শান্তিনগরের পুরোনো ফ্ল্যাটটায় একটা গুমোট, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।
ডাইনিং টেবিলের ওপর তিনটে বড় কার্টন সাজিয়ে রেখেছে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী কর্পোরেট ল-ইয়ার ফারাহ। কার্টনগুলোর গায়ে মার্কার দিয়ে লেখা — 'ডাস্টবিন', 'দান' এবং 'বিক্রি'। গত পরশু তার মা সুলতানা বেগম মারা গেছেন। আজ ফারাহ এসেছে ফ্ল্যাট খালি করতে।
তার চোখে জল নেই, মুখে শোকের কোনো ছায়া নেই। পুরো অস্তিত্ব জুড়ে কেবল এক নিরেট, যান্ত্রিক বিরক্তি। গত বারো বছর মায়ের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। সুলতানা বেগম ছিলেন চরম রগচটা, নিয়ন্ত্রণকামী এবং ফারাহর ভাষায় — ভীষণ ‘টক্সিক’ একজন মানুষ।
পড়াশোনা, চাকরি, এমনকি ফারাহর বিয়ে — সবকিছুতেই তাঁর ছিল অন্তহীন নেতিবাচকতা। অতিষ্ঠ হয়ে বারো বছর আগে এই বাড়ি ছেড়েছিল ফারাহ, আর ফিরে আসেনি।
মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতাল থেকে লাশ সোজা আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করে এসেছে সে। কেউ তাকে এক ফোঁটা কাঁদতে দেখেনি। ফারাহ বিশ্বাস করে, যে সম্পর্কগুলো মানুষকে কেবলই শ্বাসরুদ্ধ করে, সেই সম্পর্কের মৃত্যুতে শোক করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
অত্যন্ত ক্ষিপ্র হাতে মায়ের জিনিসপত্র আলাদা করছে ফারাহ। দামি শাড়িগুলো 'বিক্রি'র বাক্সে, পুরোনো থালাবাসন আর কাঁথাগুলো 'দান'-এর বাক্সে, আর দরকারি কাগজপত্র নিজের ব্যাগে ভরছে সে। তার কাছে পুরো ব্যাপারটা একটা নিখুঁত অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজ মাত্র। আজ বিকেলের মধ্যেই এই ফ্ল্যাটের চাবি বাড়িওয়ালার হাতে বুঝিয়ে দিয়ে নিজের ছিমছাম, গোছানো জীবনে ফিরে যেতে চায় সে।
ফারাহর ভ্রু কুঁচকে গেল। শিশিটা বেশ ভারী, গা জুড়ে পুরোনো দিনের নকশা, কিন্তু কোনো লেবেল নেই। ভেতরে তলানিতে পড়ে আছে খুব সামান্য একটু লালচে-সোনালি তরল।
মস্তিষ্কের যে অংশটি কেবল যুক্তিতর্ক আর হিসাব-নিকাশ বোঝে, ঘ্রাণের স্নায়ু তাকে নিমেষেই পাশ কাটিয়ে চলে যায় সোজা স্মৃতির গভীরে। ফারাহর মতো তুখোড় আইনজীবীর এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি জানা থাকলেও, তার জানা ছিল না — এই ছোট্ট শিশিটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার বারো বছরের জমানো সব ক্ষোভ আর ইগোর মৃত্যু।
অবচেতনভাবেই রুপালি ঢাকনাটা খুলল ফারাহ। তারপর শিশিটা নাকের কাছে নিয়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস টানল।
মুহূর্তের মধ্যে শান্তিনগরের সেই গুমোট ফ্ল্যাটটা যেন উবে গেল।
শিশির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা গন্ধটা কোনো আধুনিক ফ্রেঞ্চ পারফিউমের নয়। ভেজা মাটি, চূর্ণ করা বেলি ফুল আর সামান্য একটু এলাচের কড়া ঝাঁঝালো গন্ধের এক অদ্ভুত, আদিম মিশ্রণ। সুবাসটা মস্তিষ্কে আঘাত করার সাথে সাথে ফারাহর মনে হলো, কেউ যেন তাকে এক ধাক্কায় পঁচিশ বছর পেছনে ছুড়ে ফেলেছে।
১৯৯৯ সাল। বাইরে ভয়ংকর কালবৈশাখী। বিদ্যুৎহীন ঘরে দশ বছর বয়সী ছোট্ট ফারাহ অন্ধকারে ভয়ে কাঁপছে। ঠিক তখন একটা নরম হাত তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল।
"ভয় কী রে পাগলি! আমি আছি না?"
কণ্ঠস্বরটা সুলতানা বেগমের। দশ বছর বয়সী ফারাহ সেদিন মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ঠিক এই ঘ্রাণটাই পেয়েছিল। ভেজা মাটি, বেলি ফুল আর এলাচের গন্ধ।
তখন সুলতানা বেগম রগচটা ছিলেন না। তখনো স্বামী তাঁকে ছেড়ে যায়নি, পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা তাঁকে পাথর বানিয়ে দেয়নি। তখন তিনি ছিলেন কেবলই একজন মা, যিনি বুকের সুগন্ধি আর ওম দিয়ে মেয়েকে পৃথিবীর যাবতীয় ঝড় থেকে আড়াল করে রাখতেন।
ফারাহর হাত কাঁপতে শুরু করল। আঙুলের ফাঁক গলে মেঝের ওপর খসে পড়ল শিশিটা। কাঁচ ভেঙে যাওয়ার ঝনঝন শব্দের চেয়েও তীব্র হয়ে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা তরলের সেই জাদুকরি সুবাস। একটা প্রবল নস্টালজিয়ায় ফারাহর চোখের সামনের শক্ত, যুক্তিবাদী কর্পোরেট দেয়ালটা বালুর দুর্গের মতো ধসে পড়তে লাগল।
গত বারো বছর সে সুলতানা বেগমকে কেবল একজন 'টক্সিক' মানুষ হিসেবেই বিচার করেছে। সে ভুলেই গিয়েছিল, এই নারীটি একসময় একা হাতে দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে তাকে বড় করেছেন। পৃথিবীর কঠিন আঘাতগুলোই সুলতানাকে খিটখিটে আর অসহিষ্ণু বানিয়েছিল। ফারাহ কেবল মায়ের রুক্ষ আচরণটাই দেখেছিল, সেই রুক্ষতার পেছনের একাকীত্ব আর দীর্ঘশ্বাসটা কখনো বোঝার চেষ্টা করেনি। ভালো রূপটাকে সযত্নে ভুলে গিয়ে সে কেবল খারাপটুকুই মনে রেখেছিল।
আজ এই পুরোনো সুগন্ধির শিশিটা তার সেই হারিয়ে যাওয়া মা-কে ফিরিয়ে এনেছে। ফারাহ দু'হাতে মুখ ঢাকল। তারপর গত বারো বছরে প্রথমবারের মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার এই কান্না আজ কোনো মৃত মানুষের জন্য নয়, তার কান্না সেই জীবিত মানুষটার জন্য, যাকে সে নিজের অহংকার আর যুক্তির কারণে বেঁচে থাকতে কখনো ক্ষমা করতে পারেনি।
মানুষ হওয়ার আগে এভাবেই হয়তো কখনো কখনো যুক্তির অহংকার চূর্ণ করে, ঘ্রাণের মতো কোনো অমূর্ত পথপ্রদর্শকের হাত ধরে স্মৃতির অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের কাছে ফিরে যেতে হয়। ক্ষমার কাছে আত্মসমর্পণ করেই মানুষের জন্ম হয় নতুন করে।
লেখক একজন নবীন কবি ও সাহিত্যস্রষ্টা। মানুষের অনুভূতি, জীবনবোধ, বিষাদ, প্রকৃতি এবং অন্তর্জগতের নানা অনুষঙ্গ তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। দীর্ঘদিন ধরে কবিতা ও গল্পচর্চার মাধ্যমে নিজস্ব সাহিত্যভাষা নির্মাণে তিনি নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। পাঠকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টি করাই তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল লক্ষ্য।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।