সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল অনিন্দ্য সুন্দর চ্যাটার্জী, নামের মতোই অনিন্দ্য সুন্দর তাঁর রূপ। পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের কোঠায় বয়স, চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আভিজাত্যের ছাপ। কবিতা লেখেন বটে, তবে সেই অর্থে কবি হিসাবে নামডাক তেমন হয়নি। হাত ভালো, ছন্দ আর উপমায় বেশ দখল থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের মতোই ভাবনায় যুক্ত হয়েছে নতুন ক্লেদ। প্রথম যৌবনের উন্মাদনায় লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় দুনিয়া বদলানোর স্বপ্ন দেখতেন, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বামপন্থী আদর্শ ছিল তাঁর রক্তে। সেদিনের সেই স্বপ্নগুলো আজ কেবলই নস্টালজিয়া, সময়ের পুরু চাদরের নিচে ঢাকা পড়ে গেছে প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম। জীবনের চাকা অবিরত ঘুরছে, জীবন মাখছে উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্লেদ। স্বপ্নেরা পরিণত হচ্ছে শুধুই ছোট ছোট স্মৃতির টুকরোয়। যেগুলো জুড়লে রচিত হতে পারে সময়ের স্মৃতিরেখা।
তাঁর ব্যক্তিগত সহায়ক এবং ড্রাইভার শুভজিৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি টপকানো মধ্য তিরিশের এক বুদ্ধিমান যুবক। স্যারের প্রতিটি প্রয়োজন সে বোঝে, যেন পড়তে পারে তাঁর মনের অব্যক্ত যত কথা। নীরব, অথচ সদা তৎপর, শুভজিৎ অনিন্দ্যর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অনিন্দ্যর পারিবারিক জীবন খুব একটা সুখকর হয়নি। সিনেমার মতো বাস্তবের সব প্রেম সফল হয় না। তাঁরও হয়নি। সাত বছরের প্রেমের শপথ বিয়ের তিন মাসের মধ্যে বাসিমড়া। তারই গলিত শবদেহ আজও নীরবে বয়ে চলেছেন অনিন্দ্য। এক এক সময় নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। মনে হয় প্রেম-ভালোবাসা বলে আসলে কিছু হয় না, সবই লেনদেন নয়তো শর্তহীন সমর্পণ। উচ্চবিত্তের জীবনে এক অদৃশ্য কোলাহল, এক অন্তঃসারশূন্য আভিজাত্যের অহংকার যেন গ্যাস বেলুনের মতো তাঁকে ভাসিয়ে রেখেছে। এই অহংকার, এই আভিজাত্য এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, যেখানে অসহায় মানুষের বাঁচার আর্তনাদ আলপিনের মতো বেঁধে। অনিন্দ্যর মনে মাঝে মাঝেই প্রশ্ন জাগে, তাঁর এই শূন্যগর্ভ অহংকারের ফানুস কি মাঝ আকাশেই নিভে যাবে?
আজ সকাল থেকেই মনটা কেমন যেন অস্থির। গত কয়েকদিন ধরে এই অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে তাঁর ওপর জেঁকে বসছে, তীব্র থেকে আরও তীব্র হচ্ছে। তাঁর মনে হচ্ছে, সেই সেদিনের মতো তিনি যেন নতুন করে শ্রেণিচ্যুত হতে চলেছেন, আর সব থেকে অবাক করার মতো আশ্চর্যরকমভাবে তিনি নিজেও এই পরিবর্তনটাকে আলিঙ্গন করতে চাইছেন তাঁর সমগ্র সত্তা দিয়ে। উচ্চবিত্তের নিস্তরঙ্গ জীবন, অহংকারের আবরণে ঢাকা অস্তিত্ব তাঁকে ক্লান্ত করে তুলেছে। তিনি অনুভব করছেন, মেকি ভদ্রতার মুখোশ পরে আর চলতে পারছেন না। তাঁর ভেতরটা যেন মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় ছটফট করছে, পরিচিত গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে শ্বাস নিতে চাইছে আকাশের শামিয়ানায়। এই এক চিন্তা তাঁকে অহরহ কুরে কুরে খাচ্ছে। জীবনের ছন্দপতনের ভয়ের বদলে এক অন্যরকম মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আসছে তাঁর চেতনায়।
আত্মার মুক্তির প্রথম ধাপ হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন প্রান্তজনের বিলাসী অভ্যাস, বাংলা মদ। কিন্তু কীভাবে? বাড়িতে ঢোকানো যাবে না। কোনোরকমে লুকিয়ে নিয়ে গেলেও দোসর মিলবে কই? দুঃখ একা সইতে হলেও আনন্দ একা একা উপভোগ করা যায় না। অন্য কোথাও... না। একজন সরকারি কলেজের প্রিন্সিপালকে মদ্যপান করতে দেখলে সমাজের চোখে সেটা হবে এক চরম কেলেঙ্কারি। তার থেকেও ভয় ভাইরাল হবার, লুকিয়ে কেউ কোথাও থেকে ভিডিও বানিয়ে ছেড়ে দেবে তার ঠিক নেই। তাঁর আর একটা মন চাইছে, কেলেঙ্কারিটা ঘটুক। তিনি চান, সমাজের ক্যামেরায় তাঁর যে ছবিটা ধরা আছে, তাঁর যে ইমেজটা জমানো আছে বাসস্থানের বাইরে, সেটা একবার হলেও ভেঙে তছনছ হয়ে যাক। নিজেকে নিজের চোখে অন্য রূপে দেখার আনন্দটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতে চান তিনি। তুখোড় অভিনেতার মতো নিজেকে চরিত্র বদলের মধ্য দিয়ে আরও উপভোগ্য করে তুলতে চান। কালজয়ী সাহিত্যের বিমূর্ত চরিত্রকে মূর্ত করে তুলতে চান রক্ত-মাংসে। শহরের আনাচে-কানাচে, মোড়ে মোড়ে সিসি ক্যামেরা। লুকানোর কোনো জায়গা নেই। প্রাইভেসি শব্দটা আজ শুধুই ডিকশনারির অলংকার। অতি আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে, যেখানে বাতাসের প্রতিটি কোণায় কোণায় চোখ, সেখানে নিজের পরিচিতি লুকিয়ে কিছু করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এই অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অদ্ভুত জেদ যেন তাঁকে পেয়ে বসেছে।
শুভজিৎ কোনো প্রশ্ন না করে শহর ছাড়িয়ে দূর দিগন্তের দিকে গাড়ি ছোটাতে থাকে। সে জানে, স্যার যখন এমন উদ্ভট কিছু বলেন, তখন তাঁর মনে কোনো এক গভীর অস্থিরতা কাজ করছে। তাই সে চুপচাপ ড্রাইভ করতে লাগল। অনিন্দ্য মনের মেঘাচ্ছন্ন আকাশ থেকে চোখ সরিয়ে বাইরের খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে, ছোটবেলায় পুকুরে স্নান করতে নেমে নিজের শ্বাস পরীক্ষা করার পর জল থেকে মাথা তুলে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে থাকতেন যেভাবে, সেভাবে শ্বাস নিতে থাকলেন, যেন অনেক কাল আকাশ দেখেননি।
শহর ছাড়িয়ে যখন তাঁরা অনেকটা দূরে চলে এসেছেন, তখন ক্লান্ত সূর্যের নরম আলো ফিকে হয়ে এসেছে। রাস্তার দু’পাশে সবুজের গালচে পাতা, গ্রাম্য সরলতায় ভরা শান্তির উপনিবেশ, পরিচিত শহুরে কোলাহল নেই। অনিন্দ্য জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁর মন তখনও তাঁর ভেতরের দ্বন্দ্বে ডুবে। হঠাৎ করেই শুভজিৎ ব্রেক কষল। সামনে পুলিশের ব্যারিকেড।
“স্যার, মনে হচ্ছে কোনো ভিআইপি মুভমেন্ট আছে। পুলিশের নাকা চেকিং চলছে।” শুভজিৎ বলল।
অনিন্দ্যর বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। এই সময় পুলিশ চেকিং? তাঁর গাড়িতে একটা দেশি মদের বোতল রাখা আছে। ধরা পড়লে তো সর্বনাশ! ‘কলকাতার নামী সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল মাদকসহ ধরা পড়লেন’ — সোশ্যাল মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়ায় ঝড় উঠবে। তাঁর সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। কিন্তু এই সর্বনাশের মধ্যেও এক অদ্ভুত টান অনুভব করলেন তিনি। যেন তিনি নিজেই এই বিপদের মধ্যে নিজেকে ঠেলে দিচ্ছেন। বোতলটা সিটের কভারের ভেতর চালান করে নিজের ফোলিও ব্যাগ দিয়ে আড়াল করতে করতে বললেন, “চলো, দেখা যাক।”
একজন পুলিশ অফিসার গাড়ির দিকে এগিয়ে এল।
“কাগজপত্র দেখান।”
শুভজিৎ গাড়ির কাগজপত্র এগিয়ে দিল। কলকাতার নম্বর প্লেট দেখে অফিসার কাগজপত্র দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাবেন?”
কোথায় যাবে তা তো জানা নেই, আসলে নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যই তো নেই। সত্যি কথাটা তো আর পুলিশকে বলা যায় না। অনিন্দ্য জানেন না কোন দিকে কতটা এসেছেন। শুভজিৎ ম্যানেজ করে নেয়, তার মনে পড়ে কলেজে তার সঙ্গে পড়ত একজন বন্ধুর বাড়ি আর কিছুটা দূরে আনন্দনগরে।
“আনন্দনগর।”
নামটা শুনে চমকে যান অনিন্দ্য। বড় অদ্ভুত নাম, তাঁদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সমার্থক — ‘আনন্দনগর’। মনে মনে ছেলেটাকে আর একবার ধন্যবাদ না দিয়ে পারেন না তার উপস্থিত বুদ্ধির জন্য। ওদিকে অফিসার সন্দেহজনক কিছুর গন্ধে গাড়ির ভেতরে উঁকি মারল। তার চোখ পড়ল সিটের নিচে লুকানো মদের বোতলটার দিকে।
“ওটা কী? দেখি।” অফিসার কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল।
নিমেষে অনিন্দ্যর মুখ শুকিয়ে চৈত্রের মজা দীঘি। শুভজিৎ একবার অনিন্দ্যর দিকে তাকাল, তারপর অফিসারের দিকে। অনিন্দ্যর আলজিভ জমাটবাঁধা লালরসে আড়ষ্ট।
অফিসারের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সে শুভজিতের বাধা অতিক্রম করে বোতলটা হাতে নিল। বোতলের গায়ে অফিসারের লোভাতুর নোংরা হাতের স্পর্শে অনিন্দ্যর মনে হলো, তাঁর মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে যাচ্ছে। হাতের তালু ঘামছে, কিন্তু বুকের ভেতরটা সাহারা মরুভূমির মতো তপ্ত। তাঁর মনে হলো, তাঁর কণ্ঠনালীটা কেউ অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে টেনে ধরেছে — কথা বলতে গেলে কেবল একটা অস্পষ্ট গোঙানি বেরোবে। এসি চললেও তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, যা আভিজাত্যের শেষ প্রলেপটুকু ধুয়ে দিতে চাইছে।
“স্যার, এটা... এটা আসলে ভুল করে... কী করে রাখা হয়েছে আমরা জানি না।” শুভজিৎ কোনোমতে বলল।
“ভুল করে রাখা হয়েছে মানে? দেশি মদ? আপনি কে? আর ইনি কে?” অফিসার আরও কঠোর স্বরে প্রশ্ন করতে লাগল।
শুরু হলো পুলিশের হয়রানি বলতে যা বোঝায় তাই। এই জন্যই বোধহয় তাঁর ঠাকুরদা অবিনাশ চ্যাটার্জী ছেলেকে পুলিশের চাকরিতে পাঠাননি। নানা অনাবশ্যক প্রশ্ন, অপমানজনক মন্তব্য। অনিন্দ্য নিজেকে চরম অসহায় মনে করতে লাগলেন। তাঁর মনে হলো, তাঁর জীবনের সমস্ত অহংকার, সমস্ত আভিজাত্য যেন এক নিমেষে ভেঙে পড়ছে। জেগে আছেন কিনা বিশ্বাস করতে পারছেন না। এই মুহূর্তটা যেন এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। মনে-প্রাণে চাইছেন, এক্ষুনি দুঃস্বপ্নের ঘোর কেটে গিয়ে তিনি জেগে উঠে দেখবেন নিজের বিছানায়। কিন্তু না, দুঃস্বপ্নের রাত্রির মতোই তাঁর ভাবনা সত্য হলো না। বুঝলেন, সত্যি সত্যিই জেগে আছেন। তিনি একজন সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল, সমাজের একজন সম্মানিত ব্যক্তি, আজ তাঁকে কিনা পুলিশের সামনে এভাবে অপদস্থ হতে হচ্ছে!
ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর মগজের কোণে একটা পুরোনো কবিতার লাইন বিচ্ছিরিভাবে হুল ফোটাতে লাগল — যেটা তিনি বছর দশেক আগে কোনো এক উজ্জ্বল সন্ধ্যায় আবৃত্তি করেছিলেন: ‘অহংকার চূর্ণ করে যে আলো নামে রাজপথে, সে আলোয় চিনে নিও আমায়।’ আজ এই নাকা চেকিংয়ের ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় অফিসার যখন তাঁকে ‘চিনে’ নেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন অনিন্দ্যর মনে হলো, কবিতা আসলে এক নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাঁর নিজের ছন্দই আজ তাঁকে নিয়ে মকারি করছে।
অফিসারের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে অনিন্দ্যর চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। সেই অন্ধকারে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন কলেজের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকশো ছাত্রের মুখ। যে ছাত্রদের সামনে তিনি দিন কয়েক আগেই ‘নৈতিকতা ও মূল্যবোধ’ নিয়ে দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছেন, তারা যেন সবাই এই গাড়ির জানালার কাঁচ দিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসছে। তাদের শান্ত দৃষ্টিগুলো এখন এক একটা সার্চলাইটের মতো তাঁর ভেতরের অন্ধকারকে খুঁড়ে বের করছে। তিনি চোখ বন্ধ করলেন, কিন্তু সেই হাজার হাজার চোখের নজরদারি থেকে পালানোর কোনো পথ পেলেন না।
তাঁর মনে হলো, তাঁর পরিচয়টা এবার জানান দিতে হবে। না হলে এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। তিনি তো চেয়েছিলেন অচেনা জগতে হারিয়ে যেতে, নিজের মতো করে নিজেকে হারাতে। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁকে বাধ্য করছে তাঁর পরিচিত জগতে ফিরে আসতে। এই ফিরে আসাটা যেন তাঁর নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই হচ্ছে, যদিও তিনি নিজেই এই পতনের সূচনা করেছিলেন। পরিচয় দেওয়ার পরও নিস্তার মিলল না।
উল্টে অফিসার বোতলটা উঁচিয়ে ধরে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন, “দেশি মাল! রুচি তো খাসা স্যার!”
শেষমেশ উপায়ান্তর না দেখে অনিন্দ্য তাঁর ফোন বের করলেন। সেই পুলিশ অফিসারকে জিজ্ঞেস করলেন, “একটা ফোন করা যাবে তো?”
পাশে দাঁড়ানো সহকারী জবাব দিল, “অবশ্যই।”
তাঁর এক পুরোনো বন্ধু আছে, সরকারি দলের একজন প্রভাবশালী নেতা। অনিন্দ্য ফোন করলেন।
“হ্যালো, দেবব্রত? আমি অনিন্দ্য বলছি রে। একটু বিপদে পড়েছি, দোস্ত।” অনিন্দ্যর গলায় হতাশা আর অসহায়তা স্পষ্ট।
ফোনের ওপাশ থেকে দেবব্রত সব শুনল।
“মেয়েছেলের ঝামেলা নেই তো? তাহলে কিছু ক্যাশ লাগবে। জানিস তো সবই। সঙ্গে আছে?”
“না, সেসব কিছু নয়। ক্যাশ আছে, কিন্তু কত?”
“কোন থানা বললি?”
“হরিপাল। অফিসারের নাম ঋভু গুপ্তা।”
“ওকে। নো টেনশন। আমি দেখছি। ফুর্তি করবি তো আমায় বলতে পারতিস। উত্তরবঙ্গে তিনখানা রিসর্টের মালিক আমি, দুটো বার চলে বেনামে। একাধিক গোপন ডেরা আছে। কলকাতা থেকে ভিআইপিরা দলে দলে ছুটি কাটাতে যায়।”
“না, ব্যাপারটা তা নয়।”
“শুধুই বাংলা, নাকি সমাজতত্ত্বের গবেষণা!”
“খোলা আকাশের নিচে, শ্রমজীবী গরিব আদিবাসী জনজাতির মানুষগুলোর মতো...”
অনিন্দ্যর কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোনের ওপ্রান্তে হো হো করে হেসে উঠল দেবব্রত।
“শালার মাথা থেকে শ্রেণিসংগ্রামের রোমান্টিসিজম এখনও যায়নি দেখছি।”
“রোমান্টিসিজম বল আর যাই বল, এই ট্র্যাজেডির হাত থেকে এখন বাঁচা ভাই।”
“ঠিক আছে, ফাইভ মিনিটস।”
বলে দেবব্রত ফোনটা কাটতে কাটতে কাকে যেন নির্দেশ দিলেন, “হরিপাল থানার আইসিকে ধর তো।”
পাঁচ মিনিটের আগেই এসআই ঋভু গুপ্তার মোবাইল বেজে উঠল।
“ইয়েস স্যার... রাইট স্যার। আমি দেখছি স্যার। এক্ষুনি ছেড়ে দিচ্ছি স্যার। ইয়েস স্যার... নো স্যার... ইয়েস স্যার... ইয়েস স্যার।”
ফোন হাতে নিয়েই জোড়হাত করে কৃত্রিম বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “সরি স্যার। আপনি যেতে পারেন। বোঝেনই তো, আমাদের ওপরওয়ালার নির্দেশ মানতে হয়। পাপী পেট কা সওয়াল স্যার। আগে বলবেন না আপনি স্যারের চেনা! শুধু শুধু ঝাড় খাওয়ালেন।”
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। অনিন্দ্যর মনে তখন এক মিশ্র অনুভূতি। একদিকে মুক্তি পাওয়ার স্বস্তি, অন্যদিকে নিজের অসহায়ত্ব আর অহংকারের ভাঙন। তিনি বুঝতে পারলেন, জীবনটা কত ভঙ্গুর। একটি মদের বোতল, একটি ভুল সিদ্ধান্ত, আর একটু হলেই কী ভয়ংকরভাবে তাঁর সমস্ত অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিতে পারত!
শহরে ফিরে আসার পর অনিন্দ্য তাঁর ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। রাতের শহর ঝলমল করছে আলোর মালায়। কিন্তু তাঁর ভেতরের সব আলো যেন নিভে গেছে। তিনি অনুভব করলেন, তাঁর কাঁচের থেকেও ঠুনকো অহংকারের ফানুস সত্যি সত্যি মাঝ আকাশেই নিভে গেছে। ফেটে গেছে। শুধু অসহায় মানুষের বাঁচার আর্তনাদ নয়, আজ তাঁর নিজের অসহায়তাই যেন পিনের মতো ফুটে দিয়েছে তাঁর অহংকারের বেলুন। তিনি চেয়েছিলেন এই পতন, কিন্তু এর ফলাফলটা যে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক, বেশি তিক্ত হবে, ভাবতে পারেননি শহরের সব থেকে উঁচুতে এই অভিজাত আবাসনের বাসিন্দা অনিন্দ্য সুন্দর চ্যাটার্জী।
ততক্ষণে শুভজিৎ গাড়ি গ্যারেজ করে উপরে চলে এসেছে। সে চার কামরার এই ফ্ল্যাটে গেস্ট রুমে থাকে। অনিন্দ্যর মনে হলো, এই ছেলেটিই তাঁর জীবনের একমাত্র স্থির অবলম্বন। এই অস্থির সময়ে এই ছেলেটিই তাঁকে আগলে রেখেছে।
“শুভজিৎ,” অনিন্দ্য ডাকলেন।
“জি স্যার?” শুভজিৎ কাছে এসে দাঁড়াল।
“কিছু মনে করিস না, আজ আমার জন্যই তোকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হলো।” অনিন্দ্যর গলায় অনুতাপ।
শুভজিৎ হাসল, “স্যার, এসব তো জীবনেরই অংশ। আপনি তো আমার নিজের লোকের মতোই।”
অনিন্দ্য কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বললেন, “শুভজিৎ, আজ থেকে আমার আর লিটল ম্যাগাজিনের সেই স্বপ্নগুলো নেই। দুনিয়া বদলানোর স্বপ্নও নেই। ফেরার পথে স্মৃতির পাতা থেকে বেয়াড়া স্বপ্নগুলোকে ইরেজার দিয়ে প্রাণপণে ঘষে ঘষে মুছে দিয়েছি। শুধু এইটুকু জানি, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ খুব সাবধানে ফেলতে হবে। অহংকার আসলে এক ধরনের বিকার।”
শুভজিৎ কিছু বলল না। সে জানে, স্যারের মন আজ বড় অস্থির।
সে রাতে অনিন্দ্যর ঘুম এল না। তাঁর মনে বারবার ফিরে আসছিল পুলিশের হয়রানি, সেই মদের বোতল আর তাঁর প্রভাবশালী বন্ধুর সাহায্য। এই পুরো ঘটনাটা যেন তাঁকে এক নতুন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তিনি উপলব্ধি করলেন, তাঁর উচ্চবিত্তের জীবন, তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, তাঁর সামাজিক সম্মান — সবই এক ফানুসের মতো। একটুখানি বিপদেই তা মিলিয়ে যেতে পারে। অসহায়ত্বের যে বোধ তিনি আজ অনুভব করেছেন, তা তাঁর জীবনের পূর্ববর্তী অহংকারকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। তিনি নিজেই এই পথে নেমেছিলেন, কিন্তু পথটা যে এত কঠিন হবে, তা বুঝতে পারেননি। অথচ দেশের গরিব মানুষগুলোকে দেখো, শুধু প্রাণে বেঁচে থাকার জন্য, দুমুঠো ভাতের জন্য মালিকের কত নির্যাতন, সরকারবাবুদের কত খামখেয়ালিপনা, কত লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে। সে নিজেও কি তাই চায়নি? কিন্তু...
পরের দিন সকালে অনিন্দ্য যখন কলেজে গেলেন, তখন তাঁর চালচলনে এক নতুন পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। তিনি হয়তো আগের চেয়ে আরও বেশি বিনয়ী, আরও বেশি মানবিক হবেন। লিটল ম্যাগাজিনের পুরোনো স্বপ্নগুলোর অবশেষ আর নেই, তাঁর মনের এক নতুন দিগন্ত খুলেছে। অহংকারের ফানুস নিভে গেছে ঠিকই, বদলে জন্ম নিয়েছে এক নতুন উপলব্ধি, যা প্রান্তিক মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোর এক নতুন কৌশলের উদ্ভাবন হতে পারত, কিন্তু হয়নি।
লেখক পেশায় একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। বই পড়া ও ভ্রমণ তাঁর নেশা। কলেজ জীবনে "প্রগত" নামের মাসিক দেয়াল পত্রিকা ও ত্রৈমাসিক লিটিল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেছেন। দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় সাহিত্যচর্চায় ফিরে এসে বর্তমানে মূলত ছোটগল্প ও অনুগল্প লেখেন; পাশাপাশি কখনো সখনো কবিতা ও প্রবন্ধও রচনা করেন। অজ পাড়াগাঁয়ের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম। পড়াশোনার পাশাপাশি শ্রমসাধ্য কৃষিকাজের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই লেখক জীবনের বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। মানুষের বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামই তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।