মধ্যপ্রদেশের কানহা, বান্ধবগড়, পেঞ্চ ঘোরা হয়ে গেলেও পান্না যাওয়া হয়ে উঠছিল না। তাই সেবারের গন্তব্য ছিল অমরকণ্টক, খাজুরাহো, পান্না, আর তারপরে ঝাঁসি হয়ে ওরছা। যদিও আস্তিক, নাস্তিক কোনওটাই নই, তবুও অমরকণ্টক, প্রবাহিণী নর্মদা, শোন, আর প্রকৃতি ও আদিবাসী সহজ-সরল মানুষজন আপনাকে আকর্ষণ করবেই। আসলে মধ্যপ্রদেশের মানুষজন এখনও বড্ড সরল, আন্তরিক। তাদের সঙ্গে কথা বললেই সেটা বোঝা যায়। তাই মধ্যপ্রদেশ আমাকে খুব টানে।
খাজুরাহোতে বিদেশি প্রচুর। খাজুরাহো মন্দির চত্বরে সন্ধ্যাবেলার লাইট অ্যান্ড সাউন্ড আমাকে তেমন আকর্ষণ করেনি। মন্দিরের বাইরে বসে থাকা এক অন্ধ ভিখারির দেশীয় বাদ্যযন্ত্র, রাজস্থানের রাবণহাত্তার মতো, বাজিয়ে গান সূর্যের পড়ন্ত আলোয় অনেকদিন মনে থাকবে।
ওরছা ছিল ছোট্ট পশুপালকদের গ্রাম। এখানে ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে আছে অনেক লোককাহিনি। বেশিরভাগ মানুষ কৃষিজীবী। সারা দেশ যখন রামলালার মন্দির প্রতিষ্ঠায় উদ্বেলিত, তখন ওরছার কথা মনে পড়ে। রঘুপতি রাঘব রাজা রাম — এখানে দেবতা নয়, রাম রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ভালোবাসার রাজা। রাম রাজার মন্দির এখানে রয়েছে। এখানে তিনি রাজা।
প্রাচীন এই নগরীর মাটিতে, পাথরে, ঘাসে প্রতিটি পরতে পরতে ইতিহাসের গন্ধ লেগে রয়েছে। বুন্দেলা রাজপুত রাজাদের আমলেই ওরছা খ্যাতি ও সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছেছিল। এখানেই ছিল তাদের রাজ্যপাট। মুঘল শক্তির সঙ্গে মিত্রতা দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে শুধু নয়, সমগ্র বুন্দেলখণ্ডের মানচিত্রেও ওরছাকে এক বিশিষ্ট স্থান দিয়েছিল। "জয় বুন্দেলা, জয় বুন্দেলা" ধ্বনিতে মুখরিত করে তুলেছিল বুন্দেলা সেনাবাহিনী তাদের শৌর্যে এবং বিক্রমে। ১৫৩১-১৭৮৩ বুন্দেলখণ্ডের রাজধানী ছিল ওরছা। রাজা রুদ্রপ্রতাপ সিংহ গড়ে তোলেন এই অপরূপা নগরী। প্রায় সাড়ে চারশো বছর ধরে তারপর তাঁর উত্তরসূরীদের হাতেই ছিল ওরছার শাসনক্ষমতা। ১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এই রাজ্য।
মুঘল জমানায় সেই সময় আকবরের রাজত্ব। যুবরাজ সেলিম তখন আনারকলির প্রেমে মগ্ন। আকবরের পক্ষে অসহনীয় এই প্রেম জন্ম দিল নতুন উদ্বেগের। বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন যুবরাজ সেলিম সম্রাটের বিপক্ষে। সম্রাট সেলিমকে দমন করার ভার দিলেন আবুল ফজলকে। সেই সময় ওরছার শাসনকর্তা মধুকর শাহের পুত্র বীর সিংহ ছিলেন বদায়ুনীর সামরিক প্রধান। সেলিম তাঁর শরণাপন্ন হলেন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন বীর সিংহ, আবুল ফজলকে হত্যা করলেন। মিত্রতাবদ্ধ হলেন সেলিম ও বীর সিংহ। শুরু হলো ওরছারও এক নতুন অধ্যায় — মৈত্রীর, বন্ধুতার। কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে এই সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করল এই দেশীয় শক্তির নতুন চলার পথ।
ওরছা নিঃসন্দেহে "hidden treasure"। ওরছা দুর্গ ১৬শ শতাব্দীতে নির্মিত। এই দুর্গের অনেকটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও রাজমহল প্রাসাদ, রাই পারভীন মহল, শীশ মহল, জাহাঙ্গীর মহল এখনও স্বমহিমায় বিদ্যমান।
ওরছার অন্যতম খ্যাতিমান শাসক রাজা মধুকর শাহ ছিলেন কৃষ্ণভক্ত। রাজমহলের fresco painting-এ তাই কৃষ্ণের জীবনকাহিনি। রানি গণেশ কুমারী ছিলেন রামভক্ত, তাই তাঁর মহলে রামায়ণের চিত্রকাহিনি রঙে ও ব্যঞ্জনায় বুন্দেলা চিত্রকলার অপূর্ব নিদর্শন।
দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস পেরিয়ে চলতে চলতে পৌঁছে গেলাম রাই পারভীন মহল। সেই সময়কার অসামান্য সুন্দরী, নর্তকী, সুগায়িকা, কবি ছিলেন রাই পারভীন। স্বয়ং মুঘল সম্রাট আকবর তাঁর রূপমুগ্ধ ছিলেন, এতই ছিল তাঁর রূপের খ্যাতি। রাজা মধুকর শাহের পুত্র ইন্দ্রজিৎ ছিলেন তাঁর দয়িত। রাই পারভীন মহলে রয়েছে তাঁদের দুজনের ঘোড়সওয়ারি ম্যুরাল।
প্রেমকাহিনি তো বুন্দেলখণ্ডের আকাশে-বাতাসে। গোয়ালিয়রের রানি মৃগনয়নী, রাজা মান সিংহের প্রেমকাহিনি, রাই পারভীন-ইন্দ্রজিতের প্রেমগাথা কিংবা বাজিরাও-মস্তানির প্রেম — সবই আজ ইতিহাসের পাতায়।
জুঝড় সিংহ যখন ওরছার সিংহাসনে আসীন, সেই সময় তিনি মুঘল সম্রাট শাহজাহানের কথা অমান্য করায় শাহজাহান তাঁকে দমন করার জন্য ঔরঙ্গজেবকে পাঠান। জাহাঙ্গীর মহলে উড্ডীন হয় মুঘল পতাকা। মুঘল শক্তির সঙ্গে সখ্যতার চিত্র বদলে যায় বৈরিতায়।
ওরছার অন্যতম আকর্ষণ লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির। রাজা বীর সিংহের তৈরি এই মন্দির বুন্দেলা স্থাপত্যের নিদর্শন। আর আছে রামরাজা মন্দির, তৈরি করেন রাজা মধুকর শাহ। রাজা-রানি আগে এখানেই থাকতেন। রামচন্দ্র এখানে পূজিত দেবতা।
সূর্যাস্তের অস্তরাগে বেতোয়া নদীতীরে কাঞ্চনঘাটে দাঁড়িয়ে, বুন্দেলা রাজপরিবারের ১৪টি ছত্রি বা সমাধিসৌধের দিকে তাকিয়ে মনে আসে ওয়াজেদ আলী শাহের সেই গানের কলি, "বাবুল মোরা নৈহার ছুটো হি যায়।" এমনইভাবে শেষ হয়ে যায় কত গৌরব, উজ্জ্বলতা, শ্রেষ্ঠত্বের কাহিনি, তবুও দাঁড়িয়ে থাকে ইতিহাস, তাকে মুছে ফেলা যায় না।
সন্ধেবেলা ওরছা ফোর্টে son-et-lumiere দেখতে বসে দেখছিলাম, আমার পাশের আসনের দর্শনার্থীরা সকলেই বিদেশি। ওরছার রাস্তায় তাঁদেরই ভিড়। সবকিছুর স্বাচ্ছন্দ্য এখানে নেই, সাধারণ মানের কিছু হোটেল রয়েছে, কিন্তু বেতোয়া নদীর তীরে মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের হোটেল অনবদ্য। ওখানে থাকলে খাওয়ার অসুবিধা নেই। নাহলে খাওয়ার হোটেল পছন্দ নাও হতে পারে। ওরছা রাজপ্রাসাদে থাকার, খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, তবে ভালো কাঞ্চনমূল্য চুকিয়ে। তবে বুন্দেলখণ্ড রাজপ্রাসাদে ব্রেকফাস্ট করতেই পারেন। ভালো দোসা, ইডলি, পুরি-সবজি সবই পাবেন। তবুও একটু রাজদরবারের আতিথ্য না হয় নেওয়া হয়ে গেল।
তবুও শুধু ভারতীয় সংস্কৃতি, ইতিহাসের প্রতি তাঁদের অদম্য কৌতূহল, শ্রদ্ধা তাঁদের বিরত রাখতে পারেনি। দেশজ গন্ধ গায়ে মেখে তাঁরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাজা বীর সিংহ, মধুকর শাহ, ছত্রসালের এই রাজ্যে।
সবকিছুর পরেও কোনও মেঘমেদুর দিনে, বিষণ্ণ সন্ধ্যায়, একা ট্রেনের জানলায় বসে সূর্যাস্তের পড়ন্ত আলোয়, সন্ধ্যে হব-হব মুহূর্তে ওরছার ওই বেতোয়া নদী, মলিন, ধূসর রাজপথ, জীর্ণ রাজপ্রাসাদ, কাঞ্চনঘাটের ছত্রি মন মেদুর করে তুলবে, অথচ যেখানে নেই কোনও রাজকীয়তা, বাহুল্য — দাঁড়িয়ে আছে শুধু কথা বলা ইতিহাস।
লেখিকা পেশায় শিক্ষিকা। পড়ানো ও পড়ার পাশাপাশি কবিতার প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ; মনের আনন্দে মাঝেমধ্যে আবৃত্তিও করেন। ছাত্রছাত্রী, বন্ধু কিংবা পরিবারের সঙ্গে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন ভ্রমণে। ক্লাসিক ও সমকালীন সাহিত্য — দুই ক্ষেত্রেই তাঁর সমান আগ্রহ। তাঁর ভাবনায় ইতিহাস ও সাহিত্য সমান্তরালভাবে চলে। মনে ছায়া ফেলা অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে শব্দে বেঁধে রাখতেই তাঁর লেখালেখি।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।