স্বামী স্ত্রী আলাদা থাকেন।
না, কোনো ঝগড়া হয় নি। দুজনের সম্পর্কে চিড় ধরিয়ে কোনো তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশও ঘটে নি। এমনকি ভালোবাসারও খামতি হয় নি। একে অপরের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ খুবই সুখী এক দম্পতি। যাকে বলে পারফেক্ট কাপল। এমনও নয় যে স্বামী স্ত্রী দুর্ভাগ্যবশত বা পৃথক কর্মক্ষেত্রের কারণে আলাদা থাকতে বাধ্য হয়েছেন।
তবু স্বামী স্ত্রী নিজেদের ইচ্ছায় একই শহরে আলাদা থাকেন।
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, ভারতে শিক্ষিত শহুরে অনেক দম্পতির মধ্যেই এই ধরণের বিবাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে প্রাধান্য পাচ্ছে। পশ্চিমের দেশগুলিতে তো আগেই এই ট্রেন্ড ছিল, গ্লোবালাইজেশনের সুবাদে এখন এ দেশেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিবাহিত দম্পতি বিবাহের পরে একে অপরের থেকে আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এঁদের বলে LAT কাপল। LAT, অর্থাৎ Living Apart Together — এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে দুজন বিবাহিত বা কমিটেড মানুষ ভিন্ন বাড়িতে থাকেন। উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যায় বুকার প্রাইজ বিজয়ী লেখিকা অরুন্ধতী রায় ও তাঁর স্বামী প্রদীপ কৃষেন-এর। দিল্লিতে তাঁরা পৃথক বাড়িতে থাকেন।
সেপারেশনে থাকা দম্পতিদের কিন্তু LAT বলা যায় না। LAT কাপলদের সম্পর্কের মধ্যে কোনো টানাপোড়েন নেই। বরং সবসময় একসাথে না থাকার দরুন তাঁদের রোমান্স পিরিয়ডটা আর শেষ হতে চায় না। সম্পর্কের মধ্যে স্পার্কটা বজায় থাকে। আধুনিক যেসব দম্পতি ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং গোপনীয়তাকে মূল্য দেন, LAT তাঁদের সেই ব্যক্তিত্ব সংরক্ষণের সুযোগ দেয়। লাইফস্টাইলে কোনোরকম আপোষ না করেও একজন জীবনসঙ্গীর সাহচর্য লাভ করা যায়।
দূরত্ব দুজন কমিটেড মানুষের হৃদয়বন্ধনকে আরও জোরদার করে তুলতে পারে। তাঁরা একে অপরের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি করে অ্যাপ্রিশিয়েট করতে পারেন। সব সময় কাছে না পাওয়ার জন্য ভালোবাসার মানুষকে যখন কেউ মিস করে, তার সাথে প্রতিবার দেখা হওয়াটাই অনেকটা নতুন প্রেমিক বা প্রেমিকার দেখা পাওয়ার মতো অনুভূতি জাগায়। একসাথে দেখা করার এবং সময় কাটানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা সেই মুহূর্তগুলিকে আরও বিশেষ করে তোলে। তাকে কাছে পাওয়ার সময়টুকুতে যেকোনোরকম নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হওয়ার সম্ভাবনা এড়িয়ে চলা হয়।
কাপলদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, দায়িত্ব ইত্যাদির জন্য যে ক্রমাগত অ্যাডজাস্টমেন্ট ও কম্প্রোমাইজের প্রয়োজন হয়, তার থেকে অনেক সময়ই দ্বন্দ্ব ও হতাশার সৃষ্টি হয়। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে এতো বছর আমাদের সমাজে দম্পতিরা সেটা সামলেছেন কি করে? উত্তর — সহ্য করে। নিজেকে পরিবর্তন করে। নিজের পছন্দ ও ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে। এবং বেশিরভাগ সময় এটা মহিলারাই করেছেন। কিন্তু আজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন একজন নারী হয়তো সেই কম্প্রোমাইজটা করবেন না। এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকারে বিশ্বাসী একজন আধুনিকমনস্ক পুরুষও চাইবেন না তাঁর স্ত্রী কম্প্রোমাইজ করে সংসার করুন। নিজের প্রতি ভালোবাসা ও পার্টনারের প্রতি ভালোবাসার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা থেকেই কমবয়েসী দম্পতিদের মধ্যে LAT ব্যবস্থা ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে।
LAT সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস। নয়তো আলাদা থাকার ফলে ভুল বোঝাবুঝি এবং নিরাপত্তাহীনতা মাথা চাগার দেবে। LAT কাপলরা পরিমিত হলেও নিয়মিত একে অপরকে সময় দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেন। অনেকেই প্রতিদিন ভিডিও কল-এর মাধ্যমে কথা বলেন এবং সপ্তাহান্তে একসাথে সময় কাটান।
LAT কাপলরা 'মি টাইম' এবং 'উই টাইম'-এর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে বিশেষ পারদর্শী হয়ে থাকেন। 'মি টাইম' তাঁদের নিজের অনুভূতি বুঝতে ও আগ্রহ অনুসরণ করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে 'উই টাইম' সঙ্গীর সাথে হৃদয়বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। একটি সুস্থ সুন্দর সফল সম্পর্কের জন্য 'মি টাইম' এবং 'উই টাইম'-এর মধ্যে ভারসাম্য রাখাটা খুব জরুরি। সে LAT কাপল হোক, কি একটি ট্রাডিশনাল কাপল।
পাঠকবন্ধুর মতামত কি? LAT কি আধুনিক জীবনধারার নিখুঁত সমাধান? নাকি বিবাহপ্রথার ঐতিহ্যের অপমৃত্যু?
লেখিকা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে এমবিএ। স্কুলজীবন থেকেই পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত; বর্তমানে একটি এডুকেশন কনসালটেন্সির ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবারের সঙ্গে ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। সুইজারল্যান্ড থেকে কাশ্মীর — দীর্ঘদিনের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতায় বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চল তাঁর দেখা। 'উদ্যোগ' ওয়েব ম্যাগাজিনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে যুক্ত আছেন।