ডায়েট। শব্দটা শুনলেই আমাদের মাথার মধ্যে চলে আসে একজন স্বাস্থ্যবান ব্যক্তির চিত্র, যিনি কি না নিজের স্বাস্থ্য কমানোর জন্য নানা উপায় চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমরা যারা নিউট্রিশন সম্পর্কে অল্প স্বল্প ধারণাও রাখি, তারা জানি যে “শুধুমাত্র না খেয়ে” স্বাস্থ্য কমানো অথবা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়। এরজন্য দরকার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা যা কি না লম্বা সময় ধরে মেইনটেইন করতে হয়। আর একজন স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি যে শুধুমাত্র নিজের ওজন কমানোর জন্য ডায়েট করবেন, বিষয়টি এমনো না! বরং প্রতিটি মানুষেরই নিজের শারীরিক সুস্থ্যতার জন্য ডায়েট চার্ট মেইনটেইন করা উচিৎ।
“বিড়ালের ডায়েট চার্ট” শব্দটা শুনেও যদি এমনটা মনে হয় যে, কোনো গলুমলু বিড়ালের স্বাস্থ্য কমানোর জন্যই শুধুমাত্র ডায়েট চার্ট দরকার, তাহলেও সেটা ভুল ধারণা করা হবে। বিড়ালের ডায়েট চার্ট একদম জন্মের পর “Neonate” অবস্থা থেকে শুরু করে তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মেইনটেইন করা উচিৎ যেন সে একটি সুন্দর এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে পারে।
আমাদের বিড়ালের যেকোনো রোগ হলেই আমরা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই, বিভিন্ন মেডিসিন দিয়ে তার রোগ ভালো করার চেষ্টা করি, তার পিছনে সময় ও শ্রম সবই দিই, কিন্তু ডায়েট ঠিক না থাকার কারণে অনেক রোগই আবার ফিরে আসে। আর বিড়ালের অনেক রোগেরই একটা মূল কারণ থাকে তার খাদ্যাভাস।
যেমন — কোনো বিড়ালকে যদি অনেক বেশি পরিমাণে ড্রাই ক্যাট ফুড খাওয়ানো হয়, তাহলে তার শরীরে ফ্যাট জমে obesity হয়ে যেতে পারে। আবার যদি কোনো বিড়াল অনেক কম পানি খায়, তাহলে তার urinary tract disease হতে পারে, কিডনির সমস্যা হতে পারে। বিড়াল বেশ কিছু প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং অ্যামাইনো অ্যাসিড নিজের শরীরে তৈরি করতে পারে না। যেমন — Taurine, Vitamin-A, Vitamin-D, Niacin ইত্যাদি। এইসব ভিটামিন এবং অ্যামাইনো অ্যাসিড গুলো অবশ্যই বিড়ালের খাবারে preformed থাকতে হয়। যদি দীর্ঘসময় ধরে এই উপাদানগুলো বিড়ালের খাবারে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তা একসময় গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রোগ সৃষ্টি করতে পারে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই রোগ গুলো আর কখনো ভালো হয়ে উঠে না, বরং এই রোগের সাথেই বিড়ালকে বসবাস করতে হয়, যা কি না বিড়ালের ও তার owner উভয়ের জন্য কষ্টকর।
এইসব রোগ থেকে বেঁচে থাকার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে ডায়েট চার্ট! এখন তাহলে প্রশ্ন আসছে যে ডায়েট চার্টটা আসলে কি?
বিড়ালের ডায়েট চার্ট হচ্ছে তার দৈনন্দিন খাবারের প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে তৈরি একটি সম্পূর্ন তালিকা যেখানে তার প্রতিদিনের খাবারে কতটুকু প্রোটিন লাগবে, কতটুকু ফ্যাট লাগবে, পানির পরিমাণ কতটুকু লাগবে, ঘরে বানানো খাবার অথবা ড্রাই বা ক্যানড ফুড এর পরিমাণ কেমন হবে আর ট্রিট কেমন হবে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা দেয়া থাকে। আর এটা হয় সম্পূর্ণ personalized!
অর্থাৎ তার বয়স, ওজন, শারিরীক অবস্থা, দৈনন্দিন কর্মকান্ড, বর্তমানের খাবারের চাহিদা, ফিউচার গোল সব মিলিয়ে একটি পূর্নাঙ্গ চার্ট যা কি না শুধুমাত্র ঐ একটি বিড়ালের জন্যই প্রযোজ্য। ডায়েট চার্টে একদিনের প্রয়োজনীয় খাবারের পরিমাণ বেশ কয়েকভাগে ভাগ করা থাকে। যেমন — সকালের খাবার, নাস্তা, দুপুরের খাবার, বিকালের স্ন্যাক্স, রাতের খাবার, ট্রিট ইত্যাদি। এছাড়াও আরো অনেক ভাগে ভাগ করা যেতে পারে বিড়ালের অবস্থার উপর ভিত্তি করে। একেক বিড়ালের চাহিদা যেমন একেকরকম, তাই তাদের ডায়েট চার্টও একেকরকম হয়। এমনকি একই বিড়ালের দুই ছানার ডায়েট চার্ট দুই রকম হতে পারে যদি তাদের শারিরীক অ্যাক্টিভিটি বা শরীরের রোগ বালাই এর ভিন্নতা থাকে।
ডায়েট চার্ট আসলে একটি সারা জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া যেখানে কি না আপনাকে কন্টিনিউয়াসলি একজন ভেটেরিনারিয়ানের সান্নিধ্যে থাকতে হবে, প্রতি মাসে একবার চেক আপ করিয়ে তার ওজন, শারিরীক অবস্থার উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কে অবগত হতে হবে এবং সে অনুযায়ী ডায়েট চার্টে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। বিড়ালের শারিরীক সুস্থ্যতার জন্য আপনার সিদ্ধান্ত একটি বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে।
সুতরাং আপনার বাসায় যদি এক বা একাধিক বিড়াল থেকে থাকে, তাহলে তার বা তাদের জন্য পার্সোনালাইজড ডায়েট চার্ট তৈরি করা এবং মেইনটেইন করার মাধ্যমে আপনি যেমন তাদেরকে একটি সুন্দর জীবন উপহার দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন, তেমনি আপনার মানসিক প্রশান্তি অর্জনের পাশাপাশি দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকতে পারবেন।
লেখক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি ভি এম ও সার্জারিতে এম এস সম্পন্ন করেছেন। তিনি NSU’র ল্যাংগুয়েজ লীগ ২০১৯-এ স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ে প্রথম এবং ২০২৫ সালে WaterAid আয়োজিত ইভেন্টে সেরা দশ গল্পকারের একজন। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন। বর্তমানে লেখালেখির পাশাপাশি স্মল অ্যানিম্যাল প্রাক্টিশনার হিসেবে নিয়োজিত আছেন।