কোনো নির্দিষ্ট কবিতায় সরাসরি পৌঁছতে কবির নামের ওপর ক্লিক করুন —
আকাশ
পাগল দার্শনিক
সুনীলদা পাহাড় কিনতে পেরেছিলেন কিনা —
সে খবর ইতিহাস জানে,
আমার জানা নেই।
তবে এ বছরের দুর্গাপুজোর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে
আমার ইচ্ছে কেবল, নতুন জামা কাপড় নয়,
একখণ্ড নয়, একটি প্রকাণ্ড আকাশ কেনার।
ধূসর চিতার উজ্জ্বল চামড়ার শালের মতো
গভীর অথচ দীপ্ত — এক আকাশ,
যার গায়ে সন্ধ্যার রক্তিম ছোপ
আর ভোরের নীল নৈঃশব্দ একসঙ্গে লেগে থাকে।
ছোটবেলা থেকেই
আমি তার দাম হিসেবে জমাচ্ছিলাম —
একটি করে আধুলি,
একটু করে বিস্ময়,
একটু করে একাকীত্ব,
আর অনেকটা নীরব স্বপ্ন।
এখন পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাঠের দিকে হাত বাড়িয়েছি,
এতদিনে মনে হয় হিসেব মিলেছে —
এই মুদ্রায় নিশ্চয়ই আকাশ কেনা যায়।
সেই আকাশে আমার স্বপ্নগুলি ইচ্ছে খুশি উড়বেই
নীল হাওয়ার বুক চিরে ওঠা
সমুদ্রের স্ফীত, মাতাল বেলুনের মতো সাদা মেঘেরা —
কখনো চাঁদের পাহাড়ে ঠেস দিয়ে,
কখনো তারাদের মাথায় মাথায়
দুরন্ত শকুনের মতো উড়িয়ে নিয়ে যাব দূর দিগন্তে।
যে নক্ষত্রেরা হাজার হাজার বছর আগে
নিভে গিয়েছে অজানা অন্ধকারে,
আমি জানলার ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে
এক এক করে আবার সাজিয়ে দেব —
ইচ্ছে মতো, অবহেলায়, মমতায়।
এই আকাশে মৃত্যু নেই,
তারাখসা নেই,
আছে কেবল পুনরাবিষ্কার —
জীবনের মতোই ধীর,
জীবনানন্দের রাতের মতোই গভীর।
লেখক সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনায় তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব অনুভূতির ভুবন, যেখানে জীবনদর্শন, প্রেম, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক ভাবনা এক অনন্য মেলবন্ধনে ধরা দেয়। পেশায় একজন সরকারি কর্মচারী হলেও অন্তর্লোকে তিনি নিরন্তর এক সাধক-লেখক। তাঁর ছদ্মনাম “পাগল দার্শনিক”— যা তাঁর সাহিত্যচিন্তারই প্রতিফলন: প্রশ্নমুখর, অনুভবনির্ভর এবং অস্তিত্বসন্ধানী।
মেলাতে পারি না
প্রতীক মিত্র
মেলাতে পারি না।
অন্ত্যমিল থাকে না।
ঘেমো দিন যাপন
কতটা কাব্যময় হতে পারে?
জানলার কাছে
আকাশ খুলে রাখা আছে।
আখ্যানের এইটুকুই সব নয়।
দীর্ঘ পথ জুড়ে
দাবী-দাওয়া-আপোষ ছড়ানো।
সেগুলো কুড়িয়ে,
সুগন্ধি ফুলের মতন মাড়িয়ে
মেলে না, তবু বেশ কিছু জিনিস মেলে না।
চরিত্র আসে-যায়
কিছু প্রাসঙ্গিকতার ভারে গ্যাঁট হয়ে বসে,
কিছু বিস্মৃতির মতন ভাসে হাওয়ায়।
বন্ধু ভেবে যারা বাড়ায় হাত
তাদের জন্য যদি
রাখতে পারতাম কোনো নদী
সম্ভাবনার কিম্বা সঞ্চিত আবেগের খয়রাত!
সময় ছকে দেয় সীমানা।
আগামীর নকসাও যেন তার জানা।
চিত্রকল্প গল্পে কতটা বদল পারে?
মেলে না, অন্ত্যমিল থাকে না।
ঘেমো দিন কি আদৌ কাব্যময় হতে পারে?
সেদিনের কথাগুলি
রামিজ আলি খাঁন
সেদিনের সেই আজগুবি কথাগুলিকে
আজ একটু একটু করে বুঝতে শিখেছি;
কতটা কঠোর হয়ে সেই শব্দগুলো,
আমার সব ব্যঙ্গ-বিদ্রূপকে
আপন করে নিয়েছিল —
প্রভাতের কিরণ আসতেই
তা চকচক করছে নজরে৷
নক্ষত্রের সমাবেশে,
সেই অক্ষরগুলির দীপ্তি,
কেন জানি না,
রামধনু হয়ে ওঠেনি সেইদিন?
সুর-তাল-নাচের ছন্দময় কাব্যে-বেমানান,
বেসুরো,অস্পষ্ট আর অতিরিক্ত হয়ে
চুপ থাকার কৌশলটি
তারা বেশ রপ্ত করে নিয়েছিল!
কান্না যে পায় নি, তা নয়;
তবে অশ্রু আসে নি কোনোদিন৷
তবুও ঘোমটায় মুখটিকে ঢেকে
সেদিনের সেই বর্ণমালাগুলি
শক্তিহীন হয়ে থেকেছিল;
শুধু এই বিশ্বাসে যে,
একদিন ঠিক প্রস্ফুটিত হবে বসন্ত এলে৷
আদালতে সেদিনও বিচার বসেছিল,
দলিল শুনে সবাই হেসেছিল;
মান-অভিমানের কুরুক্ষেত্রে
শুধু জয়-পরাজয়েরই গুরুত্ব বেড়েছিল৷
নগ্নতার তামাশায়
পোশাকের সরু সুতোগুলো ঢিলে হয়ে পড়েছিল;
আরও সুন্দর অনুভূতি দিতে!
আজ সেই কথাগুলোকে তাই
বেশ গাঢ় গাঢ় মনে হচ্ছে৷
হঠাৎ যেন কে তাদের কলেবর বাড়িয়ে দিয়েছে৷
হাসি-ঠাট্টার সঠিক সময়টি এখনই এসেছে৷
কিন্তু মন অসহায় হয়ে বুঝতে চায়ছে —
কোনটা ছায়া আর কোনটা মরীচিকা?
অন্ধ সমাজের নস্টালজিয়া
মৃন্ময় সরকার
চোখ বাঁধা প্রজন্মের নির্ভুল দাবার চালে
শৃঙ্খলিত মন্ত্রী, কখনো নৌকা, কখনো গজ —
সাত সমুদ্র পেরিয়ে পরাজিত অন্ধ সমাজ।
যেন চায়ের কাপের তলানিতে পড়ে আছে
সুগার-লেস শুষ্ক চুম্বন।
সপ্তলোক ছাড়িয়ে প্রতিভার আলো,
তবু নরম কাদার মতো অঙ্কে কাঁচা
এই নস্টালজিক সমাজে প্রতিষ্ঠিত প্রতিভা
অন্ধের জয়ের মতো মুগ্ধ।
শার্টের বোতাম খুলে বৈশিষ্ট্যহীন জন্মদাগটি
চোখে আসার মতো;
বাকি সব থৈথৈ জলে
উৎসাহহীন হাবুডুবু সমাজব্যবস্থা।
রাজা আর প্রজায় শুধু আড়াই চালের সম্পর্ক।
দাসত্বের জীবনে পত্রালাপ
যেনভুল করে সর্বনাশ ডেকে আনা।
গন্তব্যহীন জলপথ — নিশ্চিত নীলনদ,
অথবা অরুন্ধতীতে শিমুল তুলোর মতো
মিশে যাবে; আঙুলে বাঁধা ঘুড়ির মতো,
উড়ে যাবে ভবিষ্যৎ।
পানপাতায় ঢাকা সমাজে,
ক্ষতবিক্ষত ঠোঁটের পদচিহ্নে
আদর মাখাবে গালে।
অনায়াসে বুঝে যাবে,
মুগ্ধতায় মিশে আছে মিসিসিপি।
অন্ধ প্রেমিক সমাজের বুকে
তিল ছাড়া পায়নি কিছু আর।
আমার দুঃখেরা
মলয় সরকার
সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই,
তার সাথে ঝুপ ঝুপ করে নামে —
অদৃশ্য দুঃখের ধারাপাত।
ধীরে ধীরে কিলবিল করে
ঢুকে পড়ে স্থানু শরীরে।
বিছানায় বিষাদের বালিশ মাথায় দিই,
বিষাদময়ী ঘুমায় পাশেই।
দুঃখেরা দাপাদাপি করে সারারাত
অতৃপ্ত বিছানা জুড়ে।
ভোরের আলোয় ভৈরবী বাজে,
কোথায় লুকিয়ে পড়ে দুঃখের দল।
আমি গালে মুখে সুখের পাউডার ক্রীম মাখি;
নিজেকে মিশিয়ে দিই —
সারাদিনের সুখের বাজারে।
লেখক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ক আধিকারিক। বহুদিন ধরে লেখালেখি করছেন। দেশে ও বিদেশে বহু পত্রপত্রিকায় নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত বই তিনটি। অনুবাদের জন্য সোনালী ঘোষাল স্মৃতিপুরস্কার পেয়েছেন। অনুবাদ, গল্প, কবিতা ও ভ্রমণকাহিনিতে স্বচ্ছন্দ। নেশা দেশে-বিদেশে ভ্রমণ, উদ্যানচর্চা ও বইপড়া। সমাজসেবায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ম্যাজিক
বিশ্বনাথ বসাক
যদি ম্যাজিক হতো
খুশিটাকে ব্যাগে পুড়ে ছুঁড়ে দেব দুখীর কোলে,
হাসির মুখোশ পরিয়ে থামিয়ে দেব
কান্নার আর্তনাদ।
বালির শুষ্ক নীরবতায়
হঠাৎ জল বেলুনের ফোয়ারায়
ওই যে শুনি,
নতুন সাগরের উল্লাসের সংবাদ।
কাগজের প্লেনটাকে উড়িয়ে
খবর নেব পাখীদের;
বৃষ্টির সিঁড়ি বেয়ে উঠে দেখবো
মেঘেদের ঘরটাকে।
মেরুরেখায় চেপে —
পৃথিবীর হৃদস্পন্দন আসবো শুনে;
ফুলে ফুলে ভ্রমরের গল্প-ছায়ায়,
ছোঁব তাদের মনটাকে।
সব অযাচিত মিথ্যেকে
সত্যের দ্বারা সম্মোহিত করি,
ভালোবাসার পরমাণুর বিস্ফোরণে
হিংসার বিনাশ ঘটে।
এমন এক আশ্চর্য প্রদীপের আলোয়
অন্যায় অদৃশ্য হয়।
একটা আগুনের ফুলকি মশাল হয়ে জ্বলে ওঠে।
আয়নার ওপারের শহরটায়
এক লাফে চলে যাই,
রিমোট দিয়ে পর্দায় শৈশবটাকে একবার দেখি —
ইচ্ছের ট্রাম লাইনে
রেলগাড়ির শব্দ শোনার ইচ্ছা পূরণ।
রামধনুর রং নিয়ে এসে
হই দোল উৎসব মুখী।
ছেঁড়া তারের ঐ গিটারে
মন পাখির সুর বেজে ওঠে আগামীর।
গল্প পড়ি —
কোনো এক অনামী বইয়ের ভেতর
সোনার কাঠির ছোঁয়ায় পাই
কোনো প্রাণ বিন্দুর স্পর্শ।
কানামাছি খেলে হঠাৎ খুঁজে ফেলি —
পরশ পাথর।
অজানা ঠিকানা
তীর্থ মুখার্জী
মিথ্যে বোনা জালে আমি
জড়িয়ে আজকাল,
প্রতারণার ঠান্ডা স্রোতে
হারিয়েছি যে তাল।
শুকনো বুকের ওঠানামা
শুধুই দীর্ঘশ্বাস,
দ্রবীভূত হৃদয় আমার
ধোঁয়ায় যে হাঁসফাঁস।
খেলা চলে জিতিয়ে দেওয়ার,
এই তো অন্ধকার,
হেরে গিয়েও বিজয় মিছিল
হাঁটার অধিকার।
সূর্য ডুবলে সময় তখন
রাতের নাগালে,
সন্ধ্যে হলেই তৈরি থাকে
সব আলোর আড়ালে।
কোন মুখোশের আড়ালে
কোন মানুষের মুখ,
অত্যাচারের অস্ত্র দিয়ে
ছিনিয়ে নেয় সে সুখ।
তীব্র লোভের জ্বালায় বাঁচে
মানুষগুলো আজ,
বিবেক বেচে স্বার্থ কেনে,
এ কেমন সমাজ?
সত্যের কণ্ঠ রুদ্ধ করে
চলে মিথ্যার জয়গান,
মানুষ আজ নিজের কাছে
নিজের ভগবান।
আয়নাতে মুখ দেখে আজ
যায় না কেন চেনা,
কোন পথে যে হাঁটছি সবাই,
গন্তব্য আজ অজানা।
নাস্তিক
অরবিন্দ নাহা
কেউ যদি আমাকে নাস্তিক বলেন
বলতেই পারেন,
কারণ,
আমি প্রতিমাকে মা বলে মনে করি না!
মাত্র ক'টা দিন ধোপ-দূরস্ত পোশাক পড়ে
হাতে ফুল-বেল পাতা নিয়ে
তার সামনে জোড়-হাতে অবোধ্য মন্ত্র উচ্চারণ করে
যার অর্থ আমি বুঝিনা —
জানিনা প্রতিমাও বোঝেন কিনা!
অঞ্জলি দিয়ে নিজের পাপস্থালন?
— অসম্ভব।
তাতে কেউ যদি আমাকে নাস্তিক বলেন —
বলতেই পারেন।
যারা গর্ভধারিণী মাকে খেতে দেয় না,
মায়ের সম্পত্তি গ্রাস করবে বলে
তার মৃত্যুর প্রত্যাশায় দিন গোনে
শুধুমাত্র স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সুখে থাকবে বলে —
তারা নাস্তিক।
আমি বরং পথের ধারে বসে থাকা
কোন এক অভুক্ত মাকে
যদি একবেলা পেট ভরে খাওয়াতে পারি —
সেটাই হবে আমার
বিশ্বের সমস্ত গর্ভধারিণী মাকে দেওয়া
শ্রেষ্ঠ পুষ্পাঞ্জলি।
তারপরও যদি আমাকে কেউ নাস্তিক বলেন —
বলতেই পারেন।
লেখক জন্মগ্রহণ করেন ৩ জুন, ১৯৫২ সালে। সাহিত্যচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই তাঁর নাট্যকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ। নিজস্ব নাট্যদল "আবিষ্কার"-এর জন্য তিনি ছদ্মনামে নাটক রচনা ও পরিচালনা করেছেন। তাঁর চারটি নাটক আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত হয়েছে। কলেজ স্ট্রিটের "সাহা বুক স্টল" থেকে "বিকর্ণ সেন" ছদ্মনামে তাঁর দশটি নাটকের বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া "এস চক্রবর্তী" প্রকাশনা সংস্থা থেকে তাঁর স্বনামে একটি কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছে। নাটক তাঁর সৃষ্টির প্রধান ক্ষেত্র হলেও, কবিতা তাঁর অন্তরের ভালোবাসা।
স্মৃতির বালুচরে
ওয়াহেদ কাজী
অচেনা পথেই তবে হেঁটে যায় মন,
অজানা মেঘের দেশে স্মৃতির গুঞ্জন।
যে কথা রয়নি মুখে নীরব ভাষায়,
খুঁজে ফিরি তারে আজ কোনো এক আশায়।
অভিমানের বালুচরে স্বপ্নের ভিড়,
দমকা বাতাসে ভাঙে হৃদয়ের নীড়।
স্মৃতির পাতায় জমে কাচের মত,
যতনে রাখা আছে ভালোবাসা যত।
ভাঙা গড়া খেলায় কাটে অলস প্রহর,
থমকে দাঁড়িয়ে আছে বিষাদের শহর।
অপেক্ষা লেখা থাকে সময়ের গায়ে,
দূরত্ব বাড়ে রোজ চেনা দুটি পায়ে।
বুকভাঙা হাহাকার বাতাসে ভেসে,
আশ্রয় খুঁজে ফেরে কোনো দূর দেশে।
অকূলে ভাসিয়ে তরী খুঁজি কিনারা,
রাতের আকাশে আজও আমি দিকহারা।
যদি কোনো দিন ফের দেখা হয়ে যায়,
পুরোনো বচনে যেন মন না হারায়।
ক্ষতের দাগেই থাক প্রেমের স্বাক্ষর,
নিঝুম আঁধারে জ্বলুক ভালোবাসার অক্ষর।
লেখক ১৯৯৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কাজী আব্দুস সালাম এবং মাতা কোহিনুর বিবি। জন্ম, বেড়ে ওঠা ও বর্তমান বসবাস পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙার দেবকুণ্ড গ্রামে। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক। স্কুলজীবন থেকেই তাঁর লেখালেখির সূচনা। মূলত কবিতা লিখলেও ছড়া ও ছোটোগল্পও লেখেন। সাহিত্যজগতে তাঁর প্রথম পদার্পণ ইংরেজি একক কাব্যগ্রন্থ "The Poetry By Soul"-এর মাধ্যমে। ২০২৪ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর বাংলা একক কাব্যগ্রন্থ "হৃদয়ের এপিটাফ"। বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকায় তাঁর কবিতা, ছড়া ও ছোটোগল্প প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি ক্রিকেট তাঁর অন্যতম নেশা।
সেই প্রেমিক কে
অনুপ্রীতি বোড়েল
আমি যে কী ভীষণভাবে তোমায় চাই,
তুমি যদি জানতে!
যেদিন তোমার ফোন কল আমার ঘুম ভাঙায়,
সেই দিনগুলোতে হাজারো শোকসভা
আমার দিনটাকে ধূসর করতে পারে না।
তোমার জন্য মন কেমন করা বিকেলগুলোতে
ছাদে যাই, পাখি দেখি। তুমি জানো না,
পরিযায়ী হতে ইচ্ছে করে আমার।
লাস্যময়তা আমার আসে না,
স্বভাবতই আসে না।
কিন্তু তুমি জানো না,
তোমার জন্য কী ভয়ঙ্কর সাহসী হতে পারি আমি।
আমি সাদা রং ভালোবাসি,
কিন্তু প্রখর গ্রীষ্মের রক্তাভ কৃষ্ণচূড়া
আমায় ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
এক পৃথিবী ভালোবাসা বিলিয়েও
ভীষণ রকম দুঃখবিলাসী আমিটাই
বড্ড হিংসুটে।
তুমি জানো না,
তোমায় ভালোবেসে
কত অহংবোধকে জয় করেছি আমি।
ক্ষমতা কখনো অমর নয়
বিশ্বজিৎ মানিক
জীবন ভাগ করা উঠোনে ঘুঁটি সাজিয়ে বসে,
প্রত্যেকের চোখে জয়ের গোপন সাধ।
কেউ রাজা হয়ে ধীর পায়ে চলে,
কেউ সৈনিক হয়ে এগিয়ে যায়,
ফিরে আসার অধিকার নাই তার।
মন্ত্রীর ভুল চালে অনেক স্বপ্নের মৃত্যু,
ঘোড়া বাঁকা পথে লাফিয়ে যায় উন্মাদনায়।
তার গন্তব্য ঠিক করে দেয় অন্য কেউ।
হাতি সোজা পথে হাঁটে,
সব পথ সবার জন্য নয়।
নৌকা চলে ত্রাণকার্যে।
সময়ের নির্দেশে মন আর বুদ্ধি এক না হলে
কাটা পড়ে, বদলে যায় সম্পর্কের সমীকরণ।
কখনো নিজের মানুষকেই উৎসর্গ করে
জয়ের আশায় —
জয়টাও আসলে পরাজয়।
শেষে রাজাকে ঘিরে
যখন সব রাস্তায় কিস্তি পড়ে,
তখন বোঝা যায়,
ক্ষমতা কখনো অমর নয়।
লেখক ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম মহকুমার আমলীঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখা কবিতা, অণুগল্প ও পত্ররচনা ত্রিপুরা, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা ও ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নিঃশব্দ কোলাহল’ কলকাতার আনন্দ প্রকাশন থেকে ১ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত হবে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
মাঝি ও যাত্রী
নিখিল চক্রবর্তী
মাঝি! উত্তালতায় ধ্বংস চেয়ে
কোন তরঙ্গ তোমার নায়ে
হানছে গোলা-শেল,
চাইছে কাড়তে হিংস্র হাতে
তোমার নায়ের প্রতিবাদী হাল?
কোন তুফান দিচ্ছে ছিঁড়ে মুক্ত পাল
স্তব্ধ করতে যাত্রী পারাপার?
যাত্রী, তুমি ঢেউ-তুফানের ভয়াল রূপে
হচ্ছ কেন কাতর?
এ তো নিত্যদিনের লড়াই মোদের
নদীর কোলে উথাল জলে।
দেখছো না, হচ্ছে সারাই ব্যস্ত হাতে
নায়ের ফুটোয়, হালে, পালে,
উঁচিয়ে ওঠা লক্ষ হাতে
তোমার আমার সাথি হয়ে সামাল দিতে
পারাপারে বাধার প্রতিকূলে।
দেখছি, মাঝি, দাঁড়িয়ে কূলে অবাক চোখে,
তুমুল জঙ্গে, তুফান-তরঙ্গে তোমার সঙ্গে
আসছি ছুটে শঙ্কা ছেড়ে বাধা তোড়ে
সওয়ার হতে তোমার নায়ে
অপর পারের নাগালে।
লেখক ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম মহকুমার আমলীঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখা কবিতা, অণুগল্প ও পত্ররচনা ত্রিপুরা, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা ও ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নিঃশব্দ কোলাহল’ কলকাতার আনন্দ প্রকাশন থেকে ১ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত হবে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
ক্ষুধার্ত
অপরাধী মাজেদ
আমি চক্ষুসম্মুখে যা পাই,
তাই গিলে খাই।
আমি ক্ষুধার্ত — ক্ষুধার্ত কুকুর যেমন
রাস্তার পাশে পড়ে থাকা
আবর্জনা থেকে খাবার খোঁজে,
আমিও ঠিক তেমনি।
ক্ষুধার জ্বালায় এমন কিছু আমি ভক্ষণ করি,
যা আদৌ খাদ্য নয়।
মাংসাশী ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন
ক্ষুধার তাড়নায় আর কিছুই দেখে না,
আমিও ঠিক তেমনি।
নিজের কাঁথা, কম্বল, বালিশের খোল —
ক্ষুধার উন্মাদনায়
খুবলে খুবলে ছিঁড়ে খাই।
আমি এতটাই ক্ষুধার্ত —
হয়তো কোনো একদিন
পুরো মানচিত্রটাই ছিঁড়ে খাব।
লেখক এলাকায় মাজেদ মিয়া নামে পরিচিত। ‘অপরাধী মাজেদ’ নামে কবিতা লেখেন। ১৯৯৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর গ্রামে জন্ম। পিতা মোঃ ইদ্রিস মিয়া ও মাতা রোকিয়া বেগম। স্থানীয় উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হক কলেজ থেকে এইচএসসি ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করে বর্তমানে একটি এনজিওতে কর্মরত।
সুবর্ণরেখার পাড়ে আমি
মানস করমহাপাত্র
পড়ন্ত দুপুর।
সুবর্ণরেখার বুকের উপর
রোদটা সোনার মতো গলে পড়ছে।
আমি দাঁড়িয়ে আছি কাঠের নৌকোর গায়ে,
সামনে অনন্ত জল,
পেছনে থেমে থাকা দিন।
ঝাড়খণ্ডের নাগরি পাহাড় থেকে নেমে এসে
পশ্চিমবঙ্গ আর ওড়িশার সীমানা ছুঁয়ে
বঙ্গোপসাগরে নিজেকে মিশিয়ে দেয় যে নদী,
নাম তার সুবর্ণরেখা।
সোনার রেখার মতোই সে একসময় বয়ে নিয়ে যেত সোনা,
আর আজ বয়ে নিয়ে যায় আমার সব পুরনো গল্প।
নৌকোগুলো চুপচাপ শুয়ে আছে পাড়ে,
আমারই মতো।
কখনো ঢেউয়ের সাথে লড়াই,
কখনো পাড়ে বাঁধা অপেক্ষা।
জীবনটাও তো এমনই —
কখনো ভেসে যাওয়া,
কখনো তীরে আটকে থাকা।
হাওয়ায় ভাসে দূরের গাছের সারি,
ওপারে মাঠ,
এপারে আমার নীরবতা।
আমি ভাবি, এই জল কত যুগ দেখেছে।
সাঁওতাল পরগনার কান্না,
ব্রিটিশ আমলের জাহাজ,
জেলের জাল আর মাঝির গান।
সব ধুয়ে নিয়ে যায়,
তবু নিজে থেকে যায়।
আমার ভেতরের নদীটাও স্মৃতি বয়ে নিয়ে যায়।
মানুষ বদলে যায়,
তবু একই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকি।
কিছু দুঃখ, কিছু প্রাপ্তি, কিছু না-পাওয়া —
সব জমে জমে একটা চর হয়ে যায় বুকের মাঝে।
সূর্য হেলে পড়ছে পশ্চিমে।
জলের রং এখন আর সোনালি না,
একটু গাঢ়, একটু বিষণ্ণ।
ঠিক আমার মনের মতো।
তবু দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগে।
কারণ সুবর্ণরেখা শিখিয়েছে —
বয়ে যেতেই হবে।
থেমে গেলে পচে যাবে।
ক্ষত নিয়ে, ঘোলা জল নিয়ে,
সাগরের দিকে যেতেই হবে।
এই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে
আমি নিজেকেই নতুন করে চিনি।
আমি নৌকোও, আমি পাড়ও।
আমি স্রোতও, আমি স্থবিরতাও।
পড়ন্ত দুপুর ফুরিয়ে আসে,
কিন্তু নদী থেকে যায়।
আর আমি…
আমিও থেকে যাই
এই সোনার রেখার টানে।
ধুলোর শরীরে আলোকচিহ্ন
আবরারুল হক মনির
কীভাবে আলো এসে ছুঁয়ে দেয় মৃত আসবাব,
কীভাবে সে চিনে নেয়
বহু বছর আগে বন্ধ হওয়া জানলার ফাটল —
এ এক আশ্চর্য নীরবতার ব্যাকরণ।
মেঝেতে জমে থাকা ধুলো
কোনো আবর্জনা নয়,
ওরা আসলে ঝরে পড়া সময়।
ওদের শরীরে এসে যখন
বিকেলের তির্যক রোদ পড়ে,
মনে হয় শূন্যতারও
নিজস্ব একটা মানচিত্র আছে,
যাকে কেবল আলোই পড়তে পারে।
যে ঘরে কেউ হাঁটে না,
সেখানে ধুলোরা কেমন নিঃশব্দে সংসার পাতে।
পুরোনো চিঠির হলদেটে খামে,
দেয়ালের গা থেকে খসে পড়া পলেস্তারায়,
আর সেই আয়নায় —
যেখানে অনেককাল কোনো মুখ প্রতিফলিত হয়নি।
ধুলো তো কেবল মাটি নয়;
ওতে মিশে আছে আমাদের খসে পড়া ত্বক,
পুরোনো উলের সোয়েটারের সুতো,
আর দীর্ঘশ্বাসের অদৃশ্য ভগ্নাংশ।
হঠাৎ একফালি রোদ এসে যখন ঠিকরে পড়ে
সেই ধুলোর স্তূপে,
আলোককণাগুলো যেন শূন্যে ভাসতে থাকে,
ছোট্ট, স্বাধীন, উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো।
তখন মনে হয়,
বিস্মৃতি মানেই তো মুছে যাওয়া নয়।
বিস্মৃতি হলো অন্ধকারের নিচে ঘুমিয়ে থাকা
এক অনন্ত অপেক্ষা,
যা শুধু একটুখানি আলোর জন্য বেঁচে থাকে।
আমি দেখেছি,
বাতিল হয়ে যাওয়া ক্যালেন্ডারের ওপর
কীভাবে রোদ আর ধুলো মিলে
তৈরি করে নতুন দিন।
যে ছবিটার রং জ্বলে গেছে বহু আগে,
তাতেও আলো পড়লে মনে হয় —
ফ্রেমের ভেতরের মানুষটা এইমাত্র চোখ খুলল।
আলো আসলে অতীতকে ফেরায় না,
সে শুধু মনে করিয়ে দেয়,
এখানে একদিন জীবন ছিল।
হালকা হাওয়া দিলে যখন ধুলোর শরীর কেঁপে ওঠে,
রোদ তখন দিক বদলায়।
স্থানচ্যুত হয় প্রাচীন ছায়া।
আমরা যারা এই স্মৃতির শহরে আজীবন নির্বাসিত,
আমরাও তো ওই ধুলোরই মতো।
অন্ধকারে পড়ে থাকি,
আর ভাবি কেউ আমাদের মনে রাখেনি।
অথচ কোথাও না কোথাও,
কোনো এক ফাটল দিয়ে
ঠিকই এসে পড়ে আলোকের চিহ্ন।
তারপর একদিন রোদ ফুরিয়ে যায়।
বিকেল গড়িয়ে নামে গাঢ়, নিরেট অন্ধকার।
আলো চলে যায় ঠিকই,
কিন্তু ধুলোর শরীরে রেখে যায় এক অদ্ভুত উত্তাপ।
যে উত্তাপ বুকে নিয়ে
পুরোনো ঘরগুলো অনায়াসে পার করে দেয়
আরও একশো বছরের একাকিত্ব।
লেখক একজন নবীন কবি ও সাহিত্যস্রষ্টা। মানুষের অনুভূতি, জীবনবোধ, বিষাদ, প্রকৃতি এবং অন্তর্জগতের নানা অনুষঙ্গ তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। দীর্ঘদিন ধরে কবিতা ও গল্পচর্চার মাধ্যমে নিজস্ব সাহিত্যভাষা নির্মাণে তিনি নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। পাঠকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টি করাই তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল লক্ষ্য।
কবিতা
সুব্রত মুন্সী
সম্মুখে তুমি কেদারায় বসেছিলে,
চেষ্টা করিনি তোমার সামনে আসার,
মনের বাসনা সুপ্ত রেখে,
কোনো এক সভাঘরে,
মনে আকুলতা এসেছিল তোমাকে দেখার।
সামলেছি নিজেকে, আটকেছি মনোবাসনা,
সম্পর্কের ব্যবধান বেড়ে গিয়েছে,
কিন্তু মনের বন্ধন তো জীবিত আছে,
অন্ততঃ আমার তো বটে,
মনে আসে কত স্মৃতি, কত বঞ্চনা।
তুমি এসেছিলে কবিতার ডালি নিয়ে,
যে কবিতা লিখেছিলাম তোমার মুখ চেয়ে,
সর্বসমক্ষে সে কবিতা পাঠ করে দিলে,
দর্শক তারিফে উদ্বেলিত হয়ে গেলে,
আমি দেখে গেলাম অপার বিস্ময়ে।
আমন্ত্রণ ছিল আমারো কবিতা পাঠের আসরে,
ভেবেছিলাম গাইব আজ সেই কবিতার সুরে,
লিখেছিলাম যা, বাজি রেখে অন্তরাত্মা,
যা ছিল আমার প্রেমের উন্মত্ততা,
আজ সেই উন্মত্ততা বিলীন হয়েছে সাগরে।
ধীরে ধীরে উঠে আসি সবার অলক্ষ্যে,
যেন শক্তিশেল বুকে বিঁধে আছে,
সভা ছেড়ে দাঁড়াই উন্মুক্ত গগনতলে,
বুকে নিয়ে একরাশ অপমান,
কার ভুলে? হঠাৎ পিছনে তাকাই,
তুমি দাঁড়িয়ে পাশে।
কম্পিত অধরে, নত মস্তকে, তুমি কহিলে,
কোনো উপায় ছিল না, ক্ষমা করে দিও,
ভাবি নাই তুমি আজও আছো,
এখনও কবিতা লিখে চলেছো।
বললাম, ছাড়ো আমার কথা,
তুমি ভালো থেকো।
লেখক একজন কবি ও গল্পকার। জন্ম ২৮ জানুয়ারি, উত্তর কলকাতায়। ফিজিক্সে অনার্স গ্রাজুয়েট। B. A. R. C. থেকে Radiation Safety-তে ডিপ্লোমা অর্জন করেছেন। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘মেরুদণ্ড’ ও ‘বসন্ত মঞ্জরী’, রহস্য উপন্যাস ‘বিশ্বনাথ রহস্য’ এবং একক গল্পসংকলন ‘বহ্নিশিখা’। এছাড়াও দেড় শতাধিক কবিতা সংকলনে তাঁর দুই শতাধিক কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। একটি মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর উপন্যাস ‘দক্ষিণের বারান্দা’, যার চারটি কিস্তি ইতিমধ্যে প্রকাশিত। তিনটি প্রকাশনীর গল্পসংকলনে তাঁর আটটি গল্পও প্রকাশিত হয়েছে।
আলাপ
সন্দীপ গাঙ্গুলী
বর্ষাস্নাত শরৎ বিকালে,
বিদায়ী সূর্য হেঁটে চলে অস্তাচলে।
তার স্বেচ্ছা নির্বাসনকে,
নানা রঙে সম্ভাষণ জানায়
দীপ জ্বলা সন্ধ্যা।
ছায়াবৃত্তে ঘুরতে থাকে
অর্বাচীন সুখী গৃহকোণ,
কল্পনার ইজেলে বাস্পায়ন ঘিরে ধরে;
ভুল করেও দেখা হয়না আমাদের — বহুদিন।
একান্ত দিনযাপন ছুঁয়ে থাকে —
রিমিঝিমি গিরি শাওন।
একটা সন্ধ্যা
টিনটিন
বেলার ধূসর প্রতিচ্ছবি,
মনের মাঝে বাচালপনা।
বন্ধ দরজা, নির্জন রাত,
দিনের মাঝে সুদিন গোনা।
বনের ময়ূর টেবিল জুড়ে
খেলতে থাকে সভ্য সমাজ।
দুধটা বুঝি রোজ কেটে যায়?
পুষ্টি পায়নি বিড়ালছানা।
আকাশ-বাতাস তপ্ত গরম,
শীতল মনে শরীর খোঁজা।
গাছের ডালে দড়ি বেঁধে তাই
পিঠের মাঝে যমের বোঝা।
বোতল বিক্রি হলো সেই দিন,
খালি হলো তাই সিঁড়ির তলা।
ওজন কমার কারণ হলো
ফিসফিস করে সত্যি বলা।
বিড়ির গন্ধে বাড়ির জানলা
খুলল কবে নিজের থেকে?
জানলাটা কি অনেক দূরে?
ইটের দেয়ালে পিঠটা ঠেকে।
কাকের মুখে কিসের নাভি?
মৃত্যুটা কি শরীরে জমে?
মনের মৃত্যু কবেই হলো,
শরীরেরই খালি ওজন কমে।
দিনের আলো চামড়া জ্বালায়,
চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরোয়।
পাশেই কামার লোহা পেটায়,
আর কী পাবে শুকনো ছায়ায়?
ঘড়ির কাঁটা মন্থর ছিল,
সময় দিল অনেকখানি।
সময় দিল জ্বলে যাওয়ার,
পুড়িয়ে দিল হাত দুখানি।
আবার কবে সন্ধ্যা হবে?
ঘুরতে যাবো নিজের সাথে।
আবার কবে মন ভরাবে?
মনের টাকা তো সংসারের খাতে।
প্রশ্ন করল দেয়ালের রং,
নীলটা কেন এত গাঢ়?
জবাব পেলাম গভীরতায়,
কষ্ট হয়েছে একটু তারও।