একটু লজিক্যালি ভেবে দেখুন তো... আজ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ‘কানেক্টেড’ সময়ে বাস করছি আমরা। আপনি চাইলেই আটলান্টিকের ওপারে বসে থাকা বন্ধুর মুখটা এক সেকেন্ডে স্ক্রিনে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। কিন্তু এই অতি-সহজ যোগাযোগ কি আসলেই সম্পর্ককে গভীর করছে, নাকি জলছাপের মতো পাতলা করে দিচ্ছে? আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে পুরো পৃথিবী আমাদের হাতের তালুতে আটকে গেছে, অথচ পাশের মানুষটির হাত ধরার সময়টুকু উধাও। প্রযুক্তি আমাদের মহাকাশের মতো এক অসীম ‘ভার্চুয়াল গ্যালাক্সি’ উপহার দিয়েছে, কিন্তু সেই আলোর রোশনাইয়ের নিচে দাঁড়িয়ে আমরা যেন একেকটা নিঃসঙ্গ নক্ষত্র — আলো ছড়াচ্ছি ঠিকই, কিন্তু নিজস্ব কক্ষপথে বড্ড একা।
আজকের যুগে ভালোবাসার গভীরতা মাপা হয় চ্যাটবক্সের নোটিফিকেশনে, আর দূরত্ব মাপা হয় ‘লাস্ট সিন’-এর সময়ের ব্যবধানে। আমরা প্রতিদিন শত শত লাইক, কমেন্ট আর রিঅ্যাকশন শেয়ার করছি; অথচ মনের ভেতরে তৈরি হওয়া এক চিলতে অভিমান প্রকাশ করার মতো একজন মানুষ খুঁজে পাচ্ছি না। এটি কেবল প্রযুক্তির বৈপ্লবিক অগ্রগতি নয়, এটি আমাদের অনুভূতির এক নীরব মহামারী। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ভেতরের স্বাভাবিক সত্তাকে ঢেকে দিয়ে একটি রঙিন ‘প্রোফাইল’ তৈরি করতে শিখিয়েছে।
সম্পর্কের প্রতিটি মুহূর্তকে এখন ‘কনটেন্ট’ মনে করা হয়। কোথাও ঘুরতে যাওয়া মানে স্মৃতির খাতা ভরানো নয়, বরং অ্যালবামের ফাইল সাইজ বাড়ানো। ডেটিং অ্যাপের ক্যাটালগে মানুষ এখন জামাকাপড়ের মতো সঙ্গী বদলায়। মনে করা হয়, “এ না চললে অন্য অপশন তো রয়েছেই!” ফলে ভুল শুধরে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ধৈর্য হারিয়ে গেছে; টিকে থাকছে কেবল সস্তা অহংকার আর তাসের ঘরের মতো ভাঙন। ভালোবাসার চেয়ে ‘ভালোবাসার প্রদর্শন’ করতে বেশি ব্যস্ত মানুষ। ফলে ভেতরটা ফাঁপা থেকে যাচ্ছে, আর সেই শূন্যতাই জন্ম দিচ্ছে এক গভীর মানসিক দূরত্বের। স্ক্রিনের ওপাশে অন্যের সাজানো-গোছানো ‘পারফেক্ট’ জীবন দেখে মানুষ নিজের জীবনের বাস্তব সম্পর্কগুলোর ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ছে।
বাস্তবতার সবচেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্যটা কোনটা জানেন? একই রেস্তোরাঁয় কিংবা একই বিছানায় দুটো মানুষ মুখোমুখি শুয়ে আছে। দুজনেরই মুখের ওপর নীলচে পর্দার আলো। চোখ দুটো স্ক্রিনে আঠার মতো লেগে আছে, অথচ দুজনের মাঝের দূরত্বটা কয়েক আলোকবর্ষ। শারীরিক উপস্থিতি আছে, কিন্তু আবেগীয়ভাবে দুজন দুজনকে অনেক আগেই দাফন করে দিয়েছে। হৃদয় দিয়ে সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতা হারিয়ে মানুষ এখন মুদ্রার বিনিময়ে আবেগ ও সান্নিধ্য কিনছে।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোকে — যেমন বিষাদ, বিচ্ছেদ, কান্নাকাটি, এমনকি নিজের অসুস্থতাকেও — আজ মানুষ ক্যামেরাবন্দি করে ‘সিমপ্যাথি’ বা ‘ভিউ’ কুড়ানোর জন্য বাজারে বিক্রি করছে। নিজের ভেতরের নিখাদ কষ্টটুকুও যখন ক্যামেরার লেন্সের সামনে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করতে হয়, তখন বুঝতে হবে মানুষ হিসেবে আমাদের আত্মসম্মান আর নিভৃত আবেগের মৃত্যু ঘটেছে। জ্যান্ত মানুষগুলো ভেতরে ভেতরে পচে যাচ্ছে, আর বাইরে শুধু প্লাস্টিকের মেকি হাসির বিজ্ঞাপন ঝুলছে।
আজকাল কষ্ট প্রকাশ করতে না পেরে কেউ নিজের কোনো ক্ষতি করে ফেললে তার ফেসবুক প্রোফাইলটি ‘Remembering’ বা মেমোরিয়ালাইজড হয়ে যায়। মানুষটার পুরোনো ছবিতে হাজার হাজার মেসেজ আর কান্নার রিঅ্যাকশন জমে — “খুব মনে পড়ছে তোকে,” “ফিরে আয় বন্ধু।” অথচ কী করুণ নির্মমতা! মানুষটা যখন বেঁচে ছিল, প্রচণ্ড হতাশায় রাত জেগে একা কাঁদছিল, তখন একটা মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করার মতো কেউ ছিল না — “তুই ভালো আছিস তো?” আমরা মানুষকে জীবিত অবস্থায় নিঃসঙ্গতায় মারি, আর মরে যাওয়ার পর তার ডিজিটাল দেওয়ালে ভালোবাসার তোড়া সাজাই।
আজকাল কেউ মারা গেলে বা বড় দুর্ঘটনা ঘটলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে RIP বা কষ্টের ইমোজি পোস্ট করা হয়। শোক প্রকাশ করাটাও এখন একটা ‘ফর্ম্যালিটি’ বা সামাজিক অ্যাটেনডেন্স হয়ে গেছে। অথচ যে মানুষটি তার প্রিয়জনকে হারাল, পোস্টের নিচে শত শত সমবেদনার কমেন্ট জমা হওয়া সত্ত্বেও বাস্তব জীবনে তার দরজায় কড়া নাড়ার মতো একটা মানুষ থাকে না। এই সমাজ শোকাচ্ছন্ন মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেয়ে বিশ্ববাসীকে নিজের ‘সহমর্মী রূপ’ দেখাতে বেশি ব্যস্ত।
রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, কোনো বয়স্ক মানুষ বিপদে পড়লে বা কেউ কষ্টে থাকলে মানুষ এখন আগে হাত বাড়ায় না — আগে পকেট থেকে ফোন বের করে ভিডিও রেকর্ড করে। বিপন্ন মানুষটিকে বাঁচানোর চেয়ে সেই মুহূর্তের ভিডিও দিয়ে ‘ভিউ’ ও ‘লাইক’ কামানো আজ বেশি জরুরি। মানুষের রক্ত-মাংসের কষ্ট এখন অন্যের ফিডের বিনোদন। সহমর্মিতা এখন আর কোনো মানবিক গুণ নয়, তা ডিজিটাল কনটেন্ট।
পকেটে ফোন বাজেনি, তাও বারবার পকেটে হাত দিয়ে ফোন বের করে দেখছে — কিসের নোটিফিকেশন? এটাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘Phantom Vibration Syndrome’ বলে। কিন্তু এর সামাজিক দিকটা হলো — মানুষ প্রতি মুহূর্তে কারও না কারও দ্বারা অনুমোদিত হওয়ার তাড়নায় ভুগছে। কেউ একটা মেসেজ দিল কি না, কেউ তার কথা ভাবল কি না — এই অদৃশ্য ক্ষুধা নিজের সাথে নিজের শান্তিতে থাকার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে।
আগে ডাইনিং টেবিলে ভাত খাওয়ার সময় সারা দিনের অভিজ্ঞতা, হাসি-ঠাট্টা আর পরামর্শ শেয়ার হতো। আর এখন? ডাইনিং টেবিল যেন একটা সাইলেন্ট জোন। সবাই একসাথে খাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রত্যেকের চোখ আলাদা আলাদা স্ক্রিনে। মাসে মাসে দামি রেস্তোরাঁয় গিয়ে পারিবারিক ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতে ভোলে না তারা — Family Time বা Blessed! কিন্তু বাস্তব জীবনে যে পরিবারে প্রতিদিন মুখের কথার চেয়ে থালার টুংটাং শব্দ বেশি শোনা যায়, সেই পরিবারগুলো ভেতরে ভেতরে কবেই ভেঙে গেছে।
আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আর ধুলোবালি, বৃষ্টি কিংবা ছাদের কার্নিশে চড়ুই পাখির বাসা দেখে বড় হচ্ছে না। কান্নার শব্দ বন্ধ করতে মা-বাবা নিজের হাতে শিশুর দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছেন এলসিডি স্ক্রিন। শিশুটি ভাষা শেখার আগেই শিখছে ‘সোয়াইপ’ করতে। সন্তানকে সামলানোর ধৈর্য হারিয়ে তাদের শৈশবকে অ্যালগরিদমের কাছে বন্ধক রাখছে। ফলে জন্ম নিচ্ছে চরম আত্মকেন্দ্রিক, স্পর্শকাতর এবং সহনশীলতাহীন এক প্রজন্ম, যারা মানুষের রাগ বা দুঃখ বুঝতে শেখে না, শেখে শুধু কার্টুনের মতো রিঅ্যাকশন দিতে।
আমরা খেয়ালই করছি না যে আমাদের ঘরগুলো আস্তে আস্তে নীরবতার গোরস্থানে পরিণত হচ্ছে। শিশুটি তার মায়ের চোখের দিকে না তাকিয়ে স্ক্রিনের কার্টুনে হাসতে শিখছে। রাস্তায় রক্তাক্ত মানুষ দেখে আমরা বাঁচানোর বদলে আগে পকেট থেকে ফোন বের করে রেকর্ডিং বোতাম চাপছি, কারণ আমাদের কাছে মানুষের জীবনের চেয়ে ভিডিওর ‘ভিউ’ এখন বেশি দামি। এটি আর স্বাভাবিক জীবন নয়; এটি সমাজব্যবস্থার স্বতঃস্ফূর্ত পচন।
প্রযুক্তি খারাপ নয়, কিন্তু যখন প্রযুক্তি আমাদের আবেগ আর সম্পর্কের চালক হয়ে দাঁড়ায় — তখনই বিপর্যয় ঘটে। ফোন স্ক্রিনের টুংটাং শব্দে এতটাই অভ্যস্ত আর অন্ধ হয়ে যাচ্ছে মানুষ, পাশে শুয়ে থাকা মানুষটার নিঃশব্দ কান্নার শব্দ কিংবা ভেজা চোখের জল আর চোখে পড়ে না। ডিজিটাল দুনিয়ায় কোটি কোটি মানুষকে ‘ফলো’ করছে, কিন্তু যে মানুষটা একই ছাদের তলায় বাস করে, তাকে চরম অবহেলায় হারিয়ে ফেলছে।
সোশ্যাল মিডিয়া এখন ভালোবাসার চেয়ে হিংসা আর আক্রোশ ছড়াতে বেশি পটু। কেউ একটু ভুল করলে, কোনো সম্পর্কে ফাটল ধরলে বা জীবনের কোনো ব্যর্থতা প্রকাশ পেলে শত শত অচেনা মানুষ তাকে নিয়ে ‘ট্রোল’ করে, ‘মিম’ বানায়।
“স্ক্রিন যত উজ্জ্বল হচ্ছে, মানুষের ভেতরের উষ্ণতা তত ম্লান হচ্ছে। মনে রাখবেন, একটা ইমোজি কখনো স্পর্শের উষ্ণতা দিতে পারে না, আর হাজারটা ‘লাইক’ কখনো একটা খাঁটি আলিঙ্গনের বিকল্প হতে পারে না। ‘কানেকশন’ কেটে গেলে ওয়াইফাই ফেরানো যায়, কিন্তু সম্পর্ক নয়।” সমাজ মানে কেবল কিছু মানুষের বসবাস নয়; সমাজ হলো সেই অদৃশ্য বন্ধন, যা মানুষকে বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। আমরা সম্পর্কের ডিজিটাল ব্যাকআপ রাখছি ঠিকই, কিন্তু হৃদয় থেকে হৃদয়ের যে রিফ্রেশ বোতাম, তা চাপতে হয়তো ভুলেই যাচ্ছি।
লেখিকা পেশায় গ্রাফিক ডিজাইনার। দীর্ঘদিন একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। প্রতিদিনের বাঁধাধরা ও যান্ত্রিক জীবন থেকে বেরিয়ে নিজেকে নতুন করে সময় দেওয়া এবং জীবনকে আরও গভীরভাবে অনুভব করার তাগিদে আপাতত পেশাগত ব্যস্ততা থেকে বিরতি নিয়েছেন। নিজেকে কল্পনা ও অনুভূতির জগতের মানুষ বলেই ভাবতে ভালোবাসেন। সেই অনুভূতি ও কল্পনার প্রকাশ ঘটে তাঁর লেখালেখি ও আঁকায়। অবসরে টুকটাক লেখেন, আর ছবি আঁকা তাঁর বিশেষ ভালোবাসার জায়গা।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।