লাশটাকে শ্মশানে নিয়ে এসেছে সবাই। যে ত্রিশ-চল্লিশ জন লোক এসেছে, তার মধ্যে বেশিরভাগই পুরুষ। মহিলা আছে হাতে গুনে কয়েকজন, তারা আবার মাঝে মাঝে চোখে কাপড় দিয়ে কিছু একটা মুছছে। জল আছে কিনা, সেটা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না। যে লোকটা মারা গেছেন, তাঁর স্ত্রী, ছেলে দুজনেই এসেছে। আরও একটা মেয়ে আছে ওঁর, সে বাড়িতেই আছে। তাকে আর শ্মশানে নিয়ে আসা হয়নি। ছেলেটা ছোট, তাই মুখাগ্নি করার জন্য ওর সঙ্গে ওর মা এসেছে। বাকিরা পরিবারের লোকই বেশি। তার মধ্যে কয়েকজন দুজনের বন্ধুবান্ধব আর পাড়ার কিছু লোকজন।
লাইনে রাখা আছে বডি। ভেতরে জানিয়েছে, এখনও ঘণ্টাখানেক পর শুরু হবে। তাই একটু বিরতির সময়ে সবাই শ্মশানের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে চায়ের দোকানে চা-বিস্কুট খাচ্ছে। কেউ কেউ আবার নিজের পছন্দের সিগারেটটা না পেয়ে একটু বিরক্ত হয়ে অন্য সিগারেট নিয়ে সেটাতেই সুখটান দিচ্ছেন।
আমি ওদের সামনে বসে বসে শুনছি সবার কথাগুলো। সবাই খুব দুঃখ করে বলছে, “ইসস, এত অল্প বয়সে চলে গেল গো বাবিনটা, ছেলেটা-মেয়েটা একদম ছোট। বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল।”
আর একজন আবার নিজের চুড়িদারের ওড়নাটা দিয়ে মুখে-চোখে ঘষে বলল, “কপাল, কপাল! বুঝলে। যার যখন যাওয়ার সময় আসবে, যেতেই হবে।”
কথাটা বলছিলেন পুষ্পিতা কাকিমা। বয়স ষাটের কাছাকাছি হলে কী হবে, চেহারায় যেমন মডার্ন, মানসিকতাও সেইরকম। ওনার বয়সী অন্য কেউ হলে শ্মশানে আসতেন না এত রাতে। ওনার কথা শুনে আমি বিরক্ত হয়ে মনে মনে বললাম, “ধুর, কপালের দোহাই খালি। আরে কাকিমা, নিজেদের বয়সটা দেখুন। হাজারটা রোগ নিয়ে আপনারা তো কপালের জোরে এখনও টিকে আছেন। খালি কপালের দোহাই দিলে হবে?”
কিছু করার নেই। সবার সঙ্গে এসেছি এখানে, তো সবার এইসব কথা শুনতেই হবে। কিছুক্ষণ সবার বকবক শুনে ভেতরে যেতে ইচ্ছে করল খুব। দেখি বডিটার কী হলো? ভেবেই গাছের ওপরের যে ডালে বসেছিলাম, সেখান থেকে নেমে পড়লাম নিচে। সেখান থেকে ভেতরের দিকে গেলাম।
বেশ হালকা লাগছে নিজেকে। যেখানে খুশি উঠতে পারছি, যেখানে খুশি নামতে পারছি। যেকোনো মানুষের ভেতরে দিয়েও ঢুকে যেতে পারছি। তবে অনেকক্ষণ থেকে বডিটার থেকে নিজেকে দূরে দূরে রাখছি। লাশটার কাছে গেলেই মনে হচ্ছে শরীরটার ভেতরে ঢুকে যাই। কিন্তু পারছি না, কিছু একটা বাধা দিচ্ছে। আটকে দিচ্ছে বারবার। তাই নিজেকে দূরে দূরে রাখছি।
ভেতরে দেখলাম লাইনে রাখা আছে বডিটা, তার আগে আরও একটা লাশ পড়ে আছে। ওটাকে পোড়ালে তবে এইটাতে হাত দেবে। তবে বডি না বলে আমার শরীর বলাই ভালো। ইসস, এভাবে ফেলে রেখে দিয়েছে। কোনো ভ্যালু নেই শরীরটার। কত যত্ন নিতাম আমি নিয়ম করে। কালকেই চুলগুলো কাটিয়ে একটা স্পা নিয়ে আসলাম। এখন সেই চুলগুলোয় রক্তের দাগ লেগে আছে। কোনো মানে হয়? কতগুলো টাকা খরচ হয়ে গেল আমার। চুল কাটতে নিয়েছিল পাঁচশো আর স্পা করতে নিয়েছিল আটশো।
জানি, কেউ শুনতেই পাবে না আমার কথা। সকালে জিম করে ফেরার পথে একটা অন্য গাড়ি ধাক্কা মেরে যাওয়ার পর থেকে কতজনকে বলার চেষ্টা করছি, কেউ শুনতেই পাচ্ছে না। গাড়িটা ধাক্কা মারতেই কী যে হলো, কিছুক্ষণ পর দেখি আমি গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। আর সব লোকজন ছুটে ছুটে আসছে, অথচ আমার দিকে তাকাচ্ছে না। আরে, আমি তো ওখানেই দাঁড়িয়ে আছি। তারপর দেখি গাড়ির ভেতরে আমার মতো দেখতে একটা শরীর। বুঝলাম... ধীরে ধীরে সব বুঝলাম।
সবাই আমার নিথর দেহটার পেছনে ছুটছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ উঁকি মেরে দেখছে। কেউ আবার নাকে কাপড় দিয়ে সরে যাচ্ছে। যতসব! আমার কি নিজের সামনে পড়ে থাকা নিজের শরীরটা রক্তমাখা অবস্থায় দেখতে ভালো লাগে? সকাল সাতটায় ধাক্কা মেরে চলে গেল শালাটা, ধাক্কা মেরেই হুস করে বেরিয়ে গেল। আমি তাল সামলাতে না পেরে সোজা ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা। ব্যস, ওখানেই আমার শেষ।
শেষ চোখ বন্ধ করার আগে চোখের সামনে দেখলাম, সেই কবে মরে যাওয়া আমার বাবা আর মা আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আর ওদের পাশে দুটো বিশাল আকৃতির লোক, মাথায় শিং আছে আবার। কী বিশাল চেহারা, বাপ রে বাপ! দেখেই ভয় লাগছিল। কিন্তু শরীরটার ভেতর থেকে বেরোতেই আর ভয় লাগল না। আসলে বলতে গেলে কোনো অনুভূতি ঠিকভাবে বুঝতে পারছিলাম না।
রিমি এসে পৌঁছল আটটার পর। ওমা, দেখি রিমি আমার শরীরকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটছে। কতবার রিমিকে বললাম, “আমি এখানে আছি, ঢুকতে পারছি না রিমি। এদিকে তাকাও।” কে শোনে কার কথা!
শ্মশানের ভেতরে ওদের কাছে তাও একবার গেলাম, যদি আমার কথাটা এখানে শুনতে পায়। বরাবর আমি শরীরের প্রতি খুব বেশি সচেতন। সেটা রিমি জানে, তাও আমার চুলের রক্তটা পরিষ্কার করে দিচ্ছে না কেন? পিকুকে জড়িয়ে ধরে আছে রিমি। বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। কীভাবে যে সামলাবে এবারে দুটো ছেলেমেয়েকে, কে জানে? আমার পিএফ, সেভিংসের টাকাগুলোর কথা রিমি জানে। কিন্তু মিউচুয়াল ফান্ড, এলআইসির টার্ম ইন্স্যুরেন্স — এগুলোর কিছুই তো জানে না। কীভাবে টাকাগুলো যে বের করবে!
এইসব ভাবছিলাম, হঠাৎ দেখি ছোটোকাকা ছুটে এসেছে সুদূর কলকাতা থেকে। ছুটতে ছুটতে এসে রিমির কাছে রিমিকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। চোর একটা, সেবারে পাঁচ লাখ টাকা মেরেছিল লোকটা। এখন ছুটে এসেছে কেন?
“কী করে হলো?” রিমিকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে রিমির উত্তরগুলো শুনছিলাম। সেই সকাল থেকে যা যা হয়েছে, তার বর্ণনা করে যেতে লাগল। আরে, আমার এবারে বিরক্ত লাগছে। মনে হচ্ছে ছুটে গিয়ে শরীরটাতে ঢুকে যাই। আর এদের সবার মুখটা বন্ধ করি। হঠাৎ রিমির একটা কথা শুনে চমকে ওদের দিকে আবার তাকালাম।
রিমি কাকাকে জিজ্ঞেস করছে, “বাবিন টাকা-পয়সাগুলো যে কোথায় জমিয়ে রেখেছে, কিছুই জানি না কাকা। আপনি তো এইসব মিউচুয়াল ফান্ডের বিষয়গুলো দেখেন। মিউচুয়াল ফান্ডগুলো আমি কোনোদিন খোঁজ নিইনি ওর কাছে। এইরকম দুর্ঘটনা যে ঘটবে, কীভাবে জানব? আপনি যদি এই বিষয়ে একটু সাহায্য করেন, তাহলে ভালো হয়।”
ছোটোকাকা বলছে, “তুমি চিন্তা কোরো না, আমি এইসব দেখে দেব।”
ও বাবারে, আমার শরীরটা এখনও নিচে লুটিয়ে আছে আর এরা টাকা-পয়সা নিয়ে চিন্তা করছে, তাও আবার এই চোরটার কাছে সাহায্য চাইছে। আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, “রিমি, ওর কাছে কিছু বোলো না। তোমার সব টাকা চুরি করে পালাবে। ওইটা একটা চিটিংবাজ।”
রিমি তো জানে না, সেবারে তো কী একটা ঢপের মিউচুয়াল ফান্ডের কথা বলেই অতগুলো টাকা ডুবিয়ে দিল। অনেকবার বলে বলে তারপর লাখ দুয়েক টাকা ফেরত দিয়েছে। ইসস, তখন যদি রিমিকে বলতাম, তাহলে কি আজকে রিমি এই চোরটাকে বিশ্বাস করত? ভয়ে বলিনি, যদি রিমি রাগ করে। দেখো, আজকে তার ফল ভুগতে হচ্ছে।
তারপর আবার রিমি বলে উঠল, “কী বলব কাকা, যে যাওয়ার সে তো চলে গেল। আমি এবারে একলা বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কীভাবে যে সবটা সামলাব, কে জানে?”
মনটা খারাপ হয়ে গেল। সত্যি তো, টাকা ছাড়া কীভাবে চলবে এই পৃথিবীতে রিমি? ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ে। সমগ্র ভবিষ্যৎ সামনে অপেক্ষা করছে ওদের দুজনের। আর সেই দায়িত্ব এবারে রিমির ঘাড়ে পড়েছে একলা।
ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ভালো লাগছিল না নিজের সুন্দর দেহটাকে ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে। একটা লাশবাহী গাড়ি ঢুকল। তার পেছনে পেছনে একটা এনফিল্ড নিয়ে একজন ঢুকল। নিজের গাড়িটার কথা মনে পড়ছে। ইসস, মাস দুয়েক আগে শখ করে কিনলাম গাড়িটা। পুরোনো বাইকটা বিক্রি করে দিয়ে এনফিল্ডটা কিনলাম যে, সব সময় তো আর চারচাকা নিয়ে যাওয়া যায় না। তাই মাঝে মাঝে একটু লং ট্রিপে বাইকে করে যেতে বেশ ভালোই লাগে।
প্রিয়াঙ্কার জন্য মূলত কিনেছিলাম। প্রিয়াঙ্কা আমার অফিস কলিগ। না, মানে ওর সঙ্গে সেইরকম কিছুই নেই। মানে হয়নি এখনও। মাঝে মাঝে ওই একঘেয়েমির জীবন থেকে একটু স্বস্তি ফেলা, ওই আর কী। রিমি জানে না, বলার মতো কিছু নেই বলেই বলিনি। সম্পর্ক তৈরির আগেই তো ফুটে গেলাম, আর কী বলব। পরের সপ্তাহে ওর সঙ্গে একটা এক রাতের মন্দারমণি প্ল্যান হয়েছিল। অফিসের মিটিংও আছে একটা। ভেবেছিলাম, ওইদিন ওর সঙ্গে গেলে এনফিল্ডটা নিয়ে যাব। কিন্তু কই হলো!
খুব আফসোস হচ্ছে, রিমিকে ঠকাচ্ছিলাম আর একটু হলেই হয়তো ঠকিয়ে দিতাম। যাক, মরে গিয়ে এই পাপ থেকে অন্তত বাঁচলাম। রিমিকে ভালোবাসি আমি, সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ওর মতো বউ হয় না। তাও কেন যে পুরুষ মানুষের মাঝে মাঝে চরিত্র বিগড়ে যায়!
একটা ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্ট করেছিলাম আগের মাসে। বাকি টাকা এই মাসে দিতে হবে। সারপ্রাইজ দেব ভেবেছিলাম রিমিকে। খুব চিন্তা হচ্ছিল, রিমি এখন জানলে কি আদৌ খুশি হবে? অতগুলো টাকা কীভাবে দেবে এখন রিমি? না দিলে যদি ডাউন পেমেন্টের টাকাটা না ফেরত দেয়। প্রোমোটারগুলো এমনিতেই খুব চালাক হয়, আজগুবি গল্প শুনিয়ে টাকাগুলো ফেরত দেবে না আর।
হঠাৎ সবাই ভেতরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তাহলে কি সময় হয়ে এল? আবার দূরে ওই শিং-মাথাওয়ালা লোকগুলোকে দেখতে পাচ্ছি আমি। লোক না বলে ওগুলোকে দৈত্য বলা ভালো, কী ভয়ংকর দেখতে! আমি আবার ওদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলাম, “আমি যাব না তোমাদের সঙ্গে।” বলেই দ্রুত ভেতরে গেলাম।
ভেতরে রিমি কাগজপত্রের কাজকর্ম সারছে। সামনে আমার শরীরটা রাখা, এবারে আমার পালা। আর দেখতে পাব না এই শরীরটা। আর একবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম ঢোকার। পারছি না, টানছে কেউ পেছন থেকে। এরপর কী হবে? আমার পাপ-পুণ্যের হিসেব হবে? কোথায় নিয়ে যাবে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই শিং-মাথা দৈত্যগুলো?
আচ্ছা, ছোটবেলায় ইচ্ছে করে বল ছুঁড়ে প্রবীর কাকুদের বাড়ির জানলা বারবার ভেঙে দিতাম আর কাকিমা কত রাগ করত। বারবার একই জিনিস করতাম বলে কত অভিশাপ দিত কাকিমা, আমি হাসতাম — শকুনের অভিশাপে কি গরু মরে? আচ্ছা, ইচ্ছে করে যে ওদের জানলার কাঁচ ভেঙেছি, সেটা কি আমার পাপ?
স্কুলে মেয়েদের বাথরুমের জানালা দিয়ে একবার নয়, বারবার কত কত মেয়েকে দেখতাম বসে বসে প্রস্রাব করছে। সেটাও কি পাপ! ইসস, তখন তো বুঝিনি এগুলোর প্রতিটা জিনিসের হিসেব হবে? তখন মজা লাগত। মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে, বাবার থেকে লুকিয়ে রাতের বেলা পড়তে বসার নাম করে কম্পিউটার চালিয়ে যে পর্ন দেখেছি, সেটাও কি পাপ? কী জানি, হিসেব হবে এবারে। একটা একটা সেকেন্ডের হিসেব হবে। পাপ-পুণ্যের হিসেব।
ইসস, জীবনে সেভাবে পুণ্য কিছুই করিনি নাকি? ইসস, চূড়ান্ত আফসোস হলো আমার। এত অল্প বয়সে মরলাম। বুড়ো হলে তাও শেষ জীবনে ঠাকুর-ভগবানের নাম করে একটু পুণ্য অর্জন করতাম। সেই সুযোগটাও দিলে না আমাকে ভগবান। আকাশের দিকে তাকিয়ে একটু রাগ আর অভিমান ছুঁড়ে দিলাম।
ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ভেতরে। আমার শরীর, আমার শরীর...। আমাকে কেউ আবার ঢুকতে দাও। কথা দিচ্ছি, রিমিকে ঠকাব না, পাপ করব না। ভালো ভালো কাজ করব। সবাই কাঁদছে, রিমি কাঁদছে, আমার পিকু কাঁদছে। কষ্ট পাচ্ছে সবাই।
রনির গলা শুনে পেছনে তাকালাম। রনি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, সবকিছু শেয়ার করার পার্টনার। রনি পাশে থাকা আমার আর এক বন্ধু বিকাশকে বলছে, “ভাবা যায়, পরশু রাতেই আমরা সবাই কত আনন্দ করলাম। মদ খেয়ে খেয়ে এত বমি করল বাবিনকে তোলাই যাচ্ছিল না। আর আজকে সে নেই। আর কোনোদিন মদের আসরে ওকে পাব না রে। ওর ঠাট্টা, ইয়ার্কি খুব মিস করব।”
বিকাশ বলছে, “এবারের মদের টাকা বাবিনের দেওয়ার কথা ছিল তো? দিয়েছিল তোকে?”
“না, আমি ভেবেছিলাম দিয়ে দেবে। প্রতিবার তো দিয়ে দেয়। কিন্তু দেখ, কী থেকে কী হয়ে গেল!” রনি উত্তর দিল।
কথাটা শুনে আমার মাথাটা গরম হয়ে গেল। শালা, তোরা বন্ধু, না ছাই! মদের টাকার হিসেব করছিস এখন। মদের কথা শুনেই আবার মাথায় পাপবোধ ভর করে উঠল। ওদের টাকা দিতে পারলাম না, আবার মদের টাকা। এটা তো মনে হয় চরম পাপ! দিয়ে দিতাম, হঠাৎ মরে যাব কীভাবে জানব?
আড়চোখে শিংওয়ালা লোক দুটোর দিকে তাকালাম। নিজেই নিজেকে বললাম, আরে ভাই, মদ খাওয়া আবার পাপ নাকি? ধুর, এখানে আসায় ভুল হয়েছে।
ওদিকে লাশ দিয়ে দিয়েছে চুল্লির সামনে। পিকুর হাতে একটা লাঠিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে মুখাগ্নি করার জন্য। একবার দুষ্টুমি করার জন্য পিকুকে মেরেছিলাম। পিকু আজকে তার প্রতিশোধ নিচ্ছে নাকি? আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি, চিৎকার করছি, “পিকু, দিস না। তোরা আগুন না দিলে আমার ঠিক চেষ্টা করে ওই শরীরের মধ্যে ঢুকতে পারব। আমার সব প্ল্যান শেষ হয়ে যাবে তো।”
হঠাৎ মনে পড়ল, ট্রেকে যাব বলে টিকিট বুক করে রেখেছি পরের মাসে। পিকু শুনছে না কিছু। আগুন ছুঁয়ে দিল মুখে। আর এক ধাক্কা পেছনে সরে গেলাম। এবারে আমি সবার পেছনে দাঁড়িয়ে, আর দেখতে পারছি না। দেখতেও চাই না। নিজের সাধের শরীর, শখ, ইচ্ছে — সবকিছুকে আগুনে পুড়তে দেখতে চাই না আমি।
লাশ ঢুকছে চুল্লির ভেতরে। এবারে দরজা বন্ধ করে দেবে। আমি আর দেখতে পারলাম না শেষ পঁয়তাল্লিশ মিনিট নিজের শরীরকে তিলতিল করে শেষ হতে দেখা। বেশ কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার পর দেখলাম, রিমি কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসছে, সঙ্গে পিকু। পিকুর হাতে একটা হাঁড়ি। ওতে অস্থি আছে। মা-বাবার কাজে আমাকে করতে হয়েছে এটা। সামনের নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা।
নদীর জলে হাঁড়ির ভেতরের ছাইগুলো ফেলতেই আমি আর কাউকে দেখতে পেলাম না। মহাশূন্যে বিলীন হয়ে গেলাম মনে হলো। কিন্তু এত শখ, ইচ্ছে, ধার, বাকি নিয়ে কি মুক্ত হওয়া যায়? নাকি আবার ফিরতে হবে বাকি শখগুলো পূরণ করার জন্য!
লেখিকা পেশায় শিক্ষিকা, নেশায় লেখিকা আর স্বভাবে একজন মা। মনের নানা অনুভূতিকে কলমে প্রকাশ করার তাগিদ থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু। নিজের ফেসবুক পেজ ‘নকশিখাতা’-য় মাঝেমধ্যেই সেই অনুভূতিগুলিকে শব্দে তুলে ধরেন। লেখালেখির মাধ্যমে আরও পাঠকের কাছে পৌঁছে যাওয়া এবং তাঁদের সঙ্গে ভাবনার যোগসূত্র তৈরি করাই তাঁর প্রত্যাশা।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।