“তুমি কফিতে চিনি নাও না?” – আজকাল এমন প্রশ্ন প্রায়শই শোনা যায় বাঙালি বন্ধুদের আড্ডায়। এক সময় যেখানে সকাল শুরু হতো লাল চা আর পরোটা দিয়ে, আজ সেখানে ‘ওটস’, ‘গ্রিন টি’ বা ‘স্মুদি’ জায়গা করে নিচ্ছে। বাংলা জীবনের পরতে পরতে, আচরণে, খাদ্যে, ভাষায় এক অদ্ভুত বিদেশি ছাপ এসে গেছে। অনেকেই বলেন ‘এটা তো আধুনিকতা’, কেউ কেউ আবার বলেন, ‘বাঙালি স্বকীয়তা হারাচ্ছে।’ তবে প্রশ্নটা শুধু হারানো বা পাওয়ার নয়, বরং বদলে যাওয়া জীবনের গতিপথ বোঝা।
বাংলা এখন আর আগের মতো নেই। “আমি একটু আউটডোরে যাচ্ছি”, “তুমি এই কনসেপ্টটা বুঝেছো?” – এসব বাক্য আজ শহুরে বাঙালির দৈনন্দিন ভাষার অংশ। ইংরেজি শব্দের প্রভাবে বাংলা আজ এক ধরনের 'হাইব্রিড ভাষা' হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কথোপকথনে ইংরেজি শব্দ ছাড়া একটাও বাক্য খুঁজে পাওয়া ভার। এর একটা দিক বলছে, ভাষা প্রাণবন্ত হচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে, খাঁটি বাংলা শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে, ভাষার শুদ্ধতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হয়তো আগামী প্রজন্ম 'পায়েস' শব্দ না জেনে শুধু ‘রাইস পুডিং’ বলেই চিনবে এই খাবারটিকে।
বাংলার খাদ্যসংস্কৃতি চিরকাল বহুকৌণিক, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি খাবারের প্রতি আগ্রহ যেন বাড়ছেই। ‘পাস্তা’, ‘সুশি’, ‘বার্গার’, ‘সিজলিং ব্রাউনিজ’—এসব এখন আর অভিজাত রেস্তরাঁয় সীমাবদ্ধ নেই, মলে, ক্যাফেতে, এমনকি টিউশন সেন্টারের পাশেও এসবের দাপট।
এক সময় দুপুর মানেই ভাত, ডাল, মাছ। এখন অনেক ঘরেই দেখা যায় লাঞ্চে ম্যাক অ্যান্ড চিজ বা হট ডগ। খাবারের এই বদল জীবনযাপনের ছন্দে নতুনতা এনেছে ঠিকই, তবে লোকজ রেসিপিগুলি যেন ধীরে ধীরে হিমঘরে চলে যাচ্ছে। তবে খুশির কথা এই যে, অনেকেই এখন “ফিউশন” ধারায় বাঙালি উপকরণ দিয়েই বিদেশি খাবার বানাচ্ছেন—যেমন, পোস্ত দিয়ে পাস্তা, বা কাসুন্দি চিজ ডিপ!
শাড়ির বদলে গাউন, পাঞ্জাবির বদলে হুডি—বাঙালি পোশাকেও এসেছে এক বড়সড় পরিবর্তন। এখন পুজোর ফ্যাশন মানেই হাই-ওয়েস্ট জিনসের সঙ্গে কুর্তি বা ব্লাউজের সঙ্গে জ্যাকেট। তরুণ প্রজন্মের কাছে ফ্যাশন মানেই ‘ইনস্টাগ্রাম ট্রেন্ড’। ফলে পোশাক নির্বাচনেও পাশ্চাত্য স্টাইল এখন বড় ফ্যাক্টর। তবে এখানে একটা আশার দিক আছে—অনেকেই পুরনো পোশাককে নতুনভাবে তুলে ধরছেন, যেমন- জামদানী শাড়ির সঙ্গে স্নিকার্স, বা ধুতি-শার্টের সঙ্গে সানগ্লাস। একে বলা যায় বাঙালিয়ানার আধুনিক রূপ।
বিদেশি প্রভাব শুধু বাহ্যিক রূপেই নয়, মানসিক কাঠামোতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, এবং ‘নিজের মতো করে বাঁচা’—এই ধারণাগুলোর জন্ম পাশ্চাত্য চিন্তায়, কিন্তু আজ তারা বাঙালি সমাজে গৃহীত ও প্রতিষ্ঠিত। আজকের বাঙালি মেয়েরা শুধু শাড়ি বা সংসারে সীমাবদ্ধ নন—তাঁরা বিদেশে পড়তে যান, একা ভ্রমণ করেন, আর কর্পোরেট মিটিংয়ে নেতৃত্ব দেন। পাশ্চাত্যের শিক্ষা ও সংস্কৃতি তাঁদের আত্মবিশ্বাসের রসদ দিয়েছে।
বিদেশি প্রভাব মানেই যে নিজের সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলা, তা নয়। বরং, সময়ের দাবি মেনে বাঙালির রুচি ও জীবনধারা তার রূপ পাল্টাচ্ছে। এই রূপান্তর একদিকে যেমন উদ্বেগের, অন্যদিকে তেমনই সম্ভাবনার। কারণ, যেই জাতি ‘রবীন্দ্রসংগীত’ গাইতে গাইতে কফি হাউসে কোল্ড কফি খায়, বা লাল পাড় শাড়ির সঙ্গে হাই হিল পরতে জানে, তারা হারিয়ে যায় না—বরং নতুন সময়কে আপন করে নেয়, নিজের মতো করে।
লেখিকার জন্ম এবং ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা দূর্গাপুর টাউনশীপে। স্নাতক বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রানীগঞ্জ উইমেনস কলেজে। বিবাহসূত্রে ১৯৯৬ সাল থেকে কলকাতা নিবাসী। লেখার প্রতি আগ্রহ সেই ছোট থেকেই । তা সে উপন্যাস হোক বা ছোটগল্প কিম্বা আর্টিকেল। ভালোবাসেন তাঁর লেখার মধ্যে সমাজের বিভিন্ন দিকের ছবি ফুটিয়ে তুলতে।