About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
সমু–শুভরা
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

সমু–শুভরা

নামগুলো ওদের সবই বেশ ছোট ছোট। বাপি, রাজু, জয়, সমু, শুভ, সিরাজ, নানু, বিশু, বুড়ো — এরকম। অবশ্য ওগুলো ওদের পোশাকি নাম নয় — বন্ধুবান্ধবদের যে একটা সার্কেল রয়েছে, সেখানে চলটা বেশি। এতে একে অপরকে নাম ধরে ডাকার যেমন সুবিধা হয়, তেমনই বন্ধুত্বের প্রগাঢ়তাও বেশ আত্মপ্রকাশ করে। নামের মধ্যে যে মডার্নিটির একটা ঝিলিক আছে, সমু-শুভরা তা উপলব্ধি করেছে মর্মে মর্মে।

সমু-শুভরা কোনও শহর, আধা-শহর কিংবা কলকাতার রকে বসা আড্ডাবাজ যুবক নয়। ওরা যেখানে আড্ডা দেয়, তার সামনে দিয়ে চলে গেছে মোরাম বিছানো লাল কাঁকর মাটির রাস্তা, যার ওপর দিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করতে করতে এখনও গরুর গাড়ি চলে, গরিব চাষি জোয়ালে গরু বেঁধে কাঁধে লাঙল নিয়ে এখনও মাঠে যায়। চারণক্ষেত্র হতে প্রত্যাগত গরু-ছাগলগুলি রাস্তা ছেড়ে পাশের শস্যক্ষেত্রে নেমে পড়ে যখন-তখন। একটু দূরেই বিশাল আয়তনের দুটি পুষ্করিণী — একটি পদ্মফুলে ভরা, অপরটির রুই, কাতলা, মৃগেল মাছে ঠাসা। রাস্তার ধারে এখানে-সেখানে বাবলা, নিম, শিরীষের গাছ। প্রাইমারি স্কুলটার সামনেই বৃহৎ দুটি বটগাছ আর একটি অশ্বত্থ গাছ। তার সামনে ফুটবল মাঠ। সমু-শুভদের দিনের বেশিরভাগটা কাটে এখানেই।

সমু-শুভদের সবাই এখনও বেকারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এই যেমন রাজু স্কুল ফাইনাল দিয়েছে। শুভ ইলেভেনে পড়ছে। সমু ইংরেজির জন্য দুবার পরীক্ষা দিয়েও হায়ার সেকেন্ডারি পাস করতে পারে নি। নানু কলেজে পড়ছে। কিসু বেসিক ট্রেনিং পাস করেছে। পুরুষানুক্রমে জায়গাটা স্কুলডাঙ্গার মাঠ নামেই পরিচিতি লাভ করে এসেছে। সমুদের বাবা, জ্যাঠা, কাকা কিংবা দাদারা এই মাঠেই খেলেছে। এখনও তারা সময়-অসময়ে ইচ্ছে হলে খেলতে নেমে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সমুরা ক্রিকেট বেশি খেলে। ক্রিকেটের মধ্যে একটা আভিজাত্য খুঁজে পায়। বড়দের সমালোচনাকে ওরা আমল দেয় না। ওরা ওদের মতো টিম বানায়, টুর্নামেন্ট খেলে। প্রাক্তনেরা ওদের খেলা দেখে আর বিচলিত হয়। খেলার সেই মান নেই, এই কি খেলা! মন নেই, প্রাণ নেই। খেলার নামে মিথ্যা সময় কাটায় ওরা। নিষ্ঠার অভাব, নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাব। একসময় তারা কত টুর্নামেন্ট জিতেছে। আর এরা যত দুর্বল টিমের কাছেও হেরে আসে। অথচ এদের সরঞ্জামের অভাব নেই। সময়ের অভাব নেই।

সমু-শুভরা নিজেদের নিয়ে মশগুল থাকে। খেলা শেষে বসে বৈঠক। বিষয় সবই টাটকা। টিভিতে ক্রিকেট সিরিজ চললে তো কথাই নেই। শচীন, সৌরভ, শেন ওয়ার্ন — যে কেউ ওদের মধ্যে চলে আসে। চলতি ম্যাচে কে কী ভুল করেছে, পরের ম্যাচে কাকে কীভাবে খেলতে হবে, স্ট্র্যাটেজিতে কী পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী — তাই নিয়ে মতামতের ঝড় ওঠে। সন্ধ্যার আঁধার ঘন হয়, রাত্রি নামে। ওরা বাড়ি ফিরে। পরের দিন আবার খেলা শুরু হয়... আবার শেষ হয়... আবার আরম্ভ হয় বৈঠক। খোশখবর, খোশমেজাজ।

সমু-শুভদের কেউ কেউ নিউজপেপার পড়ে। প্রথমে হয়তো তারাই শুরু করে। ইংল্যান্ডের যুবরানীর বিবাহবিচ্ছেদ... সেখান হতে ফিরে আসে বোম্বেতে — উঠতি নায়িকার রহস্যজনক মৃত্যু। নায়িকার মৃত্যুতে জনৈক নায়কের মার্কেট ভ্যালুর অভাবনীয় হ্রাস। পরিশেষে টলিউড টাচ করে ওরা। অশ্লীল পোশাকে অভিনয় করে কোন নায়িকা সম্প্রতি একটি ছবিতে হৈরৈ ফেলেছে, তারই আনুষঙ্গিক বিবরণ। কোনও কোনও দিন আবার শুধুই পড়াশোনার কথা। ইংরেজি-আতঙ্ক সকলেরই। বিশেষ করে সমুর। এটি সম্ভবত তার লাস্ট চান্স। সমু অপেক্ষাকৃত ভালো। সমুর কাছে তাই পরামর্শ। সাত কিলোমিটার দূরে রাজগ্রাম স্কুলের মহাদেববাবুর নোট পড়লে পাস হবেই। গত বছর হান্ড্রেড পার্সেন্ট কমন এসেছিল। লেটার, প্যারাগ্রাফগুলো, এমনকি ৪০ নম্বরের আনসিনটাও পর্যন্ত কমন। ভাবা যায়!

সহসা ওদের টপিক একটু সরে যায়। শুভদের সঙ্গে জয়পুরের যে মেয়েটি আর্টস নিয়ে পড়ত, সে হঠাৎ সুইসাইড করেছে। কারণ লাভ অ্যাফেয়ার্স। মেয়েটির এ ছাড়া উপায় ছিল না! গভীর ভালোবাসার পরও ছেলেটি অন্য মেয়েকে বিয়ে করে নিয়েছে।

পলিটিক্স নিয়েও ওরা মাথা ঘামায়। উত্তপ্ত হয় পরিবেশ। ওরা কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। সে কেন্দ্রের ইউরিয়া কেলেঙ্কারি হোক বা পঞ্চায়েত প্রধানের ছেলের চাকরি পাওয়া হোক। রাজনৈতিক মতামত ওদের সকলের মোটামুটি স্বচ্ছ এবং ঐক্যপূর্ণ। পঞ্চায়েত নেতারা তাদের সক্রিয় রাজনীতিতে নামার আহ্বান জানায়, কিন্তু ওরা দূরে থাকতে চায়। রাজনীতিকে ওরা ভালো চোখে দেখে না। কোনও দুর্নীতি ওদের দৃষ্টি এড়ায় না। ছলনা, চাতুরী, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, অন্যায়, অবিচার — কোনও কিছুই সমু-শুভদের কাছে অবিদিত নয়।

দিন যায়। মাস যায়। বছরের পর বছর অতিক্রম করে। সমু-শুভরা সেই আগের মতোই স্কুলডাঙ্গার মাঠে জমায়েত হয়। খেলাধুলার চর্চা আর তেমন চলে না। অপেক্ষাকৃত নবীন যারা, তারা এখন খেলার মাঠ সচল রেখেছে। সমু-শুভরা ওদের গাইড করে। ওরা এখন সমুদা, শুভদা। সমু হায়ার সেকেন্ডারি পাস করতে পারে নি। রাজু, শুভ কলেজে পড়ছে। রাজু হিস্ট্রিতে অনার্স পেয়েছে। শুভ বায়োসায়েন্স। কিছুদিন হলো মাঠের পাশে মোহনের চায়ের দোকান হয়েছে। ওরা সেখানে আড্ডা জমায় আজকাল। বর্তমানে ইনডোর গেমসের কিছু খেলা চালু করেছে মোহনের দোকানের পাশে চালাঘরটাতে। কখনও ক্যারাম, কখনও তাস নিয়ে ব্রিজ কিংবা টোয়েন্টি নাইন।

সমু-শুভদের জেনারেশনটার একটা দিক লক্ষণীয়। সাজপোশাকে ওরা কেউ পিছিয়ে নেই। প্রত্যেকেরই একটা স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে। সেরা টেলারের ফিটিং করা প্যান্ট-শার্ট, শ্রীলেদার কোম্পানির শু আর বাটা কোম্পানির বেল্ট। হাতঘড়িগুলো অবশ্য রকম-রকম। কিন্তু প্রত্যেকেই কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কারও ঘড়ি দিন-তারিখে বিশিষ্ট, কারও ঘড়ি মোরগের ডাক ডেকে জানিয়ে দিতে পারে সময়, কারও ঘড়িতে অমাবস্যা-পূর্ণিমার চাঁদ দেখা যায়, মানুষের গলায় কথা বলতে পারে এমন ঘড়িও কারও কারও হাতে রয়েছে। একে অপরকে ওরা প্রশংসা করে, পুলকিত হয়।

সমু-শুভদের আগের জেনারেশন, এখন যারা নিজেদের প্রাচীনপন্থীর আসনে বসাতে বড় ভালোবাসে, তাদের সময় কিন্তু এমনটা ছিল না। বামুনের ছেলে বিমল, তেলির ছেলে তপনের পিছনে লাগত। দুহাত ধুতিকে তীব্র কটাক্ষ করে মানুষ হতে বলত। বাগদির ছেলে নবা পিছনে লাগত সিরাজের। চাষাকে চাষা, কায়েতকে কায়েত, মুসলমানকে মুসলমান বলতে কেউ সংকোচবোধ করত না। আবার জাতিশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণকেও অন্যান্যরা কম অপদস্থ করত না। তাই বলে সুসম্পর্কে কোনও দিন ফাটল দেখা দেয়নি। বর্তমান জেনারেশন সমু-শুভদের মধ্যে কিন্তু এমনটা নাই। ওরা সবাই সমান। মুসলমানের ছেলে বামুনের হেঁসেলঘরে ঢুকে যায়। মুসলমান বন্ধুর বিয়েতে নিমন্ত্রিত হয়ে খানাপিনা পর্যন্ত চলে। আর বাইরে থেকে বোঝারই উপায় নাই — কে গরিব, কে আমির। সকলেরই ভাষা মার্জিত। আদবকায়দায় সকলেই প্রথম শ্রেণি।

আজকাল কর্মক্ষেত্র পত্রিকা নিয়ে সমু-শুভরা চাকরির সন্ধান করে। অ্যাপ্লিকেশন লিখে। পরীক্ষা, ইন্টারভিউ নিয়ে চর্চা চলে। সমুর শরীরের যা মাপজোখ, তাতে করে বর্ডার সিকিউরিটিতে নয় আরপিএফ-এ চান্স পেয়ে যাবে। সেই আশা নিয়েই ইদানীং শরীরচর্চা চলছে। কিন্তু সুপারিশ আর তিরিশ হাজার টাকা ঘুষের কথায় মুষড়ে পড়েছে। তিরিশ হাজার টাকা পাবে কোথায়! ইচ্ছা করলে বাবা দিতে পারে, কিন্তু দাদারা কি দিতে দেবে? দেবে না। চাষির ছেলে, জমিজায়গার অভাব নেই, লাঙল ধরতে জানে না। মাথায় বোঝা ওঠালে সম্মান নষ্ট হয়। তাকে কি কম কথা শুনতে হয়! বন্ধুদের সামনে এসব বলা যায় না।

নানু চাকরি পাওয়ার পর থেকে পুরো গ্রুপটার মধ্যে এখন চাকরি পাওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। নানুকে নিয়েই ওদের আলোচনা চলছিল। কলকাতায় ওর মামা চাকরি করে দিয়েছে। রেস্তোরাঁর চাকরি। নানুকে যে কী কাজ করতে হয়, তার স্পষ্ট ধারণা ওদের এখনও হয়নি। গাজনের সময় ও এলে বোঝা যাবে। নানু অবশ্য শুভকে একটা চিঠি দিয়েছে। লিখেছে, বেশ ভালো লাগছে তার নতুন চাকরি। প্রায় দুহাজার টাকা মাইনে। সঙ্গে উপরি রোজগার আছে।

কিসু এক্সচেঞ্জ থেকে একটা কল পেয়েছে। প্রপার চ্যানেল ধরবার জন্য তাকে সকলে পরামর্শ দেয়। ওদের পুরো গ্রুপটা পঞ্চায়েতের চোখে অ্যান্টিসোশ্যাল। অথচ কিসুর চাকরি হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। কীভাবে কী করা যায়, এ নিয়ে সমু-শুভদের জোরদার বৈঠক চলে।

গ্রামের হাটতলায় বুড়ো দোকান খুলবে, সেই পরিকল্পনাটা সেদিন আলোচনা হচ্ছিল। ওর দাদা বিহারের একটা প্রাইভেট স্কুলে চাকরি করে। দাদা এই টাকা দেবে বলেছে। এদিকে এক্সচেঞ্জ থেকে লোন নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। কিন্তু কিসের ব্যবসা করা যায়? সিরিয়াস আলোচনা থেকে সমু-শুভরা সরে আসে। কঠোর বাস্তব ভুলে রঙ্গরসিকতার জোয়ার তোলে। লেডিজ কর্নার খোলার পরামর্শ দেয় — মেয়েদের জন্য কেবল। প্রস্তাব শুনে হাততালি বাজে। বুড়ো বলে, গ্রামের মাঝে লেডিজ কর্নার খুললে দুদিন পরে লেডিজ ফিঙ্গার বেচতে হবে।

জয়ের পিছনে লাগে ওরা। জয় একসময় ভালো ছাত্র ছিল, কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারিতে বিগড়ে গেছে। এখন প্রাইভেট টিউশন শুরু করেছে। মেয়েদের বেশ ভিড় ওর টিউশনিতে। জয়কে সমু-শুভরা মাস্টার উপাধি দিয়েছে। বলে, ছাত্রীরা কেমন পড়াশোনা করছে? দেখিস মাকড়সার জালে যেন জড়িয়ে যাস না। জয় ওদের সব ইঙ্গিত বুঝতে পারে। প্রতিবাদ করার উপায় নেই। নীরবে হাসে।

আগের দিন বিকেলবেলা ওরা ঠিক করেই রেখেছিল, সিনেমা দেখতে যাবে। হিন্দি ফিল্ম। সাইকেলে যেতে যেতে শুরু হলো আজকের জোরালো খবরটার পুনরালোচনা। প্রতিদিনই গ্রামের বিশেষ বিশেষ ঘটনা ওদের আড্ডায় ঠাঁই পায়। আজকের ঘটনা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি কারণে। ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক যুবক। গ্রামের অনেক ছেলের আদর্শ হতে পারত যে! রেলের বড় অফিসার, সেই আদর্শবান সৎ চরিত্রের যুবক কাজের মেয়ের কাছে চরিত্র হারিয়েছে। মুখে কালি মেখেছে। বাপের চৌদ্দপুরুষের মাথা হেঁট করেছে। আজ রাতেই তার বিয়ে হবে পাশের গ্রামের কোনও ভাগ্যবতীর সঙ্গে। ওদিকে পঞ্চাশ হাজার টাকার বিনিময়ে কাজের মেয়ে বেকসুর খালাস দিয়েছে গ্রামের হীরের টুকরো ভীতু কাপুরুষ ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে।

একটা বছর কখন যে গলে যায়, সমু-শুভরা স্কুলডাঙ্গার মাঠে দিনের পর দিন আড্ডার আসর জমিয়ে বুঝে উঠতে পারে না! ওদের চারজনের মুখে সিগারেট জ্বলছিল। অর্ধাংশ শেষ হলে আরও চারজনের মুখে স্থানান্তরিত হবে। আলস্য আর কর্মহীনতার পথের পথিক ওরা। ওদের সামনে এখন অখণ্ড অবসর। পড়াশোনার মাথাব্যথা নাই। চাকরি খোঁজার উদ্যম নাই, উৎসাহ নাই। পকেটের পয়সা খরচ করে পরীক্ষাতে বসার কোনও মানে সমু-শুভরা খুঁজে পায় না। পঞ্চাশ টাকার পোস্টাল অর্ডার, পনেরো টাকা রেজিস্ট্রি, রাহা খরচ দু’শ। কী লাভ! ঘরের লোকও তাই বলে। তবু চাইতে হয়। পরীক্ষার জন্য নয় — পকেটমানির জন্য।

সিগারেট শেষ হলে ওরা চুন আর তামাকপাতা দিয়ে খৈনি বানায়। এই দ্রব্যটি এখন বেশ জনপ্রিয় হয়েছে ওদের মধ্যে। ওরা বলে, কম পয়সায় পুষ্টিকর খাদ্য। জেনারেল নলেজ বইতে নাকি লেখা রয়েছে, এতে প্রচুর প্রোটিন। বিজ্ঞানীরা কি তাদের চেয়েও বেকার হয়ে পড়ল! শেষে খৈনি নিয়ে গবেষণা!

একটা পুরনো সিএসআর নিয়ে খেলা করছিল বিশু। সমু বলল, ওই মডেল মেয়েদের আর কত ছবি দেখবি? কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। খিস্তি দিতে দিতে বলল, এসব দেখবি না, মুখস্থ করবি নোবেল প্রাইজ বিতরণ সভায় উপস্থিত রাজার ডান চোখের চশমার পাওয়ার কত ছিল? অমর্ত্য সেনের জন্ম বাংলাদেশের যে গ্রামে, সেটা কোন নদীর তীরে অবস্থিত?

সমু দুর্গাপুরে লাইন দিতে গিয়েছিল। বিএসএফের চাকরি। নেপালি সার্জেন্ট পেটে হঠাৎ এমন গুঁতো মেরেছে, বেচারি ‘মা গো’ চিৎকার করে জ্ঞান হারাবার উপক্রম! চাকরি হয়নি। দু’বছর হলো এক্সচেঞ্জে উইলিং করে এসেছে কিসু। এখন পরের ইলেকশনের জন্য অপেক্ষা। যদিও চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন সে দেখে না। বাবার জমিজায়গা রয়েছে। নিজেকে ধীরে ধীরে চাষের কাছে অভ্যস্ত করে তুলছে, কারণ দু’চোখে তার বিয়ের স্বপ্ন।

বুড়োর বিজনেস বাস্তবায়িত হয় নাই। চাকুরে দাদা বিমুখ হয়েছে। বুড়ো জানে, এটা বৌদির কারসাজি। যে ছেলে বিড়ি-সিগারেট খায়, মদ খায় — তার ওপর কোন ভরসায় এত টাকা ঢালবে! সঙ্গদোষে ছেলেটা উচ্ছন্নে গেছে। বংশের কলঙ্ক ও। বড় বিজনেসম্যান হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল — স্বপ্ন ভেঙেছে।

গাজনের সময় নানু এসেছিল। চেহারায় কত পরিবর্তন! সামান্য মুটিয়েছে। গায়ের রঙে বেশ চাকচিক্য। রেস্তোরাঁয় কাজ। বাবু-বিবিরা সব ভিড় করে। নানু কত গল্পই না করেছে। দুনিয়াতে এত সব ঘটে যাচ্ছে! ভদ্রঘরের মেয়েদের এমন সব কীর্তিকলাপ! নানুদের বাড়তি ইনকামের গল্প শুনে সমু-শুভরা তো থ! শুধু কি তাই? লেন্স বসানো দেয়ালের গুপ্ত ফাঁকে চোখ রেখে সাহেব-বিবিদের কাণ্ডকারখানা দেখা। নানু কথা দিয়েছে, ওদের কলকাতা নিয়ে গিয়ে ওসব দেখাবে। নানু এখন মদ খায় — কী সব নাম বলছিল, রাম, থ্রি-এক্স, আরও কী সব! গাজনের সময় এনেছিল — রাধাপুরের মাঠে সমু-শুভরা চিকেন মাংস সহকারে বেশ খেয়েছিল। মুখের গন্ধ লুকাবার জন্য মসলাপান চিবিয়েছিল দু-তিনটে করে। রথের মেলায় আবার আনবে বলেছে। কাজুবাদামের সঙ্গে নাকি টেস্টই আলাদা!

জয় মাস্টার এখন সমু-শুভদের গ্রুপের পার্মানেন্ট সদস্য। আঙুলের ফাঁকে অহর্নিশি বিড়ি-সিগারেট জ্বলে। বাতাসে মুখের ধোঁয়া ছবি আঁকে। প্রতিহিংসায় বলিরেখা স্পষ্ট হয়। গভীর নিশ্বাস পড়ে... নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করে উদাত্ত গলায়! জয় মাস্টার এখন বেকার — সমাজ ওর পিঠে চরিত্রহীনের তকমা এঁটে দিয়েছে। প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা পর্যন্ত অবজ্ঞায় মুখ ফিরিয়ে চলে। হৃদয়-গভীরে প্রেমের বাসাতে শ্যামলবর্ণা, ছিপছিপে, অতি সাধারণ তরুণী ছাত্রীটিই ঠাঁই চেয়েছিল বেশি, যত না চেয়েছিল জয় মাস্টারের বেরোজগারি জীবন্মৃত প্রেম! কিন্তু সমাজ ক্ষমা করেনি!

সমু-শুভদের কাছে সময়ধারা বড় অলস। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পৃথিবীর গতি শ্লথ হয়ে ওদের সঙ্গে পৃথিবী যেন মজা করে! সময় দীর্ঘতর হয়ে কর্মহীন মানুষদের শাস্তি দেয়! কর্মহীনতার যন্ত্রণা দগ্ধ করে। দাহন-যন্ত্রণার হাত থেকে রেহাই পেতে সমু-শুভরা সময়ধারাকে অগ্রাহ্য করে কখনও তাস খেলে, কখনও দাবা খেলে। দাবায় চাল দিতে দিতে একের পর এক বিড়ি-সিগারেট শেষ হয়। মোহনের দোকানে রঙিন সুদৃশ্য প্যাকেটে নানান ব্র্যান্ডের নেশাসামগ্রী অলস সময়ধারাকে ভুলিয়ে রাখে।

সমু-শুভরা অনুভব করে, লেখাপড়া শিখে ওরা মারাত্মক ভুল করেছে! শিক্ষা ওদের পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিয়েছে। শিক্ষাই ওদের পথে বসিয়েছে। সমু-শুভরা এভাবেই বেঁচেবর্তে থাকবে। তীব্র হতাশাকে বুকে লুকিয়ে ওদের কেউ কেউ হয়তো একদিন বিগত যৌবনকালে সংসার করবে। হতাশাগ্রস্ত পিতার সন্তান-সন্ততিরা পিতা-মাতার অনাদরে বড় হবে। শিক্ষাহীন, সংস্কৃতিহীন সামাজিক পরিবেশে ভরে উঠবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম!




আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম

আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের শারদ ১৪৩৩ সংখ্যাটি ৫ অক্টোবর ২০২৬ (১৭ই আশ্বিন) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top

    ‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

    ‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।