লেখার শুরুতে একটা গানের লাইন মাথার ভিতর পাক খেয়ে যাচ্ছে — "পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে, স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে, ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী..."! ৩০ বছরের পুরোনো হলেও আজ যেন এ'গানটা আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক, কারণ এখনকার জীবন আটকে গেছে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার-এ।
পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসে শুধুমাত্র একটা ক্লিক করলেই কাজ হাসিল। সেটা ফোন-এ কথা বলা হোক বা প্রিয়জনকে সামনে থেকে দেখা, সবটাই এখন ইচ্ছের অধীন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এখন ফোন-এ শুধুই দুজন কথা বলছে তা নয়, সব কলই এখন যেন কনফারেন্স কল! কেউ যেন ক্রমাগত আড়ি পাতছে আমাদের জীবনে। অদ্ভুত এক রহস্যময় জীবন, হাতে ফোন থাকুক বা নাই থাকুক, কোনও এক অদৃশ্য গোয়েন্দার চোখ-কান সবসময় আমাদের উপর! আজ ধরা যাক আপনি কাউকে কোনও একটা দোকানের কথা বললেন, একটু পরেই দেখবেন সেই দোকানের বিজ্ঞাপন আপনার ফোন-এ বারবার এসে হাজির! বিরক্ত হলেও সেটাকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় আমাদের নেই। "সোনার কেল্লা" সিনেমায় উল্লেখিত "টেলিপ্যাথি" আজ "টেলি-প্যাথেটিক" হয়ে যাচ্ছে বহু ক্ষেত্রে।
শিল্প বিপ্লব হোক বা কম্পিউটার আবিষ্কার, সবসময়ই সেগুলো আলোড়ন সৃষ্টি করেছে মানুষের জীবনে। তেমনই AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যার সাহায্যে কিছু কাজ নিমেষে হয়ে গেলেও তার খারাপ প্রভাবও মানুষকে যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলছে। কিছু সংস্থার দাবি অনুযায়ী AI অনেক মানুষের কাজ নিমেষে করে দিতে পারে বলে বহু কর্মী তারা ছাঁটাই করছে, ফলে কাজ হারাচ্ছে বহু মানুষ। এমনই এক কারণে বছর দুয়েক আগে হলিউড-এর কলাকুশলীরা ধর্মঘট করেছিলেন।
রাইটার্স গিল্ড অফ আমেরিকা (WGA) এবং স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড – আমেরিকান ফেডারেশন অফ টেলিভিশন অ্যান্ড রেডিও আর্টিস্টস (SAG–AFTRA) তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে AI ব্যবহারের বিধিনিষেধের উপর একটি ঐতিহাসিক চুক্তি অর্জন করতে সক্ষমও হয়েছিল। যদিও তাতে এই কৃত্রিম মেধার কাজ বা অগ্রগতি আটকানো যায় নি, বরং প্রতিদিন নানা ভাবে সেটা জুড়ে যাচ্ছে আমাদের সাথে, সে গুগুল ম্যাপ হোক বা চ্যাটজিপিটি। সঠিক ভাবে প্রম্প্ট দিলে AI বিজ্ঞাপনের কপি লেখা থেকে মার্কেটিং স্ট্রাটেজি সবই বানিয়ে দিচ্ছে। ক্রিয়েটিভ বিভাগ থেকে শুরু করে মেডিক্যাল বিভাগ — সব জায়গায় থাবা বসাচ্ছে এই AI. এক্ষেত্রে ধারণা করা যেতে পারে ভবিষ্যতে আরও মানুষ কাজ হারাতে চলেছেন!
তবে এর ভাল কিছু প্রয়োগও লক্ষ্য করা গেছে। যেমন, খুব সম্প্রতি সৃজিত মুখার্জী তাঁর "অতি উত্তম" সিনেমায় বাঙালির চিরকালের সিনেমার আইডল নায়ক উত্তম কুমারকে পর্দায় আবার জীবন্ত করে তুলেছেন। আবার অনেক কঠিন হিসেব বা তথ্য খুব সহজেই সামনে নিয়ে আসছে এই কৃত্রিম মেধা। বাইরে যেমন জটিল সার্জারি খুব সহজেই সেরে ফেলছে কৃত্রিম মেধা! পড়াশোনার ক্ষেত্রেও কৃত্রিম মেধার ব্যবহার অনেক জিনিস সহজ করে দিচ্ছে ছাত্রদের কাছে। যেকোনো জটিল সমীকরণ মিনিটেই সমাধান করে দিচ্ছে AI. এসব শুনে মনে হয় যেন প্রফেসর শঙ্কুর কোনও গল্প পড়ছি। যদিও বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে আজ এসব গল্প হলেও সত্যি।
তবে এর অদূর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে এই কৃত্রিম মেধার একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা ঠিক করে দেওয়া দরকার। একই কথা বলেছেন AI-এর ‘গডফাদার’ রূপে পরিচিত জেফ্রি হিন্টন।
তার মতে "এই প্রযুক্তিতে লাগাম না পড়ালে এর পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে"! তাই বলা যায় এই কৃত্রিম মেধার ভাল আর খারাপ দুই গুণই আছে, ঠিক ছোটবেলায় পড়া "বিজ্ঞান অভিশাপ না আশীর্বাদ" রচনার মতো। তবে ভালটা নির্ভর করছে আমরা কীভাবে সেটাকে মানব-কল্যাণে ব্যবহার করছি তার উপর।
শুধু যন্ত্র নির্ভর অনুভূতি শূন্য হয়ে আমরা কখনোই থাকতে পারবো বলে মনে হয় না! কারণ আমরা আজও সেই সমাজবদ্ধ প্রাণী, যারা একসাথে সুখ দুঃখের সাথী হয়ে জীবন কাটাতে চাই। তাই ভবিষ্যতে AI যতই আগ্রাসী হোক, হীরক রাজাদের স্তব্ধ করে গুপী গাইনরা চিরকালই গেয়ে উঠবে, "নহি যন্ত্র, নহি যন্ত্র, আমি প্রাণী..."।