১৮ কেজি! আর একটা পুরো পাকা ফলের ওজন ৪৩ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। ভাবুন একবার, মাথায় পড়লে আর রক্ষে নেই! একটা বীজ থেকে জাস্ট অঙ্কুর বেরোতেই ১ বছর লেগে যায়। গাছটা বড় হয়ে যখন প্রথমবার ফুল ফোটায়, ততদিনে মানুষের বয়স ২৫ থেকে ৫০ বছর পার হয়ে যায়। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার কি জানেন? ফুল ফোটার পর একটা ফল পুরো পেকে গাছ থেকে খসে পড়তে ৬ থেকে ১০ বছর সময় নেয়! মানে একটা ফল পাকতে পুরো একটা দশক! আর আয়ুষ্কাল? এক-একটা গাছ বেঁচে থাকে ২০০ থেকে ৪০০ বছর পর্যন্ত!
তাছাড়া, এই গাছের কিন্তু পুরুষ আর মহিলা আলাদা হয়। মহিলা গাছে ওই বিখ্যাত 'ডাবল নারকেল' ধরে, আর পুরুষ গাছের ফুলগুলো দেখতে হয় লম্বা লাঠির মতো, যা প্রায় ১ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। মানুষের অঙ্গসংস্থানের সাথে মিলে যাওয়া রূপ নিয়ে সেশেলসের আদিবাসীদের মধ্যে অনেক রোমান্টিক লোকগাথাও প্রচলিত রয়েছে। ঝড়ের রাতে নাকি পুরুষ আর মহিলা গাছেরা হেঁটে এসে একে অপরের সাথে প্রেম করে! অবশ্য পুরোটাই গল্প, আসল কারণ হলো বাতাস আর ছোট ছোট টিকটিকি-পতঙ্গ, যারা পরাগায়ন ঘটায়।
কোকো দে মের-এর পাতাগুলোও বিশালাকার হয়, যা প্রায় ৬ মিটার লম্বা ও ৪ মিটার চওড়া হতে পারে। প্রাচীনকালে এই পাতা ঘরের ছাউনি তৈরিতে ব্যবহৃত হতো এবং এর খোলস দিয়ে তৈরি হতো মূল্যবান পাত্র। তবে বর্তমানে এই উদ্ভিদটি অত্যন্ত বিপন্ন (Endangered) প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তন, চোরাচালান এবং বনের আগুনের কারণে এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ আজ হুমকির মুখে। আজকের দিনে এই গাছ পৃথিবীর আর কোথাও নেই, শুধু সেশেলসের দুটো ছোট দ্বীপে (প্রসলিন এবং ক্যুরিউজ) টিকে আছে।
প্রাকৃতিকভাবে এই গাছের সংখ্যা এত কম যে সেশেলস সরকার এদের সুরক্ষায় জানপ্রাণ লড়িয়ে দিয়েছে। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট 'ভালে দে মে'-তে এই গাছগুলোকে কড়া মিলিটারি পাহারার মতো আগলে রাখা হয়। গাছের প্রত্যেকটা ফলের একটা ইউনিক নম্বর থাকে। আপনি যদি পর্যটক হিসেবে সেশেলস যান, আর একটা কোকো দে মের-এর খোলস স্মৃতি হিসেবে কিনতে চান, তবে তার জন্য সরকারি লাইসেন্স আর মোটা টাকা লাগবে। ওখানকার এয়ারপোর্টে স্পেশাল সার্টিফিকেট না দেখালে কাস্টমস আপনাকে জেলেও পুরে দিতে পারে! সেশেলসে একটা খোলসের দাম ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পরবে। আর ভারতে বসে অর্ডার দিলে? তখন দামটা ৭৮ হাজার থেকে শুরু করে এমনকি ২ লক্ষও ছাড়িয়ে যেতে পারে!
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।