“আসুন সবে খেলাধুলা করি,
সুস্থ-বিনোদনে জীবন উপভোগ করি!”
আমরা উন্নতির সোপানের যত ঘোড়া দাবড়াই না কেন। মানব শরীর মূলত প্রগাঢ় প্রাচীন! মানুষের শরীর আধুনিকতায় বসবাস করলেও মানব মন খোজে প্রশান্তি, একটুখানি আরাম। দেহ-মন কখনো কখনো চায় হুল্লোড় কিংবা শুনশান নীরবতা৷ খেলাধুলা দেহ-মনকে যেমন আন্দোলিত করে তোলে, তেমনি এটাই আবার উপভোগ্য হয়ে উঠে।
খেলাধুলা হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখে
খেলাধুলা করলে হৃদপিণ্ড দ্রুত ও শক্তিশালীভাবে কাজ করে। এতে সিস্টোলিক এবং ডায়াস্টোলিক ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকে। Aerobic খেলাধুলা (যেমন দৌড়, সাঁতার) VO₂ Max বাড়ায়, অর্থাৎ শরীর কতটা অক্সিজেন কাজে লাগাতে পারে তা উন্নত হয়।
পেশি ও হাড় মজবুত হয়
ওয়েট-বিয়ারিং (weight-bearing) খেলা যেমন বাস্কেটবল বা ফুটবল, হাড়ের মধ্যে ক্যালসিয়াম জমাতে সহায়তা করে এবং osteoblast কোষ সক্রিয় করে, যা হাড় গঠনে সাহায্য করে। এছাড়া, নিয়মিত খেলাধুলা করলে সারকোমিয়ার সংখ্যা ও আকার বাড়ে, যার ফলে পেশির শক্তি বাড়ে।
মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি
খেলাধুলা করলে মস্তিষ্কে ব্রেইন-ডেরাইভড নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর (BDNF) নিঃসৃত হয়, যা নিউরনের বিকাশ ও সংযোগ তৈরিতে সাহায্য করে। ফলে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে।
হরমোন নিঃসরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি
খেলাধুলা করলে এন্ডোরফিন, ডোপামিন, সেরোটোনিন ও অক্সিটোসিন নিঃসরণ ঘটে, যা শরীরে স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেয় এবং বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ কমায়।
উদাহরণ: ৩০ মিনিট হাঁটলে এন্ডোরফিনের মাত্রা গড়ে 27% পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতা বৃদ্ধি
নিয়মিত খেলাধুলা NK (Natural Killer) কোষ ও T-লিম্ফোসাইট সক্রিয় করে, যা ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত কোষ ধ্বংস করে। মাঝারি মানের ব্যায়াম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
আজকের কথিত এই আধুনিককালে আমরা মানুষরা যেনো বড্ড বেশি বস্তুবাদী যান্ত্রিক মানবে পরিণত হয়ে গেছি বা হচ্ছি৷ ভোর থেকে রাত কিংবা ঘুমানো থেকে জেগে উঠা অবধি মোবাইল, টিভি, ল্যাপটপ, এসি-ফ্যান এমনকি প্রাকৃতিক খাবারের জায়গাও দখল করে নিয়েছে বার্গার, পিজ্জাসহ আরো কত কি? পরিশেষে প্রশ্ন উঠছে, শরীর-মনের অদ্ভুতসব বেড়াজালে এবং জাগতিক নিয়মের ইঁদুর-দৌড়ে আমরা আসলে কতটুকু বেচেঁ আছি বা আদৌ বেচেঁ আছি?
নাগরিক জীবনের পছন্দ-অপছন্দ, কথা-কাজগুলো নিত্যদিনের চলা-ফেরায় আমাদের আচার-ব্যবহারেও প্রতীয়মান হয়! সাধারণত আজকের সময়ে আমরা পরিচিত-অপরিচিত কিংবা স্বল্প পরিচিত কারো সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করার চেয়ে অন্যান্য কথায় বেশি মগ্ন থাকি! যেমনঃ দু বন্ধুর আলাপে কে কেমন আছে, কতটুকু ভালো-মন্দ জীবন কাটছে এর চেয়ে বেশি কথা হয় কার কি আছে! কে কি করছে এসব নিয়ে।
সভ্যতার মতো আমাদের জীবন,আচার-আচরণও যেনো যান্ত্রিক হয়ে উঠছে দিন-দিন। সেখানে বলা যায়, নেই তেমন কোন মায়া-মমতা, ভালোবাসা, সুন্দর আবেগ-অনুভূতি। মানুষ যেনো ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠছে এক জীবন্ত রোবট, জীবন্মৃত এক রক্তে-মাংসে গড়া কংকাল! ফলাফল, সভ্যতা থেকে জীবন সব বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
জীবন-সম্পর্কের জটিল ধাধাঁয় মিলিয়ে যাচ্ছে মানবিক গুনাবলীগুলো! প্রশ্ন হতে পারে আমাদের তাহলে করণীয় কি? আমাদের করণীয় আছে অনেক। যেমনঃ
১) সুস্থ বিনোদনোর আয়োজন, ২) মানুষের সাথে মানবিক সম্পর্কের উন্নয়ন, এবং ৩) ব্যাপক জনসচেতনা বৃদ্ধি ইত্যাদি।
মানুষ কিংবা পশুপাখির যখন রোগ হয় তখন আমরা ওষুধ খাই বা খাওয়াই। আর যখন সভ্যতার অসুখ হয়, সভ্যতা বিষিয়ে উঠে তখন উপায়?
সভ্যতার সংস্কার জরুরি সুস্থ সংস্কার। সভ্যতার সংস্কারের বেশ কিছু পদ্ধতি রয়েছে। যেমনঃ কল্যাণকর শিক্ষা, সুস্থ বিনোদনের অভ্যস্ততা, যথাসম্ভব মানবিক হবার প্রতিযোগিতা ইত্যাদি৷ এসবের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে মানবিক উদার-ভালোবাসা, শ্রদ্ধা-স্নেহ বাড়ানো সম্ভবপর হতে পারে।
সভ্যতার উন্নতি একদিকে যেমন মানুষের জন্য সুন্দর হয়ে উঠেছে তেমনি এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমাদের সুস্থ জীবনের জন্য হয়ে যাচ্ছে ভয়ংকর বিপদসংকুল। সভ্যতার উন্নয়নে একশ জন শ্রমিকের কাজ হয়তো এক জনেই করা যাচ্ছে কিন্তু এতে সময় বেচে যাচ্ছে। ফলে বাড়তি সময় মানুষের জন্য নানামুখী আলস্যে কাটছে। আর আমরা জানি যে, সাধারণত অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা! এর ফলে সমাজে নানাবিধ সামাজিক নীতি-নৈতিকতা বহির্ভূত কার্যকলাপ অহঃরহ ঘটছে। সুস্থ মানসিকতার বিকাশ, সমাজে মাদকসহ অন্যান্য অপকর্ম রুখতে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
খেলাধুলা শিশুদের বিকাশ এবং মানসিক, সামাজিক ও স্নায়ুবিক সমন্বয় উন্নত করে। নিয়মিত খেলাধুলা করলে শরীর, মন এবং মস্তিষ্কের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। যেমনঃ
পেশি ও হাড় — পেশি শক্তিশালী ও হাড় ঘনত্ব বৃদ্ধি; অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ।
মস্তিষ্ক — BDNF বৃদ্ধির মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা বাড়ায়।
মানসিক স্বাস্থ্য — এন্ডোরফিন, সেরোটোনিন ও ডোপামিন নিঃসরণ → বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ হ্রাস।
ইমিউন সিস্টেম — T-সেল ও Natural Killer কোষ সক্রিয় → সংক্রমণ প্রতিরোধ।
ডায়াবেটিস ও স্থূলতা — ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি ও গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা।
ঘুমের মান — Circadian Rhythm নিয়ন্ত্রণ করে গভীর ও প্রশান্ত ঘুমে সহায়ক।
সুস্থ বিনোদনে দেহ-মন হোক বিশুদ্ধ,
ভালো ভালো কাজে নিয়ত হোক পরিশুদ্ধ!